শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

ছোঁবো না তামাক, শপথ নিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ারা, ব্লু লাইন কর্মসূচি চালু জলপাইগুড়িতে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: তামাক রোখার অঙ্গীকার এ বার নীল রেখায়। সতর্কতার ‘সহজ পাঠ’ দিতে এগিয়ে এল জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। হাত ধরল জেলা স্বাস্থ্য দফতর। সিগারেট, তামাক, গুটখা থুড়ি নেশার যাবতীয় রসদ বহু যোজন দূরে সরিয়ে জেলার প্রথম ‘টোবাকো ফ্রি কলেজ’ হিসেবে ঘোষণা করা হল জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে। নীল রেখা টেনে তামাক-বিরোধী কর্মসূচির প্রথম ধাপ শুরু করলেন স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা।

সিগারেট খাওয়া, না খাওয়া নিয়ে এত বিতর্ক হয়। কিন্তু সিগারেট বন্ধ হল কই? বরং নেশায় আরও বেশি ডুবে গেছে স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা। স্কুলের চত্বরের বাইরে, কলেজের ঠিক গায়ে দেদার বিকোচ্ছে সিগারেট, গুটখা।  গ্রাম, শহর জুড়ে সাংবাদিক বৈঠক, সেমিনার, আলোচনাসভা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা-সহ তামাক-বিরোধী দিবস পালনের নানা আয়োজন সত্ত্বেও নিট ফল সেই লবডঙ্কা। তাই নিজেদের জেলাকেই তামাক-মুক্ত করতে কোমর বেঁধে নেমেছে জলপাইগুড়ি জেলা স্বাস্থ্য দফতর।

সূচনাটা হয়েছে গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ দিয়েই। পরে পুরসভা ও পঞ্চায়েত এলাকাগুলিতে এর প্রচার চলবে। কলেজের বাইরে নীল রেখা টেনে বড় বড় করে ‘টোবাকো ফ্রি কলেজ’ লিখে দিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্তারা। তবে লেখাতেই শেষ নয়, তামাক স্পর্শ না করার শপথও নিয়েছে পড়ুয়ারা। যে কোনও কর্মসূচি তো আর পাতায় লেখা কয়েকটি নির্দেশ নয়, সেগুলোকে মেনে চলা এবং অন্য মেনে চলতে বাধ্য করানোটাও কর্মসূচির প্রধান ও প্রাথমিক কর্তব্য। সেই কাজই শুরু করে দিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছেলেমেয়েরা।

কলেজের এক ছাত্র ঋষভ ধারার কথায়, “আমরা নিজেরা তামাকের ব্যবহার বন্ধ তো করবই, সমাজের সব স্তরে এই ভয়াবহ দিক নিয়ে প্রচার চালাব। আমাদের কলেজের সামনের দোকানগুলিতে গিয়ে বিক্রেতাদের হাতে গোলাপ ফুল দিয়ে সিগারেট, গুটখার বিক্রি বন্ধ করতে বলেছি।”

একই মত জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রিন্সিপাল অমিতাভ রায়েরও। তিনি বলেছেন “এই অভিনব কর্মসূচিকে স্বাগত। আমার কলেজের ১৮০০ ছাত্র আজ তামাক বিরোধী সচেতনতা প্রচারে শপথ নিয়েছে। আমরা এই কর্মসূচিকে সফল করব।”

দেশে তামাক-বিরোধী আইন আছে। কিন্তু সেই আইন পালন করানোর লোক নেই। মেনে চলার লোক তো আরও কম। ২০০৩ সালেই দেশে ‘সিগারেটস অ্যান্ড আদার টোবাকো প্রোডাক্টস অ্যাক্ট’ (সিওটিপিএ) পাশ হলেও সেটা কার্যকর করা যায়নি সার্বিক স্তরে। আইনের বিভিন্ন ধারা সম্পর্কে সচেতন নন প্রশাসনের কর্তারাও। তাই ব্লু লাইন কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে সচেতনতার পাঠ দিতে উদ্যোগী হয়েছেন জলপাইগুড়ি জেলা স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা।

কী কী বোঝানো হয় এই ব্লু লাইন কর্মসূচিতে?

১) সিওটিপিএ আইন ২০০৩ অনুয়ায়ী ব্লু লাইন একটি তামাক বিরোধী সচেতনতা প্রচার।

২) এই আইন মাফিক, স্কুল-কলেজ চত্বর, পাবলিক প্লেসে ধূমপান অথবা তামাক জাত জিনিসের ব্যবসা আইনত অপরাধ। এই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করাটাই এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।

৩) স্কুল চত্বর বা কলেজ গেটের ১০০ মিটারের মধ্যে ধূমপান করলে ২০০ টাকা জরিমানা। ওই সীমারেখার মধ্যে সিগারেট বিড়ি খৈনি ও গুটখা বিক্রিতেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ১৮ বছরের নীচে কারও কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করা যাবে না।

৪) এই সীমারেখার মধ্যে তামাকজাত জিনিস বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়লে সিওটিপিএ আইন অনুযায়ী ২০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। প্রয়োজনে ছ’মাস থেকে ছ’বছর অবধি জেল হতে পারে। অথবা জরিমানা ও জেল, দুটোই একই সঙ্গে হতে পারে।

৫) কর্মসূচির প্রতিটা বিষয়ের উপর নজরদারি চালাবে পুলিশ, জেলা মনিটরিং সেল ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

ফুসফুসে ক্যানসার, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), মুখগহ্বরে ক্যানসার, হৃৎপিণ্ডের নানা অসুখের কারণ ধূমপান ও গুটখা-সহ বিভিন্ন তামাকজাত দ্রব্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) তথ্য বলছে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে তামাকজাত দ্রব্য সেবনে ৮০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। পরোক্ষ ধূমপানে মৃত্যুর সংখ্যাটা ১০ লক্ষ। ধূমপান শুধু ক্যানসারের কারণ নয়। এর জন্য গ্লকোমা, অপটিক নার্ভের সমস্যার মতো চোখের রোগও হতে পারে। কম বয়সে ছানির কারণ হতে পারে ধূমপান। শুধু পুরুষ নয়, মহিলাদের মধ্যে এই প্রবণতা অনেক বেড়েছে।

জলপাইগুড়ি জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডঃ জগন্নাথ সরকার বলেছেন, “সিগারেট বা তামাক সমস্ত রোগের আঁতুর ঘর। এর যথেচ্ছ ব্যবহারে ফলে হৃৎপিণ্ড, ফুসফুসের ক্ষতি হয়। ক্যানসার-সহ বিভিন্ন রোগ বাসা বাঁধে শরীরে। এর থেকে মুক্তি পেতে তাই আমরা ব্লু লাইন কর্মসূচি চালু করলাম।“

Comments are closed.