শনিবার, অক্টোবর ১৯

বনবিবির দেশে হারিয়ে গেছে প্রিয়জন, সরকারি সাহায্য চেয়ে আন্দোলনের পথে ‘বাঘ-বিধবা’রা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কারও চোখের সামনেই স্বামীকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বাঘে। কারও স্বামী আবার মাছ ধরতে গিয়ে ফেরেনইনি ঘরে। কারও স্বামী আবার বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে বাঁচতে পারেননি। তাঁদের কারও মেলেনি ক্ষতিপূরণ। তাই তাঁরা সব জেনেও মৃত স্বামীদের মতোই ঝুঁকি নেন রোজ।

তাঁরা ‘বাঘ-বিধবা’। সুন্দরবনে বাঘের হানায় প্রত্যেকেই হারিয়েছেন প্রিয়জনকে। পেটের টানে, ঝুঁকির পেশায় ভেসে গিয়েছে সংসার। অভিযোগ, সরকারের ছিটেফোঁটা সাহায্য জোটেনি কারও।

সুন্দরবনের বাসিন্দা, এ রকমই কয়েক জন বিধবা মহিলা বৃহস্পতিবার হাজির হয়েছিলেন কলকাতা প্রেস ক্লাবে। দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম এই মহিলাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে অন্দোলন শুরু করেছে সম্প্রতি। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মিলন দাস বলেন, “সুন্দরবনে কত জন মহিলার স্বামী বাঘের হানায় মারা গিয়েছেন, তার স্পষ্ট কোনও হিসেবই নেই। বহু ঘটনাই সরকারের গোচরে আসে না। প্রথমে এই সংখ্যাটা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তার জন্য বিশেষ কমিশন বসাতে হবে। আমাদের হিসেব অনুযায়ী হাজার সাতেক এরকম মহিলা আছেন সুন্দরবনে। তাঁদের সবাইকে মাসিক তিন হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার দাবি নিয়ে আজ জড়ো হয়েছি আমরা।”

যেমন গোসাবার বাসিন্দা কৌশল্যা মণ্ডল। আজ থেকে বছর তিনেক আগে, নৌকায় চেপে স্বামীর সঙ্গে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন কৌশল্যা। ফিরেছিলেন একাই। কারণ তাঁর চোখের সামনেই প্রকাণ্ড এক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার তাঁর স্বামীকে টেনে নিয়ে চলে যায়।

২০১৬ সালে এই ঘটনা ঘটার পর থেকেই বিভিন্ন সরকারি অফিসে গিয়েছেন কৌশল্যা। কিন্তু কোনও সাহায্য মেলেনি। তাই সংসার চালানোর জন্য, পেটের টানে আজও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই বাঘেদের ডেরাতেই কাঁকড়া ধরতে যান তিনি। কৌশল্যা বলেন, “স্বামীকে হারিয়েছি। আমিও যে কোনও দিন বাঘের আক্রমণে মরে যেতে পারি। কিন্তু তা নইলে তো না খেয়ে মরতে হবে।” ১৮ বছরের ছেলেকে অবশ্য জঙ্গলে যেতে দেন না কৌশল্যা।

গোসাবারই আর এক বাসিন্দা গীতা মৃধা জানালেন, মাস সাতেক আগে তাঁর স্বামীও আর কয়েক জনের সঙ্গে সুন্দরবনে পীরখালির জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন। দিন পাঁচেক পরে বাকিরা সবাই ফিরে এলেন একে একে। ফিরলেন না শুধু গীতার স্বামী। বাকিদের মুখে শুনেছিলেন গীতা, ঠিক কেমন করে কত বড় বাঘটা এসে নিয়ে গিয়েছিল তাঁর ঘরের লোককে। আপাতত বাড়ি-বাড়ি পরিচারিকার কাজ করেন গীতা। তিনিও পাননি কোনও সরকারি সাহায্য।

আর এক ‘বাঘ-বিধবা’ কবিতা মণ্ডল জানালেন, তাঁর স্বামীও বাঘের পেটে গিয়েছে। তিনি বলেন, “বিধবা হওয়ার পর থেকে কোনও ভাবে সংসার চালাচ্ছি। ছেলেটা স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে পড়ছে। আমি চাই বড় হয়ে ওকে যেন এই কাজ করতে না হয়। কারণ সুন্দরবনের জেলেদের সুরক্ষা নিয়ে সরকারের কোনও মাথাব্যথাই নেই।”

‘বাঘ-বিধবা’দের সকলেরই অভিযোগ, তাঁদের বিষয়ে রাজ্য সরকার উদাসীন। বরং সাহায্য চাইতে গেলে বন দফতর থেকে জুটেছে তিরস্কারই। নানা রকম নথির কথা বলে বিভ্রান্ত করা হয়েছে বারবার। তাঁদের দাবি, রাজ্যে কেউ বিষ মদ খেয়ে মারা গেলেও সরকারি সাহায্য মেলে। অথচ কোনও মৎস্যজীবী বাঘের পেটে গেলে তাঁর পরিবারের দিকে ঘুরেও তাকায় না কেউ। হিঙ্গলগঞ্জ, গোসাবা, কুলতলি, পাথরপ্রতিমা এবং বাসন্তী ব্লকের গ্রামবাসীরা রোজকার জীবন এবং জীবিকার জন্য জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল। তাঁদের জন্য এইসব অঞ্চল সংলগ্ন জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতি খুব বড় ভয়ের কারণ।

তবে এই বার জোট বেঁধেছেন তাঁরা। বাঘ-কুমীরের আক্রমণে কোনও মৎস্যজীবীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে কী কী করতে হবে, তা নিয়েও সুন্দরবনের গ্রামে গ্রামে প্রচারভিযান শুরু করেছে দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম। মিলন দাস আরও বলেন, “সুন্দরবনে কোর এলাকায় অনুমোদন ছাড়া মাছ ধরা নিষিদ্ধ। মাত্র হাজার চারেক মৎস্যজীবীকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মৎস্যজীবীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাই চোরাপথে বহু মৎস্যজীবী মাছ বা কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের পেটে যাচ্ছেন।”

এই সমস্যা মেটানোর দাবি জানান তিনি। তাঁর আক্ষেপ, সুন্দরবনের মানুষজন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জঙ্গলের উপরে নির্ভরশীল হলেও অরণ্যের অধিকার আইনের কোনও সুবিধাই তাঁরা পান না।

Comments are closed.