চিনকে বিশ্বাস করা যায় না

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

করোনা অতিমহামারীর প্রথম ধাক্কায় দেশ যখন দিশাহারা, ঠিক তখনই শোনা গেল, সীমান্তে গোলমাল পাকিয়েছে চিন। গত ৫ মে ব্যাপারটা প্রথমে জানা যায়। লাদাখের প্যাঙ্গং লেক এবং তিব্বতের স্বশাসিত অঞ্চলে চিনা ফৌজ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়ার চেষ্টায় আছে। ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি, পাথর ছোড়াছুড়ি ইত্যাদি হয়েছে।

মে মাসের শেষদিকে গালওয়ান নদীর উপত্যকায় ভারত একটা রাস্তা বানানো শুরু করে। চিনারা তাতে ঘোর আপত্তি জানায়। এরপর শোনা যায়, ১৫ মে রাতে গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাবাহিনীর বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়েছে। ভারতের ২০ জন সৈনিক শহিদ হয়েছেন। ভারত দাবি করে, চিনেরও এক সেনা অফিসার সহ ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও বেজিং থেকে সেকথা স্বীকার করা হয়নি।

অনেকে ভাবছিল, অতগুলি প্রাণহানির পরে সংযত হবে চিন। ভারতের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে তাদের আলোচনা চলছিল। দু’পক্ষই বলেছিল, গালওয়ান, হট স্প্রিং ও গোগরা অঞ্চল থেকে  সেনা সরিয়ে আনবে। কিন্তু ৩০ জুলাই ফের শোনা গেল, দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়েছে। প্যাঙ্গং সো এবং গোগরা এলাকা থেকে তখনও দুই দেশের সেনা সরে আসেনি। ভারতে নিযুক্ত চিনের রাষ্ট্রদূত বললেন, আগে ভারত ও চিনের সীমানা ঠিক করে নির্ধারিত হওয়া দরকার। অর্থাৎ নতুন করে সীমান্ত বিতর্ক শুরু করল চিন।

এর পরেই শোনা যায়, চিন সীমান্তে আরও সেনা পাঠাতে শুরু করেছে ভারত। আর কিছুদিন বাদেই আসবে শীতকাল। লাদাখ অঞ্চলে তাপমাত্রা হু হু করে নামতে থাকবে। শুধু মানুষ নয়, কোনও প্রাণির পক্ষেই সেখানে থাকা হয়ে উঠবে অসম্ভব। সেকথা জেনেও চিন সীমান্তে বাড়তি সেনা পাঠাচ্ছে ভারত। তার মনোভাব পরিষ্কার। চিনাদের বিশ্বাস করা যায় না। তারা এখনও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু তার ফাঁকেই যে নতুন করে হামলা চালাবে না, তার কোনও গ্যারান্টি নেই।

এই আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না তা বোঝা গেল সোমবার। ওইদিন ভারতীয় সেনা বিবৃতি দিয়ে জানায়, ২৯ তারিখ রাতে প্যাঙ্গং সো লেকের দক্ষিণ তীরে চিনারা এসে পড়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় সেনাকে উস্কানি দেওয়া। তাদের মতলব টের পেয়ে ভারতীয় সেনা আগেভাগেই প্রতিরোধ তৈরি করেছিল। তাই চিনের পিপলস লিবারশন আর্মি সুবিধা করতে পারেনি। হ্রদের উত্তর তীরে যেখানটাকে ফিঙ্গার এরিয়া বলে, সেখানেই চিনাদের কার্যকলাপ এখন সীমাবদ্ধ।

বিবৃতির শেষে ভারতীয় সেনা বলে, আমরা সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আগ্রহী। তা বলে নিজেদের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হতে দেব না। কিছুদিন আগে চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বিপিন রাওয়াত এই কথাটিই একটু ঘুরিয়ে বলেছিলেন, চিনের সঙ্গে আলোচনায় যদি কাজ না হয়, তাহলে আমাদের সেনাবাহিনী তৈরি আছে।

আলোচনায় কাজ হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ১৯৬২ সালে চিনযুদ্ধের ইতিহাস যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, সেবারও দুই দেশের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছিল। ভারত-চিন পঞ্চশীল চুক্তি হয়েছিল। তার মূল কথা হল, দুই দেশ সীমান্তে শান্তি বজায় রাখবে। তাহলে সীমান্তে পাহারা দেওয়ার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে না। যে অর্থ ভারত উন্নয়নের কাজে লাগাবে।

চিনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই নাকি নেহরুকে দাদার মতো শ্রদ্ধা করতেন। নেহরু তাঁর ভাল ভাল কথায় ভুলেছিলেন। তার পরিণামে কী হয়েছিল সকলেই জানেন। সেই যুদ্ধের পরে কেটেছে প্রায় ছ’টি দশক। দ্বিতীয়বার একই ভুল করার প্রশ্নই নেই। ভারত আর চিনকে বিশ্বাস করে না। কিন্তু একটা বিষয় ভাবার আছে। চিনাদের স্ট্র্যাটেজিটা কী? তারা লাদাখে এমন খুচখাচ গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে কেন?

‘৬২ সালেও চিনারা প্রথমে ছোটখাটো আক্রমণ চালিয়েছিল। তারপরে শীতের আগে, অক্টোবর মাসে পুরোদস্তুর আক্রমণ শুরু করে। এবারও অক্টোবর মাসের বেশি দেরি নেই। ‘৬২ সালের তুলনায় ভারত নিশ্চয় এখন অনেক শক্তিশালী। কিন্তু মনে রাখতে হবে, করোনা অতিমহামারীর জেরে গত কয়েক মাসে তার অর্থনীতি হয়ে পড়েছে দুর্বল। চিন কি এই সুযোগে কোনও মিসঅ্যাডভেঞ্চার করার চেষ্টায় আছে?

এই প্রশ্নের জবাব নিশ্চিতভাবে কেউই জানে না। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে। সাবধানের মার নেই। এবার যতই শীত পড়ুক, লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বরাবর যুদ্ধের প্রস্তুতি রাখতে হবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More