সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

বাবা-মা তার সামনে কোনও ভূত বা ভগবানকে এনে দেয়নি কোনও দিন, শুধু দু’হাত ভরে রবীন্দ্রনাথ দিয়েছেন

রিনি

বেহালা চৌরাস্তায় বড় রাস্তাটা যেখানে নিরিবিলি গলির মধ্যে ঢুকেছে, সেখানেই, সেই মধ‍্যবিত্ত পাড়াতেই, দু’কামরার এক আনকোরা সংসার। কর্তা, গিন্নি আর তাদের একরত্তি মেয়ে। সে দিন অন্য দিনের মতোই সকাল থেকে হুলস্থুল! ভোর ভোর উঠে প্রতিদিন মেয়েকে ইস্কুল পাঠানো, তাপ্পর ঘরকন্নার হাজারো জগঝম্প সেরে আপিস! হুলুস্থুল হবে না তো কী! তার উপর ওই একরত্তি মেয়ের পু‌ঁচকে ইস্কুলে আজ আবার ফাংশন! তাকে শাড়ি পরিয়ে, টিপ পরিয়ে, কোমরে ওড়না বেঁধে মা সাজিয়ে দিল! গত ক’টা দিন মায়ের কাছে নাচ শিখেছে কন‍্যে! আজকের জন‍্য‌ই!

আজ এক জনের জন্মদিন! তিনি এই মেয়েটার বড় চেনা! কখনও মা তাঁর গান গেয়ে ওঠে, কখনও বাবা হাতে ব‌ই নিয়ে তাঁর কবিতা পড়ে! আর ওই খুদে ছানা‌ও কিচ্ছুটি না বুঝে, কেবলমাত্র মা-বাবার দেখাদেখি কখনও গান কখনও বা সেই সব কবিতা শিখে নেয়! তবে জীবনের প্রথম অনুষ্ঠানে সে সে সব কিছুই করেনা, সে নাচ করে! তিন তিনটে গানের সঙ্গে! “দারুণ অগ্নি বাণে রে”, “শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন”, আর একটা যেন কোন গান!! নাহ্ মনেই আসেনা! মনে আসার কথাও তো নয়! তার বয়স তখন মাত্র তিন!

সে বার মায়ের অফিসের লেডিস ক্লাব তাদের অ্যানুয়াল প্রোগ্রামে “শাপমোচন” করবে! মা অফিস থেকে ফিরে গীতবিতান খুলে গান করতে বসে! রাতে বাড়ির ফিলিপ্সের রেকর্ড প্লেয়ারে মেয়ে প্রথম শোনে অরুণেশ্বর আর কমলিকার গল্প! ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে তার ক’দিন পরেই সে প্রথম দেখবে “শাপমোচন”! ‘দে পড়ে দে আমায় তোরা’, বা ‘সে দিন দু’জনে’ শুনলে সে দিন থেকে আজও মেয়েটার চোখের সামনে সে দিনের সেই ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের সন্ধ‍্যে! তিন দশক পেরিয়েও যে সন্ধ্যের জৌলুস এক ফোঁটাও মলিন হয় না!

মা সে দিন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি এসেছে। ঝুপ করে লোডশেডিং হ‌ওয়ায় তখন চার পাশে ঘুটঘুট্টি অন্ধকার! অন্ধকার মেয়েটার একটুও ভালো লাগে না, কিন্তু ওই অন্ধকার সন্ধ‍্যেটা তার বড় মনে লেগে থাকে, ভালো লেগে যায়। সে দিনই যে সে মায়ের কাছে শিখেছে “জোনাকি কী সুখে ওই ডানাদুটি মেলেছো!”

মা এক এক দিন নিজের মনে গেয়ে ওঠে ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’, ‘চরণধ্বনি শুনি তব নাথ’, ‘এই লভিনু সঙ্গ তব’, ‘ভরা থাক স্মৃতি সুধায়’ আরো কত কত গান…. আর এই সব গান মেয়েটার মনের মধ্যে লেপ্টে যায় বিনা আয়াসে!

ছোট ইস্কুল পেরিয়ে তত দিনে সে মাঝারি ইস্কুলে! ক্লাস টু নাকি থ্রি?! ‘সহজ পাঠ’ পেরিয়ে ‘তালগাছ’, ‘বিজ্ঞ’ হয়ে তখন সে পৌঁছে গেছে ‘দুঃসময়’-এ! পাড়ার অনুষ্ঠানে আরও বেশ কিছু কচিকাঁচার সঙ্গে তার‌ও সে বার আবৃত্তি! যদিও মুখস্থ, তবু সম্ভবত মা-ই কবিতাটা লিখে দিয়েছে বড় একটা কাগজে! সটান দাঁড়িয়ে দুই হাত পেছনে দিয়ে, মাইকের সামনে কবিতা বলতে বলতেই মেয়ের খেয়াল হয়, যাহ্ কাগজটা তো দেখে বলা হল না! গম্ভীর মুখে মাঝপথে কবিতা থামিয়ে সে হাতের মুঠোয় রাখা ভাঁজ করা কাগজ খোলে! এবং তার সে কী পরিতৃপ্তি! যাক্, শেষ পর্যন্ত চার-ছ’লাইন অন্তত দেখে বলতে পেরেছে ! এই করতে গিয়ে যে মাঝপথে তাকে থেমে যেতে হয়েছে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ কিন্তু তার নেই! আর সবাই যদি এই নিয়ে হেসে থাকে, তাতে তার ভারী বয়েই গেল!

মেয়েটার বাড়িটা বেশ অদ্ভুত! লোকসংখ‍্যার চেয়ে সেখানে ব‌ইয়ের সংখ্যা কয়েকশো গুণ বেশি! মাথাপিছু যত ব‌ই সেখানে আছে, তার সব পড়ে শেষ করতে গেলে যে “ইহজীবন কম পড়িবেক”, তা মেয়েটা বোঝে! মা-বাবা কোনও দিন ব‌ইয়ে হাত দিতে বারণ করে না, ফলে এর মধ‍্যেই কাচে ঢাকা যে ব‌ইয়ের আলমারি, তার একটা তাকে তার অনায়াস বিচরণ! রচনাবলী নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে সে এভাবেই খোঁজ পায় ছোটগল্পের!

যখন সে ইস্কুলের বড় ক্লাসে, তখন এখান থেকে ব‌ই নিয়েই সে প’ড়ে ফেলে “গোরা” আর “শেষের কবিতা”। এ ছাড়া বাবার মুখে শোনা কবিতা, মায়ের গাওয়া গান আর পাঠ‍্য গদ‍্য-পদ‍্য ইত্যাদি তো আছেই! আষ্টেপৃষ্ঠে তত দিনে তাকে বেঁধে ফেলেছেন মেয়েটির প্রাণের ঠাকুর! আর কোন ঈশ্বর তার কোনও দিন ছিল না। বাবা-মা তার সামনে কোনও ভূত বা ভগবানকে এনে দেয়নি কোনও দিন। শুধু দু’হাত ভরে রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছে। খোলামেলা সেই ছোটবেলার রবি ঠাকুর, মেয়েটির সঙ্গেই বড় হয়েছেন। আনন্দে-দুঃখে, সাফল্যে আর ব্যর্থতায়; সচেতন ভাবে আঙুল দিয়ে তাঁকে চিনিয়ে দিতে হয়নি, চার পাশে সব কিছুর মধ্যেই তিনি বড্ড বেশি করে মিলেমিশে থেকেছেন সব সময়! অহেতুক সমীহ করে তাঁকে দূরে রাখতে হয়নি বলেই মেয়েটা তাঁর মধ্যেই থাকতে পেরেছে আজও!

সে দিন থেকে আজ, কেবল এই এক জন‌ই মেয়েটির ভরসা….ঘুরে ফিরে তাঁর কাছেই বারেবারে ফিরতে চাওয়া! জীবনের অর্ধেক পথ (নাকি তার বেশি!) পেরিয়ে মেয়েটা বুঝতে পারে, আর কিচ্ছু না হলেও সে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। মেয়েটা মাঝেমধ্যে ভাবে ভাগ্যিস উত্তরাধিকার সূত্রে সে এই নিঃশর্ত সমর্পণ শিখে নিতে পেরেছিল! না হলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তার যে কিছুই রেখে যাওয়ার থাকত না।

এখন আছে। একমাত্র সন্তানকে সে আর কিচ্ছু দিতে চায় না, এই ‘সমর্পণ’টুকু ছাড়া!

Comments are closed.