বৃহস্পতিবার, মে ২৩

শুধু ৮ মার্চ নয়, সারা বছরই আনন্দে বাঁচুন

মধুরিমা রায়

মার্চ মাস এলেই চার পাশে গোলাপি বেলুন, দোকানে দোকানে বিভিন্ন অফার, কিছু বাছা বাছা শব্দ ব্যবহারে সন্ধ্যার অনুষ্ঠান, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে গুচ্ছ গুচ্ছ পোস্ট– আর তার পর! ওই, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, ইত্যাদি ইত্যাদি।  ব্যস…নারী দিবসের কোটা কমপ্লিট।  ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস।

দিনটার ইতিহাসে যদি তাকাই, তাতে যে তথ্যগুলো আসে একটু চোখ বুলিয়ে নিই।  নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাসের কথা বলে এই দিনের ইতিহাস। মজুরির তফাত, নির্দিষ্ট কাজের সময় বেঁধে দেওয়া, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১৮৫৭ সালে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতো কারখানার নারী শ্রমিকেরা।  ১৯০৮ সালে নিউ ইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয় জার্মানিতে।

এর পর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে হল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন।  ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন।  এ সম্মেলনে প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।  সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সমান অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালন করা হবে।

১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল।  বাংলাদেশও ১৯৭১ এ স্বাধীনতার লাভের আগে থেকেই এই দিনটি পালন করতে শুরু করে।  ১৯৭৫ এর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।  দিনটি পালনের জন্য বিভিন্ন দেশকে আহ্বান জানায় জাতিসঙ্ঘ  এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমান অধিকার আদায়ের জন্য।

বিশ্বের অনেক দেশেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস সরকারি ছুটির দিন হিসেবেও পান মহিলারা।  কিন্তু এখনও কেন নারীদের আলাদা করে একটা দিনের দরকার পড়ছে? মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রিমা মুখোপাধ্যায় বলছেন, এখন অনেক মহিলাই এগিয়ে আসছেন, কথা বলছেন নিজেদের সমস্যা নিয়ে। তবে সমস্যা তো আমাদের ভাবনাতেই রয়ে গেছে।  সামাজিক যে ব্যবস্থায় আমরা আছি, তাতে এখনও বিয়ের কথা আগে ভাবা হয় কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে। অথচ ছেলে হলে তার ভবিষ্যতের চাকরি নিয়ে ভাবনা বেশি থাকছে।  এর বদলে দু’টো বাচ্চার ক্ষেত্রেই তো একই রকম ভাবতে পারেন মা বাবারা।   

আর যে বিয়ে নিয়ে এত কিছু, সেখানে অন্য একটা পরিবেশে গিয়ে মেয়েটিকে বারবার মানিয়ে নিতে বলা হচ্ছে, কেন! এই যে বলা হয় “ও আমার মেয়ের মতো”, আসলে মতো বলে কিছু হয় না।  শ্বশুড়বাড়িতে যদি মেয়েটির সম্পূর্ণ আলাদা সত্তাকে মেনে নিতে না পারেন লোকজন, আর ভাবেন, সংসার সুখের করতে গেলে রমণীকেই গুণবতী হতে হবে, তা হলে মুশকিল।

একটি মেয়ে বড় হচ্ছে যখন, তখন তার অভ্যাস থাকতেই পারে দু’বেলা ভাত খাওয়ার, হতেই পারে সে আরশোলা দেখলে চেঁচামেচি করে বা নিজের রোজগারে প্রতি মাসে শপিংও করে।  এবার তাকে যদি বাধ্য করা হয় রুটি খেতে বা আরশোলা দেখে তার চেঁচানোকে ন্যাকাপনা বলা হয়, আর তার শপিং মানেই খুব বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে ভাবা হয়, তা হলে স্বাভাবিক ভাবেই বাড়ির পরিবেশ আর আনন্দের থাকবে না।  রমণীর গুণই যদি ভাল থাকার শর্ত হয়, তা হলে তো বাড়ির মহিলা দু’জনেই…… বৌমার সঙ্গে সঙ্গে শাশুড়িও।  শাশুড়ি আর বৌমার এই যোজন দূরত্ব থাকলে মেয়েদের অধিকার তা হলে আর কোথায় থাকে!

এ প্রসঙ্গেই কথা আসে, ‘মুখার্জিদার বৌ’-এর।  উইনডোজ় প্রোডাকশনের এই ছবিটির পরিচালক পৃথা চক্রবর্তী। স্ক্রিপ্টরাইটার সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়।  যেখানে গল্পের দুই মুখ্য চরিত্র শাশুড়ি আর বৌমা।  অভিনয়ে অনসূয়া মজুমদার এবং কণীনিকা চট্টোপাধ্যায়।  তাঁদের ছোট ছোট বিষয়ে ভাবনার অমিল বাড়িতে গুমোট একটা পরিবেশ এনে দেয়।  তার পরে?

সেটা অবশ্য আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আপনাকে হলে গিয়েই জানতে হবে। কারণ ওই দিনই মুক্তি পাচ্ছে এই ছবি। এ ছবিরই দু’জন পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিশ্বনাথ বসু এবং বাদশা মৈত্র। বিশ্বনাথ বলছেন, পুরুষদের আসলে স্যান্ডুইচের মতো অবস্থা হয়, তাই যে যত বেশি ব্যালেন্স করতে পারেন, তাঁর বাড়িতে তত সুখ। তবে বড় সত্যটা হল, এখনও নারীরাই নারীদের ঠিক করে বোঝেন না, তাই সমস্যা বাড়ে।  কেন এত জটিল করে ভাবেন তাঁরা! এক জন নারীই অন্য জনকে পিছিয়ে দেয়। এগিয়ে আসতে হবে তাঁকেই।

আর এই দমবন্ধ পরিবেশে বাড়ির বৌ যদি অক্সিজেনের খোঁজ করেন বাইরের কোনও পুরুষ বন্ধুর কাছে? এই প্রশ্নের উত্তরে বাদশা মৈত্র বলছেন, নারী পুরুষ যে বন্ধুই হোন, মনের ভাব ভাগ করে নিতে নিতে সম্পর্কের গভীরতা যদি বাড়ে, তা হলে সেটায় স্বচ্ছতা থাকা খুব জরুরি। সংবেদনশীল না হলে যে কোনও সম্পর্কই দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে না।  আসলে সিনেমা সাহিত্যে মহিলাদের যে সমস্যাগুলো আমরা দেখি, সেগুলো সমাজেরই অংশ।  আমাদের মধ্যে থেকে কেউ যদি কারও সাথে ২ ঘণ্টা সময় কাটিয়ে ২৪ ঘণ্টা ভালো থাকেন, তাতে তো বাকিদের সমস্যা হওয়ার কথাই নয়।  আর নইলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করাই ঠিক নয় যাতে মহিলাদের বাইরে অক্সিজেন খুঁজতে যেতে হয়।

রিমা মুখার্জি বলছেন, সব মেয়ের মধ্যেই মাতৃত্ববোধ থাকতে হবে এমন কোন কথাও নেই।  কেউ নিজের পছন্দেই সন্তান না-ও নিতে পারেন।  এমনিই এত বেশি জনসংখ্যা, যে শিশুরা অবহেলায় বড় হচ্ছে।  যাঁরা ওয়ার্কিং ওম্যান তাঁদের সমস্যা হয়। সময় দিতে পারেন না শিশুকে।  তিনি মনে করতেই পারেন, সারা দিন ঠিক মতো সময় দিয়ে শিশুকে মানুষ করতে না পারলে তিনি এই দায়িত্বে যাবেন না।

অর্থাৎ মহিলা হয়ে নয়, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারেই একটি মেয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে পারেন।  সে ক্ষেত্রে তাঁকে সুচাকুরে অথচ মাতাল বরকে রোজ সামলানোর দায়িত্ব না নিলেও চলে। অফিসে নিজের কাজ, হাসি, আড্ডার সঙ্গে পুরুষ বসের ভুল প্রস্তাবে সাড়া না দিলেও চলে। বাবার সারা জীবনের সঞ্চয় শ্বশুরবাড়িতে পণ হিসেবে নিয়ে না গেলেও চলে।

হোমমেকার এবং অফিসযাত্রী মহিলারা কেউ কেউ এবার অন্তত ভাবতে শুরু করুন, যে আপনার অফিসের কাজটাও কাজই। তা সে যতই শাশুড়ি বলুন, “তোর আর কী কাজ বল, আমরা ছেলেটা তো কত পরিশ্রম করে।”  আপনিও কাজ সেরে ফিরে সিঙ্কের বাসন ধুতে যাবেন না, বা রান্নাঘরে ঢুকবেন না।  —এরকম লম্বা লিস্ট পরপর থাকে।

শুরুতেই যখন না বলতে চেষ্টা করবে কেউ, স্রোতের বিপরীতে হাঁটবে, অবশ্যই অনেক কিছু তাঁকে সহ্যও করতে হবে।  কিন্তু তবু নিজের জন্য বাঁচার আনন্দই আলাদা।  বারবার ‘আমি তার জন্য এত করেও কী পেলাম’, এই হতাশা অন্তত গ্রাস করবে না। তাই সহজে বাঁচার চেষ্টা করুন।  আর নিজেকে সময় দিন, নিজেকে ভালোবাসুন।

বছরের একটা মাত্র দিন নয়, সারা বছরই ভালো করে বাঁচুন।

Shares

Comments are closed.