কণ্ঠরোধের গণতন্ত্রে হিংসার অধিকার মৌলিক

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

হিন্দোল ভট্টাচার্য

তবে কী প্রকাশ্যে হিংসার অধিকার পাওয়ার নাম নির্বাচন?

কী না হল আমাদের এই পঞ্চায়েত ভোটের সারাদিন। মানুষকে পুড়িয়ে মারা হল, গণপিটুনি হল, প্রকাশ্যে হত্যা হল, ব্যালট বাক্স পোড়ানো হল। কারা মরল? কোনও না কোনও পার্টির ক্যাডার, তা সে গেরুয়া হোক, ঘাসফুল হোক বা লাল। কত পরিবার হারালো তাদের প্রিয়জন। কত কাছের মানুষ অকালে চলে গেল না-ফেরার দেশে।

এদের কি শহীদ বলব আমরা? গণতন্ত্রের শহীদ? না কি ব্যবহৃত সৈনিকের হত্যা? না কি রাজার-ও রাজা হতে চাওয়ার মাঝে উলুখাগড়ার প্রাণদান? না কি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহান গণতন্ত্রের পুজোয় নরবলি? কী বলব আমরা? না কি এও বলতে পারি এ হল ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের সংসদীয় পার্টিগুলির প্রকাশ্যে সন্ত্রাসবাদ। কী প্যারাডক্স ভাবুন তো। এখানে সংসদীয় গণতন্ত্রের এই  পরিসরের বাইরে যে সব রাজনীতির লোকজন গেরিলা যুদ্ধের কথা বলে, তারা কিন্তু সংসদীয় রাজনীতির জায়গায় হিংসার কারণেই নিষিদ্ধ। কিন্তু এই যে ক্ষমতাদখলের নামে দিনের পর দিন ধরে এবং নির্বাচনের দিন তো বটেই, প্রকাশ্যে সন্ত্রাসবাদ চলে দিনের আলোয়, এক পার্টির লোক আরেক পার্টির দিকে প্রকাশ্যে সকলের সামনে আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্যান্য নিয়ে আক্রমণ করে, খুন করে—এইগুলি কি সন্ত্রাসবাদ নয়? ভোট দিতে গিয়ে আঙুলে ভোটের ছাপ নয়, বুকে বুলেটের ক্ষত নিয়ে রাস্তায় ধুলো ও রক্তে মাখামাখি হয়ে পড়ে রইল নাগরিক- এ কি সন্ত্রাসবাদ নয়? এক রাতের মধ্যে পরিবার শুদ্ধ তিনজনকে পুড়িয়ে মেরে দেওয়া-  এও কি নয় সেই তাপসী মালিককে হত্যা করার মতোই নৃশংস সন্ত্রাসবাদ?

প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কি আগেও দেখিনি কেশপুর, গড়বেতা? দেখিনি কি বন্দুকের নলে শাসিত হচ্ছে জনগণের কণ্ঠ? এও প্রশ্ন উঠতে পারে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গেরুয়া হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যদি হিংসাকে আশ্রয় করে, ধর্মভিত্তিক হিংসাত্মক চোখরাঙানিকে আশ্রয় করে নির্বাচন করতে পারে, তাহলে এখানেই বা নয় কেন?

প্রশ্নটি তো এখানেই। তোমরা, এই তথাকথিত সংসদীয় রাজনীতির লোকেরা, আদৌ কি জনগণের জন্য এই নির্বাচনের আয়োজন করো? তোমরা তো ক্ষমতাদখলের জন্য করো। গেরুয়াশিবির যে ফ্যাসিবাদ সারা দেশে এখন-ই বিস্তৃত করেছে, সেই ফ্যাসিবাদকে আটকানোর জন্য ভারতের অন্যান্য প্রদেশ তথা এই বাংলায় যে সব শক্তিগুলি আছে, সেগুলিও তো আধা-ফ্যাসিস্ট। তারাও রামনবমী পালন করে, হনুমানের পুজো করে, বলে- আমরাই সেরা হিন্দু, আবার তাদের নেতৃকে কেউ কেউ বলে তিনিই সাচ্চা কমিউনিস্ট। কিন্তু দেখি, বুঝি, এক অশিক্ষিত অসহিষ্ণু বাতাবরণ সারা ভারতের মতোই এই বাংলাতেও পরিব্যাপ্ত। একটা নন্দীগ্রাম নয়, – একটা নন্দীগ্রাম হলে তখন তাকে জেনোসাইড আখ্যা দেওয়া হবে। বরং ছোট ছোট করে অসংখ্য  নন্দীগ্রাম তৈরি হচ্ছে এখন। আমরা কেউ বলতে পারছি না যে বাংলায় জেনোসাইড চলছে, বলতে পারছি না গৃহযুদ্ধ চলছে। আমাদের বলতে হচ্ছে নির্বাচনের প্রস্তুতি, নির্বাচনের সন্ত্রাস, শান্তিপূর্ণ হিংসা।

এমন পরিস্থিতি যে তৈরি হবে, তা ক’দিন আগে থেকেও বোঝা গেছিল, যখন এক বর্ষীয়ান কবিকে এ বঙ্গের একজন বাহুবলী রাজনৈতিক নেতা জঘন্য ভাষায় অপমান করলেন। আবার সেই সেই নেতাকেই দাগিয়ে দেওয়া হল সাব-অল্টার্ন সমাজের প্রতিনিধি বলে। বলা হল, তথাকথিত ভদ্রলোক নন বলে, এলিট নন বলে , এলিটিস্ট ভদ্রলোক সেই কবিকে আক্রমণ মেনে নিচ্ছে না কেউ কেউ।

এই চোখ রাঙানি গুন্ডামিকে মান্যতা দেওয়ার যুক্তি যাঁরা দিলেন তাঁরা কারা? আমাদের এই বঙ্গের কিছু বুদ্ধিজীবী, শিল্পী। আর কেউ কেউ পাশ কাটিয়ে গেলেন। কথাই বললেন না। কারণ তাঁরা জানেন গুন্ডাকে গুন্ডা বলে মেনে নিলে, গুন্ডার গুন্ডামিকে মান্যতা না দিলে, গুন্ডামির বিরোধিতা করতে হয়। আর সেই বিরোধিতা করলে, সমস্যা। গেরুয়া শিবিরের গুন্ডাদের বিরোধিতা করলে সারা দেশে সমস্যা। আর ঘাসের গুন্ডাদের বিরোধিতা করলে এ রাজ্যে সমস্যা। তাঁরা এড়িয়ে যেতে বললেন। আর তার পরেই হল এই নির্বাচন, এই হিংসাত্মক নির্বাচন, যার পুজোয় বলি হল কয়েকটি প্রাণ।

আহা আমরা কী সুন্দর একটা দেশে আছি। এখানে তো ক্ষমতার জন্য সবাই লালায়িত। ক্ষমতার প্রসাদ পাওয়ার জন্য কবি/ শিল্পী/ গায়ক/ সুলভ শৌচালয়ের কর্মী/ দালাল/ এজেন্ট/ হিরো/ ভিলেন/ কমেডিয়ান/ রিংমাস্টার/ ভিখারি থেকে সন্ন্যাসী পর্যন্ত সকলেই ভাবছে কোন কথাটি বলব আর কোন কথাটি বলব না। অবশ্যই এ অধিকার গণতন্ত্র তাকে দেয়। কিন্তু কখনও কখনও এ তো নিয়তির বিধান বলে চলা, কখনও কখনও উপনিষদ আওড়ানো, কখনও কখনও ফুকোর ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন আওড়ানো আবার কখনও কখনও ‘এত রক্ত কেন’ বলে গান্ধী হয়ে যাওয়া এই সব বুদ্ধিজীবীদের আপনি ঠিক কি বলবেন? আচ্ছা বুদ্ধিজীবী কারা? বুদ্ধিকে যারা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন না কি বুদ্ধিকে যারা বিকৃত করে জীবিকা নির্বাহ করেন? এ উত্তর দেওয়ার জন্য-ও কি হাইকম্যান্ডের পারমিশন নিতে হবে?

যে তথাকথিত ‘লাল-সন্ত্রাস’কে সরানোর জন্য বলা হয়েছিল বদলা নয়, বদল চাই, সেই লালেরা তো নির্মূল। মিউজিয়াম পিস হয়ে গেছে। কিন্তু আজ বিরোধ গেরুয়া আর ঘাসফুলের মধ্যে। আর কী আশ্চর্য দেখুন দুপক্ষই অশিক্ষার পূজারী। দুপক্ষই ফ্যাসিজমের পূজারী। দুপক্ষই নির্বিচারে মানুষ হত্যার পিঁজরাপোল বসিয়েছে। দুপক্ষই যথেচ্ছ অনুমোদন দিয়েছে প্রকাশ্যে হিংসা করার, অস্ত্র নিয়ে মিছিলের, ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে অসহিষ্ণু, নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠা করতে গায়ের জোরে।

এইগুলি যদি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্রের ডিএনএ হয়, তাহলে বুঝতে পারছেন না আপনি যে ভোটকে , যে ভোট দেওয়ার অধিকারকে, ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার যে চয়েসকে আপনার মূল্যবান নাগরিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করছেন, তা ইংরেজিতে যাকে বলে – হোক্স।

হে ভারতীয় নাগরিক গণ, ভোট দিয়ে জনমতামতে মিশে গিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার দিবাস্বপ্নটি  আপনারা কতদিন আর দেখবেন? প্রতি ভোটে আপনার না হোক, কারুর না কারুর বাড়ির মানুষ তো প্রাণ হারাচ্ছেন। এর মানে, ভোটের অধিকার বজায় রাখতে , সেই অধিকারকে রূপ দিতে প্রাণ দিতে হচ্ছে মানুষকে। যে দেশে নিজের অধিকারের জন্য প্রাণ দিতে হয়, সে দেশে কি আদৌ গণতন্ত্র আছে? না কি গণতন্ত্র আর নির্বাচন হল সেই শিখণ্ডীর মতো, যাকে সামনে রেখে দেশের কতিপয় হিংস্র শ্বাপদ নিজেদের ক্ষমতার চেয়ারগুলিকে সুরক্ষিত রাখে। আর সেগুলি যাতে সুরক্ষিত থাকে, তার জন্য তৈরি করে সন্ত্রাসের বাতাবরণ। কেন সন্ত্রাস, কারণ তারা নিজেরাই সন্ত্রস্ত। কেন সন্ত্রস্ত? কারণ তারা জানে নাম ছাড়া, লেবেল ছাড়া, পার্টি ছাড়া তাদের কারো আর আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। তাদের একটাই পরিচয়, তারা ক্ষমতালোভী। কেউ কেন্দ্রের তো কেউ রাজ্যের। তাদের অস্ত্র কখনও ধর্ম তো কখনও গুন্ডামি। নাহলে বাম আমলেই বা লক্ষ্মণ শেঠ কেন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আর এই সময়েই বা কেন অনুব্রত মণ্ডল? ভেবে দেখেছেন? দুজনেই তো গুন্ডা।

এই মহান গণতন্ত্রের জন্য যাঁরা শহীদ হলেন, তাঁদের জন্য বিষন্নতা প্রকাশ করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ এই প্রাণত্যাগ যদি হত বিপ্লবের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য, সকলেই তাঁদের মনে রাখত। কিন্তু প্রথমত এখনকার মানুষের স্মৃতি সততই ক্ষণস্থায়ী, দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন নতুন নতুন ইসু উঠে আসছে আর তা আগুনের মতো মতামতের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে, এবং তৃতীয়ত, তাঁরা আসলে প্রাণ দিয়েছেন কিছু ক্ষমতালোভী মানুষের বাসনা চরিতার্থ করতে, না বুঝে, যে এই শহীদ হলেও তাঁদের বা তাঁদের পরিবারের জীবনে ইতরবিশেষ কিছুই বদলাবে না।

অথচ নির্বাচন হচ্ছে, হবে। মানুষ আবার ভোট দিতে যাবে। ভোট দিতে যাবে সেই সব দলগুলিকেই যারা স্বয়ং মৃত্যু হয়ে, হিংসার ঔদ্ধত্য হয়ে, সন্ত্রাসের বিষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে তাঁদের শিয়রেই, আবার বেশ কিছু মানুষ মারা যাবেন, বেশ কিছু মায়ের কোল শূন্য হবে, বেশ কিছু স্ত্রী হারাবেন ভালোবাসা, বেশ কিছু সন্তান হারাবে পিতা বা মাতাকে। কিছুই পাল্টাবে না। রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকবে জনপদবধূর মতো। কিন্তু হাসপাতালে আসবেনা ওষুধ। কারখানা খুলবে না। চাকরি পাবে না শিক্ষিত বেকাররা। মিডলম্যানদের দাপট বাড়বে। যেমন ছিল মন কী বাত তেমন থাকবে, যেমন ছিল মাটির সঙ্গীত- তেমন-ই থাকবে। তবু মানুষ ভোট দিতে যাবে।

এই ভোট দিতে যাওয়া হচ্ছে ভারতীয় জনগণের হিন্দি সিনেমা দেখার মতো। সেখানে যেমন মানুষ দেখে একজন আছে হিরো, যে ঢিসুম ঢিসুম করে সব ভিলেনকে মেরে নিয়ে আসে হ্যাপি এন্ডিং। তেমনি মানুষ, আমাদের ভারতের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ ভাবে একজন আসবে একদিন যে সবকিছু পালটে দেবে। ভাল থাকবে কৃষক, ভাল থাকবে শ্রমিক, সবার জন্য ভারতবর্ষ হবে এক রূপকথার দেশ। রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকবে, কড়া নাড়বে, ঘরে এসে চা বিস্কুট খাবে, একটু ভাত টাত খেয়ে ঘুমিয়েও নিতে পারে হয়ত।

আর এই দিবাস্বপ্ন দেখার সময় তার দিকে ধেয়ে আসবে তাজা সীসার বুলেট। বা, কেউ চেপে ধরবে গলা।

ভাবছেন এসব কেউ বোঝে না? ঈশ্বর, বুদ্ধিজীবী এবং শয়তান—সব বোঝে। কিন্তু তাদের নির্মাণ করে কে? ক্ষমতাই তো! মানুষ তো আর  করে না। তারা মেনে নেয়। পালন করে। মরে। ম’রে বাঁচে না। ভোট দেয়। এবং আবারও ভোট দেয়। এই মহান কর্তব্য পালনের জন্যই তো তাঁদের জন্ম। নাহলে এই ১২০ কোটির দেশে ১১৯ কোটির বেশি মানুষের প্রাণের আর মূল্য আছে নাকি?

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হল- শেয়ালে বেগুন খায়, তারা তেল আর নুন কোথায় পায়?

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

(হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More