বুধবার, মার্চ ২০

দশ বছর পরে রোমিও পেল জুলিয়েটকে! বেঁচে গেল বিলুপ্তপ্রায় এক আস্ত প্রজাতি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সব চেয়ে বেশি জনপ্রিয় প্রেমের গল্পগুলিতে মিলন হয় না প্রেমিক-প্রেমিকার। বিচ্ছেদে বা বিরহেই শেষ হয় জীবন। এই প্রেমও তেমনই হতে চলেছিল। কিন্তু তা যদি সত্যিই হতো, তা হলে বাস্তুতন্ত্রে বেশ সমস্যা হয়ে যাচ্ছিল। জীবজগতের গোটা একটা প্রজাতি শেষ হতে বসেছিল। রোমিও যে কিছুতেই তার জুলিয়েটকে খুঁজে পাচ্ছিল না! শেষমেশ খোঁজ মিলল জুলিয়েটের। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন জীববিজ্ঞানীরা। কারণ রোমিও এক বিরল প্রজাতির ব্যাং। দশ বছর ধরে নিঃসঙ্গ অবস্থায় থাকা এই ব্যাংটিকে নিয়ে দুর্ভাবনার অন্ত ছিল না এত দিন।

বলিভিয়ার একটি দিঘিতে বেড়ে ওঠা বিশেষ সেহুয়েনকাস প্রজাতির ব্যাং রোমিওর বৈজ্ঞানিক নাম টেলমাটোবিয়াস উরাকেয়ার এত দিন জীববিজ্ঞানীরা মনে করেছিলেন, সেহুয়েনকাস প্রজাতির আর কোনও ব্যাঙই বেঁচে নেই পৃথিবীতে। ফলে ওই প্রজাতির পুরুষ ব্যাং রোমিও একলা অবস্থায় মারা গেলে, গোটা প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের স্বস্তি দিয়ে, সম্প্রতি পাওয়া গিয়েছে একই প্রজাতির এক নারী ব্যাং। নাম তার অবশ্যম্ভাবী ভাবেই জুলিয়েট। জুলিয়েটকে পেয়ে জীববিজ্ঞানীদের মতোই খুব খুশি রোমিও নিজেও।

প্রায় এক দশক আগে রোমিওকে বলিভিয়ার ‘ক্লাউড ফরেস্ট’ থেকে উদ্ধার করেন বিজ্ঞানীরা। সারা বছর মেঘে ঢেকে থাকার জন্য বলিভিয়ার ওই জঙ্গলকে ক্লাউড ফরেস্ট বা মেঘ অরণ্য বলা হয়। রোমিওর স্বজাতির সঙ্গী ব্যাঙেরা তখন ছত্রাকজনিত এক মারণ রোগে আক্রান্ত। বিজ্ঞানীরা ওই অবস্থায় রোমিওকে তুলে আনেন সংরক্ষণাগারে। ভাবা হয়েছিল, তাকে বাঁচিয়ে তুলে, যোগ্য ‘পাত্রী’ খুঁজে বার করা হবে। পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হতে বসা তার প্রজাতিকে রক্ষা করবে রোমিও ও তার বংশধরেরা।

কিন্তু এমনটা ভাবলেও, বাস্তবে তা সহজ হল না। মিলল না ওই প্রজাতির কোনও ব্যাং। দশ বছর ধরে জুলিয়েটকে খুঁজে না পেয়ে, হাল ছেড়ে দিয়ে রোমিওকে দেওয়া হয় ‘নিঃসঙ্গ ব্যাং’-এর তকমা। ‘রোমিও, দ্য ওয়ার্ল্ডস লোনলিয়েস্ট ফ্রগ’ নামে একটি টুইটার অ্যাকাউন্টও খোলেন বিজ্ঞানীরা। সেই সঙ্গে ‘ম্যাচ ডটকম’ নামে আর একটি প্রোফাইল খোলা হয়। রোমিওর অসহায় অবস্থা দেখে সাহায্যের হাত বাড়ান অনেকে। ওঠে ২৫ হাজার ডলার অর্থও। সেই অর্থ দিয়ে রোমিওর জন্য জুলিয়েট খুঁজে আনতে আয়োজন করা হয়েছিল ‘ক্লাউড ফরেস্ট’ অভিযান। জুলিয়েটের খোঁজ আনতে পারলে বড় অঙ্কের পুরস্কারও ঘোষণা হয়েছিল।

জুলিয়েট।

শেষমেশ অবশ্য খালি হাতে ফিরতে হয়নি বিজ্ঞানীদের। তবে খুব সহজেও পাওয়া যায়নি তার খোঁজ। জীব বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ধরনের ব্যাং জলের নীচে থাকে। ফলে রোমিওর সঙ্গী খুঁজতে সমুদ্রের গভীর পর্যন্ত পাড়ি দিতে হয়েছে গবেষকদের। গবেষক দলের এক সদস্য টেরেসা কামাচো বাদানি বলেন, “আমরা খুঁজতে খুঁজতে রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তবু হাল ছেড়ে দেওয়ার আগে ভেবেছি আর একটু খুঁজে দেখা যাক!” এক সময়ে একটি ব্যাং পাওয়া যায়, কিন্তু সেটা এই নির্দিষ্ট প্রজাতির নয়। কিন্তু ওটাকেই অনুসরণ করে গবেষক দলটি। শেষমেশ, আরও খানিক খোঁজার পরে নির্দিষ্ট প্রজাতিটি খোঁজ মেলে। তবে তাতেও অবশ্য কাজ হয়নি। কারণ সেটা ছিল পুরুষ।

টেরেসা কামাচো বাদানি

টেরেসা কামাচো বাদানি আরও বলেন, “পরের দিন আমরা আবার ওখানে যাই। যদি কিছু পাওয়া যায়! এবং ঠিক তা-ই হয়। ওখানে সে দিন চার-চারটি ব্যাং পাই আমরা। দু’টো পুরুষ এবং দু’টো নারী। দু’টো নারী ব্যাঙের মধ্যে একটিকে আমাদের উপযুক্ত মনে হয়। তখনই সবার আগে ওটার নাম দেওয়া হয় জুলিয়েট। অন্য ব্যাংটির বয়স কম। এখনও তার প্রজনন ক্ষমতা তৈরি হয়নি।”

এভাবেই খোঁজ চলে ক্লাউড ফরেস্ট জুড়ে।

সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে রোমিওর জুলিয়েট খুঁজে পাওয়ার এই কাহিনি। নেটিজেনদের কেউ কেউ বলছেন, ২০১৯-এ তাঁরাও এভাবেই নিজেদের সঙ্গী খুঁজে পাবেন। টুইটারেও রোমিওর অ্যাকাউন্ট নামের পাশে এখন যোগ করা হয়েছে, নো লঙ্গার। অর্থাৎ এখন আর একলা নেই সে।

বিজ্ঞানীরা অবশ্য জুলিয়েটকে একা নয়, সব ক’টি ব্যাংকেই ধরে এনেছেন। ফলে সেহুয়েনকাস প্রজাতির পাঁচ-পাঁচটি ব্যাঙ এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে বলিভিয়ার ‘আলকাইড ডি’অরবিনি ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম’-এ। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, পথিবী থেকে সেহুয়েনকাস প্রজাতির বিলুপ্তি রোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই রোমিও-জুলিয়েট জুটি।

বিশেষজ্ঞদের আশা, রোমিও জুলিয়েট একে অন্যকে নিশ্চয় পছন্দ করবে। দ্রুতই বদলে যাবে তাদের ‘রিলেশনশিপ স্টেটাস’। প্রকৃতির নিয়ম মেনে সন্তানও আসবে। তবে সেই সন্তানদের ফের ক্লাউড ফরেস্টেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। 

মেঘ অরণ্যে নিজেদের বাসভূমিতেই বড় হবে তারা, রক্ষা করবে বিলুপ্তপ্রায় এক প্রজাতিকে।

Shares

Comments are closed.