বৃহস্পতিবার, জুন ২০

ভয়নিখের পাণ্ডুলিপি কি দেহতত্ত্বের গোপন নথি ?

জিষ্ণু বসু

বাংলার বাউল, ফকির, দরবেশরা চারিচন্দ্রের সাধনা করেন। তাঁরা মনে করেন যে মানব দেহের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিশ্বচরাচর। তাই কায়াবাদী সাধক দেহের পরিত্যক্ত এক একটি বস্তুকে আবার দেহে প্রবেশ করিয়ে প্রতীক্ষা করেন অনন্তের। মল, মূত্র, বীর্য ও রজ এই চারবস্তু সেবন করেন সাধক। চারিচন্দ্রের সাধনায় সাধন সঙ্গিনীর সঙ্গলাভের পর সাধক নিজ বীর্য পরিষ্কার মাটির পাত্রে ধরে রাখেন। কখন বা ওই ‘মূলবস্তুর’ চারভাগের একভাগ বাউল তেলের সঙ্গে গায়ে মাখেন, বাকি অংশ জলে বা দুধে গুলে পান করেন দু’জনে। রজস্বলা সঙ্গিনীর দেহনিঃসৃত শোণিত পরম আদরে গায়ে মাখেন কায়াবাদী। এরকম অনেক আপাত কুৎসিত ধর্মাচরণ করেন আউল, বাউল, নেড়া, সাঁই, দরবেশের মত নাম জানা নাজানা কত সম্প্রদায়। তাঁদের যুক্তি অপবিত্রতা থেকেই সৃষ্ট এই জগৎ প্রপঞ্চ, তাই শাশ্বত সত্যে সঙ্গে মিলিত হতে হল এই নোংরা পথ দিয়েই যেতে হবে।

সাহেবধনী ঘরের কর্তা শরৎ ফকির যখন অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তীকে অন্ধকার কুঠুরীর মধ্যে রাখা সিন্ধুকের ভেতরর থেকে, লাল শালুর মোড়ক খুলে, গুপ্তমন্ত্র আর সাধনরীতি লেখা তুলট কাগজ বের করে দেখিয়েছিলেন। অধ্যাপক দেখালেন তাতে অদ্ভূত ভাষায় সব মন্ত্র লেখা,

“শনি শুককুল বীজরূপে এক

‘আর আতস খাক বাদ চারে এক চারের মধ্যে এক।”

যারা এই দেহতত্ত্বের সাংকেতিক ভাষা জানেন না তার পক্ষে বোঝা অসম্ভব যে এখানে শনি বলতে শোনিত মানে ঋতুমতী নারীর রজ আর শুককুল বলতে পুরুষের শুক্র বোঝানো হয়েছে। ফকির সুধীরবাবুকে রোগ সারাবার গাছ গাছড়ার বিবরণ লেখা কাগজ দেখিয়েছিলেন আর দেখিয়েছিলেন তাবিজ কবজ তৈরি করার রেসিপি।

সেদিন এমনটা হতেই পারত যে ওর মধ্যে একটা পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেল যেটা লেখা এক দুর্বোধ্য ভাষায়, অপাঠ্য হরফে। কিন্তু বর্ণনার পাশে আঁকা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, যেন একটা মানব দেহের ব্যবচ্ছেদ। গর্ভজলে স্নান করছে কয়েকজন মেয়ে তাদের সারা গায়ে কোন বসন নেই। সেই জল থেকে উঠে এসেছে একটা অদ্ভুত দর্শন নল। নলের উপরের দিকে পরের পর মোটা মোটা কাণ্ডের মত অংশ। কিছুটা উঠে নলটা দু’ভাগ হয়ে গেছে। একটা ভাগের মাথায় থোকা গাদা ফুলের মত কী একটা ফুটে আছে। ঠিক যেন মূলাধার চক্র থেকে সুষুম্না উঠে স্বাধিষ্ঠান, মনিপূট চত্রু ছাড়িয়ে গেছে, সঙ্গে উঠেছে দুই নাড়ি ইড়া আর পিঙ্গলা। অন্য একটা ছবিতে মানব শরীরের দুটি চক্রের স্থানে বাসে আছে ছ’জন অপ্সরা, তাদেরও পরনে একটা সুতোও নেই। এরকম একটা পাণ্ডুলিপি সেদিন সুধীরবাবু পেলে খুব আশ্চর্য হতেন কি? সম্ভবত হতেন না। কিন্তু এটা যদি ইউরোপের কোন পুরনো দূর্গে পাওয়া যায়? আর অদ্ভুত ছবিগুলোয় দেখানো মহিলাদের মুখ বা চেহারার আদল হয় জামান বা ইতালীয় ধাঁচের? তবে তাতে অবশ্যই অবাক হতে হবে।

উইলফ্রিড় ভয়ানিখ, ভদ্রলোক পুরাতন পাণ্ডুলিপি, দুষ্প্রাপ্য বই এসবের ব্যবসা করতেন। থাকতেন পোল্যান্ডে, তারপর লিথুয়ানিয়ায় আর শেষে পাকাপাকিভাবে আমেরিকায়। ১৯২২ সাল নাগাদ একটা অদ্ভুত পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করলেন ভয়নিখ। তাঁর বক্তব্য ছিল ওটা উনি পেয়েছেন ফ্রান্সের একটা দুর্গ থাকে।

পাখির পালকের কলম দিয়ে পার্চমেনট কাপড়ে লেখা ২৪০ পাতার বই। পাতার নাম্বারের অসংগতি দেখে মনে হয় আরও ৩২ পাতার মত ছিল, কিন্তু ভয়নিখের হাতে পাণ্ডুলিপিটা আসার আগেই সেগুলো খোয়া গেছে। বইটা লেখা এক অদ্ভুত সাংকেতিক ভাষায়। ভাষা বা বইয়ের অক্ষর কোনটাই আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি। আর আছে অলঙ্করণ। পাতায় পাতায় আঁকা সেসব ছবি দেখেই মোটামুটি ধারণা করা যায় যে লেখার বিষয়বস্তু কী হতে পারে। বেশিরভাগ  ছবিই ভরা আছে নারীমূর্তিতে, প্রায় সবই নগ্ন নারীদেহ।

এই পাণ্ডুলিপি প্রকাশ পাবার পরেই সারা পৃথিবীর রহস্যপ্রেমী মানুষ আগ্রহে ঝাপিয়ে পড়েন। কী কথা লেখা আছে ওই পাণ্ডুলিপিতে? কে বা কারা লিখেছিলেন ওই লিপি? শেষ কথাটা প্রথমে বলে নেওয়াই ভাল, সেটা হল আজও অধরা থেকে গেছে এই রহস্য – কী লিখেছেন? আর কেই বা লিখেছেন? সারা পৃথিবীর বিখ্যাত সব গুপ্ত সংকেত বিশেষজ্ঞরা বহু চেষ্টা করেছেন এর সমাধান করতে। তারপর ঘটে গেছে দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের সময় এই রকম সাংকেতিক ভাষায় গোপন খবর পাঠানো হয়। সেই সঙ্গে শত্রু পক্ষের পাঠানো সংকেত পড়ে ফেলার চর্চাও হয় জোরকদমে। পরিভাষায় একে বলে ‘সাইফার’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন শান্তি ফিরে এসেছে, তখন মিত্রশক্তি এবং অক্ষশক্তি দু’পক্ষেরই দুঁদে সাইফার বিশেষজ্ঞদের সামনে রাখা হয়েছিল ভয়নিখের পাণ্ডুলিপি। অনেক চেষ্টা করেও দাঁত ফোটাতে পারেননি কেন্দ্র। তাহলে? তাহলে যা হয়, নামকরা পণ্ডিতেরা কোন প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক না দিতে পারলে যেমন বলেন, ‘অর্থহীন প্রশ্ন’, তেমনই ভয়নিখের পাণ্ডুলিপি না পড়তে পেরে বলে দিলেন যে ওটা কোন অর্থ বুঝে লেখা হয়নি। স্রেফ ঠাট্টা করে লিখেছে কেউ। অনেকে তাতে বলতে শুরু করে দিলেন যে বেশি টাকায় বিক্রি করবেন বলে ভয়নিখ নিজেই ওই সব হাবিজাবি লিখেছেন। কিন্তু যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এই তত্ত্ব দাঁড়ায় না। ভয়নিখ নিজে বা তাঁর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী কেউই এই পাণ্ডুলিপি বিক্রির কোন চেষ্টা করেননি। যদি মুনাফার জন্য অত ঝামেলা করে অমন বিদঘুটে জিনিস বানাবেন, তবে তা বিক্রির কোন চেষ্টা করবেন না কেন? শুধু নাম কিনে বিখ্যাত হবার জন্য?

সম্প্রতি কয়েকটা গবেষণা এই ধরনের সন্দেহের আগুনে একেবারে জল ঢেলে দিয়েছে। বর্তমানে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে আছে ওই পাণ্ডুলিপি। ২০০৫ সালে সেখান থেকে বের করে ওটার ‘কার্বন ১৪’ পরীক্ষা করা হয়েছিল। এই তেজষ্ক্রিয় কার্বন পরীক্ষায় কোন পুরনো জিনিসের বয়স ঠিকঠাকভাবে নির্ণয় করা যায়। পরীক্ষায় দেখা গেল ওটা লেখা হয়েছিল ১৪০৫ সাল থেকে ১৪৪৮ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে। অতি সম্প্রতি পাণ্ডুলিপির অক্ষরের রাশি বিজ্ঞানের বিশ্লেষণও করা হয়েছিল, দেখা গেছে যে যিনি ওটা লিখেছিলেন তিনি অর্থ বুঝেই লিখেছেন। কারণ অর্থ না বুঝে লিখলে হরফের নকশার পুনরাবৃত্তি হয়ে যাবে। আসলে মানুষের ‘র‍্যান্ডম নম্বর’ বা অবিন্যস্থ সংখ্যা তৈরির একটি স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে। ভয়নিখের পাণ্ডুলিপির অক্ষরের বিন্যাস সেই সীমার অনেক বাইরে। তার মানে মানুষের পক্ষে কম্পিউটারের সাহায্য ছাড়া সম্ভবই না ওরকম ঠাট্টা করা।

আধুনিক গবেষণায় আরও একটি মজার বিষয় উঠে এসেছে। সেটা হল ‘ল্যাঙ্গুয়েজ এনট্রপি’। এই এনট্রপি কথাটা আদতে তাপগতিবিদ্যায় ব্যবহার হত। এনট্রপি হিসাব করেই স্টিম ইঞ্জিনের সব অঙ্ক কষা হত। এরপর সামিন সাহেব তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে মিনিমাম এনট্রপি থিওরির ব্যবহার করেন। তার সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারই আজকের তথ্যপ্রযুক্তি সাম্রাজ্যের ভিত তৈরি করেছিল। যাই হোক এই এনট্রপির ধারণাটা কিন্তু একটু দার্শনিক ধরনের। এনট্রপি হল ‘অর্ডার অফ ডিসঅর্ডার’ মানে ‘অবিন্যাসের বিন্যাস’। যদি ভাষার এনট্রপির কথা বলা হয় তবে, ‘ককককক’ এটা হল একদম কম এনট্রপির উদাহরণ। কারণ এখানে সাজানোটা একদম খাপছাড়া নয়। কিন্তু ‘কমপগল’ এটা বেশ বেশি এনট্রপির। গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রচলিত অর্থবহ ভাষাগুলোর এনট্রপির মাত্রা মোটামুটি একটা ঊর্ধসীমা ও নিম্নসীমার মধ্যে থাকে। ভয়নিখের পাণ্ডুলিপির ভাষার এনট্রপি ওই সীমার মধ্যে আছে। তার মানে দাঁড়াল ওই লিপিটা অর্থবহ ভাষার হরফের মতই ব্যবহার হত।

কিন্তু আছেটা কী ওই পাণ্ডুলিপিতে ? ঠিক কী যে আছে তা যে বা যাঁরা লিখেছিলেন তাঁরা ছাড়া কেউ জানে না। আমাদের জানাটা হল ছবি দেখে। এই বইয়ের পাতায় পাতায় ছবি, বিচিত্র সব ছবি। এই ছবি দেখেই গবেষকরা বলেছেন যে, বইটার মোট ছ’খানা অধ্যায় আছে। প্রথম অধ্যায়টা হল, অনেক রকম গাছের, ফুলের, মূলকন্দর ছবি দেওয়া। এটাকে ভেষজ অধ্যায় নাম দেওয়া হয়েছে। পরেরটা তারা, গ্রহ, সূৰ্য চন্দ্রের অবস্থান দেখানো জ্যোতিষশাস্ত্র বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের(?) অধ্যায়। তৃতীয় অধ্যায়টাই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। সেটা জীববিদ্যার বা বায়োলজিক্যাল অধ্যায়। মূলত মানুষের দেহতন্ত্রের সব ছবি। ছবিগুলোতে মানুষের দেহতন্ত্রগুলোর ব্যবচ্ছেদ আছে। ব্যবচ্ছেদ করা দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে অসংখ্য নগ্ন নারীমুর্তি। বিবসনা মুর্তিগুলো কেউ পাকস্থলীর মধ্যে, কেউ অন্ত্রের মধ্যে, কেউ বা গর্ভজালে স্নান করছে। কোনও এক মুক্ত বক্ষ মেয়ে যেন একটা নাড়ির সঙ্গে আর একটা নাড়ি জুড়ে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে ওই অদ্ভুত লিপিতে ব্যাখ্যা আর বর্ণনা। এর পরের অধ্যায়টার নাম দেওয়া হয়েছে কসমোলজিক্যাল বা মহাজাগতিক। এখানে বড় বড় সব নক্সা আঁকা, যেন ব্রহ্মাণ্ডের ম্যাপ। তাতেও আছে ন’টা দ্বীপ, ছায়াপথের মতো রাস্তা, দুর্গ আর একটা যেন আগ্নেয়গিরি! পঞ্চম অধ্যায় হল ফার্মাসিউটিক্যাল। অনেক রকম গাছের পাতা, মূল, কন্দ আরও কত কী বড় বড় জারে মিশিয়ে ওষুধ তৈরির ছবি ও বর্ণনা। সর্বশেষ অধ্যায়ের নাম দেওয়া হয়েছে রেসিপি বা প্রণালী। এখানে শুধু ক্রিয়াকর্ম কিংবা বিষয়ের বর্ণনা আছে। কোনও ছবি নেই। কতগুলো বাক্যের শুরুতে ফুল বা তারা চিহ্ন আঁকা। অনেকগুলো বাক্য এমন আছে যেখানে একই শব্দ পরপর পাঁচ-ছয় বার লেখা আছে।

এই পাণ্ডুলিপির ইতিহাসটাও বেশ রোমাঞ্চকর। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে দুটো বিষয় তার প্রত্যেকটির ওপরই কয়েকশ মোটা মোটা বই লেখা আছে। যেগুলো হল, অ্যালকেমি আর জেসুইট সম্প্রদায়। মধ্যযুগের ইউরোপে কয়েক শতক জুড়ে চলেছিল এক সাধনা, কী করে কম দামী ধাতুকে সোনায় রূপান্তরিত করা যায়। এই পরশপাথর খোঁজার তাগিদে একটা কাজের কাজ হয়েছিল। রসায়নের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন অ্যালকেমিস্টরা। এমনি একজন অ্যালকেমিস্ট ছিলেন প্রাগের জর্জ বারেশ। তার লাইব্রেরিতেই ছিল ওই পাণ্ডুলিপি। যার এক বর্ণ উদ্ধার করতে পারেননি বারেশ। শুধু শুধু লাইব্রেরির জায়গা আটকে রাখা! সেসময় জেসুইটদের রোমান কলেজের বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন অ্যামানসিয়াস কিরচার। জেসুইট মানে সোসাইটি অফ জেসাস। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন যুদ্ধ ফেরত প্রতিবন্ধী সৈনিক ইগনাসিয়াস, পরে হলেন সাধু ইগনাসিয়াস লোয়েলা। শুরুতে কিন্তু জেসুইটদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংস্কার বিরোধিতা করা আর অন্ধ ভাবে পোপকে অনুসরণ করা। ইগনাসিয়াসের ১৩ নম্বর চিন্তা সূত্রে এমন কথাও লেখা ছিল যে, “যদি আমি চোখে যাকে কালো দেখছি আমার উৰ্দ্ধতন চার্চ তাকে সাদা বলেন, তবে আমি বিনা প্রতিবাদে তাকে সাদা বলেই বিশ্বাস করব।” কিন্তু কালক্রমে এই জেসুইট হয়ে উঠলেন সংস্কারের কাণ্ডারী আর তাদের প্রতিষ্ঠিত কলেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্র। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর মনেও বিজ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের এক জেসুইটি সন্ন্যাসী ফাদার লাঁফো।

ফিরে আসি ভয়নিখে, তা জেসুইট পণ্ডিত কিরচারকে বারেশ অনুরোধ করেছিলেন এই পাণ্ডুলিপির

পাঠোদ্ধার করতে। বেশ কয়েক পাতা প্রতিলিপি করে পাঠিয়েছিলেন রোমে। কিরচার উত্তরে কী বলেছিলেন বা আদৌ পাঠোদ্ধার করতে পেরেছিলেন কি না তা জানা যায় না। তবে এটুকু বোঝা যায় যে, কিরচার পাণ্ডুলিপিটা নিজে পেতে চেয়েছিলেন। যেটা ওই আলকেমিস্ট ভদ্রলোক মৃত্যর দিন পর্যন্তও রাজি হয় নি। বারেশের মৃত্যুর পর এই পাণ্ডুলিপি পান তার এক ঘনিষ্ট বন্ধু জোহান্স মার্কাস মার্সি। মার্সি কিন্তু কিরচারকে দিয়ে দেন পাণ্ডুলিপিটা, সঙ্গে একটা সশ্রদ্ধ চিঠি। সেই চিঠিটা অবশ্য আজও আছে পাণ্ডুলিপির সঙ্গেই। চিঠির তারিখ ১৬৬৫ কি ১৬৬৬। কিরচার ওই পাণ্ডুলিপিটা ‘কলেজিও রোমানো’ যা আজকের ‘পেন্টিফিক্যাল গ্রেগরিয়ান ইউনিভার্সিটি’, তার লাইব্রেরিতে রেখেছিলেন। তার পরের ২০০ বছরের কোনও ইতিহাস জানা নেই। ১৮৭০ সালে যখন ইতালির দ্বিতীয় ভিক্টর এমানুয়েল পোপের সাম্রাজ্য দখল করেন তখন সম্ভবত ভয়নিখের পাণ্ডুলিপি ওই লাইব্রেরিতেই ছিল। দেশ দখলের পর নতুন ইতালীয় সরকার চার্চের সম্পত্তির দিকে হাত বাড়ায়। বাদ যায় না কলেজ অফ রোমানোর লাইব্রেরিও। সেই সময় জেসুইটরা তড়িঘড়ি করে বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য বই আর পাণ্ডুলিপি কলেজের লাইব্রেরি থেকে নিয়ে ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে চালান করেন। পিট্রাস বেক্স সেসময় ছিলেন জেসুইট প্রধান আর কলেজের রেক্টর। সম্ভবত তার বাড়িতেই গিয়েছিল এই পাণ্ডুলিপি। কারণ আজও বেক্সের ব্যক্তিগত লাইব্রেরির নম্বর সাটা আছে পাণ্ডুলিপিতে। সম্ভবত ১৯২২ নাগাদ অর্থসঙ্কটের জন্যই কিছু বইপত্র বিক্রি করেন জেসুইটরা। ভয়নিখ সেই সুযোগে কিনে নেন সেই পাণ্ডুলিপি। ১৯৩০ সালে ভয়নিখের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী এথেল লিলিয়ান ওই পাণ্ডুলিপির মালিক হন। ভদ্রমহিলাও খুব বিদুষী ছিলেন। গণিতজ্ঞ বাবার মেয়ে এথেন ঔপন্যাসিক হিসাবেও বেশ নাম করেছিলেন। ১৯৬১ সালে এথেল মৃত্যুর সময় পাণ্ডুলিপিটি তার বন্ধু মিস অ্যান নিলকে দিয়ে যান। অ্যান অবশ্য এটা আর একজন দুষ্প্রাপ্য বই বিক্রেতাকে বিক্রি করেছিলেন। সে বেচারা অনেক চেষ্টা করেও এর খদ্দের পাননি, শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ওটা দান করে দেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়কে। এখন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বেইনিক রেয়ার বুক এন্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরি’তে আইটেম নম্বর ‘এমএস, ৪০৮’ হিসাবে আছে ভয়নিখ পাণ্ডুলিপি। ২০০৬ সালে ওর সব কটি পাতায় স্ক্যান করে ফোলিও ফাইল হিসাবে আপলোড করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট যার ইউআরএল হল https://brbl-dl.library.yale.edu/vufind/Record/3519597

কিন্তু কেন পড়ে উদ্ধার করা গেল না ভয়নিখের পাণ্ডুলিপি? এর ভাষা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সাংকেতিক ভাষার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যা ব্যবহৃত হয় তাকে বলে ‘সাইফার’। সবচেয়ে সহজ ‘সাইফার’ হল একটা মাত্র বর্ণমালার সাইফার। শুধু ‘ন’ কে ‘হ’ করে সাজানো। এই সংকেত পড়ে ফেলা বেশ সহজ। এর থেকে জটিল করে লেখা যায় যদি দুই বা তার বেশি বর্ণমালা মিশিয়ে তৈরি হয় ‘সাইফার’। দ্বিতীয় পদ্ধতি হল ‘মাইক্রোগ্রাফি’। সামগ্রিকভাবে শব্দ বা বাকের কোনও অর্থ হয়ত নেই, কিন্তু এক একটা অক্ষরের ভেতরে আছে সূক্ষ্ম আঁকিবুকি। যেগুলো কেবল আতস কাচের নীচে ধরলে পড়া যায়। শেষ পদ্ধতির নাম ‘স্টেনোগ্রাফি’। বাক্যেরও কোনও অর্থ নেই, আলাদা করে শব্দের অর্থ নেই, কিন্তু লুকোনো আছে সংকেত। যেমন ধরা যাক, প্রতিটি শব্দের দ্বিতীয় বর্ণটাই শুধু কাজের। যেগুলো জুড়ে জুড়েই পড়তে হবে। এরকমভাবে সাংকেতিক ভাষা তৈরি হলে সূত্র না বলল তাকে পাঠোদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। তবে ভয়নিখ পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে একটা মত ধীরে ধীরে প্রবল হচ্ছে। ভাবা হচ্ছে যে দূর প্রাচ্যের কোনও ভাষা কৃত্রিম বর্ণমালায় লেখা। চিনের হরফ উচ্চারণ নির্ভর প্রায় হাজার খানেক চিহ্ন আছে, বর্ণমালা নেই। এমন কোনও ভাষা কোনো প্রাচ্যের গুরুর কাছে শিখে ইউরোপের কোনও ছাত্র

লেখেনি তো? তাই হয়ত নগ্ন মেয়েদের চেহারায় ইউরোপীয় ছাপ!

লেখকদের পরিচয় খুঁজতে গিয়েও গবেষকরা ঘুরে ফিরে এসেছেন প্রাচ্যে, দূর প্রাচ্যে। ভয়নিখ নিজে অবশ্য লেখক হিসাবে ভেবেছিলেন জেসুইট পণ্ডিত রজার বেকনের কথা। আজ কেউই বিশ্বাস করেন না যে রজার বেকন এটা লিখেছিলেন। আগে ভাবা হত যে ক্যাথার কাল্টের অথবা দেবী ইসইসের উপাসক কোনও গোষ্ঠীর উপাসনা পদ্ধতির বর্ণনা এটি। এই পাণ্ডুলিপি তাদের আত্মহত্যার দস্তাবেজ। মৃত্যু কাছে এসে গেছে যাদের তারা হাতের শিরা কেটে গরম জলে রক্ত দিয়ে পবিত্র দেহে অমৃতের সঙ্গে মিশবেন তারই পদ্ধতি শেখানো আছে এখানে। এই মতও আজ অচল। স্ট্রং সাহেব অ্যান্টনি আসখাম বলে একটা নাম খুঁজে পেয়েছিলেন ওই অপাঠ্য লিপি পড়ে। ওই আসখামই নাকি পাণ্ডুলিপির লেখক। তবে স্ট্রং সাহেবের যুক্তি খুবই দুর্বল। উনি অনেক কষ্টে এক পাতার বেশি পাঠোদ্ধার করতে পারেননি। রোমের মহান সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফের রাজত্বকাল ষষ্ঠদশ শতকের শুরুর দিকে। তার রাজসভায় জন ডি আর এডওয়ার কেলি নামে দুই চালাক চতুর প্রাজ্ঞ মানুষ এসেছিলেন। গবেষকরা দেখেছেন জন ডি প্রাগ ছেড়ে যাওয়ার সময় বেশ মোটা টাকা গুছিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কী একটা বই না পাণ্ডুলিপি বিক্রি করে। মনে করা হত রুডলফকে বোকা বানাতে ওরাই এই সব হাবিজাবি লিপি আর ছবি দিয়ে বই বানিয়েছিলেন। কিন্তু ‘কার্বন ১৪’ পরীক্ষায় দেখা গেছে পাণ্ডুলিপি লেখা হয়েছিল পঞ্চদশ শতকের প্রথম দিকে। এ তত্ত্ব আজ আর খাটে না। তবে কি চিনা কিংবা তিব্বতী ভাষার কোনও গুহ্য তত্ত্বের বইয়ের অনুবাদের অপটু প্রয়াস এটা?

তিববতী বইটা কীসের হতে পারে? তন্ত্রের? সত্যি বলতে কি বৌদ্ধতন্ত্রের একসময় পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল তিব্বতের লাসা। তিব্বতী চিত্র, পুঁথি দেখলে অবাক হতে হয়, এটা কীসের বর্ণনা? ধর্মতত্ত্বের না ফলিত বিজ্ঞানের? হিন্দু বা বৌদ্ধতন্ত্রের সঙ্গে মুসলমান সহজিয়া সুফীবাদ মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল অনেক অনেক সাধন সম্প্রদায়। বাংলার আউল, বাউল, ফকিরের মত কত কাল্ট। সম্ভবত সপ্তদশ শতাক পাঞ্জাবের মুহসি-ই-ফনি নামের এক আলেম লিখেছিলেন দস্তান-ই-মজহিব। সেখানে তৎকালীন লোকায়ত দেহতত্ত্ব নির্ভর ধর্মাচরণের সবিস্তারে বর্ণনা ছিল। ভয়নিখের পাণ্ডুলিপি হয়ত তিব্বতের লাগোয়া সিল্করুট দিয়ে বা আরব মশলা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চলে যাওয়া কোনও লোকায়ত তান্ত্রিক কলা।

ভয়নিখের পাণ্ডুলিপির ‘রেসিপি’ অধ্যায়ে অনেক জায়গায় একই শব্দ চার-পাঁচবার লেখা আছে। ইউরোপের সাহেবরা শব্দের এমন অর্থহীন প্রয়োগ দেখেননি বলে অবাক হয়েছেন। কিন্তু আমরা ‘ঐং হ্রিং হ্রিং হ্রিং হ্রিং স্বাহা!’ শুনে ভীষণই অভ্যস্ত। ভাবতে কষ্ট হয় না ‘রেসিপি’ অধ্যায়টা হয়ত শুধুমাত্র মন্ত্রেরই অধ্যায়।

ওই পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায় যে, কতগুলো বর্ণ কেবল শব্দের শেষেই বসে। সেগুলো কখনও শব্দের প্রথমে বা মাঝে নেই। যেমন ‘আমাদের বিসর্গ বা উণস্বর। “অথ চৈনং, নিত্যজাতং নিত্যং বা মনসে মৃতম্‌’ এমন কোন শ্লোক শুনে কী কখনও মনে হয় উণস্বরগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শব্দের শেষে বসে কেন?

ভেষজ অংশে যেসব গাছের ছবি আছে তার বেশিরভাগই দেখতে হিমালয়ের অর্কিড বা ঔষধির মতো। যাদের কাণ্ড প্রায় নেই শুধু পাতা আর মূলকন্দ। এক সময়ে এমানুয়েল স্যয়াট নামে একজন ডাচ শিল্পীকে ভাবা হত ভয়নিখ পাণ্ডুলিপির সম্ভাব্য লেখক হিসাবে। এই ভদ্রলোক বিভিন্ন ভারতীয় গাছপালার একাধিক ক্যাটালগ বানিয়েছিলেন।

মজার ব্যপার হল বাউল বা ফকিররা নিজেদের মৃত মানুষ ভাবেন। তাই তাঁরা সন্তান নেন না। ভয়নিখ পাণ্ডুলিপির দুটো অধ্যায়ের ছবিগুলো দেখলে মনে হয় এ যেন মৃত্যুর তপস্যাই শেখানো হচ্ছে। ওই পাণ্ডুলিপিতে ফোলিও নং ৭৫ এর ছবিতে আছে এক মানব শরীর। শরীরে মাথা থেকে মূলাধার চক্র পর্যন্ত উপর থেকে নীচে সাজানো আছে ১৪ জন নারী। এ যেন সেই বাউল গানটা মনে করিয়ে দেয়।

‘সর্ব ত্রিকোটি নাড়ি আছে বল ভাই কার জানা।

তার মধ্যে চোদ্দটি হয় নারী প্রধান

আছে অমাবুস্যা সরস্বতী হস্তিনী জিহবা শঙ্খিনী

পুষ্যা যশোস্বিনী পয়স্বিনী জুহা বারিনী গান্ধারী বিষধরী

এই চোদ্দ নারীর গরল হলা”।

ভয়নিখ পান্ডুলপির ছবিতেও গরলের স্রোতের মধ্যেই সাঁতার কাটছে চোদ্দ নারী।

বাউলরা দেহটাকে কতরকমভাবে বর্ণনা করে। কখনও বলে এ দেহ যেন তিনতলা বাড়ী,

“এ দেহ ঘরখানা হয় তিনতলা

আধ কুঠুরী নয় দরজা

দেহ ঘরের কোনখানে নেই আলো।

ফোলিও নং ৮৩তে যেন সে কথাই বলা হচ্ছে। দেহের তিনতলার সবচেয়ে উপরে এক সুন্দরী। দোতলার একজন হৃদয়েশ্বরী হৃৎপিন্ডের উপর দাঁড়িয়ে আর নীচের তলায় উপস্থের বেদিপীঠে অধিষ্ঠিতা মুকুট পরা এক মহিষী।

৭৯এ নম্বর ফোলিওর ছবিতে যেন এই কথাটাই একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো হয়েছে। এখানে দেহের চারটি তলা। সবচেয়ে উপরের তলার ভদ্রমহিলা যেন কি একটা ধরে ঝুলছেন। তার নীচের তলায় হৃৎপিন্ডের উপরে দাঁড়িয়ে একজন। দোতলায় দুটো কিডনির উপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই সুন্দরী। এক তলায় পাকস্তুলীতে (নাকি জরায়ুতে?) কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই কিশোরী। তার নীচে নেমে এসেছে একটা নির্গম নল, সেই নির্গম পথের নীচে একটা যেন কালকুঠুরী। তাতে ভুষোকালির অন্ধকারে অস্পষ্ট অবয়বে যেন একজন মহিলা।

ফকিরের গলায় সেই গানটাই ধরা যাক,

“আগে ছিল জলময় পানির উপর খাকি রয়

খাকি উপর ঘর বাড়ি সকলরে। ‘

ভাইরে যে আল্লা সেই কাল সেই ব্রহ্মা বিষ্ট

সেই বিষ্ঠুর পদে হল গঙ্গার সৃষ্টিরে।”

খাকি ফারসী শব্দ যার অর্থ হল মাটি। এখন পাণ্ডুলিপির ৭৯আর নম্বর ফোলিওর ছবিতে যেন সেই সমন্বয়েরই ছাপ। সবচেয়ে উপরের নারী বাঁ হাতে ধরে রয়েছে পবিত্র ক্রশ তার নীচে শোবার ঘরে আর এক সুন্দরী বিবসনা শুয়ে। তার নীচে গাছপালা নিয়ে ‘খাকি’ আর একদম নীচে জলে দাঁড়িয়ে যেন একদম মকরবাহিনী গঙ্গা। জলের ধারে সিংহ, শেয়াল আরও কিসব জন্তু জানোয়ার।

‘৮০ডি’ নম্বরে ফোলিওতে যেন নারীর গর্ভের সেই ‘উল্টো দেশের’ ছবি, যার রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বাউল গান বেঁধেছে,

“সেই দেশের যত নদনদী।

ঊর্ধ দিকে জলস্রোতে বয় নিরবধি

আবার নদীর নিচে আকাশ বায়।

তাতে মানুষ বাস করতেছে,

সেই দেশের যত লোকে বাস।

মুখে আহার করে না কেউ, নাকের নাই নিশ্বাস

তারা মল মুত্র ত্যাগ করে না

আহার করে বাঁচতেছে,

দীন শরৎ বলে হইলাম চমৎকার

চন্দ্র সূর্যের গতি নাই ঘোর অন্ধকার

আবার সেই দেশের লোক অবিরত

এই দেশেতে আসতেছে।”

তবে ছবির বর্ণনা মোটেই এত পরিষ্কার নয়। অনেক নাড়ি, বল, ফানেলের মধ্যে অন্তরবাসিনীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনই এলোমেলো অস্পষ্ট। এই ধরনের অস্পষ্টতা ভীষণ পছন্দ করেন কায়াবাদী সম্প্রদায়ের সদস্যরা। তাদের গুপ্ত বিদ্যা যাতে বাইরের কেউ না জানে প্রাথমিক ভাবে তার জন্য নেওয়া হত অস্পষ্টতার মোড়ক। ধীরে ধীরে সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধারনা দৃঢ় হয় যে অস্পষ্টতা বা রহস্যময়তার মধ্যে আছে মন্ত্র শক্তির মত অতি জাগতিক শক্তি। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই সাংকেতিক জ্ঞান প্রবাহিত হতে হতে অনেক সময় এর অর্থটাই কখন হারিয়ে যায়। যেমন সুধীর চক্রবর্তীকে ইমান আলী শাহজী ফকির তাঁর খাতা খুলে বলেছিলেন নানাবিধ ‘কার’এর রহস্য – অন্ধকার, ধন্ধকার, কুয়াকার, আকার, সাকার, ডিম্বাকার, নিরাকার, শূন্যাকার, হাহাকার, হুহুকার, নৈরাকার এই এগারোটার সঙ্গে চারটে গোপনকার। পরে বোঝা গেল এইসব কারের কোনওটার মানেই ফকির সাহেব নিজেও জানেন না।

ভয়নিখের পাণ্ডুলিপিও হয়তো এমনই আনাড়ির হাতে পারে শুধু ডিম্বাকার বা হুহুকারের রূপ পেয়েছে। যার আকার অর্থহীন রহস্যময়তার জালে অস্পষ্ট হতে হতে আজকের দুর্বোধ্য চেহারা নিয়েছে।

দেহতত্ত্ব নিয়ে অনেক গুণিজন গবেষণা করেছেন, এখনও অনেকে কাজ করছেন। বর্তমানে বাউল ফকির সম্প্রদায়ের জীবন বেছে নিয়েছেন এমন শিক্ষিত মানুষও কম নেই। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই প্রতিবেদন অতি সামান্য জ্ঞান নিয়ে ভয়নিখ পাণ্ডুলিপির সঙ্গে দেহতত্ত্বের মিল খোঁজার এক দুর্বল প্রয়াস মাত্র। হয়ত অদূর ভবিষ্যতে বিস্তৃত গবেষণায় উঠে আসতে পারে আরও প্রকটতর কোনো সত্য।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত 

ড. জিষ্ণু বসু, সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস লেখেন।

Leave A Reply