বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

মাকালু অভিযানে ‘ইয়েতি’র পায়ের ছাপ! ভারতীয় সেনার দাবি ঘিরে প্রশ্নে উত্তাল নেট দুনিয়া

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিমালয়ের মাকালু পর্বতশৃঙ্গ অভিযানে গিয়ে বরফের উপর কিছু বিশালাকৃতির পায়ের ছাপ দেখে, সেগুলি ইয়েতির পায়ের ছাপ বলে দাবি করে টুইট করল ভারতীয় সেনা! প্রশ্ন উঠেছে, সেনার তরফে কী করে এমন ভিত্তিহীন বক্তব্য পেশ করা সম্ভব! সেনা অবশ্য সে সন্দেহ উড়িয়ে দিয়ে দাবি করছে, ইয়েতি সম্পর্কিত যাবতীয় ছবি ও ভিডিও খুব তাড়াতাড়ি প্রকাশ্যে আনবে তারা।

শুধু তা-ই নয়। ইতিমধ্যেই নিজেদের বক্তব্যের সপক্ষে টুইটে কিছু ছবি প্রকাশ করেছে সেনা। তাতে দেখা যাচ্ছে, বরফের উপরে বেশ বড় বড় ছাপ পড়ে রয়েছে। দেখে পায়ের ছাপ বলেই মনে হয় সেগুলি। যে প্রাণীরই হোক না কেন, সোজা একটা সরলরেখা ধরে এগিয়ে গিয়েছে সেই পায়ের ছাপগুলি। নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে, বেশ কিছুটা তফাতে পড়েছে এক একটা ছাপ, বরফের উপর তৈরি হয়েছে গভীর চিহ্ন।

টুইটারে এই ছবিগুলি প্রকাশ করা হয়েছে সেনার জনসংযোগ বিভাগের তরফে। তাতে বলা হয়েছে, ৯ এপ্রিল সেনার পর্বতারোহণ অভিযানের একটি দল নেপাল-চিন সীমান্তের মাকালু বেস ক্যাম্পের পাশে এই রহস্যময় পায়ের ছাপ দেখতে পায়। ওই টুইটে দাবি করা হয়েছে, এক একটি পায়ের মাপ লম্বায় ৩২ ইঞ্চি এবং চওড়ায় ১৫ ইঞ্চি। শুধু তা-ই নয়। ওই টুইটে লেখা হয়েছে, মাকালুর এই বরুণ জাতীয় উদ্যানে এর আগেও ইয়েতির দেখা মিলেছে বলে শোনা যায়!

দেখুন সেই টুইট।

বস্তুত, ইয়েতি নামের একটি কাল্পনিক প্রাণীকে নিয়ে জল্পনার শেষ নেই বহু বছর ধরেই। শোনা যায়, হিমালয়ের গহিন তুষাররাজ্যে একা ঘুরে বেড়ায় বিশাল এক দৈত্যাকৃতি প্রাণী। টিনটিনের গল্প থেকে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সিনেমা– বারবার এই ইয়েতির কথা উঠে এলেও, আজ অবধি কেউ যে তাকে সরাসরি চোখে দেখেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বরং পর্বতারোহী মহল, যাঁরা হিমালয়ের নানা প্রান্তে অভিযান করেন, তাঁরা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন এই প্রাণীর উপস্থিতি। বরং এই ধরনের কল্পনার পিছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়েছেন তাঁরা। কেউ বলেছেন, বেশি উচ্চতায় অনেক সময়েই ভাল ভাবে মাথা কাজ করে না, হ্যালুসিনেট করেন অভিযাত্রীরা। তখন এই ধরনের প্রাণী ধরা দেয় কল্পনায়।

কেউ আবার বলেছেন, পাহাড় আসলে প্রকৃতির চরমতম দুর্গম একটা জায়গা। সেখানে মানুষ ভয় পায়, নিজেকে ক্ষুদ্র ভাবে। সেই চিন্তা থেকেই অতিপ্রাকৃত কোনও কিছুর অস্তিত্বের উপরে বিশ্বাস জন্মে যায় মানুষের।

তবে বিজ্ঞানী বা পর্বতারোহীরা যতই অস্বীকার করুন, নেপাল বা তিব্বতের পাহাড়ি গ্রামগুলিতে, শেরপাদের বসতিগুলিতে সাধারণ স্থানীয় মানুষ ভীষণ ভাবে বিশ্বাস করেন ইয়েতির অস্তিত্বের কথা। তাঁরা মানেন, পাহাড়ের গভীরে রাজত্ব করে ইয়েতি।

আধুনিক শেরপারা অবশ্য এমনটা আর বিশ্বাস করেন না মোটেই। তাঁরা বলেন, পাহাড়ি মানুষদের কাছে পাহাড় ঈশ্বর-সম। তাঁরা পাহাড়কে শ্রদ্ধা করে, ভয় পায়, পুজো করে। বিশ্বাস করে, পাহাড়ের কন্দরে এমন কিছু অতিপ্রাকৃত জীববৈচিত্র্য আছে, তাদের বিরক্ত না করাই ভাল। পাহাড়ের রহস্য সম্পূর্ণ ভাবে মানুষের কাছে আজও ধরা দেয়নি বলেই বিশ্বাস করেন তাঁরা। তাই সেই না-ধরা-দেওয়া কল্পজগতেই ইয়েতির মতো প্রাণী স্থান পায় ভয়াল রূপে।

কিন্তু মানুষের কল্পনায় এই ইয়েতির চেহারা কী রকম? পাহাড়ের মানুষেরা বলেন, ইয়েতিকে দেখতে নাকি বিশাল গোরিলার মতো। হিমালয়ের অনেক গভীরে রহস্যজগতে বাস করে সে। পাহাড়ি লোককথায় সে যতই ধরা পড়ুক, সে নাকি মানুষের চোখে কখনও ধরা দেয় না।

প্রায় ২০০ বছর আগে থেকে বহু মানুষ বিশালাকৃতির দু-পেয়ে প্রাণীকে হিমালয়ের বরফের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছেন বলে দাবি করলেও, কোনও দাবির সপক্ষেই সত্যতা প্রমাণ করা যায়নি। বারবারই দাবি উঠেছে ইয়েতির অস্তিত্বের, কিন্তু যুক্তি আর বিজ্ঞানের কাছে বারবার পরাজিত হয়েছে সেই দাবি।

কিন্তু এবার সেই ইয়েতি নিয়েই নজিরবিহীন এক দাবি করে প্রশ্ন তুলে দিল ভারতীয় সেনা। সে দাবি নিশ্চয় খতিয়ে দেখবেন বিজ্ঞানীরা। সেনা জানিয়েছে, তারা এই সম্পর্কিত আরও কিছু ছবি ও ভিডিও সামনে আনবে।

কিন্তু যত দিন না তা আনছে, তত দিন প্রশ্ন থেকেই গেল, বিনা প্রমাণে এমন যুক্তিহীন দাবি কী করে উঠতে পারে ভারতীয় সেনার তরফে। এবং সেই সঙ্গে এটাও ভাবার বিষয়, অত বড় মাপের পায়ের ছাপগুলি আসলে কার!

তবে ইথিমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন নেটিজেনরা। আর স্বাভাবিক ভাবেই তাতে মজার মন্তব্যের শেষ নেই। কেউ বলেছেন, মোদীজিকে ভোট করাতে গুহা থেকে বেরিয়ে এসেছে ওই ইয়েতি। কেউ আবার বলেছে, ইয়েতিটা নিশ্চয় চৌকিদার ইয়েতি, তাই তাকে দেখতে পেয়েছে ভারতীয় সেনা। কেউ আবার তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, কোনও বিশেষজ্ঞের মতামত না নিয়ে এরকম একটা পোস্ট করা মোটেই উচিত হয়নি সেনার।

কেউ আবার বিশেষ রকমের জুতো পরা অভিযাত্রীর ছবি দিয়ে লিখেছেন, এটাই এত বড় পায়ের ছাপের ব্যাখ্যা, ইয়েতি বলে কিছু হয় না।

দেখুন সেই উত্তর।

Comments are closed.