বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

দীর্ঘ লড়াইয়ের পরে এসেছে মাতৃভাষার অধিকার, একে আগলে রাখতে হবে চর্চা দিয়েই

সজীব ঘোষ মণ্ডল (শিক্ষক, বগুড়া)

প্রতিটি মানুষের জীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের পরিচয়েরই সেরা কষ্টিপাথর হল মাতৃভাষা। ১৯৪৭ সালের অগাস্ট মাসে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির উপর আঘাত হানা শুরু করে। প্রথম এই আঘাত আসে মাতৃভাষার উপর। পুরো পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা হওয়া সত্বেও সংখ্যালঘু মাত্র ৩.২৭% জনগোষ্ঠীর ভাষা উর্দুকে তারা রাষ্টভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায়।

পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ‘তমদ্দুন মজলিশ’ গঠিত হয়। এটিই ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগঠন। তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে ভাষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপদানের জন্য ৪৭-এর ডিসেম্বরে গঠিত হয় প্রথম রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদ। কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদেের প্রথম অধিবেশনে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে অধিবেশনের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি জানান। কিন্তু মুসলিম লীগের সকল সদস্য এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে। এই ঘটনায় পূর্ব বাংলায় ছাত্র সমাজ ব্যাপক ভাবে প্রতিবাদ করতে থাকে।

১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলি জিন্না ঘোষণা করেন, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্টভাষা।’ উপস্থিত ছাত্রেরা তীব্র স্বরে আপত্তি জানায়।

এই সময় থেকেই সারা পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান ঢাকায় এসে বক্তৃতা দেওয়ার সময়ে আবার উর্দুকে রাষ্টভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমউদ্দিন।১৯৫২ সালে ঢাকায় বক্তব্যে তার কন্ঠে জিন্নার প্রতিধ্বনি হলে ভাষা আন্দোলন বড় এক আকার ধারণ করে।

যার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০ জানুয়ারি সভা ও ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বান করে। ৩১ জানুয়ারি আওয়ামি মুসলিম লিগ সভাপতি মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানির সভাপতিত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সর্বদলীয় সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এই সভায় একুশে ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল বার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সময়ে হঠাৎ করে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল ইসলাম ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের সভা সমাবেশ বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে।

তার পরেও ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (বর্তমানে মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে) ছাত্রদের সভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে ছোট দলে মিছিল বার করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ছাত্রছাত্রীরা রাষ্টভাষা বাংলা চাই স্লোগান দিয়ে মিছিল বার করলে পুলিশ তাঁদের ওপর লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। ছাত্রছাত্রীরাও পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল ছোড়ে। সে সময় গণপরিষদে অধিবেশন চলছিল। ছাত্রছাত্রীরা গণপরিষদের দিকে এগোতে থাকলে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়।

পুলিশের গুলিতে শহিদ হয় আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন, আবুল জব্বার। আব্দুস সালাম সেই দিন গুলি খেয়ে ৭ এপ্রিল শহিদ হন। বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে পরের দিন, ২২ ফেব্রুয়ারি গণবিক্ষোভ শুরু হয়। জনতা শোক মিছিল বার করলে পুলিশ আবারও মিছিলে গুলি চালায়। শফিউর রহমান-সহ আরও কয়েক জন শহিদ হন।

ঘটনাস্থলে সেইস্থানে ছাত্ররা সারারাত জেগে ২৩এ ফেব্রুয়ারি একটি স্মৃতিস্তম্ভ বা শহিদ মিনার নির্মাণ করে। পরে পুলিশ শহিদ মিনারটি ভেঙো দেয়। ১৯৬৩সালে অস্থায়ী শহিদ মিনারের জায়গায় শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশা ও পরিকল্পনায় পাকাপাকি শহিদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়।

তার পরেও ভাষা আন্দোলন অব্যাহত ছিল। এই আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ বাংলাকে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতি রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।২০০০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে এই দিনটি সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

ভাষা একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ভাষা হচ্ছে সব চেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এখন আমাদের তথা তরুণ সমাজের করণীয় হলো, মাতৃভাষার শক্তি বাড়িয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষায় সংস্কৃতিতে নতুন শতকের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি– সকল ক্ষেত্রে মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব মসনদে উঁচু আসনে বসানোর জন্য বর্তমান প্রজন্মের এগিয়ে আসা অত্যাবশ্যকীয়।

Comments are closed.