শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

মেরুর আকাশে রোজ রঙের খেলা দেখায় মেরুজ্যোতি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের আকাশে ৮০-৩০০ কিমি উচ্চতায় দৃশ্যমান অত্যন্ত মনোরম এক রঙবাহারি আলোকনৃত্য হল অরোরা (Aurora) বা মেরুজ্যোতি। যা এক সময় অতিপ্রাকৃতিক বলে ভাবা হত। প্রাচীন পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বসবাসকারী বিভিন্ন উপজাতিগুলির মধ্যে অরোরা নিয়ে অনেক উপকথা প্রচলিত ছিল।

মেরুজ্যোতি

কোনও উপকথায় অরোরাকে বর্ণনা করা হত এক রহস্যময় শক্তি হিসেবে। যা কিনা অপদেবতাদের সংহার করে। কোনও উপকথায় অরোরাকে বলা হয়েছে পূর্বপুরুষদের আত্মার সম্মিলিত নৃত্য। প্রাচীনকাল থেকেই মেরু অঞ্চলের বাসিন্দারা (এস্কিমো, ইন্ডিয়ান, আথাবান) মনে করত এটি স্বর্গীয় আলো যা স্বর্গ থেকে শুরু হয়ে পৃথিবীতে এসে শেষ হয়েছে। এই পথ ধরেই মানুষের আত্মা স্বর্গের দিকে যাত্রা করে।

সুমেরুপ্রভা বা Northern Lights

অনেক উপজাতি আবার মেরুজ্যোতিকে দেবতাদের ভবিষ্যতবাণী বলে মনে করত। সবুজ রঙের মেরুপ্রভা আকাশে দেখা গেলে তারা ভাবত সুখের দিন আসছে।  মেরুপ্রভার রঙ লাল হলে তাদের মনে হত দুর্ভাগ্য আসছে বা যুদ্ধ হতে চলেছে। কিন্তু  ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে নরওয়ের বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান বার্কল্যান্ড বলেন এটি নিছকই একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এর মধ্যে কোনও অতিপ্রাকৃত নেই।

পৃথিবীর উত্তর অক্ষাংশে যে অরোরা বা মেরুজ্যোতি দেখা যায় তাকে বলা হয় Aurora Burealis বা  সুমেরুপ্রভা পৃথিবীর  দক্ষিণ অক্ষাংশে একে বলা হয় Aurora Australis বা কুমেরুপ্রভা 

কুমেরুপ্রভা বা Southern Lights

সুমেরুপ্রভা সবচেয়ে ভালো দেখা যায় কানাডার হাডসন উপসাগরীয় অঞ্চল, উত্তর স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ নরওয়ে এবং সুইডেনের কিছু অঞ্চল থেকে। কুমেরুপ্রভা দেখা যায় নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা থেকে। এইসব জায়গা থেকে রাতের বেলায় প্রায় নিয়মিতই মেরুজ্যোতি দেখা যায়।

বিজ্ঞানী বার্কল্যান্ড মেরুজ্যোতি সৃষ্টি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন  সূর্যের বুকে ওঠা সৌরঝড়ের প্রভাবে বিদ্যুৎযুক্ত কণা (প্লাজমা) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সব কণা পৃথিবীতে এসে পৌঁছানোর পর, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বায়ুমণ্ডলে সঙ্গে এইসব কণার বিক্রিয়া ঘটে বা সূর্য থেকে আসা বিদ্যুৎযুক্ত কণাগুলি পৃথিবীর বায়ুমন্ডল থাকা গ্যাসীয় অণু-পরমাণুকে আঘাত করে। সেই আঘাতে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় অণু-পরমাণুগুলি আন্দোলিত হয় এবং উজ্জ্বল আলোক বিকিরণ করতে থাকে।

মোদ্দা কথা, বায়ুমণ্ডলের থার্মোস্ফিয়ারে থাকা অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার থেকে বিদ্যুৎযুক্ত কণাগুলির ( প্রধানত ইলেকট্রন, কিছু ক্ষেত্রে প্রোটন) সংঘর্ষের ফলেই মেরুজ্যোতি তৈরি হয়। সংঘর্ষের কারণে বায়ুমণ্ডলে থাকা গ্যাসের পরমাণু বা অণুগুলি সূর্য থেকে আগত বিদ্যুৎযুক্ত কণাগুলি থেকে  কিছু শক্তি সংগ্রহ করে। যা কণাগুলির মধ্যে অভ্যন্তরীণ শক্তি হিসেবে সঞ্চিত হয়। এই অভ্যন্তরীণ শক্তি যখন আলোকশক্তি হিসেবে কণাগুলি থেকে বেরিয়ে আসে, তখনই মেরুজ্যোতি দেখা যায়। এসব ইলেকট্রন সাধারণত পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর পরিভ্রমণ করায় শুধুমাত্র মেরু অঞ্চলেই অরোরা দৃশ্যমান হয়।

মেরুজ্যোতি বিভিন্ন রঙের হতে পারে। তবে মেরুজ্যোতি কোন রঙের হবে সেটা নির্ভর করে কোন গ্যাসীয় পরমাণুকে ইলেকট্রন উদ্দীপ্ত হচ্ছে, এবং সেই বিক্রিয়ায়  কত পরিমাণ শক্তির বিনিময় হচ্ছে তার উপর। বেশিরভাগ মেরুজ্যোতি
রঙ হলো সবুজাভ-হলুদ বা গোলাপি ও সবুজের মিশ্রণ। এর কারণ হলো অক্সিজেন পরমাণুর সঙ্গে ইলেকট্রনের বিক্রিয়া। তবে অক্সিজেন পরমাণু থেকে অনেকসময় লাল রঙের মেরুজ্যোতিও তৈরি হয়।

অন্যদিকে নাইট্রোজেন পরমাণু সঙ্গে ইলেকট্রনের বিক্রিয়ায় সাধারণত নীল রঙের মেরুজ্যোতি তৈরি হয়। মেরুজ্যোতি  আকাশের পটভূমিকায় টাঙিয়ে দেওয়া আলোর পর্দার মতো দেখায়। তবে মাঝে মাঝে গোলাকার অথবা সর্পিলাকার মেরুজ্যোতিও দেখতে পাওয়া যায়। 

নিউজিল্যান্ডের ডুনেডিন বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত ছাড়ে পর্যটকদের বিমান। যা পর্যটকদের দেখিয়ে আনে  কুমেরুপ্রভার নেশা ধরানো সৌন্দর্য। গ্লোব-ট্রটারদের উইশ-লিস্টে প্রথম দিকেই থাকে মেরুজ্যোতি। এর জন্য তাঁরা যেকোনও পরিমাণের অর্থ ব্যয় করতে পিছপা হন না।

পড়ুন দ্য ওয়াল-এর পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

পুরস্কারের জন্য আমি সিনেমা বানাব না: প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য

Comments are closed.