সোমবার, এপ্রিল ২২

সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার পেলেন সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়

সন্দীপন চক্রবর্তী

এই বছর — তাঁর ‘খেলনাবাটির দিন শেষ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য — বাংলায় সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার পেলেন শূন্য দশকের এক উজ্জ্বল কবি সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। অনূর্ধ্ব ৩৫ নবীন লেখকদের জন্যই এই পুরস্কার। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্রাজ্ঞী বর্তমানে বাংলা পড়ান কলকাতার আমেরিকান ইন্সটিটিউট অফ ইণ্ডিয়ান স্টাডিজে। পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার, সুবীর মণ্ডল স্মৃতি পুরস্কার। ২০১২-য় আমন্ত্রিত হয়েছেন সাহিত্য আকাদেমির ইয়ং রাইটার্স ফেস্টিভ্যালে। ২০১৭-য় সাহিত্য আকাদেমির ইয়ং অথর’স ট্র্যাভেল গ্রান্ট নিয়ে গেছেন ভুবনেশ্বর।

২০১০-এ তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘বৃষ্টিরাশির মেয়ে’ প্রকাশ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই তা কবিতা-পাঠকদের মন কেড়ে নেয়। তারপর একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে ‘বেহায়া একুশি’, ‘খেলনাবাটির দিন শেষ’, ‘হয় প্রেম, নয় রাজনীতি’, ‘মৃত কথকের জার্নাল’, ‘পৃথিবীর বাইরের শহরে’। এবং ক্রমেই শূন্য দশকের সেরা কবিদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সম্রাজ্ঞীর লেখায় ভিতরের ক্ষরণের সঙ্গে সঙ্গে পরতে-পরতে জড়িয়ে যায় সমাজ আর রাজনীতি। মেয়েদের বর্তমান সামাজিক অবস্থান আর তার নানা যন্ত্রণা ছায়া ফেলে যায় বারবার। কিন্তু শুধু অভিযোগ নয়, তাঁর লেখায় এর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে এক তীব্র ভালোবাসার টান। আসলে, তীব্রভাবে ভালোবাসেন বলেই তো এত অভিমান আর অভিযোগ! যাপনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর সম্পর্কের রসায়নই তাঁর কবিতার মূল ভরকেন্দ্র। সেজন্যই খুব সহজে তাঁর লেখায় বাইরের দিকে ঘোরানো মুখটি মিশে যেতে পারে ভিতরের দিকে ঘোরানো মুখের সঙ্গে। লেখার থেকে যাপন তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে বলেই, খুব সহজে বলতে পারেন – ‘সারাদিন কাটে লেখা ফিরে যায়, পাপ ভরে আছে বুকে / উঠোনের ইট ভেঙে পড়ে যায়, গাছ বেড়ে ওঠে সুখে’।

তীব্র আলোর ঝলকে যখন ঝলসে যাচ্ছে আমাদের চোখ, বিজ্ঞাপনে মুখ ঢাকারও সময় পেরিয়ে এসে বিজ্ঞাপনটাই হয়ে উঠছে মুখ, তখন খুব ধীরভাবে সম্রাজ্ঞী অভিশাপ দিতে পারেন – ‘অসহ্য এক আলোয় ভরুক তোমার ঘুম / চাইলে যেন না পাও তুমি অন্ধকার’। যখন আমরা ভাবছি যে পৃথিবী গুটিয়ে চলে এসেছে মুঠোর মধ্যে, তখন তিনি দেখেন ‘এভাবে ঝাপসা আলো, এত এত চ্যাটবক্স স্ক্রিনে’, টের পান – ‘নিজেকে দেখিনি আমি, মনে হয় রঙ খুব ফিকে / আমি তাই দূর থেকে চলে যাচ্ছি দূরত্বের দিকে!’ তাঁর কবিতায় বেজে ওঠা এসব ‘নিঃশব্দ সুরের ইশারা’, যখন ঝালায় ওঠে, তখন এই তিনিই আবার লিখতে পারেন – ‘গঙ্গাজল নেই কোনো, ঋতু-রক্ত রাখা রইল কলসিতে…’। টের পান – ‘খেলনাবাটির দিন শেষ / চল… / আজ থেকে সাপ লুডো খেলি’। খুব ভিতর থেকে দেখার এক চোখ জেগে থাকে সম্রাজ্ঞীর লেখায় – ‘কাকে বলে সততা? / কাকে বলে রীতি? / যোগ বলো, সম্পর্ক বলো… / সব-ই তো শেষ পর্যন্ত / হয় প্রেম নয় রাজনীতি’।

Shares

Leave A Reply