‘প্রাণ’ মিলবে বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপায়, আন্টার্কটিকার রহস্যময় হ্রদ দিচ্ছে তারই ইঙ্গিত

আন্টার্কটিকার বরফের নীচে লুকিয়ে আছে অতিকায় এই হ্রদ। টলটলে জলে ভরা হ্রদটি দৈর্ঘে ২৫০ কিলোমিটার এবং গভীরতা ২৬২৫ ফুট।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    রবার্ট ফ্যালকন স্কট ও রোনাল্ড আমুন্ডসেনের দক্ষিণ মেরু অভিযানের প্রায় নব্বই বছর আগেই রাশিয়া দক্ষিণ মেরু অভিযানে নেমে পড়েছিল। রাশিয়ার বন্দর থেকে ১৮১৯ থেকে ১৮২১ সালের মধ্যে উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু জয়ের জন্য বেরিয়ে পড়েছিল চারটি যুদ্ধ জাহাজ। দক্ষিণ মেরুগামী দু’টি যুদ্ধ জাহাজের একটির নাম ছিল ‘মিরনি’ এবং অপর জাহাজটির নাম ছিল ‘ভস্টক’। মোট ৭৫১ দিনের অভিযানে অভিযাত্রীরা সমুদ্রে কাটিয়েছেন ৫২৭ দিন এবং আন্টার্কটিকার ভূখণ্ডে কাটিয়েছেন ১২৪ দিন। দু’টি জাহাজে করে ১৯০ জন নাবিক ও অভিযাত্রী পুরো আন্টার্কটিকা মহাদেশ প্রদক্ষিণ করেছিলেন।

    এই অভিযানের প্রায় ১৩৬ বছর পর দক্ষিণ মেরুতে রাশিয়া বানিয়েছিল তাদের প্রথম গবেষণাগার। যার নামও ছিল দক্ষিণ মেরুতে প্রথম আসা রাশিয়ান জাহাজ ভস্টক-এর নামে। রাশিয়ান ভাষায় ‘ভস্টক’ শব্দটির অর্থ ‘পূর্ব’। এই গবেষণাগারটিও ভৌগলিক দক্ষিণ মেরু থেকে ১৩০১ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। যে গবেষণাকেন্দ্র এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড করেছিল ১৯৮৩ সালের ২১ জুলাই। সেদিন গবেষণাগারের বাইরের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৮৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

    আন্টার্কটিকায় অবস্থিত রাশিয়ার গবেষণাগার ‘ভস্টক”

    ককপিটে বসে চমকে উঠেছিলেন আন্দ্রে কাপিতসা

    দক্ষিণ মেরুতে রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করার পর কয়েক বছর পর রাশিয়ার বৈমানিক ও ভূতত্ত্ববিদ আন্দ্রে কাপিতসা তাঁর বিমান নিয়ে উড়েছিলেন দক্ষিণ মেরুর আকাশে। বিমান থেকে দক্ষিণ মেরুর বিভিন্ন অংশের ছবি তুলে তিনি যখন ফিরছিলেন, আকাশ থেকে ভস্টক গবেষণাগারের থেকে কিছু দূরে বরফের ভেতরে একটি শক্ত বরফের বিশাল অথচ মসৃণ পাত দেখতে পান।

    চমকে যান কাপিতসা। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি যা ভাবছেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে দক্ষিণ মেরুর ইতিহাস নতুন করে লিখতে বসতে হবে। বিমানে থাকা Deep seismic sounding (DSS) পদ্ধতি জানান দিচ্ছে আন্টার্কটিকার পুরু বরফের চাদরের  নীচে টলটলে জল নিয়ে লুকিয়ে আছে অতিকায় এক হ্রদ।

    আন্দ্রে কাপিতসা

    বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দক্ষিণ মেরুতে

     ১৯৯৩ সালে European Remote-Sensing Satellite ( ERS-1) মহাকাশযানটিতে থাকা seismic soundings এবং তুষারভেদী রাডার দিয়ে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রিডলে প্রমাণ করেছিলেন, ঠিকই বলেছিলেন রাশিয়ার  ভূতত্ত্ববিদ আন্দ্রে কাপিতসা। আন্টার্কটিকার পূর্বে, যে অংশে রাশিয়ার গবেষণাগার আছে, সেখানেই বরফের নীচে শুয়ে আছে সুবিশাল এক হ্রদ।

    হ্রদটি দৈর্ঘে ২৫০ কিলোমিটার, প্রস্থে ৫১ কিলোমিটার এবং হ্রদটির সর্বোচ্চ গভীরতা ২৬২৫ ফুট। হ্রদটির একদিক অগভীর ও অন্যদিক গভীর। পৃথিবী থেকে উঠে আসা তাপ (Geothermal heat) হ্রদের জলের তাপমাত্রা রেখেছে ২৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা মাইনাস ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বরফের নিচে থাকলেও লেকের জল জমে বরফ হয়নি, লবণের মাত্রা সম্ভবত বেশি থাকার জন্য। রাশিয়ার গবেষণাগার ‘ভস্টক’-এর নীচে অবস্থান করার জন্য অতিকায় হ্রদটির নামও হয়ে গেল ভস্টক

    মহাকাশ থেকে তোলা বরফে চাপা পড়া লেক ভস্টকের ছবি

    বিজ্ঞানীরা বলছেন

    আজ থেকে দেড় কোটি বছর আগে আন্টার্কটিকা এখনকার মত তুষারমরু ছিল না। দক্ষিণ মেরুর বুকে বয়ে চলত অনেক নদী, ছিল টলটলে জলে ভরা অনেক হ্রদ। তাদের মধ্যে বৃহত্তম হ্রদ হচ্ছে ‘লেক ভস্টক’। আমেরিকার অন্টারিও লেকের আয়তনের প্রায় সমান এই লেক আজ চাপা পড়ে গেছে চার হাজার মিটার পুরু বরফের চাদরের নীচে।

    লুইসিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়োলজিস্ট ব্রেন্ট ক্রিসনারের মতে প্রায় দেড় কোটি বছর ধরে বরফ চাপা পড়ে আছে ‘লেক ভস্টক’। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাবগ্লেসিয়াল লেক (হিমবাহের নীচে অবস্থিত লেক) আজও গভীর অন্ধকারে বুক ভর্তি টলটলে জল নিয়ে বসে আছে। যদিও বায়ুমন্ডল ও সূর্যের সঙ্গে দেড় কোটি বছর আগেই তার সম্পর্ক ঘুচে গেছে।

    কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী রবিন বেল ও মিখায়েল স্টুদিঙ্গার  মতে ভস্টক লেকের জল প্রতিনিয়ত বরফে পরিণত হচ্ছে এবং আন্টার্কটিক আইস শিটের টানে লেক ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে। শুন্যতা পূরণ করতে হিমবাহের নিচে থাকা ২২টি অতিকায় গহ্বর দিয়ে নতুন করে ভস্টক লেকে জল ঢুকছে। হ্রদটিতে যে পরিমাণে জল ধরে তা লেকের ওপরের অংশ থেকে বরফ হয়ে বাহিত হতে অঙ্কের হিসেবে সময় লাগে প্রায় ১৩,৩০০ বছর।

    এই বরফের চার হাজার মিটার নিচে লুকিয়ে আছে লেক ‘ভস্টক’

    বরফ খুঁড়ে হ্রদকে ছোঁয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছিল

    ২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা বরফে ড্রিল করা শুরু করেন। ড্রিল করার পর গর্ত যাতে আবার না বুজে যায়, সে জন্য তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন তরল গ্যাস ফেরন ও কেরসিনের ৫৪ টন মিশ্রণ। ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি, রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা ৩৪০৬ মিটার বা ১১১৭৫ ফুট নীচে থেকে উঠিয়ে আনেন কয়েকটি বরফের থাম।

    ঠিক সেখান থেকে, যেখানে হিমবাহের শেষ ও ভস্টক লেকের জল শুরু। লেকের জলও বরফ হয়ে জমে আছে উঠিয়ে আনা থামগুলির নিচের অংশে। সেই থামগুলির বরফ নিয়ে গবেষণা করে পাওয়া গেল চাঞ্চল্যকর তথ্য। যে গবেষণার ফলাফল আশা জাগিয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মনেও।

    ড্রিল করে তুলে আনা হয়েছে এই সব বরফের থাম, ৩৪০৬ মিটার নীচে থেকে

    পৃথিবীর  চরমতম পরিবেশে পাওয়া গেছে ‘প্রাণ’

    বায়োলজিস্ট ব্রেন্ট ক্রিসনার একটি আন্তর্জাতিক দলের সদস্য হিসেবে দক্ষিণ মেরু গিয়ে হ্রদের জল জমে তৈরি হওয়া বরফ (accretion ice) থেকে আণুবীক্ষণিক জীবদের সন্ধান পান। ক্রিসনার বুঝতে পারেন আসলে বরফের নীচে ঘুমিয়ে থাকা হ্রদ ভস্টক মৃত্যুপুরী নয় বরং তা জীবনের প্রাচুর্য্যে ভরপুর।

    লেকটির বুকে আছে রহস্যময় এক জগৎ, সেখানে থাকা জীবজগতে চলে অদ্ভুত এক বাস্তুতন্ত্র। যে বাস্তুতন্ত্রে সূর্যালোক শক্তি যোগায় না। শক্তি যোগায় হ্রদের পাথুরে মেঝেতে থাকা রাসায়নিক পদার্থ। জলে বিপুল পরিমান অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন থাকলেও, সূর্যের তাপ ছাড়াই জীবন সেখানে চলেছে আপন গতিতে।

    লেক ভস্টকে আছে প্রাণের স্পন্দন

    ২০১৩ সালের ২৬ জুন, বিখ্যাত PLOS ONE জার্নালে একটি গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়। বোলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের প্রধান ডঃ স্কট রজার্স জানিয়েছিলেন, ভস্টক লেকের বরফে যে কয়েক হাজার আণুবীক্ষণিক জীবের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে, সেগুলির DNARNA বিশ্লেষণ করে তাঁরা অনেক জীবকে সনাক্ত করতে পেরেছেন, যেগুলির নিকট আত্মীয়রা আজও পৃথিবীর বিভিন্ন সাগরে, হ্রদে ও ঝর্নার জলে বাস করে। এদের মধ্যে অবশ্য ৯৪ শতাংশই ব্যাকটিরিয়া এবং বাকি ৬ শতাংশই আধুনিক কোষ যুক্ত জীব বা ইউক্যারিওটস।

    ভস্টক গবেষণাগারে চলছে পরীক্ষানিরীক্ষা

    এদের কেউ সাইক্রোফিলিক (psychrophiles) জীব বা যারা প্রচণ্ড ঠান্ডায় বাস করতে পারে। আবার কেউ থার্মোফিলিক (thermophiles) জীব বা যারা প্রচণ্ড উত্তপ্ত পরিবেশে বাস করতে ভালবাসে। ভস্টক লেকের তলায় থাকা যে ফাটলগুলি দিয়ে পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে উত্তাপ বেরিয়ে আসে সেখানে বাস করে এরা। বিজ্ঞানীরা তাই ভস্টক লেকের জলে বসবাসকারী জীবদের বলছেন এক্সট্রিমোফিল (extremophiles) বা যারা সবচেয়ে কঠিন পরিবেশে বাঁচতে সক্ষম।

    আশা জেগেছে মহাকাশে

    বহুবছর ধরে মহাকাশবিজ্ঞানীরা বলছেন জুপিটারের চাঁদ ইউরোপাতে প্রাণ আছে। গ্যালিলিওর আবিষ্কার করা এই চাঁদটি একশো কিমি পুরু বরফের চাদরে মোড়া। পাতলা বায়ুমণ্ডলে আছে প্রধানত অক্সিজেন গ্যাস। এখনও পর্যন্ত আবিস্কৃত হওয়া সবচেয়ে মসৃণ উপগ্রহ ইউরোপার গায়ে আছে আঁকাবাকা অজস্র ফাটল। ফাটলগুলি বরফের চাদর ফেটে তৈরি হয়। বুজে যায় প্রতিনিয়ত, আবার নতুন করে তৈরি হয়।

    বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা

    বিজ্ঞানীরা ইওরোপার মসৃণ তল দেখে অনুমান করছেন, সারা ইউরোপাকে ঘিরে থাকা বরফের নীচে লুকিয়ে আছে অতিকায় এক সমুদ্র। ইউরোপার উপরের তাপমাত্রা মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও ,বরফের চাদরের নীচে থাকা সমুদ্রের তাপমাত্রা অনেক বেশি। কারণ বৃহস্পতির টানে ইউরোপার বরফের নীচে থাকা সমুদ্রের জলে ওঠা উত্তাল ঢেউ প্রচুর শক্তির যোগান দেয়। এর ফলেই জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে। জোয়ারের জলের ধাক্কাতেই সম্ভবত বরফের চাদরে ফাটলগুলি দেখা দেয়।

    ইউরোপার এই বরফের নিচে সম্ভবত আছে সমুদ্র।

    মহাকাশ বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, ইউরোপার চেয়েও অসহনীয় পরিবেশযুক্ত লেক ভস্টকের জলে জীবন তার বাঁচার পথ খুঁজে নিয়েছে। তাহলে ইউরোপাতে অবশ্যই আছে ‘প্রাণ’। কারণ ইউরোপার সঙ্গে লেক ভস্টকের পরিবেশের অসম্ভব মিল। লেক ভস্টক কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে চার হাজার মিটার পুরু বরফের নিচে বন্দি আছে, তবুও তার বুকে জীবনের ঢেউ ওঠা বন্ধ হয়নি। তাই মহাকাশ বিজ্ঞানীদের দাবী, ‘প্রাণ’ মিলবেই বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপার বরফ ঢাকা সমুদ্রে, এমনকি ‘প্রাণ’ মিলতে পারে  শনির চাঁদ এনসেলেডাসেও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More