বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১
TheWall
TheWall

জগদ্ধাত্রীর পুজোই বেশি কল্যাণকর, তিনিই শ্রেষ্ঠা, এমনটাই বলছে শাস্ত্র

অনির্বাণ

পালিত হচ্ছে জগদ্ধাত্রী পুজো। আলোকনগরী চন্দননগরে মহা ধূমধাম চলছে। কিন্তু দুর্গা পুজোর পরে পরে‌ই কেন একই দেবীর অন্য রূপের আরাধনা?

একই দেবীর দুই রূপ। এক জন দুর্গা, অন্য জন জগদ্ধাত্রী। দুর্গা পুজোর ঠিক এক মাস পরেই হয় জগদ্ধাত্রী পুজো। আশ্বিন মাসের শুক্লা অষ্টমীতে দেবী দুর্গার মূল পুজো আর কার্তিকের শুক্লা নবমীতে দেবী জগদ্ধাত্রীর। শাস্ত্রকার, পুরাণকারদের বক্তব্য, সিংহারূঢ়া জগদ্ধাত্রী যাঁকে রক্ষা করেন তার পতন নেই, বিনাশ নেই।

নামেই বোঝা যায়, জগদ্ধাত্রী হলেন জগতের ধাত্রী। তিনিই জগৎ সভ্যতার পালিকা শক্তি। তিনি দেবী দুর্গারই আর এক রূপ। তাই জগদ্ধাত্রীর প্রণামমন্ত্রে তাঁকে ‘দুর্গা’ বলে স্তুতি করা হয়েছে। দুই দেবীই ত্রিনয়না ও সিংহবাহিনী। তবে দুর্গার মতো জগদ্ধাত্রী দশভূজা নন। তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ থাকে। গলায় থাকে নাগযজ্ঞোপবীত। বাহন সিংহের নীচে হাতি। এই হাতি আসলে করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ হাতিরূপী অসুর।

দেবদেবীদের মধ্যে জগদ্ধাত্রীই সর্বশ্রেষ্ঠা। ভারত সেবাশ্রম সংঘের সন্ন্যাসী স্বামী নির্মলানন্দ মহারাজ তাঁর ‘দেবদেবী ও তাঁদের বাহন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘নিখিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ কে? অগ্নি? বায়ু? বরুণ? চন্দ্র? না, অন্য কোন দেবতা? একদা প্রথমোক্ত দেবতাচতুষ্টয় ভ্রান্ত গর্ব্ববশতঃ নিজদিগকেই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ এবং জগতের ঈশ্বর ব’লে সিদ্ধান্ত করেন। তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন— মহাশক্তিরূপিণী জগদ্ধাত্রীর শক্তিতেই তাঁরা শক্তিমান্।’ এর পরে কীভাবে দেবী জগদ্ধাত্রী অহঙ্কারী দেবতাদের গর্ব চূর্ণ করেছিলেন সেই কাহিনিও লিখেছেন তিনি। একই সঙ্গে দেখিয়েছেন কেনোপনিষদের এক উপাখ্যানেও রয়েছে ইন্দ্রাদি দেবগণের অহঙ্কার চূর্ণ করার কাহিনি।

সেই কাহিনি অনুসারে, দশপ্রহরণধারিনী মহামায়ার হাতে মহিষাসুর বধের পরে দেবতারা খুব অহঙ্কারী হয়ে পড়েন। তাঁদের ধারণা, তাঁরা অস্ত্র দান করার জন্যই দেবী দুর্গা অসুরনাশ করতে পেরেছেন। মহামায়ার শক্তিকে তাঁরা অস্বীকার করতে চান। ভুলে যান মহাশক্তিরুপিণী জগদ্ধাত্রীর শক্তিতেই তাঁরা শক্তিমান। সেই অজ্ঞতাকে ভুল প্রমাণ করতে তিন কোটি সূর্যের সমষ্টিগত দীপ্তি নিয়ে আবির্ভূত হন জ্যোতির্ময়ী জগদ্ধাত্রী। একটি তৃণখণ্ড সামনে রেখে তিনি বায়ু ও অগ্নিকে স্থানচ্যুত বা দগ্ধীভূত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু কেউই তা পারেন না। বুঝতে পারেন, বৃথাই অহঙ্কার, এক খণ্ড তৃণের শক্তিও তাঁদের নেই। বুঝতে পেরেই সকলে দেবী জগদ্ধাত্রীকে সকল শক্তির শ্রেষ্ঠ হিসেবে গ্রহণ করেন। দেবী তাঁর তেজোরাশি স্তিমিত করে এক অনিন্দ্য মূর্তি ধারণ করলে সকলে দেখন ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী জগদ্ধাত্রীর দর্শন পান। মঙ্গলময়ী মহাদেবীর সেই মূর্তি দেখে দেবগণ তাঁর স্তবে বসেন৷

জগদ্ধাত্রী যে দেবী-শ্রেষ্ঠা তা শোনা যায় ঠাকুর রামকৃষ্ণের মুখেও। তিনি বলেন, ‘জগদ্ধাত্রীরূপের মানে কী জান? যিনি জগৎকে ধারণ করে আছেন। তিনি না ধরলে জগৎ পড়ে যায়— নষ্ট হয়ে যায়। মনকরীকে যে বশ করতে পারে তারই হৃদয়ে জগদ্ধাত্রী উদয় হয়।’

মদমত্ত হাতি, তার উপরে শক্তির প্রতীক সিংহ আর তার উপরে দেবী জগদ্ধাত্রী। স্বামী নির্মলানন্দ দেবী জগদ্ধাত্রীর মূর্তির বর্ণনা করে বলেছেন তিনিই মানুষের মত্ত মনকে বশ করতে পারেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের মন মত্ত হস্তীর ন্যায় সর্ব্বদা মদান্বিত। সে অস্থির, উন্মাদ। এই দুরন্ত মনকরীকে সদা উদ্যমশীল বিবেকসিংহের দ্বারা মর্দ্দন করতে হবে— মহাশক্তিরূপিণী দেবীর বশীভূত করতে হবে। মন বশীভূত হ’লেই অন্তরে চৈতন্যময়ী জগদ্ধাত্রীর মহাপ্রকাশ অনায়াসলভ্য হয়।

বাংলায় এই পুজো মূলত কৃষ্ণনগর ও চন্দননগরে বিখ্যাত। জয়রামবাটিতে মা-সারদার জন্মভিটের পুজোও খুব বিখ্যাত। কলকাতা-সহ হুগলি জেলার ভদ্রেশ্বরেও অনেক পুজো হয়। মূলত কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতেই জগদ্ধাত্রী পুজো বিহিত। তবে অনেক জায়গাতেই সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিথিতে আলাদা আলাদা পুজো হয়। তবে নবমী তিথিতে আবার একসঙ্গে তিন তিথির পুজো করা হয়।

Comments are closed.