রবিবার, মার্চ ২৪

কুকুর-বিড়াল জাতীয় প্রাণীর আঁচড়-কামড় নিয়ে কী বললেন ডাক্তারবাবু, জেনে নিন

কুকুর-বিড়াল সহ যে কোনও পোষ্য বা রাস্তার পশু আঁচড়ে বা কামড়ে দিলে কী করতে হবে, আমরা সেটা জানি না অনেকেই। তবে এই আঁচড়-কামড় থেকেই জলাতঙ্ক হতে পারে, হতে পারে মৃত্যুও।  চার পাশে কুকুরের কামড় এবং কুকুরছানা পিটিয়ে মারা নিয়ে শহরবাসী দু’ভাগ হয়েছেন।  তারই মাঝে কথা বললাম বিশিষ্ট কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ডঃ রণবীর ভৌমিকের সঙ্গে। আপনাকে কুকুর, বিড়াল, বাঁদর, ঘোড়া আঁচড়ে বা কামড়ে দিলে কী কী করবেন আর কী কী করবেন না, জেনে নিন।

দ্য ওয়াল: কুকুর, বিড়াল, বা বাঁদরে আঁচড়ে দিলে কী করতে হবে?
ডঃ ভৌমিক: সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা রানিং ট্যাপ ওয়াটারে ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। এর পরে সাবান দিয়ে অবশ্যই আরও কিছু ক্ষণ ধুয়ে নিন জায়গাটা।  যোগাযোগ করুন ডাক্তারকে। ভ্যাকসিনেশন খুব জরুরি এ ক্ষেত্রে। এই আঁচড়ের পরে যদি সঙ্গে সঙ্গে কলের জল না পান কিছু ঘণ্টা পরে হলেও অবশ্যই রানিং ট্যাপ ওয়াটারে জায়গাটা ধুতেই হবে। নইলে জার্মটা যাবে না। র‍্যাবিস ভাইরাস সাধারণত পশুদের স্যালাইভা বা থুতুর মধ্যে দিয়ে মানুষের শরীরে বেশি আসে, তবে কুকুর, বিড়াল বা বাঁদর আঁচড়ে দিলেও সেই ভাইরাস অ্যাটাক করতে পারে। আর এতে সঠিক চিকিৎসা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

দ্য ওয়াল: অ্যান্টি র‍্যাবিস কখন এবং কাদের নিয়ে রাখতে হবে ?
ডঃ ভৌমিক: যাঁরা যাঁরা রাস্তার কুকুর-বিড়ালদের নিয়ে কাজ করেন, বা পশুচিকিৎসার সঙ্গে জড়িত, কোনও ল্যাবে কাজ করেন প্রত্যেকেরই এর প্রয়োজনীয়তা আছে। যে কোনও সময়েই পশুর আঁচড়-কামড় লাগতে পারে, তাই এই ‘Pre exposure’ খুব জরুরি। আঁচড় কামড়ের পরে যে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয় তা ‘Post exposure’।

২০০৪ থেকে অ্যান্টি র‍্যাবিস ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ডোজের পরিবর্তন এসেছে।  আগে যে ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হতো তা সোজাসুজি মানুষের নার্ভে প্রভাব ফেলত, যাকে ‘Neural vaccine’-ও বলা হতো। তবে এখন যে ভ্যাকসিন দেওয়া হয় তা মানুষের কোষ থেকে বা আফ্রিকান বাঁদর ‘ভেরো’ র কোষ থেকে তৈরি করা হয়। আগে যে দিন কামড় বা আঁচড় লাগত সেই দিন, ঘটনার ৩, ৭, ১৪ এবং ২৮ দিনে মোট ৫টি ভ্যাকসিন দিতে হতো। এখন যে ভ্যাকসিন দেওয়া হয় তাতে শেষ দু’টো ডোজ দিতে হয় না সাধারণ ক্ষেত্রে। তবে ক্যানসার, ডায়বেটিস, এইচআইভি-র মতো রোগ থাকলে তাঁদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাই এঁদের ১৪ এবং ২৮ নম্বর ডোজটাও দিতেই হয়। একই ভাবে যাঁরা স্টেরয়েড নেন, তাঁদেরও পুরো ডোজ দেওয়া হয় এখনও। কারণ তাঁদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

জলাতঙ্ক নিয়ে কী বললেন ডাক্তারবাবু…

দ্য ওয়াল: বাড়ির পোষ্য হলে ক্ষতির আশঙ্কা কতটা কম থাকে? সে ক্ষেত্রে তাকে কখন কখন ভ্যাকসিন দিয়ে রাখতে হবে?
ডঃ ভৌমিক: না, পোষ্য হলেই সব সময় যে নিশ্চিন্ত থাকা যায় তা নয়। তাকে তিন এবং চার মাসে অ্যান্টি র‍্যাবিস দিতে হবে। সঙ্গে প্রতি বছর একটা করে ভ্যাকসিন দিতে হয়। এক বছর পেরিয়ে গেলে ওই ভ্যাকসিনের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাই পোষ্যরা র‍্যাবিস আক্রান্ত হতেই পারে, যার জেরে তার আঁচড়-কামড়ে আপনার জলাতঙ্ক পর্যন্ত হতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় এই ভ্যাকসিনেশনকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তবে কুকুর বা বিড়ালের ক্ষেত্রে রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায় তারা কতটা র‍্যাবিস ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিরোধ করার জায়গায় আছে। সেটা সব সময় কুকুর বিড়ালের বাড়ির লোকের খেয়াল রাখা দরকার।  নইলে পশুরও বিপদ, নিজেদেরও বিপদ।

দ্য ওয়াল: কুকুর বিড়াল সব ক্ষেত্রেই কি একই নিয়ম?
ডঃ ভৌমিক: না দুক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা।  ডোজের রকমফের আছে।  কুকুরের কামড়ে আর বিড়ালের কামড়েও তফাৎ আছে।  বিড়ালের দাঁতের গঠণের জন্যই ওর কামড় Deep tissue তে ঢুকে যায়।  কুকুরের কিন্তু তা নয়।  Superficial level এ থাকে কুকুরের কামড়।  তবে violent কুকুর হলে সেটার ব্যতিক্রম হতে পারে।  অনেকে কুকুর বা বিড়ালের মুখে আদর করে, সেটা মোটেও ঠিক নয়।  ওদের স্যালাইভা থেকে আপনার শরীরে রোগ আসবে সহজেই।  বিশেষতঃ বিড়াল ওর হাত পা’র চেটো চাটে, পরিষ্কার করে।  ফলে ওর থুতুতে অনেক বেশী সমক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।  তাই কুকুর বিড়ালের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম।

দ্য ওয়াল: আঁচড় এবং কামড়ের ক্ষেত্রে আলাদা প্রতিকারের ব্যাবস্থা?
ডঃ ভৌমিক: আঁচড়ের ক্ষেত্রে যে ভ্যাকসিন দেওয়া হয় তার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় ৭-১৪ দিনে।  কিন্তু কামড়ে মাসল টিয়ার হলে, ‘Rabies immunoglobulin’ দিতে হয়।  আঁচড়ের ক্ষেত্রে যে দিন হল সে দিন, তার পর থেকে তিন, সাত, চোদ্দ এবং আঠাশ দিনে দেওয়া হয় ভ্যাকসিন।  কিন্তু কামড়ের ক্ষেত্রে সেই জায়গায় ইঞ্জেকশন দিতে হয়।  সেলাই করতে হয়।  তবে সেলাই করার ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পরে সেলাই করা ভালো।  নইলে র‍্যাবিস ভাইরাস নার্ভকে অ্যাটাক করতে পারে। ভাইরাস যত সময় যাবে কাজ করা বন্ধ করে দেবে, তারপর সেলাই করলে নার্ভে অ্যাটাক করবে না।  মৃত্যুর আশঙ্কা কম থাকবে।

দ্য ওয়াল: বলা হয় এই জাতীয় আঁচড় বা কামড়ে জল দিয়ে, সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ধুয়ে ফেললে সমস্যা কমে যায়—কতটা ঠিক?
ডঃ ভৌমিক: না কখনওই ঘষাঘষি করবেন না।  এতে ভাইরাস সহজে আপনার শরীরে ঢুকে যাবে।  আক্রান্ত জায়গাটা জলের তোড়ে ধোয়া প্রথম কাজ, এরপর Povidone Iodine বা অ্যালকোহল দিয়ে জায়গাটা ধুয়ে দিতে হবে।  কিন্তু কোনও ঘরোয়া টোটকা বা আয়ুর্বেদিক জড়িবুটি দিয়ে একদমই কিছু করবেন না।

দ্য ওয়াল: আগে কুকুর কামড়ালে ১৪টি ইঞ্জেকশন দিতেই হত, এখন সেটা হয় না কেন?
ডঃ ভৌমিক: র‍্যাবিস ভাইরাস ব্রেনকে সরাসরি আক্রমণ করে।  আগে নার্ভ টিস্যু থেকে তৈরি হত এই অ্যান্টিভাইরাস ভ্যাকসিন।  তাতে এনক্যাফালোপাথি বা নিউরোপ্যাথি হত বেশীরভাগেরই। এক লাখে এক জনের হলেও বাঁচানো যেত না কোনও ভাবেই।  ২০০৪ এর পর থেকে এই নিয়ম বদলাতে থাকে কারণ ভ্যাকসিন তৈরি হতে থাকে মানুষের টিস্যু দিয়ে বা আফ্রিকান বাঁদরের টিস্যু দিয়ে।  ফলে এখন আর ১৪টি নয় দেওয়া হয় ৫টি ইঞ্জেকশন। তা-ও আর্থিক সমস্য কারও থাকলে আর সে ক্যনসার, ডায়বেটিস, এইচ.আই.ভি র মতো সেনসিটিভ রোগ থাকলে তার ক্ষেত্রে ডাক্তাররা আলাদা ব্যবস্থা নেন।

দ্য ওয়াল: অনেকে বলেন কোনো একটা কুকুরকে ভ্যাকসিন দিলে সে অন্য কুকুরকে কামড়ে দিলে দ্বিতীয় কুকুরটি নিরাপদ কিন্তু আমরা নই, এই ধারণা কতটা ঠিক?
ডঃ ভৌমিক: হ্যাঁ কারণ দ্বিতীয় কুকুরের ভ্যাকসিন দেওয়া নেই হয়তো, ফলে তার থেকে প্রথম কুকুরটিতে ভাইরাস পৌঁছে যাবে, আর সেখান থেকেই মানুষ নিরাপদ নয়।  কারণ প্রথম কুকুরের তখনও সেই অ্যান্টি র‍্যাবিস কাজ করছে কি না তা জানা থাকে না। তাই এটা মুশকিল হতেই পারে।

দ্য ওয়াল: কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে সেই প্রাণী যাতে ১০ দিনের মধ্যে না মরে যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয় কেন?
ডঃ ভৌমিক: আসলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ১০ দিনের মধ্যে সেই প্রাণী মারা যায়।  বাঁদর, বিড়াল,কুকুর যাই হোক।  এদের ব্যবহার হঠাৎ বদলে যায়, রেস্টলেস বা অস্থির হয়ে যায়, ছুটোছুটি করতে থাকে অথবা একদম শান্ত হয়ে যায়।  মুখ থেকে বেশি পরিমাণে লালা পড়তে থাকে। ১০ দিনের মধ্যে মরে গেলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে পশুটি র‍্যাবিস আক্রান্ত , কাজেই যাকে কামড়েছে তাঁকে ৫টা ডোজের ইঞ্জেকশন নিতেই হবে।  আর মারা না গেলে প্রাণীটি র‍্যাবিস আক্রান্ত নয়।  সেক্ষেত্রে তিনটে ডোজে মিটতে পারে সমস্যা।

দ্য ওয়াল: কোন কোন রোগীদের ক্ষেত্রে এই আঁচড় কামড়ে অতিরিক্ত সাবধানতা নিতে হবে?
ডঃ ভৌমিক: ডায়বেটিক পেশেন্ট হলে ইনফেকশনের সম্ভাবনা বেশী।  তাই সচেতন হতে হবে বেশী।  প্রেগনেন্সিতে এজাতীয় আঁচড় কামড়ে নিতে হবে ফুলডোজ।  আর ক্যানসার এইচ আই ভি এইসব ক্ষেত্রেই ইঞ্জেকশন পাঁচটাই নিতে হবে।

অর্থাৎ ঘোড়া, বাঁদর, কুকুর, বিড়াল যে প্রাণীই কামড়াক বা আঁচড়াক প্রাথমিক ভাবে কলের জলের ফোর্সে সেই জায়গাটা ধুয়ে নিতে হবে প্রায় ১৫-২০ মিনিট ধরে, সাবান ব্যবহার করবেন ধোয়ার সময়ে।  এরপর Povidone Iodine বা অ্যালকোহলে জায়গাটা ধুয়ে নিতে হবে।  কামড়ে গভীর ক্ষত হলে সেলাই করতে হবে সেক্ষেত্রেও ১২ -১৩  ঘণ্টা পর হবে সেলাই। ভয় না পেয়ে পরপর কাজগুলো করতে হবে।  আর পশুদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে।  নইলে জলাতঙ্ক হলে ১০ দিনের মধ্যে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। জলাতঙ্কে একটু জোরে হাওয়া বা জল কিছুই সহ্য করতে পারেন না আক্রান্তরা।  তাই এই পশুরা অবলা হলেও ওদের অজান্তেই আপনার মৃত্যুর কারণও হতে পারে ওরা।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।

Shares

Comments are closed.