শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

ফোনে আড়ি পাতার রোগ

রোগটা ছিল অনেকদিন ধরেই। ইদানীং একটু বাড়াবাড়ি হয়েছে। সেইজন্য এত হইচই।

পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলিতে নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকারকে যেভাবে সম্মান করা হয়, ভারতে তেমন হয় না। এখানে বরাবরই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নজরে রাখার জন্য শাসক দল তার ফোনে আড়ি পাতে। এই নিয়ে আগেও কয়েকবার বিতর্ক হয়েছে। সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে কয়েকদিন আগে।

গত ৩০ অক্টোবর ফেসবুক কোম্পানি নির্দিষ্ট করে ভারত সরকারকে জানিয়েছিল, এদেশে পেগাসাস সফটওয়ার ব্যবহার করে কয়েকজনের হোয়াটস অ্যাপে নজরদারি চালানো হয়।

পেগাসাস শব্দটির অর্থ পক্ষীরাজ ঘোড়া। ইজরায়েলের এনএসও গ্রুপ নামে এক সংস্থা ওই সফটওয়ার বানিয়েছে। ইজরায়েলিরা বরাবর এই ধরনের নজরদার যন্ত্রপাতি বানাতে খুব ওস্তাদ।

প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছিল, ভারতে মোট ১২১ জনের ওপরে পেগাসাস সফটওয়ারের সাহায্যে নজর রাখা হয়। তাঁদের মধ্যে আছেন মানবাধিকার কর্মী, দলিত ও আদিবাসী অ্যাকটিভিস্ট, আইনজীবী, সাংবাদিক ইত্যাদিরা। পরে শোনা গেল, মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলির কয়েকজন শীর্ষ নেতাও নজরদারির আওতায় আছেন। তখন সবাই নড়েচড়ে বসল। বোঝা গেল আড়ি পাতার রোগ এতদিনে মারাত্মক হয়ে উঠেছে।

রাজনীতিকরা এমনিতেই ফোনে আড়ি পাতার ভয়ে এক-একজন চার-পাঁচটা নম্বর ব্যবহার করেন। ভিন্ন ভিন্ন নামে নম্বরগুলি নেওয়া হয়। অনেকে মোবাইলের ডেটা ব্যবহার করেন। শোনা যেত, তাতে নাকি আড়ি পাতা সম্ভব নয়। কিন্তু পেগাসাস দেখিয়ে দিল, সবই সম্ভব।

ভারতে কে বা কারা পেগাসাস ব্যবহার করছে?

ফেসবুক জানতে পেরেছে, কাউকে ওই সফটওয়ার বিক্রি করার আগে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অনুমতি নিতে হয়। এনএসও নামে সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা কেবলমাত্র কোনও দেশের সরকারকেই ওই সফটওয়ার বিক্রি করে। কোনও বেসরকারি সংস্থাকে করে না। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি মোদী সরকারই পেগাসাস সফটওয়ার কিনেছিল?

ব্যাপারটা বড় ধরনের রাজনৈতিক কেলেংকারির রূপ নিতে চলেছে মনে হয়। কংগ্রেস, তৃণমূল, এনসিপি ইত্যাদি বিরোধী দল সরকারকে চেপে ধরতে তৈরি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, তাঁর ফোনে আড়ি পাতা হয়। প্রিয়ংকা গান্ধীর ফোনেও আড়ি পাতা হয়েছিল শোনা যাচ্ছে। সামনেই লোকসভার শীত অধিবেশন। বিরোধীরা সরকারকে কোণঠাসা করার এতবড় হাতিয়ার পেয়েও ছেড়ে দেবেন ভাবা ভুল।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলা যায়। বিরোধীরা এখন ফোনে আড়ি পাতা নিয়ে খুব হইচই করছেন বটে, কিন্তু একই অভ্যাস তাঁদেরও আছে। ক্ষমতায় থাকার সময় তাঁরা বিরোধী দলের নেতা, এমনকি সাংবাদিকদের ফোনে পর্যন্ত আড়ি পাততে ছাড়েন না। আমাদের রাজ্যেই ভাঙ্গড়ে জমি আন্দোলনকারীরা বলেন, তাঁদের মোবাইলে নাকি একসময় নিয়মিত ট্যাপ করা হত। মোবাইলের সূত্র ধরে অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কিছুদিন আগে খোদ রাজ্যপাল বলেছেন, তিনি অনেকের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছেন, তাঁদের ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে।

সত্যি বলতে কী, এযাবৎ ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগ আঞ্চলিক দলগুলির বিরুদ্ধেই উঠেছে বেশি। নরেন্দ্র মোদীও দীর্ঘদিন আঞ্চলিক নেতা ছিলেন। ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে এসেছেন।

আড়ি পাতার রোগ সব দেশেই আছে। অনেকের মনে পড়বে মার্কিন মুলুকের ওয়াটারগেট কেলেংকারির কথা। ১৯৭২ সালে নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের প্রার্থী রিচার্ড নিক্সন বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক দলের সদস্যদের ফোনে আড়ি পেতেছিলেন। অভিযোগ প্রমাণ হতে প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে একরাশ লজ্জা নিয়ে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

আমাদের দেশে ব্যাপারটা অতদূর গড়াবে না। আড়ি পাতার দায় নিয়ে সরকারের কোনও শীর্ষ পদাধিকারী পদত্যাগ করবেন, এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিছুদিন বাদে সব ধামাচাপা পড়ে যাবে। তবু বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসাবে আমরা আশা করতে পারি, আড়ি পাতা রোগ সারানোর জন্য কিছু দাওয়াই খুঁজবে রাষ্ট্র। অন্তত এই সংক্রান্ত আইনে কিছু কড়াকড়ি করা হবে।

Comments are closed.