মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

কচু কাটতে কাটতে ডাকাত

বাংলায় ভোট সন্ত্রাস কত রকমের হয় এবং কী তার রূপ— তা শুধু বাঙালি কেন, এত দিনে তামাম দুনিয়াই জেনে গিয়েছে।

বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, বোমাবাজি, খুন, বাইক-বাহিনীর শাসানি, ভৈরব বাহিনীর দাপাদাপি—এ সবই গত তিন দশকে আকছার দেখেছে বাংলা। এমনকী প্রয়াত সিপিএম রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসের ওয়ার্কশপে ‘রিগিং’ নামক বিষয়টিও ক্রমে কী রকম বিজ্ঞানসম্মত হয়ে উঠেছিল, তা বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে লেখা রয়েছে বড় হরফে। তবু এ রকমটা বুঝি আগে কখনও দেখা যায় নি।

কী রকম?

ভোট দিতে গিয়ে বেকুব বনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। সকাল সকাল বুথে লাইন দিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে যখন পৌঁছেছেন, জানতে পেরেছেন তাঁর ভোট কেউ বা কারা আগেই দিয়ে দিয়েছে। সন্ত্রাসের কবলের পড়ে বুথের মুখ থেকে হয়তো আবার কাউকে ফিরেও আসতে হয়েছে। তবু যে সব সৌভাগ্যবান মানুষ ব্যালট পেপারে ছাপটুকু দিতে পারতেন, বা ইভিএমের বোতাম টিপতে পারতেন, তাঁরা অন্তত এটুকু নিশ্চিন্ত থাকতেন, শাসক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে তাঁর মতটি গ্রাহ্য হবে।

কিন্তু বাংলায় অন্তত পঞ্চায়েত স্তরে সেই নিশ্চয়তাও আর রইল না। বৃহস্পতিবার নজিরবিহীন ঘটনা ঘটল উত্তর থেকে দক্ষিণ বঙ্গের বহু বুথে। ভোট গণনা যখন চলছে, তখন সমূহ পরাজয়ের আশঙ্কা দেখে ভোট গুলিয়ে দেওয়া হল। বিপক্ষের প্রার্থীকে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের ব্যালটগুলিতে ছাপ্পা দিয়ে বাতিল করে দেওয়া হল। এবং গণনা কেন্দ্ দখল করে এ ভাবে ছাপ্পা মারার সময়ে কোথাও চলল গুলি, কোথাও বোমা। এমনকী গণনা কেন্দ্রে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হল। আবার এ সবের সময় বিপক্ষের প্রার্থী যাতে ফোনে খবর দিয়ে লোকজন জোগাড় করতে না পারেন, সে জন্য জ্যামার লাগিয়ে নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগও উঠল।

এ সব থেকে বার্তা এল একটাই, অনিল বিশ্বাসের মৃত্যুর পর বাংলায় অনিলায়ন থমকে নেই। থমকে নেই তাঁর যথার্থ ছাত্র মুকুল রায়ের হাত ধরে ভোট রাজনীতিতে মুকুলায়ন। বরং তার নতুন নতুন সংস্করণ বেরোতে শুরু করেছে। এবং তা এখন কোনও একটি রাজনৈতিক দলের পেটেন্ট নয়। তার খোলা বাজার। ডান, বাম, মাঝামাঝি সে দাওয়াই ব্যবহারে কেউ পিছিয়ে নেই। আর তার ফলেই ভোটের দিন ব্যালট বাক্স পুকুরের জলে ফেলা দেওয়া বা তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে গণনার দিন বুথের মধ্যেই দেদার ছাপ্পা চলেছে। অর্থাৎ কচু কাটতে কাটতে এখন অনেকেই ডাকাতে রূপান্তরিত হয়েছেন। তারা এতটাই বেলাগাম, যে তাদের উপরে দলেরও হয়তো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেই।

প্রশ্ন হল, এর পর কি আদৌ ভোট দেওয়ার উৎসাহ থাকবে মানুষের। অন্তত পঞ্চায়েত ভোটে। কে বলতে পারে বুথের লাইনে ঠায় দাঁড়িয়ে, অনেক ভেবেচিন্তে মানুষ যে ভোট দিলেন,সেই ব্যালটে কোনও দুর্বৃত্ত ছাপ্পা দিয়ে তা বাতিল করে দেবে না। তা ছাড়া প্রত্যেকেরই জীবনের মায়া তো আছে!

Shares

Leave A Reply