দিবসজুড়ে পার্কসার্কাস-শাহিনবাগের আঙিনায় খোদাই করি সংখ্যালঘুর নারীবাদ

পরিসংখ্যান বলছে, এ দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের মধ্যে ৯৭.৮ শতাংশ নারীই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুমনা রহমান চৌধূরী

    ২০২০ সালে ভারতবর্ষের একজন বাসিন্দা, ধর্মসূত্রে এবং লিঙ্গসূত্রে সংখ্যালঘুদের থেকেও চূড়ান্ত নীচে যার অবস্থান, নারীদিবস নিয়ে সে ঠিক কী লিখতে পারে! যদি মানুষ হিসেবে, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে সে তার অধিকার চাইতে যায়, দেশজোড়া ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়তে যায়, দেশের সংবিধানের উপর আঘাতকে রুখতে যায়, অর্থনীতির চূড়ান্ত বেহাল অবস্থার বিরুদ্ধে কিছু বলতে যায়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে গলা তুলতে যায়, তখনই দেশবিরোধী বা পাকিস্তানি বলে ঠেলে পিছনে সরিয়ে দেওয়া হয় তাকে ইদানীং। তার পরিধেয় পোষাক দেখে আন্দোলনের জাত বিচার করা হয়। শাসকের অন্যায় কোনও নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে তার ধর্মীয় পরিচয় সামনে টেনে আনা হয়, যা দিয়ে তাকে সন্ত্রাসবাদের মদতকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নাগরিকত্ব প্রমাণের চ্যালেঞ্জ সামনে ছুড়ে দেওয়া হয়। তারপর কাগজ কেন দেখাব সেই প্রশ্ন করলে তাকে নিজের দেশেই ‘অবৈধ বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

    এহেন রাষ্ট্রীয়-সামাজিক অবস্থায় নারী দিবস নিয়ে আলাদা করে কী লেখা যায় এটা ভাবতে ভাবতেই কথাগুলো বলছি। নারী, সেটা হওয়ার আগেও তো ‘মানুষ’ শব্দটা আসে। কিন্তু পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে নারীরা মানুষ হলেও ঠিক যেন মানুষের মতো নয়। আর ধর্মসূত্রে সংখ্যালঘু হলে তো আরওই নয়। কত যে গুজব, কত যে ঘৃণা তাদের নিয়ে! সন্দেহের চক্রব্যুহে আবর্তিত হতে থাকে সারাটা জীবন।

    যাইহোক, এ অপমান চিরন্তন। একে কারও বা বিলাপ বলে মনে হয়। সে বিতর্ক পাশে সরিয়ে রেখে, আজকের দিনটায় আসি। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস। এই দিবসের প্রতিবছরই একটা প্রতিপাদ্য বিষয় বা থিম থাকে। এবছরের থিম: “I am Generation Equality: Realizing Women’s Rights.” প্রমিত বাংলায় এর অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “প্রজন্ম হোক সমতার: অনুভব হোক নারীর অধিকার।”

    এই যে সমতা শব্দটা লিখলাম, তা কি শুধুই নারী-পুরুষের সমতা, নাকি নারীদের মাঝেও শ্রেণি-সমতা? কারণ এই সমাজ ব্যবস্থায় শুধু নারী-পুরুষের মাঝেই অসমতা বিরাজ করে না, নারীতে-নারীতেও চুড়ান্ত অসমতা বহাল থাকে। যেমন একজন মানুষ বোরখা-হিজাব পরলেই কখনও কখনও অনেকের চোখে হয়ে ওঠে যৌনদাসী, পর্দার ভিতরে থাকা বিরিয়ানি ও বাচ্চা তৈরির মেশিন। অথবা শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত নারীর মাঝে যে শ্রেণিগত বিভাজন, শহুরে এবং গ্রামীণ নারীর মাঝে যে শ্রেণিগত বিভাজন, ধনী এবং গরীব নারীর মাঝে যে শ্রেণিগত বিভাজন, সেটাও তো অসমতাই!

    তাহলে ‘প্রজন্ম হোক সমতার’– এ শব্দবন্ধের মানেটা তো শুধু নারী-পুরুষের সমতাই নয়, নারীতে নারীতে অধিকারের ক্ষেত্রেও তাই। অর্থাৎ শিক্ষিত ও ধনী নারীটির মতো সমান অধিকার অশিক্ষিত ও গরিব নারীটিরও আছে। এবং বিপরীত লিঙ্গের পুরুষ নামক শ্রেণিটির মতো অবিকল একই অধিকার নারী নামক শ্রেণিটিরও আছে। এই বিষয়টা শুধু পুরুষকেই অনুভব করানোর উদ্যোগ নিলে হবে না, নারীকে নিজেও অনুভব করতে হবে।

    নারী দিবস উদযাপনের ইতিহাস বলছে, এই দিনটির পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। দীর্ঘদিনের সেই সংগ্রামকে সংক্ষিপ্ত ভাবে বলতে গেলে মনে করা যায়, ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুতো কারখানার নারী শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছিলেন মূলত তিনটে দাবি নিয়ে।

    ১) মজুরি বৈষম্য।
    ২) কাজের সময়কাল নিদির্ষ্ট করা।
    ৩) কর্মক্ষেত্রের অমানবিক পরিবেশ বন্ধ করা।

    কিন্তু রাষ্ট্র, শাসক সেদিন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের এহেন আস্পর্ধা দেখে রাগে জ্বলে উঠেছিল। ফলস্বরূপ নারী শ্রমিকদের সেই মিছিলে চলেছিল সরকারি লেঠেল বাহিনীর তাণ্ডব। পৃথিবীর ইতিহাসে নারীর নিজের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সবচেয়ে সংগঠিত এবং সংঘবদ্ধ লড়াই বোধহয় এই মার খাওয়া নারী শ্রমিকদের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। তারও অনেক পরে ১৯০৮ সালে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন, সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। এরপর ১৯১০ সালে কোপেনহাগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে বিশ্বের ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি যোগ দেন এবং এই সম্মেলনেই ক্লারা জেটকিন প্রস্তাব করেন ৮ মার্চ দিনটি ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, ১৯১১ সাল থেকে এই দিনটিকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে পালন করার। ১৯১৪ সাল থেকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ ৮ মার্চ উদযাপন করা শুরু করে। অবশেষে ১৯৭৫ সালে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে রাষ্ট্রসংঘ।

    Image result for women's day history

    এখন, আবারও আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে যদি এ দিনটার কথা ভাবি, তাহলে দেখা যায় সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয়– এই প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই নারীরা ভয়াবহ ভাবে শোষণ এবং বৈষম্যের শিকার। অথচ ভারতের সংবিধানে সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষের সম-অধিকার স্বীকৃত আছে। কর্মক্ষেত্রেও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারত ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। কিন্তু বাস্তবতা?

    বাস্তবতা হল, এদেশে ৮০ শতাংশ নারী দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে এবং সংগঠিত ও অসংগঠিত কাজ করার প্রবণতাও এই দারিদ্র সীমারেখার নীচে বসবাসকারীদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। ভারতে বিভিন্ন কলকারখানা, নির্মাণকাজ, কৃষিক্ষেত্র, গৃহ পরিচারিকা, বিড়ি বাঁধা, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি পেশায় প্রায় ৮০ শতাংশ নারী নিয়োজিত আছেন। কিন্তু শিল্পক্ষেত্র থেকে নির্মানকাজ — সব জায়গাতেই নারীরা পুরুষের চেয়ে মজুরি কম পায়। আলাদা করে কৃষিক্ষেত্রের কথা ধরা যায়। পরিসংখ্যান বলছে, এ দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের মধ্যে ৯৭.৮ শতাংশ নারীই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। এই ক্ষেত্রে আমার জন্মস্থান ও বাসস্থান করিমগঞ্জের একটা উদাহরণ দিই। করিমগঞ্জ গ্রামে সুপারির খোসা ছাড়ানোর কাজে বহু সংখ্যক নারী নিয়োজিত আছেন। এই কাজে সময় লাগে বেশি এবং একটানা বসে কাজ করতে হয়। ১০০০ সুপারির খোসা ছাড়িয়ে নারী শ্রমিকেরা সারাদিনে রোজগার করেন ৫০ থেকে ৬০ টাকা। অথচ সেই জায়গায় একজন পুরুষ দিনমজুরের দৈনিক রোজগার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

    Image result for women farmers india

    খেতমজুর হিসেবেও অসংখ্য মহিলা মাঠে কাজ করেন। তাঁদের নিজের নামে কোন জমি নেই। একই ভাবে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলা শ্রমিক যেমন নির্মাণ শ্রমিক, ঠিকে ঝি তথা অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মহিলারা স্বল্প মাইনেতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ তো গেল নিম্নবিত্ত নারীর কথা। সরকারী চাকরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরে নারীদের নিয়োগ পুরুষদের থেকে কম। প্রায় তিনভাগ পুরুষের বিপরীতে নিয়োজিত এক ভাগ নারী। খোদ ভারতীয় সেনাবাহিনীতেই মহিলা অফিসারদের কম্যান্ড পজিশনে যাওয়ার সুযোগ ছিল না এত দিন। মহিলা সেনারা তাঁদের অধিকারের দাবি তুলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে খোদ কেন্দ্র এর বিরোধিতা করে আদালতকে যুক্তি দেয় যে পুরুষ সৈন্যরা এখনও নারী কম্যান্ডারের আদেশ মানার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত নয়। অনেক লড়াইয়ের পর অতি সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সেনাবাহিনীর নারী অফিসারেরা সে যোগ্যতা লাভ করলেও যুদ্ধ বিভাগগুলোয় নিয়োজিত হওয়ার অধিকার এখনও তাঁরা পাননি।

    Image result for lady commando in indian army

    কয়েক দিন আগেই সারা দেশে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হলো সরকার তিন তালাক ব্যান করে মুসলমান মেয়েদেরও তাঁর ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’-এর আওতায় আনছেন। অর্থাৎ কিনা শুধু তিন তালাক ‘ব্যান’ করেই মুসলমান বেটিদের শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামাজিক জীবনেও সমানাধিকার এনে দিচ্ছেন। এখানেই প্রশ্ন জাগে, ইনস্ট্যান্ট তিন তালাক বা তাৎক্ষনিক তিন তালাকের হার শহুরে শিক্ষিত মুসলমান সমাজে এখন মাত্র ০.১% (বিবিসির সমীক্ষানুযায়ী)! কিন্তু প্রান্তিক গ্রামীণ মুসলমান মহিলারাই বহুল ভাবে এর শিকার হতেন, এখনও হবেন। অভাবের ঘরেই ঝগড়া-মারামারি বেশি হয়। এবং গরিব মুসলমান পুরুষটি যদি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভাবে শোষিত হয়ে থাকে, তবে গরীব মুসলমান বউটি হচ্ছে তিন ভাবে: অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে। স্বামী বাইরের রাগ এসে ঝাড়ছে বৌটির উপর কারণ বাইরে প্রতিবাদ বা রাগ করার অধিকার শাসক শ্রেণি তাকে দেয়নি। অতঃপর বাড়ি এসে বৌ ভাত দিতে কেন দেরি করছে সেটার জবাব না পাওয়ায় বৌকে ইনস্ট্যান্ট তালাক দিচ্ছে। পুত্রসন্তান কেন হচ্ছে না, সেটার জন্যও তালাক দিচ্ছে বৌকে।

    এই যখন অবস্থা, তখন মুসলমান বেটিদের শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থান, এসব বদলের কোনও উপায় না ভেবে শুধুমাত্র তিন তালাক ব্যান মুসলমান মেয়েদের মুক্তি, স্বাধীনতা কীভাবে এনে দিতে পারে!

    Image result for tin talaq

    অথচ ধর্ম নির্বিশেষে সারা দেশে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্ষণ, হত্যা, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, দাম্পত্য হিংসা, যৌতুকজনিত অপরাধ ইত্যাদি বেড়ে চলেছে রোজ। কিন্তু সরকার এবং প্রশাসনের নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে যে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা ছিল তা করা তো দূর, ভাবাও হয় না। সেই না-হওয়াকে চাপা দিতেই অভিযুক্ত ধর্ষকদের এনকাউন্টারে মেরে ফেলার মধ্যেই নারীর ক্ষমতায়ন খুঁজে বার করে দিতে চায় রাষ্ট্র! এমন অবস্থা দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারীদিবসে তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলি কৃতী নারীদের জন্য ছেড়ে দিলেন।

    অথচ শুধু যদি আসামের কথাই ধরি, তাহলে এই রাজ্যে মোট ১৪টি লোকসভা আসন আছে। অথচ কেবলমাত্র ৬টিতেই মহিলা প্রার্থী রয়েছেন দলীয়-নির্দল সব মিলিয়ে। বিধানসভায় ৬.৩৫%। মহিলাদের জন্য ৩৩% সংরক্ষণের বিল সংসদে পেশ হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কি মনে হয় না, নারীর ক্ষমতায়ন শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট দিয়েই হয় না, বাস্তবেও নারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগের সুযোগ, নারীর জীবিকা, শিক্ষা, সন্মান সুনিশ্চিত করার নামই নারীর ক্ষমতায়ন! একদিকে বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, অপরদিকে সেই বেটিরা নিজেদের দাবি আদায়ে রাস্তায় নামলে, সরকারের কোনও নীতির বিরোধিতা করলে, তাদের জেলে পোরা, হোস্টেলে ঢুকে রড দিয়ে মাথা ফাটানো। এতে আর যাই থাক, নারীর ক্ষমতায়ন থাকে না।

    Image result for woman beaten for NRC protest

    সাম্প্রতিক সুচর্চিত ইস্যু এনআরসিতেও সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার নারীরাই। আমার রাজ্য আসামের দিকে তাকালেই দেখা যাবে, বেশি সংখ্যক ডি-ভোটার বা সন্দেহযুক্ত ভোটার নারীরাই। সবচেয়ে বেশি ঘোষিত বিদেশিও নারীরা। সরকার থেকে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্যে যে যে নথিপত্র চাওয়া হয়েছিল, তার বেশিরভাগই পিতৃতান্ত্রিক সমাজরাষ্ট্রে নারীর থাকে না। নারীর নামে সম্পত্তি কেনা হয় না, বাবার সম্পত্তিতেও লিখিত ভাবে মেয়ের নাম যোগ হয় না। তাই তার জমির বৈধ কোনও দলিল থাকা মুশকিল। অথচ তার স্বামীর বা বাবার পরিচয়ে এনআরসিতে কিছু হওয়ার নয়। আসামে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিবাহিত মেয়েদের নাম বাবার বাড়ি থেকে ইচ্ছে করে, অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞানতাবশত, বংশলতিকায় ঢুকানো হয় নি। ফলস্বরূপ এনআরসিতে তাদের নাম আসে নি। রাষ্ট্রহীন হয়ে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে চক্কর কাটছেন এখন তাঁরা। কত জন সেই ট্রাইব্যুনাল অবধিও পৌঁছতে পারেননি।

    আসামে ২০০২ সালের আগের বেশিরভাগ প্রান্তিক ও অশিক্ষিত দরিদ্র প্রজন্মেরই জন্মের প্রমাণপত্র নেই। স্কুলে ভর্তিও খুব কম সংখ্যকই হতো। যারাও বা হতো তাদের অভিবাবকদের ইচ্ছে এবং স্মৃতি অনুযায়ী শিশুর বয়েস বাড়িয়ে বা কমিয়ে লেখানো হত। মাধ্যমিকের বোর্ড রেজিস্ট্রেশনের কার্ড বয়েসের প্রমাণপত্র হয় বটে, কিন্তু মাধ্যমিক অব্দি যাওয়ার সুযোগ তো আসামের গ্রামের দিকের ২০ শতাংশ মেয়েরও হয় না! তাহলে প্রান্তিক নারীরা তাঁদের জন্মতারিখ বা বয়েস প্রমাণ করবেন কী দিয়ে? ভারতবর্ষ নামক রাষ্ট্রে বিবাহিত নারীর পরিচয় ন্যস্ত থাকে স্বামীর উপরে। সব ডকুমেন্টেই অভিভাবক হিসেবে স্বামীর নাম লিখে দেওয়া হয়। হঠাৎ করে ডকুমেন্টের বদল না ঘটিয়েই এনআরসি নারীকে করে দিল পিতৃনির্ভর। এবং কন্যা হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করবার দায়িত্ব চাপিয়ে দিল খোদ নারীর কাঁধে। মায়ের পরিচয় এনআরসি-তে গ্রাহ্য হয় না। তাহলে যে মায়ের বাবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে তার ক্ষেত্রে কী হবে? উত্তর জানা নেই। আসামের ক্ষেত্রে যেসব প্রান্তিক নারীরা না জেনে শ্বশুরবাড়ির লিগ্যাসি দেখিয়েছিলেন, তাঁদের একজনের নামও এনআরসি-তে ওঠেনি। এটা স্পষ্ট তথ্য।

    Image result for assam nrc women

    এবার এনআরসি হয়ে গেল। তার পরে উচ্ছেদ ও শেষমেশ ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতেও নারীদের যেসব সাংবিধানিক সুরক্ষা পাওয়ার কথা তা তাদের দেওয়া হয় না। এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায় কুলসুমা বেগমের ঘটনা। হোজাই জেলার নাখুটিতে বলপূর্বক উচ্ছেদ করতে গিয়ে পুলিশ লাঠি দিয়ে মারধোর করায় প্রাণ হারান আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা কুলসুমা বেগম। বলপূর্বক, নিয়ম-বহির্ভূত উচ্ছেদ, প্রশাসনের উৎপীড়নের শিকার হাজার হাজার নামের পাশে কুলসুমাও একটি উদাহরণ মাত্রই। আসামের প্রত্যেকটা ডিটেনশন ক্যাম্পে ন্যূনতম কোনও সুবিধা পায় না বন্দি মেয়েরা। পরিবারহারা, সন্তানহারা হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর অপেক্ষায় তাঁরা বেঁচে আছেন।

    এসব দেখেশুনে আজকে যখন রাস্তায় নেমে সংবিধান হাতে নারীরা আওয়াজ তুলছেন পিতৃতান্ত্রিক এনআরসি চাই না, বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন চাই না, ডিটেনশন ক্যাম্প চাই না, যখন সোচ্চারে জানান দিচ্ছে দেশকে ধর্মের নামে ভাগ-বাটোয়ারা করা চলবে না, দাঙ্গা চাই না, শান্তি চাই, প্রগতি চাই, সমান মজুরি চাই, প্রতিশ্রুতির বদলে মহিলাদের ক্ষমতায়ন চাই, অবস্থানে বসছে শাহিনবাগ, পার্কসার্কাস, পলাশীর নারীরা– ঠিক তখনই পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমস্ত রকমের আক্রমণ নামিয়ে আনছে আন্দোলনকারী নারীদের উপরে। রাতের অন্ধকারে মুখ ঢেকে হস্টেলে ঢুকে তাদের মাথা ফাটিয়ে আসছে। মারছে, কারাগারের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, গুলি ছুড়ছে। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে নারীর কথা বলার স্বাধীনতা। ‘না’ বলার অধিকার।

    Image result for shahinbag dadi

    শাহিনবাগে মুসলমান নারীরা পিতৃতান্ত্রিক এনআরসি, বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন বাতিলের দাবীতে অবস্থানে বসেছেন, নিপীড়ক রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে বলছেন, “এটা আমার দেশ। এদেশ ছেড়ে কোত্থাও যাব না আমরা।” রাতের পর রাত খোলা আকাশের নীচে বসে আছেন, হিজাব বা বোরখা পরেই নিজের অধিকারের দাবিতে লড়ছেন, এটা লিঙ্গগত জাগরণ নয় কি? কেবল ভারতীয় সমাজে নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই এক অনন্য নজির গড়ে তুলছে এই আন্দোলন। বাবাসাহেব আম্বেদকরের ছবি আর সংবিধানের সাথে হিজাব, বোরখা মিশে গিয়ে এক নতুন চিন্তা, নতুন ভাষ্য তৈরি গড়ে উঠছে।

    কিন্তু ঠিক যে সময়ে সংখ্যালঘু সমাজের রক্ষনশীল চরিত্রকে অতিক্রম করে ঘর-পরিবারের পাশাপাশি শাহীনবাগের নারীদের প্রতিবাদের এই আওয়াজ অতীতকে পিছনে ফেলে এক নতুন সময়ের বার্তা দিচ্ছে, তখনই রাষ্ট্র মন্তব্য করছে ‘পোশাক দেখে সন্ত্রাস চেনা যায়।’ সারা বিশ্ব যখন নারী কী পোশাক পরবে, কী খাবে এই নিয়ে স্বয়ং নারীরা নিজে সিদ্ধান্ত নেবে বলে সংগ্রামে নেমেছে, ঠিক তখনই আন্দোলনের পোশাক আর ধর্মকে এক করে তাকে নারীবাদের আওতা থেকে বার করে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। অথচ অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে ‘নারীবাদের’ ডেফিনেশন হিসেবে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রয়েছে , “The advocacy of women’s rights on the ground of the equality of the sexes.” সহজ করে বললে, নারী-পুরুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার পক্ষে থাকার নাম নারীবাদ। আরও সহজ করে বললে, নারীবাদী সে মানুষটিই, যে নারী এবং পুরুষ দুজনকে সম্পূর্ণ মানুষ বলে মনে করে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা এবং সমানাধিকারে বিশ্বাস করে।

    এখন স্পষ্টতই, সেই সমানাধিকারের সঙ্গে পোশাকের কোনও সম্পর্ক নেই। বরং কেউ পোশাকের দোহাই দিয়ে কোনও নারী-আন্দোলনকে মাপতে চাইলে, তার সঙ্গে পিতৃতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের কোন ফারাকই থাকে না। তারা ভুলে যায়, কারও ইচ্ছে হলে বোরখা পরে আন্দোলনে নামতে পারে, কেউ জিন্স পরে নামতে পারে, কেউ হাফপ্যান্ট পরে নামতে পারে, শাড়ি পরে নামতে পারে, কেউ বিকিনিও পরতে পারে। কেউ চাইলে নগ্নও থাকতে পারে। উদাহরণ এ দেশেই আছে। তাতে ‘নারীবাদ’ এতটুকুও লোপ পায় না, মানবিকতারও বিসর্জন হয় না। বরং মানবিকতা বা নারীবাদ লোপ পায় শাসকদের পদলেহনে, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করলে অথবা নিজের স্বার্থ রক্ষায় নারীবাদকে বিকৃত করে ব্যবহার করলে।

    Image result for indian army rape us

    এবছরের নারীদিবস তাই উৎসর্গিত থাকুক শাহিনবাগের দাদিদের প্রতি। উৎসর্গিত থাকুক পার্কসার্কাস, পলাশির লড়াকু নারীদের প্রতি। উৎসর্গিত থাকুক ঐশী ঘোশ বা গৌরী লঙ্কেশ– প্রত্যেকটা আপসহীন নারীর জন্য। এবং একইসঙ্গে নারী-পুরুষ-সহ সমস্ত শ্রেণির নাগরিকেরা এগিয়ে আসুন ভারতীয় সংবিধানে সুনিশ্চিত করা ধর্মনিরপেক্ষতা, সমতা এবং একতা বজায় রাখতে। এটাই হোক আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আহ্বান। শান্তি, সম্প্রীতি এবং সমতার দেশ গড়ার আহ্বান।

    (মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More