Latest News

পুরুষের বকলমে নয়, মেয়েদের কথা মেয়েরাই বলবে কবিতায়, পথ দেখিয়েছিলেন এই সাহসিকা

শাশ্বতী সান্যাল

বাংলার কবিতা জগৎ কি পুরুষশাসিত? আজকের এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে সে কথা বলা না গেলেও ৩০, ৪০ বা ৫০ এর দশকটা খানিক তেমনই ছিল। মেয়েমানুষেরও যে নিজস্ব ভাষা আছে, বলার মতো কথা আছে, নিজের কথা নিজের মুখে বলার যোগ্যতাও আছে- সেই স্বীকৃতিটুকু পেতেই লেগে গেছিল অনেক সময়। নারীর দুঃখ আনন্দ, প্রেম-ব্যর্থতা সব পুরুষের বকলমে জানতেই অভ্যস্ত ছিল বাঙালি। অনেকেই বলেন ভুল সময়ে জন্মেছিলেন কবিতা সিংহ। কিন্তু ভাগ্যিস জন্মেছিলেন। পূর্বনারীদের ঐতিহ্যকে মাথায় রেখেও বলা যায়, নরমসরম মেয়েলি পদ্য’কে ‘কবিতা’র ঋজু মেরুদণ্ডে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে, পাঠকের চোখে চোখ রেখে নিজের কথা বলতে তিনিই তো শিখিয়েছিলেন, গড়ে তুলেছিলেন কবিতায় মেয়েদের নিজস্ব ভাষা-অবয়ব।

কফিহাউজের দরজায় দীপশিখার মতো উজ্জ্বল কবিতা সিংহকে দেখে একদিন মুগ্ধ হয়েছিলেন নবনীতা দেবসেন। মুগ্ধ হয়েছিলেন ঘরে বাইরে দশভুজার মতো তাঁর একা লড়াই দেখে। রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলা কবিতার নতুন পথচলা শুরু হয়েছিল ত্রিশের দশক থেকেই। কবিতা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়েছিল, ৪০ আর ৫০ এর দশকে তা যেন আরও পরিব্যাপ্ত আর গাঢ়তর রূপ নেয়। এই সময়কালেই বাংলা কবিতার অন্দরমহলে পা রাখলেন এক মেধাবী, ঋজু কলমের অধিকারিণী, তিনিই কবিতা সিংহ

১৯৩১ সালের ১৬ই অক্টোবর, কলকাতার ভবানীপুরের এক সমৃদ্ধ বনেদি পরিবারে জন্মেছিলেন কবিতা সিংহ। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ পরিণত আর সংবেদনে ভরা একটা মন ছিল তাঁর। খুব কম বয়সেই লেখালিখির জগতে পা রাখেন কবিতা সিংহ। জন্মসূত্রে বাড়িতেও পড়াশোনা-গানবাজনার পরিবেশ পেয়েছিলেন অনেকখানি। মা অন্নপূর্ণা সিংহ ছিলেন বহু গুণের অধিকারী এক উজ্জ্বল নারী। বালিকাবধূ মায়ের সঙ্গে তাঁর বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র ১৫ বছর। ছোট থেকেই দেখেছেন মা’কে কবিতা লিখতে, ছবি আঁকতে। বাবার শৈলেন্দ্র সিংহের ছিল সেতার বাজানোর শখ। সেই শিশুবয়সেই পরিবারের এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যিথাযথ উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন কবিতা। মাত্র ছ’বছর বয়স থেকেই মা’র দেখাদিখি কবিতা লেখা শুরু করেন। নাচও শেখেন মায়ের উৎসাহে। তাঁর বেড়ে ওঠার পদে পদে মা অন্নপূর্ণাদেবীর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। সে কথা পরবর্তীকালে একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই উল্লেখ করে গেছেন বারবার।

মায়ের ইচ্ছেয় স্বাধীন লেখালিখির চেষ্টার পাশাপাশি নাচ- গান- ছবি আঁকার চর্চাও শুরু করেছিলেন কবিতা। বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়িতে মেয়েদের নাচ-গান শেখানো অবশ্য নতুন কিছু নয়৷ হয়তো তাই পরবর্তী জীবনে এই সবকিছুকে ছাপিয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রটিতেই তিনি নিজের ব্যক্তিত্বের, চেতনার মনোভূমি হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। তবে কমবয়েসের সেই বহুমুখী চর্চা ও চর্যা সে তাঁকে একটা অন্যরকম স্বাধীন জীবনের স্বাদ দিয়েছিল, তা একেবারেই অস্বীকার করা যায়না। তাঁর আজীবনের সাহিত্যসাধনায় অক্সিজেনের কাজ করে গিয়েছে এই অহেতুক আনন্দ।

যতই সংস্কৃতিমনস্ক শিক্ষিত পরিবার হোক না কেন, আসলে কবিতা সিংহের বাপেরবাড়ি ছিল বেশ উন্নাসিক আর অন্তরধর্মে সংকীর্ণ। জন্ম থেকেই বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের অধিকারে বিভাজন দেখতেই অভ্যস্ত পড়েছিলেন তিনি। বাড়ির ছেলেদের পড়াশোনার জন্য যেখানে কলকাতার নামী দামি স্কুল ঠিক করা হত, সেখানে বাড়ির মেয়েদের ভর্তি করা হত অতি সাধারণ বেলতলা গার্লস স্কুলে। এই বেলতলা গার্লস স্কুলেই পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের মতো কবিতা সিংহেরও প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়। স্কুলের শিক্ষা শেষ করে তারপর নিজের চেষ্টায় তিনি ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু ১৯৫১ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে বাড়ির অমতে বিমল রায়চৌধুরীকে বিয়ে করার পর দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল পড়াশোনা। কিন্তু হার মানেননি কবিতা সিংহ। তাই বিয়ের প্রায় সাত বছর পর যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে বোটানিতে অনার্স নিয়ে স্নাতক স্তরের পড়াশুনো শেষ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনের এইসব নানা উত্থানপতন, লিঙ্গ বিভাজন, নারীদের দুঃখদুর্দশা ভুলে যাননি কবিতা। বিভিন্ন সময়ে তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে ফিরে ফিরে এসেছে এসব। সমালোচকেরা বলেন, কবিতা সিংহের লেখায় কোনও ঈশ্বর নেই, কিন্তু ঈশ্বরী আছেন। আছেন ঈশ্বরী পাটনিরাও।

বাংলা কবিতায় কামিনী রায়, স্বর্ণকুমারী দেবী, রাধারানী দেবীদের লেখায় নারীস্বাধীনতার বা নারীবাদী চেতনার একেবারে শুরুর চেহারাটা দেখা দিলেও, তার ফুটন্ত রূপটি সম্পূর্ণ চেহারা নিয়ে প্রথম ধরা দিয়েছিল কবিতা সিংহের কবিতাভাষাতেই। কবিকে নারী বা পুরুষ এই আলাদা লিঙ্গপরিচয়ে চিহ্নিত করে দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। তাই ‘নারীকবি’ শিরোনাম ভেঙে নিজের আলাদা কবিসত্তাকেই বারবার দৃঢ়ভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। বলাই বাহুল্য, তাঁর কবিতার জ্বলন্ত বিষয়ভাবনা ও বক্তব্য উপস্থাপনার তীব্রতা কবিতা সিংহকে তাঁর সমকালের থেকে কয়েক যোজন পথ এগিয়ে রেখেছে।

বাংলা ভাষার নারীকবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য কবিতা সিংহ। কিন্তু শুনলে অবাক হতে হয়, তাঁর প্রথম ছাপা কবিতাটি লেখা হয়েছিল ইংরাজি ভাষায়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে কিশোরী কবিতা সিংহের সেই প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় নেশন পত্রিকায়। তারপর মাত্র ষোলো বছর বয়সে আনন্দবাজার পত্রিকায় বিজ্ঞাপনে নারীশরীরের ব্যবহার নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন কবিতা সিংহ। প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘আর্ট ও নারী’।

বিয়ের পরে আর্থিক দুর্দশা, দারিদ্র্য, সংসার চালানোর তাগিদ- এসব নানা কারণে জীবনের প্রথমপর্বে বিভিন্ন ধরণের পেশাকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন কবিতা সিংহ। তবে পরবর্তী জীবনে সাংবাদিক হিসাবেই পেশাগত ক্ষেত্রে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। সত্যি কথা বলতে, আধুনিক কর্মজীবী সৃজনশীল নারীর এক সার্থক রূপ ছিলেন কবিতা সিংহ। ঘর ও বাহির- দুইই যোগ্য হাতে সামলেছেন আজীবন। নিজের লেখা নিয়ে খুব যে মমতা ছিল তাও নয়। যা লিখতেন, তার সিংহভাগই পছন্দ হত না, বাদ দিয়ে দিতেন। হয়তো সেইজন্যই ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত নিজের শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলনের ভূমিকায় কবি জানিয়েছেন তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলি “অজস্র রচনার সাক্ষ্য নয়, অজস্র বিসর্জনের প্রমাণ”।

শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় কবি নিজেই জানিয়েছেন প্রায় চার দশক জুড়ে ছোট বড় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অজস্র কবিতা লিখেছেন তিনি। সেসব লেখা বই আকারে প্রকাশ পেলে না কি হলে তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা অতি প্রসবের দোষে পড়ত। তাঁর প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা তিনটি। সহজসুন্দরী (১৯৬৫), কবিতা পরমেশ্বরী ( ১৯৭৬), আর হরিণাবৈরী (১৯৮৫)। এছাড়া রয়েছে একাধিক উপন্যাসের বই, গল্পসংকলনও।

পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে বরাবর পণ্য হিসাবে দেখা হয়েছে মেয়েদের। পুরুষদের অধিকার আর কামনার পুতুল ছাড়া নারী যেন আর কিছুই নয়। নারী মানে শুধুই শরীর। শুধু রমণ, আর সেই রমণের জন্য নারীজন্ম, তাই পুরুষতন্ত্র তাঁদের চেয়ে মানবী হিসাবে নয়, রমণী হিসাবে। মেয়েরা শুধুমাত্র কতকগুলো অঙ্গের সমষ্টি সেখানে। তাদের কামনা-বাসনা থাকতে নেই। অধিকার নেই নিজের ইচ্ছা জানানোর, নিজের চাহিদা প্রকাশ করার। চিরকালই মেয়েরা ‘সেক্স অবজেক্ট’। সমাজের এই অন্ধ কলুষিত চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ শানিয়েছে কবিতা সিংহের কলম। বারবার গর্জন করে উঠেছে তাঁর ভাষা।

আজ যে বাংলা গল্পে উপন্যাসে কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে ছড়িয়ে আছে যে নারীবাদের কথা, নারীর স্বতঃস্ফূর্ত সমান অধিকারের কথা, তার প্রকৃত জন্ম হয়েছিল কবিতা সিংহের হাত ধরে, তাঁরই কলমের প্রশ্রয়ে। ঘরে ঘরে মেয়েদের যন্ত্রণা-কষ্ট, পারিবারিক জীবনে নিগ্রহ, অপমান, লিঙ্গবৈষম্য, ভ্রুণহত্যা – এই সবকিছুই ছিল তাঁর লেখালিখির উপাদান। মেয়েদের কথা মেয়েদেরই কলমে তুলে ধরার যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, যুগে যুগে সেই পথেই পা মিলিয়েছে নবনীতা দেবসেন, তসলিমা নাসরিন, মল্লিকা সেনগুপ্ত থেকে শুরু করে আজকের যশোধরা রায়চৌধুরী, মন্দাক্রান্তা সেন, স্বাগতা দাশগুপ্তেরা।

You might also like