শাহিনবাগের জয়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    এক নম্বরে শাহিনবাগ। দু’নম্বরে উন্নয়ন।

    শাহিনবাগকে কেন্দ্রে রেখে দিল্লি ভোটের স্ট্র্যাটেজি ছকেছিলেন অমিত শাহ। কেজরিওয়াল প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন যাতে ভোটারের নজর ওদিক থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। তাঁর ফোকাসে ছিল বিনা পয়সার জল, বিদ্যুৎ ও শিক্ষা। কিন্তু ভোটটা শেষ পর্যন্ত হল শাহিনবাগের ওপরেই।

    দিল্লির ওখলা বিধানসভা কেন্দ্রের একটি অঞ্চল শাহিনবাগ নামে পরিচিত। নামের সঙ্গে বাগ শব্দটি থাকলেও সেখানে কোনও বাগান নেই। ঘিঞ্জি মহল্লার রাস্তা জুড়ে গত দেড় মাসের বেশি সময় ধরে চালু রয়েছে সংশোধিত নাগরিক আইন বিরোধী বিক্ষোভ। মূলত সংখ্যালঘু মহিলারা তাতে শামিল। তাঁদের সমর্থনে আছেন ছাত্রছাত্রী ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ।

    ক্রমে হিন্দুত্ববাদী শাসকের চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে শাহিনবাগ। কলকাতা, মুম্বই, হায়দরাবাদ, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, দেশের নানা প্রান্তে ওই ধরনের বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

    অমিত শাহ ভেবেছিলেন ভোটারদের মেরুকরণে সুবিধা করে দেবে শাহিনবাগ। ‘ওখানে যারা অবস্থান করছে তারা টুকরে টুকরে গ্যাং। দেশদ্রোহী। পাকিস্তানের এজেন্ট। ওখানে জঙ্গিরা তৈরি হচ্ছে। শিগগির তারা হিন্দুদের মারতে আসবে…।’ এই ছিল বিজেপির প্রচার। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা।

    শাহিনবাগে যাঁরা অবস্থান করছেন, তাঁরা যদি দেশদ্রোহী হন তো শাস্তি একটাই। ‘গোলি মার দো’। অর্থমন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরে যিনি প্রতিমন্ত্রী, তিনি প্রচারে জনতাকে দিয়ে ওই কথাটি বলিয়েছিলেন, ‘গোলি মারো গদ্দারোঁ কো’। লোক ক্ষেপানোর কৌশল।

    গত শতকের এক জার্মান প্রচারবিদ বলে গিয়েছেন, একটা মিথ্যাকে বার বার প্রচার করলে মানুষ সত্যি বলে ভেবে নেয়। অমিত শাহদের গুরু তিনি।

    শাহিনবাগকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমান বিভেদের চেষ্টা তো ছিলই, তার সঙ্গে মানুষের দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরা হচ্ছিল বার বার। শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আটকে দিনের পর দিন ধর্না চলায়, সাধারণ মানুষের অসুবিধা হচ্ছে। পাঁচ মিনিটের পথ যেতে লাগছে ৪৫ মিনিট।

    শাহিনবাগে অনেক মা শিশুদের নিয়ে এসেছেন। রাজনৈতিক বিক্ষোভে শিশুদের শামিল করা কেন? এমন প্রশ্ন তুলেছেন শাসক দলের ঘনিষ্ঠ অনেকে। যেন বস্তির শিশুদের ওপর তাঁদের কত দরদ। ব্যাপারটা কোর্ট-কাছারি পর্যন্ত গড়িয়েছে।

    দিল্লি ভোটে বিজেপির হয়ে তিনটি সভা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরাও সভা করেছেন। যোগী আদিত্যনাথ ও অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের আনা হয়েছিল। এমনও বলা হয়েছিল, ‘দিল্লির ভোট মানে হিন্দুস্তান-পাকিস্তানের লড়াই’। তার মানে সহজবোধ্য। যারা বিজেপিকে ভোট দেবে না, তারা দেশদ্রোহী।

    জনসাধারণের একটা অংশ, যাদের বয়স কম, মিথ্যা কথা ধরে ফেলার বুদ্ধি নেই, তারা এই ধরনের প্রচারে প্রভাবিত হয় বেশি। জামিয়া মিলিয়ার মিছিলে যে গুলি চালিয়েছিল, সেই ‘রামভক্ত গোপাল’ তাদেরই একজন। গুলি শাহিনবাগেও চলেছে।

    বিজেপির প্রচারের সুর এত উঁচুতে উঠেছিল, খানিকটা নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন কেজরিওয়াল। তিনি আমতা আমতা করে বলছিলেন, আমার হাতে পুলিশ থাকলে এতদিন শাহিনবাগে বিক্ষোভ চলতে দিতাম না। পাছে হিন্দু ভোটাররা পোলারাইজড হয়ে যান, সেই ভয়ে ক্যামেরার সামনে হনুমান চালিশা পাঠ করেছেন।

    ৮ ফেব্রুয়ারি দেখা গিয়েছিল, মুসলমান আর শিখ ভোটাররা সকাল সকাল দাঁড়িয়ে পড়েছেন লাইনে। তুলনায় হিন্দু ভোটাররা যেন একটু উদাসীন। সবক’টি বুথফেরত সমীক্ষায় এগিয়ে ছিল আম আদমি পার্টি। অমিত শাহ বলেছিলেন, ভোটযন্ত্রের বোতাম এমনভাবে টিপুন যাতে শক লাগে শাহিনবাগে। বুথ ফেরত সমীক্ষা দেখে তাঁদেরই শক লাগার যোগাড়। মনে হয় তখনই ছাপতে গিয়েছিল সেই পোস্টার, যাতে লেখা, ‘হেরে গেলেও আমরা হতাশ হই না’।

    ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল আটটা থেকে ফলাফলের যে ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছিল তাতে আপের আসন ছিল ৫০-এর আশপাশে। দিনের শেষে দেখা গেল, তাদের আসন বেড়ে পৌঁছেছে ৬২ তে।

    ওখলা বিধানসভা কেন্দ্রে মুসলিম ভোটার আছেন ৪৫ শতাংশ। অথচ আপের পক্ষে ভোট পড়েছে ৬৬.০৯ শতাংশ।

    বিজেপি বলেছিল, ক্ষমতায় এলে এক ঘণ্টার মধ্যে তুলে দেবে শাহিনবাগের বিক্ষোভ। সত্যি সত্যি তাই দিত। শুধু তাই নয়, অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার কেসও দিত। দিল্লির ভোটারদের মধ্যে যাঁরা সংখ্যালঘু নন, তাঁরা এমনটা চাননি। তাই আপকে ভোট দিয়েছেন।

    অমিত শাহ মানুষের মুড বুঝতে ভুল করেছিলেন। অহিংস আন্দোলন যে এভাবে ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সীমা অতিক্রম করে যাবে ভাবতে পারেননি।

    দিল্লির ভোটে জিতল শাহিনবাগ। একুশ শতকের ভারতে বাপুজির গুরুত্ব উপলব্ধি করা গেল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More