শনিবার, এপ্রিল ২০

বিকিনির ছবিতে কী এমন মানহানি! জবাব এল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছবিটা দেখেই মাথার চুল খাড়া হয়ে গিয়েছিল মেঘনার (নাম পরিবর্তিত)। ওরই ছবি। তবে বিকৃত। পোশাক খুলিয়ে অন্তর্বাস পরানো হয়েছে। ছবিটা দেখে চিনতেও পারল ও। দু’দিন আগেই ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার হিসেবে আপলোড করেছিল, ছাদে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছবি। সেই ছবিতেই তার মুখটা অপরিবর্তিত রেখে বাকিটা বদলে দেওয়া হয়েছে। স্কার্ট-টপ বদলে গিয়েছে বিকিনিতে। ভাল হাতের কাজ। এমন ভাবে মর্ফড করা, যাতে মনে হচ্ছে ওভাবেই ছাদে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে!

অন্য কেউ হলে এত কিছু দেখার বা ভাবার বদলে লজ্জায় বা ভয়েই সিঁটিয়ে যেত। মেঘনা অবশ্য অন্য ধাতুর মেয়ে ছিল। এ সব অসভ্যতা কী করে কড়া হাতে সামলাতে হয়, সে জানে। ছবিটা এসেছে মেঘনার হোয়াটসঅ্যাপে। স্বাভাবিক ভাবেই, নম্বর অচেনা। কোনও ছবিও নেই প্রেরকের প্রোফাইলে। ঠান্ডা মাথায় মেঘনা মেসেজ করল, হু ইজ় দিস। উত্তর এল না। উল্টে এল হুমকি, ছবিটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দেওয়া হবে।

কথা না বাড়িয়ে পরের দিনই সোজা লালবাজারে পৌঁছল মেঘনা। সাইবার ক্রাইম বিভাগে ঢুকে, অফিসারের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলে লিখিত এফআইআর দায়ের করল। কিন্তু পুলিশকে কিছুতেই বলতে পারল না, কোনও সন্দেহভাজনের নাম। কে এমনটা করতে পারে, অনেক ভেবেও আন্দাজ করতে পারেনি মেঘনা। তবে ভরসা ছিল, অভিযোগ পেয়ে নিশ্চয়ই অভিযুক্তকে খুঁজে বার করে ফেলবে পুলিশ।

পুলিশ জানাচ্ছে, মেঘনার মতো এমন অভিযোগের সংখ্যা রোজ বাড়ছে। ইদানীং ইন্টারনেট জগতে মানুষের বিচরণ যত বাড়ছে, তত বাড়ছে নিত্যনতুন অপরাধও। বস্তুত, কারও সঙ্গে বাস্তবের মাটিতে কোনও অন্যায় করতে গেলে যা যা ভয় বা আশঙ্কা থাকে, তার অনেকটাই এড়ানো যায় ভার্চুয়াল মিডিয়ায়। তাই হামেশাই যেন নানা রকম অন্যায়ের জায়গা হয়ে উঠছে এই সোশ্যাল মিডিয়া। আর এগুলির মধ্যে সব চেয়ে বেশি সংখ্যায় ঘটছে, কোনও মহিলার ছবি বিকৃত করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া। ঠিক যেমনটা হয়েছে মেঘনার সঙ্গেও। তবে এক্ষেত্রে ফেসবুক বা অন্য কোনও সোশ্যাল সাইট নয়, হোয়াটস্অ্যাপের মতো একটি ব্যক্তিগত মেসেজের মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে অপরাধী।

তদন্ত শুরু হল, গুরুত্ব দিয়েই। আধুনিকতম প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ধরনের কেস সল্ভ করতে খুব বেশি সময় লাগে না পুলিশের। কিন্তু এই কেসে এগোতে গিয়ে দেখা গেল, কয়েকটি সমস্যা রয়েছে।

প্রথমত, এই ক্ষেত্রে অপরাধী ছিল বিশেষ ধুরন্ধর, যে নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে, সেই নম্বরের সিম কার্ডটি অ্যানড্রয়েড ফোনে লাগিয়ে হোয়াটস্অ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলেছিল সে। তার পরেই অকেজো করে দিয়েছে সেই সিম। অর্থাৎ ওই হোয়াটস্অ্যাপ অ্যাকাউন্টের যে নম্বর, তার নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ফোন ব্যবহারকারীকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।

আর দ্বিতীয়ত, সাইবার সতর্কতাই বাধা হয়ে উঠেছে অপরাধীকে চিহ্নিত করায়। গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে হোয়াটস্অ্যাপ চ্যাট “এন্ড টু এন্ড এনক্রিপটেড” থাকে। অর্থাৎ এই কথোপকথন দু’জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, বাইরে থেকে তৃতীয় কোনও পক্ষ তা অ্যাকসেস করতে পারবে না। ফলে কারও পক্ষেই ওই হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের ভিতরে ঢুকে ব্যবহারকারীকে খুঁজে বার করা সম্ভব নয়।

এটা একমাত্র করা যেতে পারে হোয়াটস্অ্যাপের নিজস্ব সার্ভারের মাধ্যমে। তারা চাইলে, ওই নম্বরের অ্যাকাউন্ট মালিকটিকে খুঁজে বার করতে পারলেও পারতে পারে। কিন্তু এ দেশে তো হোয়াটস্অ্যাপের সার্ভার নেই! তার নাগাল পেতে পৌঁছতে হবে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায়, হোয়াটসঅ্যাপের সদর দফতরে। ইমেলের মাধ্যমে পৌঁছনো গেল সেখানেও। জানানো হল সমস্যা।

কিন্তু সহজে মোটেই সাহায্য করতে রাজি নয় তারা। কেনই বা করবে, গোপনীয়তা রক্ষা করা যাদের পরিষেবার প্রাথমিক শর্ত, তারা কোনও রকম তথ্য কেনই বা তুলে দেবে বিদেশের কোনও শহরের প্রশাসনের হাতে? সমস্যা আরও খুলে বলে সবটাই জানানো হল। জানানো হল, একটি মেয়ের মান-সম্মান জড়িয়ে আছে। দেখানো হল, বিকৃত ছবি। বলা হল, এটি ঘৃণ্য অপরাধ, তাই অ্যাকাউন্ট মালিককে খুঁজে বার করা জরুরি।

এবার চমকানোর পালা কলকাতা পুলিশের! মার্কিন সংস্থার মার্কিন কর্তারা সাফ জানিয়ে দিলেন, এই ছবিতে কী করে মানহানি হতে পারে! এ ছবিতে খারাপ কী আছে! কোনও মহিলা তো এ রকম পোশাক পরতেই পারেন। অন্তত সে দেশে তো এমনটা হামেশাই ঘটে থাকে। তাই এরকম কোনও ছবি তৈরি করে কী করে কারও সম্মানহানির মতো অপরাধ ঘটানো যেতে পারে, তা তাঁদের বোধগম্য হয়নি।

বস্তুত, সে দেশের মানুষের মানসিকতার নিরিখে এমনটা ভাবা বা বোঝা খুব অস্বাভাবিক নয়। কোনও তরুণীর স্বল্পবাস পরা ছবি তৈরির ঘটনা সেখানে এতটাও অপরাধের বা অশ্লীলতার নয়। তাই কোনও তরুণীর এরকম ছবি তৈরি করে পাঠানোটাও সেখানে তত গুরুতর ‘অপরাধ’-এর পর্যায়ে পড়ে না। এর পরে অবশ্য ভারতীয় সংস্কৃতির কথা ব্যাখ্যা করে সে ছবির অশ্লীলতা বা অসম্মানের কথা বোঝানোর কোনও চেষ্টা করা হয়েছিল কি না জানা যায়নি।

তবে হোয়াটস্অ্যাপের ব্যক্তিগত চ্যাটে ঘটা অনেক অপরাধই এই কারণে থেকে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। এক দিকে জোরকদমে চলা তদন্ত, অন্য দিকে অপরাধের গুরুত্বই বুঝিয়ে না উঠতে পারার কারণে পিছিয়ে আসা— এই দুইয়ের জাঁতাকলে কি তা হলে অধরাই থেকে যাবে হোয়াটসঅ্যাপের ব্যক্তিগত চ্যাটে অসভ্যতা করা ব্যক্তিরা? প্রশ্ন ঘুরছে সাইবার দফতরের অন্দরেই।

Shares

Leave A Reply