মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

আজব কারখানা

ইতিহাস, তা সে যত সাম্প্রতিকই হোক, মাঝে মাঝে ধন্দে ফেলে দেয়। যেমন এক দল বলেন ফকির বাবা আর রায় বাবুর এক সালেই জন্ম। অন্য মতে, দ্বিতীয়জন জন্মেছিলেন দু বছর পরে। বিলেতের ব্রিস্টলে ষাট বছর বয়সে দেহ রাখার আগে বাংলার সমাজকে পশ্চিমের মানবতাবাদী ভাবধারায় জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। আর এক জন, পুব বাংলার লালন ফকির নাকি বেঁচেছিলেন একশ বছরেরও বেশি। তিনি এত শত প্রাচ্য, প্রতীচ্য, হিউম্যানিজম, রেনেসাঁ বুঝতেন না। মুখ্যু সুখ্যু মানুষ, যিনি সহজ ভাষায় অনেক বড় কথা বলতেন। তিনি আক্ষেপ করে গাইতেন, জাত গেল জাত গেল বলে এ কী আজব কারখানা/ সত্য কাজে কেউ নয় রাজি, সবই দেখি তা না না না।

তাঁর আক্ষেপের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম জেহাদও নিহিত ছিল। রেয়াত করেননি অষ্টাদশ ও উনিশ শতকের সামাজিক ভণ্ডামি ও বদমাইশিকে। না হলে কি বলতে পারতেন, গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/ তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়?

সাহস দেখিয়েছেন, তার জন্য সময়ে সময়ে গুনাগারও দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর সহজ উপলব্ধি থেকে বিচ্যুত হননি।

গানের কলিতে তাঁর এই দর্শন আজও তো ছড়িয়ে আছে গঙ্গা পদ্মা দুই বাংলারই আকাশে বাতাসে। জনপ্রিয়তায় ভাটা তো পড়েইনি, উল্টে হালফিল ডিজিটাল দুনিয়ায় ইউটিউব নামক নতুন কলের গানে সে গান তো বাজে অনুক্ষণ। কিন্তু গান কেন গানেই আটকে থাকে? গান কেন জীবনে পৌঁছায় না? গান কেন জীবনকে আমাদের বিশ্বাসকে সর্বতো ভাবে প্রভাবিত করে না? লালনের মাটিতে কেন নোয়াখালি হয়? কেন অশক্ত শরীরে গান্ধীকে ছুটে গিয়ে নিজের জীবন বাজি রেখে হানাহানি থামাতে হয়? দেশভাগ, রক্তপাত দাঙ্গার সেই অভিশপ্ত অধ্যায় পেরিয়ে এত গুলো দশক চলে যাওয়ার পরেও কেন দুই বাংলার এখানে ওখানে ধূলাগড় বা বসিরহাট মাথা চাড়া দেয়? জাত ধর্মের বিভাজন কে কাজে লাগিয়ে, মানুষ কে উত্তেজিত ও অসহিষ্ণু করে কেন ফায়দা তোলার সুযোগ পায় রাজনীতির স্বার্থান্বেষী কারবারীরা?

এবং এই ভন্ড কারবারীরা, সৎসাহসহীন নেতারা আবার সেটা স্বীকারও করতে পারেন না। এই সে দিন দিল্লির আর্চ বিশপ একটা বোমা ফাটিয়ে দিলেন। দেশের সাংবিধানিক,সাংস্কৃতিক, সাম্প্রদায়িক সংকটের মোকাবিলায় প্রার্থনার আহ্বান যেই তিনি জানিয়েছেন,অমনি দিল্লির মসনদে কাঁপুনি, মন্ত্রী-সান্ত্রীদের অস্বীকারের ধুম, এবং দাবি সব নাকি একদম ঠিক হ্যায়।

সার কথা তো বলেই গেছেন লালন। এ কী আজব কারখানা!!!

Shares

Leave A Reply