সোমবার, এপ্রিল ২২

উৎসব

ধরা যাক একটা ফোন এলো। রিও থেকে রাজারহাটে। কিংবা ধরুন, বার্লিন থেকে বাঁকুড়া। একটাই বিনীত প্রশ্ন, ভাই রে,  তোদের এত ফূর্তি কেন?  তোরা তো ত্রিসীমানারও তিরিশ যোজন বাইরে! আমোদগেড়ে কোথাকার!

যাকে বলা হল,  সে কিন্তু এই তির্যক কটাক্ষ গায়েই মাখল না। সে ততক্ষনে উৎসবে বুঁদ। শারদীয়ার চেয়ে অনেক অনেক লম্বা। এক মাসব্যাপী দিবা রাত্রির কাব্য।

বাঙালির কাছে ফুটবল সত্যিই এক কবিতা। আবেগ আর রোমান্টিকতার ককটেল। দেশ কখনও বিশ্বকাপ খেলবে,  এমন স্বপ্ন অতি বড় উন্মাদও দেখে না। কিন্তু তাতে কিচ্ছু এসে যায় না। আনন্দে একটুও ভাটা পড়ে না। বরং আন্তরিক ভাবেই বাঙালি আন্তর্জাতিক হয়ে যায়। একেকটা দেশের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে ফেলে। নেহাত আটপৌরে পাড়াকেও নীল সাদা বা হলুদ সবুজে রাঙিয়ে দিতে হাত মেলায় আট থেকে আশি।

আশির দশকের গোড়া থেকে আমবাঙালির বিশ্বকাপ দর্শনের সূত্রপাত। সেই এসপানা ৮২। সেই সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে টাই ব্রেকারে হেরে গিয়ে মিশেল প্লাতিনির বিধ্বস্ত মুখ। সেই পাওলো রোসি নামে সুযোগসন্ধানী গোলশিকারী। তখন তো সাদা কালোর যুগ। রং বোঝা না গেলেও হাসিকান্না তো বোঝা যায়! তার চার বছর পরে মেক্সিকো, মাতিয়ে দেওয়া মারাদোনা। সেই ‘ঈশ্বরের হাত’  দিয়ে দিয়েগোর গোলের পরে লাজুক মুখ। ধরা পড়েছিল সাদা কালো পর্দাতেই। নব্বই থেকে শুরু হলো রঙের অভিযাত্রা। কত মধ্যবিত্ত পরিবার মাসে মাসে টাকা জমিয়ে জোগাড় করলো ‘কালার টিভি’র রসদ।

তিন দশক পরে এখন টিভি নিয়ে সেই আদিখ্যেতা মাতামাতির পরিস্থিতি নেই। আধুনিক প্রজন্মের টানা বসে টিভি দেখার সময়ও নেই। সে বরং স্মার্ট ফোনে টিভি প্রোগ্রামের নাতিদীর্ঘ ক্লিপ দেখতেই বেশি সচ্ছন্দ। কিন্তু বিশ্বকাপ তো বিশ্বকাপ। এ তো শুধু খেলা দেখা নয়। উৎসবের আমেজ নেওয়া। তাই আগের মতো না হলেও টিভির বাজারে আলোড়ন তুলছে মস্কো,  সেন্ট পিটার্সবুর্গ।

আগামী এক মাস পাড়ার নাম বদলে যাবে। পাল্টে যাবে মহল্লার পরিচয়। মেসি, নেইমার,  ইনিয়েস্তা,  রোনাল্ডোরাই দখল নেবে শহর,  নগর,  গ্রাম-গঞ্জের। গভীর রাতে শুতে গিয়ে আবার পরের সকালের অপেক্ষা। নিরন্তর অঙ্ক কষা,  হিসেব নিকেশ। উল্লাস আর দীর্ঘশ্বাস।

আগামী তিরিশ দিন এক স্বতন্ত্র রোজনামচা।

Shares

Leave A Reply