রাজস্থানে মেয়েদের এক স্কুলে ইউনিফর্ম ডিজাইন করেছেন সব্যসাচী! নেপথ্যে এক অসামান্য কাহিনি

৪৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজস্থান, নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার ঐতিহ্য, আভিজাত্যের কথা, ঝলমলে প্রাণবন্ত সব রঙের কথা। মনে পড়ে রঙিন লেহেরিয়া, বাঁধনি শাড়ি, পাটের জিনিস আর মিনাকারী কুন্দনের গয়না। রাজস্থানের হস্তশিল্পের সম্ভার আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অনেক কিছু দিয়েছে। বলা যায়, সাজগোজের ভিত্তিকে মজবুত করেছে। যদিও এই রাজ্যেই শিক্ষার হার সবচেয়ে কম, মেয়েদের অবস্থানও খারাপ, তবু এ রাজ্যের শিল্প যেন ভরিয়ে দিয়েছে সব খামতি।

আমেরিকার ডিজাইনার, শিল্পী মিশেল দুবে রাজস্থানের এই শিল্পের কদর বোঝেন। ভারতে দুবের যাত্রা শুরু হয় মাদার টেরিজার সঙ্গে কাজ করার সময় থেকে, সালটা ১৯৮৮। তিনি সেই সময় এখানে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন, ‘সিআইটিটিএ’। এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হল স্বার্থহীন ভাবে মানুষের সেবা করা। পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে এগিয়ে যায় এই প্রতিষ্ঠান। নেপালেও দুবের এই সংগঠন কাজ করেছে। নেপালে যেমন হসপিটাল বানিয়েছে এই সংগঠন তেমনই নেপালের মহিলা হস্তশিল্পীদের তৈরি ক্রচেট, কাশ্মীরি উলের পোশাক বাজারে নিয়ে এসেছে।

মিশেলের কাজে মুগ্ধ হয়ে এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরেছেন নৃতত্ত্ববিদ কেট স্পেইড ও ডোন্না কারান। সম্প্রতি তাঁরা এসেছিলেন রাজস্থানের ‘গোল্ডেন সিটি’ জয়সালমীরে। দুবে জানান, “ডোন্না কারান ও তাঁর টিম চেয়েছিলেন, প্রান্তিক অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মহিলাদের উন্নতির জন্য কাজ করতে। তাঁরা আমাকে প্রথমে এমব্রয়ডারির কাজ করা ব্যাগ বানাতে বললেন, তাঁদের প্রথম প্রোডাক্ট হিসেবে। সদ্যই আমি আবার রাজস্থান গিয়েছিলাম, এবং দেখি ওঁদের যা অবস্থা ছিল তাই আছে। তাই ওখানেই কাজ করার উদ্যোগ নিই। তবে ওখানকার সকলে জানান, রাজস্থানের মেয়েরা বাইরে গিয়ে লেখাপড়া করবে, কাজ করবে তা তাঁরা ভাবতেও পারেন না।”

এমন সময়ে সম্প্রতি অতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা আজরাখ প্রিন্ট রাজস্থানে খুঁজে পান দুবে। ইন্ডিগো এবং টকটকে লালের ওপর কাঠের ব্লক প্রিন্ট করা এই ইউনিক স্টাইল কিন্তু আজকের নয়! সিন্ধু সভ্যতার সময়কালেও ছিল এই প্রিন্ট। ছেলেরা এই কাপড়ের টুকরোকে কোমরবন্ধ এবং মেয়েরা ওড়না হিসেবে ব্যবহার করতো। অনেক রকমের প্রিন্ট পাওয়া যায় আজরাখের। বলা হয়, হস্তশিল্পের মধ্যে সবথেকে জটিল এবং কঠিন হল এই শিল্পটি। মিশেল দুবে বলেন, “এই পোশাক আমাকে আরও বেশি করে টেনেছিল এর ইতিহাসের জন্যে। কারণ হিন্দু এবং মুসলিম উভয়েই এই শিল্পের পেছনে নিজের শ্রম দিতেন। এই পোশাক বেশি পরতেন হরপ্পা সভ্যতার ক্ষত্রিয়রা।”

এর পরেই স্থানীয় মেয়েদের শিক্ষিত, স্বনির্ভর করে তোলার জন্যে তিনি একটি স্কুল তৈরি করেন তিনি। সেই রাজকুমারী রত্নাবতী বালিকা বিদ্যালয়ে মেয়েদেরকে লেখাপড়া এবং সমকালীন বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারুশিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ডিসেম্বরেই এই স্কুল খোলে। কিন্তু ছাত্রীরা স্কুলে আসে এপ্রিল থেকে, লকডাউনের কিছু দিন আগে। প্রায় ৪০০ জন ছাত্রী এখানে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। লকডাউন ঘোষণা হওয়ার পরেই দুবেকে ফিরে যেতে হয়, কিন্তু তাঁর কাজের দায়িত্ব নেন বাঙালি ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী মুখার্জী। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হাত বাটিক এবং ইক্কতের মতো আজরাখ প্রিন্টও তৈরি করে ফেলেছে নিজের বাজার। মানুষের কাছে রয়েছে এর বিপুল চাহিদা।

ট্র্যাডিশনাল এবং সমকালীন সময়ের চাহিদাকে এক জায়গায় নিয়ে এসে পোশাক তৈরি করতে বরাবরই সিদ্ধহস্ত সব্যসাচী। এবার তিনি তৈরি করছেন এই বিদ্যালয়ের মেয়েদের আজরাখ প্রিন্টের পোশাক। তিনি জানান, ২০০৯ এর শীত বস্ত্র সম্ভারে তিনি ‘নীলা আর বার্গান্ডি কি কাহানি’ নামে বাজারে নিয়ে এসেছিলেন আজরাখ প্রিন্টের পোশাককে।

এবার রাজস্থানের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি এই স্কুলের ইউনিফর্ম বানিয়েছেন। পুরো জামা নীল এবং পাড়ে রয়েছে আজরাখ প্রিন্ট, অনেকটা চুড়িদার-কুর্তার মতো। আর প্যান্ট লেগিন্সের মতো। সব্যসাচী বলেন যে এই পোশাক তিনি একটু বড় করে তৈরি করেছেন, যাতে দু’তিন বছর একই পোশাক আরামসে ব্যবহার করতে পারে ছাত্রীরা।

রাজস্থানের শিল্পকে সামনে আনতে সব্যসাচীর এই অভিনব কৃতিত্ব মন জয় করেছে সকলের।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More