সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

রাহুল বাজাজের তীক্ষ্ণ সমালোচনা যেন বংশগত, গান্ধী পরিবারকেও ছাড়েননি তাঁর কাকা রামকৃষ্ণ বাজাজ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সাধারণ মানুষ সরকারের কোনও রকম সমালোচনা করারই সাহস পাচ্ছে না। তারণ কেন্দ্র কোনও সমালোচনাই গ্রহণ করতে পারে না।– শনিবার একটি অনুষ্ঠানে এমনই মন্তব্য করেছিলেন বাজাজ গ্রুপের কর্ণধার রাহুল বাজাজ। এই সময়ে এমন মন্তব্য যে খুব নতুন, তা নয়। অনেকেই এই অভিযোগ তুলছেন ইদানীং। কিন্তু রাহুল বাজাজ আচমকা ট্রেন্ডিং হয়ে গিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।

কারণ খুঁজতে গিয়ে সামনে এসেছে, অদ্ভুত এক তথ্য। জানা গিয়েছে, সরকারের সমালোচনা করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করা বাজাজ পরিবারেরই পুরনো ঐতিহ্য। সেই গান্ধী পরিবারের সময় থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাজাজ পরিবারের নানা রকম খোঁচা।

তথ্য বলছে, ১৯৭৬ সালের মে মাসে বাজাজ পরিবারের আক্রমণের প্রথম সূত্রপাত ঘটেছিল। রাতারাতি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম দখল করেছিলেন রামকৃষ্ণ বাজাজ। তিনি আচমকাই প্রশ্ন তোলেন, সঞ্জয় গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ কী! তখনও বহু বিতর্ক হয়েছিল এই মন্তব্য নিয়ে। তবে এর পেছনেও ছিল আর এক ইতিহাস।

শিল্পপতি যমুনালাল বাজাজের ছেলে রামকৃষ্ণ বাজাজ নিজে মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন সেই ১৯৪২ সালে। ব্রিটিশ আমলে চার বছর জেল খেটে ১৯৪৬ সালে মুক্তি পান তিনি। মহাত্মা গান্ধীর একনিষ্ঠ অনুগামী রামকৃষ্ণ নিজের পরিচয় দিতেন, ‘মহাত্মা গান্ধীর কুলি’ বলে।

অথচ পরবর্তী কালে, ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জমানায় যখন ২১ মাস ধরে জরুরি অবস্থা জারি হয়, তখন ক্রমাগত সরকারি হেনস্থার মুখে পড়েন রামকৃষ্ণ বাজাজ। তাঁর বাড়িতে আয়কর দফতর হানা দেয় বারবার। এই একই সময়ে আবার গোহত্যার বিরুদ্ধে অনশন আন্দোলন শুরু করেছিলেন মহাত্মা গান্ধীরই আর এক অনুগামী বিনোবা ভাবে। রামকৃষ্ণকে বাধ্য করা হয়, বিনোবা ভাবেকে অনুরোধ-উপরোধ করে, প্রয়োজনে জোর করে হলেও অনশন প্রত্যাহার করাতে। কিন্তু এর কোনওটাই খুব সহজে বা একমুখী ভাবে হয়নি। স্তরে স্তরে, পরতে পরতে খেলা চলেছে রাজনীতির।

তৎকালীন বিশ্ব যুবক কেন্দ্রের ডিরেক্টর রামকৃষ্ণ বাজাজের অভিযোগ ছিল, এক দিকে তাঁকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করছে গান্ধী পরিবার, আবার অন্য দিকে তাঁকেই প্রশাসনিক চাপে রাখা হচ্ছে নানা ভাবে। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাহায্য চান রামকৃষ্ণ। তাঁরা ছোটবেলায় পরস্পরের বন্ধুও ছিলেন। কিন্তু বন্ধুত্বকে ছাপিয়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক স্বার্থ। তাই নানা রকম ভাবে রামকৃষ্ণ বাজাজের উপর হেনস্থা চলতেই থাকে।

১৯৭৫ সালের ৩০ অগাস্ট। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে একটি নির্দেশ পান শিল্পপতি রামকৃষ্ণ বাজাজ৷ তাঁকে বলা হয়, বিশ্ব যুবক কেন্দ্রটি নিজেদের অধীনে চায় দিল্লি প্রশাসন৷ ওই কেন্দ্রের ডিরেক্টর পদে ছিলেন বাজাজ। তিনি দলের অন্দরের সূত্রেই জানতে পারেন, সঞ্জয় গান্ধী নিজে ওই যুবক কেন্দ্রের বিল্ডিংটি দখল করতে চাইছেন। কারণ যুব-কংগ্রেসের হোস্টেল তৈরি করতে চান সঞ্জয় গান্ধী।

রাজি হননি রামকৃষ্ণ। তিনি সরাসরি যোগাযোগ করেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রহ্মানন্দ রেড্ডিকে। কিন্তু লাভ হওয়া দূরের কথা, উল্টে গোটা বিষয়টাই যেন ‘মায়ের কাছে মাসির গল্প’ হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে রামকৃষ্ণকে ফের নির্দেশ দেওয়া হয়, বিশ্ব যুবক কেন্দ্রের ট্রাস্টি থেকে সরে গিয়ে, সেই দায়িত্ব যেন সঞ্জয় গান্ধীর হাতে তুলে দেওয়া হয়৷

এর পরেও হাল ছাড়েননি রামকৃষ্ণ। ফের ইন্দিরার দ্বারস্থ হন তিনি৷ একসঙ্গে বিমান যাত্রার সময়ে ইন্দিরাকে রামকৃষ্ণ বলেন, “আপনি কি আমার ওপর কোনও কারণে রেগে আছেন?” জানা যায়, ইন্দিরা এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “হ্যাঁ, অভিযোগ তো কত রকমের হতেই থাকে।” রামকৃষ্ণ আসলে বিশ্ব যুবক কেন্দ্রের বিষয়টি নিয়েই ইন্দিরার সঙ্গে  আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। হয়তো পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরেই। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী আবারও তা হতে দেননি।

পরে রামকৃষ্ণ বাজাজের কাছে স্পষ্ট হয়, ১৯৬৬ সালে তাঁর ভাই কমলনয়ন বাজাজ এবং কাছের বন্ধু বীরেন শাহ (যিনি পরে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হয়েছিলেন) যখন ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতা করেছিলেন, তখন থেকেই গান্ধী পরিবারে তাঁর বিরুদ্ধেও উষ্মা তৈরি হয়। কিন্তু এ সবের পরেও গান্ধী পরিবারের প্রতি আনুগত্যে টান পড়েনি রামকৃষ্ণর। সেটা বুঝেই হয়তো জরুরি পরিস্থিতি চলার সময়ে রামকৃষ্ণের সমর্থন চেয়েছিলেন ইন্দিরা। কারণ তিনি জানতেন, রামকৃষ্ণ বাজাজ যেটা করতে পারবেন, বিনোবা ভাবে সেটা পারবেন না। রামকৃষ্ণ বাজাজ হতাশ করেননি। এই জরুরি অবস্থাকে ‘অনুশাসন পর্ব’ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

এখানেই শেষ নয়। এর পরেই গোহত্যার বিরুদ্ধে বিনোবা ভাবের অনশন তোলার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়ার জন্য রামকৃষ্ণকে চাপ দেন সঞ্জয় গান্ধীর অনুগত মন্ত্রী ওম মেটা। তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন, রামকৃষ্ণ সফল হলে আয়কর দফতরের তরফে যে চাপ তৈরি করা হয়েছে বাজাজ পরিবারের ব্যবসায়, তা বন্ধ করা হতে পারে।

এ কথা শুনে চমকে যান রামকৃষ্ণ। তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, তাঁকে রাজনৈতিক স্বার্থে ক্রমাগত ব্যবহাক করা হচ্ছে। ওম মেটাকে তিনি জানান, বিনোবা ভাবে তাঁর গুরু। এমনকি তাঁর বাবারও গুরু। তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে মতামত রাখা রামকৃষ্ণের পক্ষে শোভন নয়। তিনি এও বলেন, এই কাজটা ওম মেটা নিজে করলেই ভাল হয়।

কিন্তু শেষমেশ বিনোবা ভাবেকে চিঠি লিখতে বাধ্য হন রামকৃষ্ণ বাজাজ। তিনি লেখেন, “আমি খুবই নগণ্য ব্যক্তি। কিন্তু তবু খুব ভয়ে ভয়েই আমার গুরুর সামনে নিজের একটি মতামত প্রকাশ করছি। আপনি আমায় অনেক বার বলেছেন, শ্রী যমুনালাল বাজাজ যে গো-সেবার ব্রত নিয়েছিলেন, আপনি সেই ইচ্ছেই পূরণ করার জন্য অনশন করছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, এ জন্য অনশন সঠিক পথ নয়। বরং বিজ্ঞানসম্মত ভাবে সাধারণ মানুষকে বুঝিয়ে যদি গোরক্ষার পক্ষে জনমত গঠন করা যায়, তবে সেটি বেশি কার্যকর হবে।”

অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন বিনোবা ভাবে।

কিন্তু এর পরেও গান্ধী পরিবারকে আক্রমণ করতে ছাড়েননি রামকৃষ্ণ বাজাজ। ১৯৭৬ সালে সঞ্জয় গান্ধীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অবলীলাক্রমে প্রশ্ন তোলেন রামকৃষ্ণ। গান্ধী পরিবারের অনুগত হয়েও এবং সেই আনুগত্য সত্ত্বেও বারবার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে, সমালোচনার তির ছুড়ে দেন এক সময়ে। ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সটান।

তাঁরই ভাইপো রাহুল বাজাজ। ফলে তিনিও যে সরকারের রেয়াৎ করবেন না, তা আশা করাই যায়। তাই শনিবারের অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহ, নির্মলা সীতারমণ এবং পীযূষ গয়ালও উপস্থিত থাকার পরেও তিনি সমালোচনা করেন সরাসরি। তিনি বলেন, “শিল্পপতি বন্ধুদের অনেকেই যে কথা বলতে পারেন না, আমি সেটা খোলামেলা ভাবেই বলব। এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেমনটা ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ছিল, যাতে আমরা যে কারও সমালোচনা করতে পারি। সরকার ভাল কাজ করলে তো তার আত্মবিশ্বাস থাকবে। সমালোচনা গ্রহণ করার উদারতা থাকবে!”

প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক অতীতে দেশের অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে মুখ খুলে কড়া সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে বেশ কয়েক জন স্বনামধন্য শিল্পপতিকে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সামনে পেয়ে সম্ভবত, সেই সমালোচনারই জবাব দিতে চেয়েছেন বাজাজ কর্ণধার। এবং সেই জবাবের ধরন তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যকেই বহন করেছে।

Comments are closed.