মঙ্গলবার, জুন ২৫

এখানে দর্শক গ্রিনরুমে ঢুকে পড়ে, যা কোনও সভ্য দেশে হয় না : অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য  

তাঁকে দেখতে থিয়েটারে ভিড় করে নতুন প্রজন্ম। শো এর শেষে গ্রিনরুমের বাইরে সেলফি তুলতে দাঁড়ায় তরুণীরা। আমজনতা থেকে বিদগ্ধজন, সকলেই তাঁর অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য নিজে? কী ভাবেন তিনি তাঁর অভিনয় নিয়ে। থিয়েটার থেকে সিনেমা, অভিনয়, বোধ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বললেন, থিয়েটার কর্মী ও কবি পম্পা দেব। তিন পর্বের এই সাক্ষাৎকারের আজ প্রথম পর্ব।

পম্পা দেব

মগের কফিটা প্রায় শেষ। এক দিকে আলগোছে পড়ে রয়েছে ডানহিল সিগারেটের প্যাকেট। কানে হেডফোন গুঁজে এক মনে গান শুনে যাচ্ছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য।

কথা ছিল দেখা হবে দক্ষিণ কলকাতার এক নামি কফিশপে। সেখানে সময় দিয়েছিলেন অনির্বাণই। আমাদের পোঁছতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গিয়েছিল। ফোন করলেন নিজেই। অন্য একটা ছোট্ট কফি শপের ফুটপাথ ঘেঁষা চেয়ারে বসে আছেন। “এইখানেই কি ইন্টারভিউটা হবে?”

“এইখানে অসুবিধে?” পাল্টা জিজ্ঞাসা।

“না, আসলে জায়গাটা খুব ছোট্ট।”

“ওহ! চলুন তাহলে।”

অ্যাপ ক্যাব বুক করলেন নিজেই। আমাদের গন্তব্য অভিনেতার নতুন ফ্ল্যাট। ব্রহ্মপুরে। গাড়িতে যেতে যেতেই শুরু হল ইন্টারভিউ।

“ফেসবুকে নেই না আপনি?”

“‘নাঃ, যেটা আমার নিজের চর্চায় ব্যাঘাত ঘটাবে তাতে আমি নেই।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলাম। “অথচ আপনাকে দেখতে আসে নতুন প্রজন্ম। ‘শো’-এর পরে তরুণীদের ভিড় আপনার সঙ্গে সেলফি তোলার জন্য। এটা কি নাটকের জন্য? নাকি এটা ফিল্মস্টারের গ্ল্যামার?’

ড্রাইভারের পাশে বসা সিট থেকে বাইরে তাকালেন অনির্বাণ। চুপ কিছুক্ষণ। “দেখুন এটার মধ্যে কী আছে, সেটা যাঁরা সেলফি তুলতে আসেন তাঁরাই ভাল বলতে পারবেন। আমি নাটক অনেকদিন করছি। আমি নিজে যা দেখেছি তা হল- সিনেমায় অভিনয় করার পর থেকে পরিচিতি কিঞ্চিৎ বেড়েছে। আগে যদি দু’জন আসত, তাহলে এখন সাতজন আসে।”

মুখটা ঘুরিয়ে এবার সোজা তাকালেন পিছনে বসা আমাদের দিকে। “দেখুন, সত্যি কথা হল, আমি আদৌ ভাবিত নই কে এল সেলফি তুলতে, কে এল না। আমার কিচ্ছু এসে যায় না।”

দ্বিতীয় পর্ব: আমার শিল্পবোধটা একান্তই আমার, সেটা আমাকেই গড়ে তুলতে হবে: অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য

“কিন্তু যে প্রযোজকরা আপনাকে সিনেমায় নিচ্ছে, তাঁরা তো আপনাকে পণ্য হিসাবেই দেখে। তাই না? পণ্যের জনপ্রিয়তা থাকলে তো ভালো।”

“দেখুন, আমার চিন্তাটা অন্য।” কাটা কাটা স্পষ্ট উচ্চারণ। প্রতিটা শব্দে জোর দিয়ে। “ধরে নিলাম আমি পণ্য, তাহলেও কিন্তু আমার ভাবনাটা অন্য।  ফোকাসটা অন্য। পণ্য হিসেবে আমার চিন্তা হচ্ছে আমি  কতটা ব্যবহার যোগ্য। ধরুন আমি একটা ফেয়ারনেস ক্রিম। আমার কাছে সেটার আসল পরিচয় হল সেটা মাখলে আদৌ কেউ ফর্সা হয় কিনা। কিন্তু সেই ক্রিমের অ্যাডটা কতজন দেখল, কতজন নাম জানল সেই ক্রিমের, সেটা আমার কাজ নয়। যিনি সেই ক্রিমটা বেচবেন তাঁর কাজ।”

সামনে তাকালেন অনির্বাণ। ড্রাইভারকে পথ নির্দেশ দিলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, “আমার ছোটবেলা থেকেই একটা জিনিস মনে হয়, আমি যদি মন দিয়ে ভালো করে কাজ করি, তাহলে একদিন না একদিন মানুষ আমাকে চিনবেনই।”

“ওই যে আপনি বলছিলেন না ফেসবুক? আমি যদি ভাবতে যাই যে মানুষ কীভাবে আমাকে চিনছে, যদি সংখ্যতত্ত্বের হিসেবে যাই, ওই যে ফেসবুকে হয় না লাইকস, সেইসব নিয়ে যদি বেশি ভাবি, আমার নিজস্ব চর্চায় বাধা হয়ে উঠবে। আমার সেইদিকে কোনওদিনও আগ্রহ নেই।”

বাইরের দৃশ্য এখন একটু বদলে গিয়েছে। ব্রহ্মপুরের ভেতরে ঢুকে গিয়েছি আমরা। দু’দিকে গাছপালা। এদিকটা এখনও ততটা ঘিঞ্জি হয়নি। গাড়ি থামল।

তৃতীয় পর্ব: থিয়েটারকে কেউ ডমিনেট করতে পারে না : অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য

“আমার অনলাইন অ্যাকাউন্ট লিঙ্ক করা আছে। আলাদা করে পেমেন্ট করতে হবে না।” অনির্বাণ নিয়ে এসে ঢুকলেন তাঁর নির্মীয়মান ফ্ল্যাটে। কাঠের কাজ চলছে। ভেতরে নিয়ে গিয়ে বেডরুমে বসালেন।

“এই ঘরটা আমার মা-বাবার জন্য।” স্মিত হাসলেন অনির্বাণ। “কাজ হচ্ছে, ফলে আপনাদের একটু অসুবিধা হবে।”

খুব ভদ্র। কে বলবে স্পষ্ট বক্তা এই অভিনেতাকে ভয় পান অনেকেই।

“অদ্য শেষ রজনীর অমিয় চক্রবর্তীর রোল করে ‘মেটা’য় (মহিন্দ্রা এক্সসেলেন্স ইন থিয়েটার অ্যাওয়ার্ডস) শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান পেলেন।”

“এটা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। ‘হায় চিল, সোনালি ডানার চিল।’ ইন্দ্ররঙ্গ একটা বই বার করেছিল, তাতে লেখাটা আছে। আমার কাছে শিল্পের মূল্য হল সেটা আমার ভিতরে কতটা অন্তর্গত বদল (Internal change) ঘটাতে পারে। মানে একটা শিল্প আমাকে ভিতর থেকে কতটা বদলে দিতে পারছে। সেটাকেই আমি শিল্পের প্রভাব বলে মনে করি।

‘অদ্য শেষ রজনী’ সেই দিক দিয়ে আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রযোজনা আমার অজানা অনেকগুলো আমিকে খুঁড়ে বের করে আনতে পেরেছে। তাছাড়া তো অভিনয়টা করার জন্য প্রশংসা-টশংসা পেয়েছি। কিন্তু সেইগুলো যে হতেই হবে, আমার কাজ যে বিখ্যাত হতেই হবে, এমন কোনও দাবি আমার নেই। তবে সেগুলো হলেও যে খারাপ লাগে এমনটাও বলব না।”

হাসলেন অনির্বাণ, “ঋত্বিক ঘটকের মতো সেই দার্ঢ্য নিয়ে তো কথা বলার যোগ্যতা রাখিনা যে দর্শক ফ্লপ করেছে। ভালোই লাগে। আমার একটা কোনও কাজ দেখতে যদি দশজন আসেন। বা দেখে খুশি হন, তাহলে আমার ভালোই লাগে।”

আরও পড়ুন: ইনটারভিউ-  মুখ খোলেন বলেই খুন হন কালবুর্গি, দাভোলকর, পানসরে: গুলজ়ার

“কিন্তু এই যে এত লোক, ‘শো’র শেষে এসে দেখা করছেন। কথা বলছেন…”

“আসে বটে। কিন্ত কোনও সভ্য দেশেই এটা নিয়ম নয়। । একমাত্র বাংলা থিয়েটারে হয়।’’ বেশ রেগে গেলেন অনির্বাণ। “এখানে তো দর্শক সাজঘরে এসে প্রায় বাথরুমে ঢুকে পড়ে। ওটা তো দর্শকের জায়গা নয়। ওটা তো অভিনেতাদের জায়গা। আপনার যদি একান্তই অভিনেতার সঙ্গে দেখা করবার থাকে তাহলে সে যখন মেক আপ তুলে সাজঘরের দরজা দিয়ে বার হবে, তখন কথা বলুন। সাজঘরের দরজার সামনেই অপেক্ষা করুন।”

হাতগুলো নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলছেন অনির্বাণ। উজ্জ্বল চোখ দুটো এখন আরও তীক্ষ্ণ। “মুশকিল হচ্ছে এখানে লোকে মনে করে ‘শো’র পর অভিনেতার সঙ্গে দেখা করে কেমন লেগেছে সেটা জানিয়ে না এলে উষ্ণতা দেখানো হয় না। আর অভিনেতারাও মনে করেন, লোকে এসে জানিয়ে না গেলে আমরা বুঝতে পারব না কেমন অভিনয় করেছি।”

আরও পড়ুন: ইনটারভিউ- সুচিত্রা সেনকে আমি স্যার বলতাম: গুলজ়ার

“একজন অভিনেতার কাছে তাহলে দর্শকের কথার কোনও গুরুত্ব নেই?”

“দেখুন অবশ্যই আছে কিন্তু সেকথা জানার পথ এটা নয়। আমি সাধারণত অভিনয়ের পর দর্শকের সঙ্গে দেখা করতে চাই না। অনেকেই এটাকে অন্ধ অহং মনে করেন, কিন্তু এর সঙ্গে অহং-এর কোনও সম্পর্ক নেই। একটা ‘শো’ শেষ হয়ে গেলেই অভিনেতার কাজ ফুরিয়ে যায় না। তার পরেও তার কিছু কাজ থেকে যায়। সদ্য সে একটা অভিনয় করে বার হয়েছে। জ্যান্ত একটা ঘটনা থেকে বেরিয়েছে। তার পরেও তার মাথার মধ্যে অনেক কিছু নিজে থেকেই চলতে থাকে। সেটা তার অভিনয়ের প্রসেসের মধ্যেই থাকে। কোন জায়গাটায় টেকনিকাল ফল্ট করলাম। কোন জায়গায় আমার আবেগটা চরিত্রের আবেগের সঙ্গে একদম মাখনের মতো মিলে গেল। এইগুলো আমাকে করতে হয়। আমি তো শখের অভিনেতা নই। আমি পেশাদার অভিনেতা। এইগুলো পেশাদার অভিনেতার ডিউটি। সেই সময় কেউ এসে বেশি কথা বলুক এটা কাম্য নয়।”

গভীর প্রত্যয় থেকে কথাগুলো বলে চলেছেন অনির্বাণ। প্রতিটা শব্দ যেন ওঁর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে।

“আর তাছাড়া, আমি কেমন অভিনয় করছি সেটা তো স্টেজে দাঁড়িয়ে সবার আগে আমি নিজে বুঝতে পারব যে আমি কতটা মিথ্যে হচ্ছি বা আমি কতটা সত্যি হচ্ছি। অভিনয়ের কাজ তো ট্রুথ কানেকশন। ইমোশনাল কানেকশন। অভিনয় তো বাইরে থেকে এসে আমি কেমন করেছি সেটা বলে দেওয়ার মতো নয়। হাউজফুল শো’য়ের পরে কজন গ্রিনরুমে এল সেটা দিয়ে শো-এর মান যাচাই করতে যাওয়া সুস্থ জিনিস নয়।”

“ ‘ট্রুথ কানেকশন’। শব্দটা বললেন। অভিনেতার সত্যিটা কী?”

“সত্যটা অভিনেতার একমাত্র কাজ। শুধু সেটা খুঁজে বার করা নয়। সেটাকে নতুন করে নির্মাণ করা। রিক্রিয়েট করা। যখনই স্টেজের পর্দা উঠে যাচ্ছে বা ক্যামেরা অন হচ্ছে, সেখানে কোনও সত্য নেই। সেখানে আছে শুধু মিথ্যে, নকল। কিন্তু অভিনেতার কাজ হল সেই মিথ্যে স্পেসে দাঁড়িয়ে সত্যটাকে রিক্রিয়েট করা। মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে এমন কিছু করা যেটা সত্যের কাছাকাছি যায়। এর মধ্যে কিছু সত্য  মুহূর্তের সত্য। কিছু সত্য ইউনিভার্সাল ট্রুথ। অভিনেতা হিসেবে এটার বিচার সব চেয়ে ভালো করতে পারব আমি নিজেই। আমি বুঝতে পারব আমি নকল না আসল। দর্শকও পারবেন। কিন্তু আমি বেশি পারব।”

আরও পড়ুন : ইনটারভিউ – আমি প্রথম থেকেই অন্যরকম কিছু করতে চেয়েছিলামঃ অনুপম রায়

“একজন প্রকৃত অভিনেতার স্পেসে এই সত্যিতে পৌঁছানো কতটা সম্ভব?”

“দেখুন অভিনেতাকে মুহূর্তের শব দেহ বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। অনেক মুহূর্ত থাকে যেগুলো সব দিন সত্যি হয় না। একটা মুহূর্ত হয়তো সত্যি হল। পরেরটাই মিথ্যে। ওই সময় আমাকে আগের শো’টা নকল করতে হয়। অভিনয় হল ওই সত্য আর মিথ্যের একটা সিরিজ। হয়তো একদিন ৮০ শতাংশ সত্যি হল। সেটা হলে মিরাক্‌ল। আরেকদিন হয়তো ৪০ শতাংশ। বা ৬০। তবে আমার মনে হয়, দর্শক কিন্তু এতটা ধরতে পারেন না।

দেখুন আমাদের এইখানে কিন্তু অভিনেতার কাজের আলোচনা বা রিভিউ অন্য অভিনেতারা করেন না। করেন আলোচকরা। কিন্তু যিনি নিজে অভিনয় করেননি তিনি কতটা বুঝতে পারবেন?”

“এই যে সত্যি এবং মিথ্যের কথা বলছেন, এটা একটু বলবেন?”

“আসলে স্টেজের ওপর আমি যখন অভিনয় করি, ধরুন অমিয় চক্রবর্তীর চরিত্রটাতেই, আমি যখন চাদরটা সরিয়ে উঠে বসি, আলোটা এসে পড়ে, বা কোনও কোঅ্যাক্টরের দিকে তাকাই, তখন আমার ভেতরে কী ঘটছে সেটা তো কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। কোনওদিনই সম্ভব নয়।”

“তবু?”

মুচকি হাসলেন অনির্বাণ। “ ‘আমি সেন্টার স্টেজে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘আরে আমার থিয়েটার হাউজফুল হয়েছে টানা এক হাজার শো! আমি ওসব পড়ব কখন?’ ” একদম অভিনয়ের ঢঙে প্রযোজনার সংলাপ বলে ওঠেন অনির্বাণ। স্টেজে দেখা অমিয় চক্রবর্তী হঠাৎ সত্যি হয়ে ওঠে।

“তারপর ধীরে ধীরে আমি ট্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বেশি আলো থেকে কম আলোর দিকে। ট্রামের মধ্যে ঢুকে গেলাম। একদম অন্ধকার। পোশাক বদলালাম, ঘুরলাম। দুটো ডিম লাইট এসে পড়ছে আমার ওপর। এইবার ওখানে একটা কাঠের বাটাম আছে। আলোটাকে গার্ড করে। এপাশে আলো আছে। ওপাশে আলো আছে। মাঝে অন্ধকার। এই টেকনিকাল জিনিসটাও কিন্তু একটা সাইকোলজিকাল ইন্সপিরিশন। কিংবা ধরুন নীল একটা আলো এসে পড়ে, আমি বলতে পারি তাপ। কিন্তু তাপ তো নেই। আলোটা তো অনেক দূরে। অথচ রিহার্সালের আমি এইগুলো প্র্যাকটিস করে নিয়েছি। এক একদিন এমন হয় ওই আলোটা ঠিক মতো এসে পড়ল না। তখন আমার সিনটাও হয়না ঠিক। ওটাতে তো আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। এইগুলো কীভাবে বোঝাব বলুন?”

                                                    (চলবে)

ছবি  সৌজন্য – এসভিএফ (ওপরের ছবি) ও সন্দীপ কুমার (ভেতরের) 

Leave A Reply