৩৭০ নেই, সুদিন কি আসবে? অবিশ্বাস আর সন্দেহের হাওয়া ঝিলমের তীরে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    কাশ্মীর থেকে তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার পর থেকেই কাশ্মীরের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে জমে উঠেছে ক্ষোভ-হতাশা-রাগ। ছোট দোকানদার থেকে বড় হোটেল মালিক, গরিব ঘোড়াওয়ালা থেকে বড় ট্র্যাভেল এজেন্ট– খুশি নন কেউই।

    যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন কাশ্মীরকে ঘিরে নানা উন্নয়নমূলক চিন্তাভাবনার কথা। বারবার করে বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে কাশ্মীরের মানুষের এতদিনের বঞ্চনা পূরণ করে দেবেন তিনি। আশ্বাস দিয়েছেন সরকারি চাকরির। জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীতে কাশ্মীরি যুবকদের সুযোগ দেওয়ার কথা। পুলিশে চাকরি আরও বাড়বে, বাড়বে বেতনও। এমনকি স্থানীয় শিল্পীদের হাতের কাজ বিদেশে এক্সপোর্ট করে আরও আয় বাড়ানোর সুযোগ করে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন বেশ কিছু লগ্নির কথা, যার ফলে কর্মসংস্থান অনেক বাড়বে উপত্যকায়। নারী, পুরুষ, ধনী, গরিব– সকলের সমান অধিকার ও সমান উন্নয়নের কথা বলেছেন তিনি।

    প্রশ্ন হল, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যুব সম্প্রদায় কী ভাবছে এই আশ্বাস নিয়ে। তাঁরা কি আদৌ ভরসা করছেন মোদীর কথায়, নাকি ধরেই নিয়েছেন আদতে কোনও উন্নয়ন হবে না?

    কথা হচ্ছিল মহম্মদ মুস্তাকের সঙ্গে। বছর পঁয়ত্রিশের এই যুবকের নিজের ব্যবসা রয়েছে ইলেকট্রিক গুডসের। গত দু’মাস কাজ মেলেনি বিশেষ। দোকান প্রায় বন্ধ। এ দিন এসেছিলেন শ্রীনগরের বার্ন হল স্কুলে। ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলটি কাশ্মীরের সব চেয়ে বড় ও পুরনো স্কুল। সেখানেই ক্লাস ফোরে পড়ে তাঁর ছেলে। মুস্তাক খোঁজ নিতে এসেছিলেন, কবে পরীক্ষা হবে? স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, আগামী ২৪ অক্টোবর একসঙ্গে সব বিষয়ের পরীক্ষা হবে একই দিনে। সেটাও কেবল মৌখিক। লিখিত পরীক্ষা হবেই না।

    জানতে চাইলাম, এই কয়েক দিনের অস্থিরতার পরে কি ভাল সময় আসতে পারে বলে মনে করছেন তিনি? কর্মসংস্থান হলে কি সন্তানের ভবিষ্যৎ আর একটু ভাল হতে পারে?

    উত্তরে হতাশা চাপা থাকে না মুস্তাকজির। জানালেন, কী হবে সেটা তো কেউ জানে না। তাই হওয়ার আগে পর্যন্ত সে নিয়ে মন্তব্য করতে নারাজ তিনি। তাঁর দাবি, এ সবই ৩৭০ ধারা ওঠানোর জন্য মোদীর দেওয়া মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। “আচ্ছে দিনের কথা বলা হয়েছে আমাদের। কিন্তু গত দু’মাস ধরে যা চলছে– এত খারাপ দিন তো আগে কখনও দেখিনি আমরা। কী করে ভরসা করি বলুন তো!”– বললেন তিনি।

    সুনসান বার্ন হল স্কুল

    ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে সেনাবাহিনীতে পাঠাবেন কি ছেলেকে? অনেক কাশ্মীরি যুবক তো এখন যাচ্ছেন। এই প্রশ্নের উত্তরও ইতিবাচক নয় মুস্তাকজির কথায়। জানালেন, কাশ্মীরে সেনা-অত্যাচারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেনাবাহিনীর প্রতি রাগ এবং অসহিষ্ণুতা রয়েছে প্রতিটি মানুষের। তাই নেহাত প্রয়োজন না পড়লে চট করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা ভাবেন না কেউ। তবে তাঁর ছেলে যদি বড় হয়ে যেতে চায় সেনায়, তখন যদি পরিস্থিতি বদলায়, তবে তাকে বাধাও দেবেন না তিনি।

    আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তরফে অবন্তীপোরার শতাব্দীপ্রাচীন বিষ্ণুমন্দির দেখাশোনা করেন আজিজ আহমেদ। আগে এই দায়িত্ব ছিল এক পঞ্জাবের মানুষ। সমস্যা শুরু হওয়ার পরে ছুটি নিয়ে জম্মু চলে গেছেন তিনি। তাঁর জায়গায় অস্থায়ী স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন আজিজ। আগে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অন্য বিভাগে কাজ করতেন তিনি। সরকারি চাকরি করলেও, খুশি নন আজিজ। বলছিলেন, “১০ বছরের বেশি কাজ করেও স্থায়ী হয়নি আমার চাকরি। বেতনও যৎসামান্য। মোদীজি একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে শুনেছি। কিন্তু বিশ্বাস হয় না, আমাদের অবস্থা বদলাবে বলে। শুনেছি কৃষকদের টাকা দিচ্ছে মোদী সরকার। আমার বাবা-কাকা-মামা সকলে কৃষক। অনেক বার আবেদন করেও তো কোনও টাকা পাননি!”

    মহম্মদ আজিজ।

    শ্রীনগর পোস্ট অফিসে এই প্রশ্ন নিয়েই পৌঁছেছিলাম। প্রথমে সকলেই বিরক্তি প্রকাশ করলেন। পরে কথা বলতে রাজি হলেও, বারবার প্রশ্ন করলেন, তাঁদের নাম বা ছবি প্রকাশ হবে না তো? শেষমেশ পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক তরুণ কর্মী বললেন, “সবই আমরা শুনেছি। কিন্তু ওই শোনার পর থেকেই বিচ্ছিন্ন। উনি যা যা বলেছেন, তা করা হবে কিনা, হলে কবে হবে, তা এখনও জানতে পারিনি। এখনও ইন্টারনেটও চালু হয়নি আমাদের যে বাইরের কোনও খবর পাব। স্থানীয় নেতাদের কাছেও জানার উপায় নেই, কারণ মুখ খুলতে পারছেন না কেউই। যে কোনও সময়ে বন্দি হয়ে যেতে পারেন। অনেকে হয়েওছেন। আমি ধরে নিচ্ছি, হয়তো কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন মোদী। কিন্তু তা নিয়ে আমাদের স্পষ্ট কিছু জানানো না হলে, ঠিক কীসের ভিত্তিতে আমরা বিশ্বাস করব প্রধানমন্ত্রীর কথা?”

    ৩ হাজার তরুণ কাশ্মীরি সেনায় যোগ দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে কিছু দিন আগেই। সুযোগ পেলে কি তিনিও যোগ দেবেন? এই প্রশ্ন করেছিলাম কলেজপড়ুয়া কয়েক জন যুবককে। দু’মাস ধরে কলেজ যেতে না পেরে রীতিমতো বিরক্ত তাঁরা। তাঁদের মধ্যে আজমল (নাম পরিবর্তিত) বললেন, “৩ হাজার তরুণের যোগ দেওয়ার কথা আমিও জেনেছি জাতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে। আমার পরিচিত কেউ সেনায় যোগ দেয়নি।”

    আজমলের কথার সূত্র ধরে ইরফান (নাম পরিবর্তিত) বললেন, “আপনারা বাইরে থেকে অর্ধেক কথা জানেন কেবল। এই যে এত লোক, তারা কারা জানেন? জানেন, কাশ্মীরে কারা কেন সেনায় যায়? যারা সীমান্ত এলাকায় থাকে, সেনারা যাদের ঘরে-ঘরে রোজ অত্যাচার করে, তারাই যায় বাঁচার জন্য। সেই সঙ্গে খবর নিলে জানবেন, সেনাবাহিনীতে কুলি বা রাঁধুনি বা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন ওঁরা। হ্যাঁ, আমার যোগ্যতা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর ভাল পোস্টে সুযোগ পেলে আমি অবশ্যই যোগ দেব। কিন্তু আমার মনে হয় না যতটা বলা হচ্ছে, আমাদের কাশ্মীরিদের জন্য ততটা সুযোগ কোনও দিন আসবে বলে।”– শ্লেষ চাপা রাখেন না ইরফান।

    কথা বলতে বলতেই একটা ছবি তুলেছিলাম ওঁদের। খুব স্বাভাবিক ভাবে, আড্ডা মারার ছলেই। কথা শেষ হওয়ার পরে ইরফান মনে করিয়ে দিলেন, “ছবি ডিলিট করুন ম্যাডাম।” চমকে গেলাম। এত ভয়! বললাম, “করে দেব। একটাই ছবি আছে তোমাদের গ্রুপের। কারও আলাদা করে নেই।” একথা বলতেই, একটু আগেই হেসে কথা বলা ইরফানের গলার স্বর একটু হলেও বদলে গেল। “এখনই করুন। আমার সামনে।”

    শ্রীনগরের লালচক থানার তরুণ কনস্টেবল আদিল আহমেদ। এক বন্ধুর মধ্যস্থতায় যোগাযোগ করে কথা বলতে চাইলাম। প্রথমে রাজি হলেন না কিছুতেই। অনুরোধ করায়, কয়েক ঘণ্টা পরে বেরিয়ে এলেন থানা থেকে। উর্দি খুলে। জানালেন, সম্প্রতি বেতন বাড়ার কথা শুনেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাতে খুশি তিনি। কিন্তু সেই সঙ্গে বললেন, “মাইনে বাড়লে সকলের ভাল লাগে। কিন্তু কাশ্মীরের মানুষ হিসেবে আমি বুঝতে পারছি, ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিষয়ে আমাদের সমর্থন অর্জন করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। তাই পুরোপুরি খুশি হতে পারছি না। কাশ্মীরের মানুষের সমস্যা মোটেও এত সহজে মিটবে না।”

    ডাল লেকের ‘নিউ কাশ্মীর হ্যান্ডিক্রাফ্ট এম্পোরিয়াম’-এর ম্যানেজার আশরাফ আবদুল্লা আবার আশা দেখছেন, তাঁদের বানানো জিনিস এক্সপোর্টের আশ্বাস শুনে। তবে আশা দেখলেও, পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁর কথায়, “আমরা কিন্তু এখনও এক্সপোর্ট করি। আমাদের তৈরি জিনিস বিদেশে যায় অনেক পরিমাণেই। আমাদের কমিউনিটির লোকজন বিদেশে গিয়ে ব্যবসা করেন, আমরা ডাকেও পাঠাই প্রচুর মাল। সেটা আরও বড় মাপে করা হলে আমাদের আপত্তি নেই মোটেই। কিন্তু সেটা হলে, তাতে খাদ  মিশে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।”

    নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আশরাফ জানালেন, এমনিতেই বহু বাইরের জিনিস ‘মেড ইন কাশ্মীর’ ট্যাগ লাগিয়ে বাইরে এক্সপোর্ট হয়ে যাচ্ছে। “এখন কাশ্মীরি জিনিস রফতানি করার দায়িত্ব যদি আমাদের হাত থেকে সরকারি হাতে চলে যায়, তবে এই অসৎ ব্যবসায়ীরা আরও জাঁকিয়ে বসবেন। আমাদের কাজের নাম খারাপ হবে। উৎপাদনের তাপ বাড়লে আমাদের জিনিসের মান পড়ে যাবে। এমনিতেই কাশ্মীরেরই বহু ব্যবসায়ী লোভে পড়ে লুধিয়ানা বা পঞ্জাব থেকে উল, সুতো আনতে শুরু করে দিয়েছেন। আমরা তো সেটা বন্ধ করতে চাই। এখন এই এক্সপোর্টের চক্করে যদি সেটা আরও বেড়ে যায়, তা হলে তা কাশ্মীরের জন্য ভাল নয় মোটেই। দেখা যাক কী হয়।”

    মতামত যার যা-ই হোক না কেন, প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলার সময়েই অবিশ্বাস আর সন্দেহের পরত প্রখর হয়ে ধরা পড়ছিল। কথা বলতেই চাননি অনেকেই। বলতে শুরু করলেও, প্রশ্ন শুনেই সতর্ক হয়ে চুপ করে গিয়েছেন অনেকে। কেউ সরাসরি বিরক্তি প্রকাশ করে মিডিয়ার উপর। ছবি বা ভিডিওর বিষয়ে প্রত্যেকের অতিরিক্ত সতর্কতা স্পষ্ট। যেন কেউই জানাতে চান না তাঁদের মতামত।

    কীসের এত ভয়, কীসের এত গোপনীয়তা?

    মনে হয়, অবিশ্বাস এবং সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে কাশ্মীর জুড়ে। একশ্রেণির মানুষ মানছেনই না, কোনও পরিবর্তন আসবে বলে। অন্য একশ্রেণি হয়তো মনে-মনে আশা রাখলেও, তা প্রকাশ করতে পারছেন না। এঁদের মাঝে আছে আরও একশ্রেণি। যাঁরা পুরোপুরি অন্ধকারে। কোনও আশ্বাসবাণীর উপরে ভরসা রাখতে আর রাজি নন তাঁরা। পরিস্থিতি বুঝে যাচাই করবেন, ভাল আছেন নাকি খারাপ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More