পুরোদস্তুর ক্রিকেটার, তবু মেয়ে বলে মেঘাকে খেলতে দিল না বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    ছেলে এবং মেয়েরা একসঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারে সেখানে। পারে একসঙ্গে পড়াশোনা করতে। এমনকী নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও একসঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু পারে না কেবল, একসঙ্গে মাঠে খেলতে! না, এই ফরমান কোনও গোঁড়া ও সঙ্কীর্ণ সমাজ দেয়নি। এই ফরমান দিয়েছে রাজ্যের অন্যতম মুক্ত মানসিকতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়!

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খোলামেলা প্রকৃতির বুকে যে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেছিলেন, প্রথাগত অচলায়তন ভাঙার যে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, যে ভাবে জীবনকে উদযাপনের কথা বলেছিলেন খোলা মনে, তা যে এত বছর পরে কেবল কথার কথা হয়ে রয়ে গিয়েছে, তা প্রমাণ করল আজ, সোমবারের ঘটনা। জ়ুলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, জেলাস্তরে খেলা ক্রিকেটার মেঘা দাস কবিরাজকে মাঠ থেকে বার করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্বভারতীর স্পোর্টস বোর্ডের বিরুদ্ধে। শেষমেশ দশ জন প্লেয়ার নিয়েই ম্যাচ খেলে মেঘার টিম।

    মেঘার দাবি, তিনি বহু বছর ধরে ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, বিশ্বভারতীর অন্তর্বিভাগীয় টিমেও খেলেছেন। এ দিন মাঠে নামার পরেও তাঁকে বসে যেতে বলেন আম্পায়ার। খেলার সুযোগই পাননি তিনি। কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, ‘উচ্চতর কর্তৃপক্ষ’-এর তরফে এমনই নির্দেশ রয়েছে। নির্দেশ রয়েছে, ছেলেদের টিমে কোনও মেয়ে খেলতে পারবেন না। যদিও, বিশ্বভারতীতে কোনও মহিলা ক্রিকেট টিম নেই এত বছর ধরেও। এবং মেঘার যোগ্যতা গোটা টিমের সদস্যদের কারও চাইতে কোনও অংশে কম নয়।

    এ কথা জানিয়েছেন, মেঘার টিমের ক্যাপ্টেন দেবাশিস মাঝিও। কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের স্নাতকোত্তর স্তরের প্রথম বর্ষের পড়ুয়া দেবাশিস বলছেন, “মেঘা আমাদের টিমের সম্পদ। আমাদের আচমকাই বলা হল ওকে খেলতে না দেওয়ার কথা। আগে থেকে জানলে আমরা এমনটা হতে দিতাম না, যত দূর যেতে হয়, যেতাম।”

    প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইন্টার ইউনিভার্সিটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের নিয়মাবলিতে কোথাও লেখা নেই, কেবলমাত্র পুরুষেরা অংশগ্রহণ করতে পারবে।

    তবে মেঘা কিন্তু চেষ্টা করেছিলেন ক্রিকেট টিমে নিজের অবস্থান পাকা করার। তাঁর দাবি, এই টুর্নামেন্টের আগে যখন ইউনিভার্সিটি স্পোর্টস বোর্ডের বৈঠক হয়েছিল, সব পক্ষই সম্মতি জানায় ছেলেদের টিমে মেঘার খেলার ব্যাপারে। তবে তাঁকে বলা হয়, খেলতে গিয়ে কোনও চোট লাগলে তার দায় কর্তৃপক্ষের নয়– এই মর্মে একটি মুচলেকা লিখে দিতে।

    “সেই মতো আমি বিষয়টি লিখিত ভাবে জমা দিতে যাই অধ্যক্ষ কাশীনাথ চট্টোপাধ্যায়ের অফিসে। অধ্যক্ষ আমায় বলেন, ‘এই চিঠির কোনও দরকার নেই। তুমি আর পাঁচ জনের মতোই এই টিমের সদস্য। মেয়ে বলে আলাদা চিঠি দেওয়ার তো দরকার নেই!’ আমি ওঁকে বলি, স্পোর্টস বোর্ড থেকে আমায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

    কিন্তু অভিযোগ, টুর্নামেন্টে শিক্ষাভবনের টিমের প্রথম ম্যাচের ঠিক দু’দিন আগে, ৮ মার্চ স্পোর্টস বোর্ডের তরফে শিক্ষাভবনের টিমের ক্যাপ্টেনকে ফোন করে মেঘাকে না-খেলানোর ব্যাপারে চাপ দেন। ক্যাপ্টেন দেবাশিস মাঝির দাবি, মেঘা খেললে টিমকে ডিসকোয়ালিফাই করে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়। ক্যাপ্টেন কারণ জিজ্ঞেস করলে বলা হয়, প্রথমত: মেঘার কোনও বড় ইনজুরি হলে তার দায় কর্তৃপক্ষের হবে। এবং দ্বিতীয়ত: মেঘা মাঠে খেলাকালীন গ্যালারি থেকে কোনও অশালীন শব্দ ভেসে এলে তাতে শিক্ষা ক্ষেত্রের পরিবেশ নষ্ট হবে।

    মেঘাকে আটকানোর জন্য আট তারিখে যখন এই টানাপড়েন চলছে, তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ঘটা করে পালন হচ্ছে নারী দিবস। সকলেই কথা বলছেন নারী-পুরুষের সাম্যের অধিকার নিয়ে। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অন্য কোনও প্রান্তে বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক ছাত্রীকে প্রাণপণে লড়াই করতে হচ্ছে, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত অন্তর্বিভাগীয় টিমে খেলার জন্য!

    এ বিষয়ে ফেসবুকে পোস্টও করেন মেঘা।

    নারী দিবসের দুদিনের মধ্যে আবারও প্রমাণ হয়ে গেলো যে এ দেশে নারীদের সমান অধিকার, সমান মর্যাদার স্বপ্ন এখনও কতখানি ঠুনকো।…

    Megha Das Kabiraj এতে পোস্ট করেছেন রবিবার, 10 মার্চ, 2019

    মেঘা জানালেন, স্পোর্টস বোর্ডের ডেপুটি ডিরেক্টর সুদর্শন বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে কোনও লাভ হয়নি। তিনি জানিয়ে দেন, পুরুষদের ক্রিকেট দলে মেয়ের খেলা নিয়ম বহির্ভূত। আরও প্রশ্ন ওঠে, তাঁর যোগ্যতা নিয়ে। মেঘা যদিও জানান, তিনি এর আগে ছেলেদের সঙ্গেই সদ্য আয়োজিত একটি টুর্নামেন্টে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেই শিক্ষাভবনের টিমে নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু সে কথা মোটেই শুনতে চাননি ডিরেক্টর। শুনতে চাননি, ক্রিকেটের ইতিহাসে আগেও এমন হয়েছে সে উদাহরণের কথা। এমনকী মেঘার নামে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আনেন তিনি।

    এর জেরে মেঘার জুলজি বিভাগের প্রধান, অংশুমান চট্টোপাধ্যায় প্রিন্সিপ্যালের অফিসে ক্ষমাও চান মেঘার হয়ে। মেঘাকেও ক্ষমা চাইতে বলেন। মেঘা যদিও ক্ষমা চাইতে রাজি হলেও, খেলতে চাওয়ার অধিকার থেকে একটুও না সরার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। কিন্তু নিজের বিভাগের ছাত্রীর পাশে কেন দাঁড়ালেন না বিভাগীয় প্রধান অংশুমান চট্টোপাধ্যায়! তাঁকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমি কোনও কথা বলব না। যা বলার কর্তৃপক্ষ বলবেন, কর্তৃপক্ষের তরফে নিয়োজিত মুখপাত্র বলবেন।”

    স্পোর্টস বোর্ডের ডেপুটি ডিরেক্টর সুদর্শন বিশ্বাসকে ফোন করা হলে তিনি দাবি করেন, “ক্রিকেট একটি টিম গেম। ছেলেদের টিম আলাদা, মেয়েদের টিম আলাদা। আমি এর আগেও বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। কোথাও ছেলেদের টিমে কোনও মেয়েকে খেলতে দেওয়া হয় না।”

    ওঁকে পাল্টা জিজ্ঞেস করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হেতু আলাদা করে মেয়েদের কোনও টিম নেই, সে কারণে মেঘা এত দিন ছেলেদের টিমেই খেলত বিভাগীয় ম্যাচগুলি। আচমকা কেন অসুবিধা হল এ ব্যাপারে? ওঁর উত্তর, “ও ভাল খেলতে চাইলে ইনডিভিজুয়্যালি রাজ্য স্তরে যাক। ইউনিভার্সিটির ছেলেদের টিমে ছেলেরাই খেলবে। এর অন্যথা আজ অবধি কখনও হয়নি। এসব সমর্থন করে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না।”

    বিশ্বের ক্রিকেট ইতিহাসে আগেও এমন হয়েছে, এতে ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার প্রসঙ্গ কেন আসছে– এ কথা শেষ করার আগেই ফোন কেটে দেন সুদর্শন বাবু।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীকে এ বিষয়ে ফোন করা হলে তিনি বলেন, “আমি ফোনে কোনও কথা বলব না। আর এ বিষয়ে যা জানার, মেঘার থেকেই জেনে নিন।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More