মঙ্গলবার, জুন ২৫

জীবনখাতার প্রতি পাতাতেও তিনি ছিলেন মহানায়ক

রূপাঞ্জন গোস্বামী –  কলকাতা থেকে কক্সবাজার,ক্যানিং থেকে কালিম্পং, পর্দায় তাঁর চাউনিতে বুকের রক্তে সুনামি আসেনি তাঁর যুগের কোনও মহিলা হলফ করে বলতে পারবেন না। তাঁর যুগের পুরুষরাও হলফ করে বলতে পারবেন না যে পাড়ার-বেপাড়ার যুবতীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য তাঁর পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত নকল করার অক্ষম চেষ্টা করেন নি।পর্দায় তাঁর এন্ট্রিতে ‘গুরু’ ‘গুরু’ বলে চিৎকারে সিনেমা হলের কাঠের সিট ভাঙেনি এমন সিনেমা হল পশ্চিমবঙ্গে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

যে মানুষটিকে বাঙালি, বাংলা সিনেমার প্রথম ও শেষ মহানায়ক হিসেবে আজও হৃদয়ের লকারে বন্দী করে রেখেছে। কাউকে মন থেকে মহানায়ক ডাকতে পারেনি। বরং ‘মহানায়ক’ শব্দটি আর তিনি সমার্থক হয়ে গেছেন। সেই উত্তমকুমার চট্টোপাধ্যায় বাস্তবের জীবন-খাতার প্রতি পাতাতেও মহানায়ক ছিলেন, তা সিনেমা পাড়ার অলিগলি ও মহানায়কের কিছু ভক্ত ছাড়া অনেকেই জানেন না। এর  জন্য দায়ী ছিলেন ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রচারবিমুখ উত্তমকুমারই।অভাবী মানুষজনকে অকাতরে সাহায্য করতেন কাউকে না জানিয়ে। অবশ্যম্ভাবী শর্ত রাখতেন, তিনি যে সাহায্য করছেন তা কাউকে বলা যাবেনা। কেউ কেউ বলে ফেলতেন, তাঁর আড়ালে।কৃতজ্ঞতায়,আবেগবিহ্বল হয়ে। জমতে থাকতো টুকরো টুকরো ঘটনা উত্তমকুমারের অজ্ঞাতসারে। সেই সব টুকরো টুকরো ঘটনার মণিমুক্তাগুলিকে কোলাজ বানিয়ে কেউ কেউ রেখে দিয়েছেন শব্দের আধারে। সেখান থেকেই কয়েকটি মণিমুক্তা আজ দ্য ওয়ালের পাঠকদের জন্য।

বাংলা সিনেমার চরিত্রাভিনেতা মণি শ্রীমাণির মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। কিন্তু বিয়ের খরচ সামাল দেবার মতো টাকা হাতে নেই মণি বাবুর। কোনও সূত্রে খবর পেলেন ভাই তরুণকুমার, উত্তমের আদরের বুড়ো। রাতে বাড়ি ফিরে বললেন দাদাকে।দুই ভাইয়ের মধ্য শলাপরামর্শ হলো রাতভর। বাংলা সিনেমার শিল্পীদের থেকে চাঁদা নেওয়ার মতো করে সাহায্য নিলে মণি বাবু আঘাত পেতে পারেন। তাই উত্তমকুমার আরেক অসামান্য অভিনেতা সত্য বন্দোপাধ্যায় কে নিয়ে এক জমজমাট জলসার আয়োজন করলেন বিশ্বরূপা থিয়েটারে। সঙ্গে ছিলেন তরুন কুমারও। নিজে সমস্ত শিল্পীকে অনুরোধ করেছিলেন উত্তমকুমার। কোনও শিল্পী পারিশ্রমিক নেননি। জলসায় বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে নিয়েও গান গেয়েছিলেন উত্তমকুমার। তবলা সঙ্গতে ছিলেন অসিতবরণ।অনুষ্ঠানটি থেকে সংগৃহীত অর্থ যে মণি বাবুর মেয়ের বিয়ের ভার অনেকটাই বহন করেছিলো, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

আরও পড়ুন: বসন্ত কেবিনের উত্তম কুমার

তখন টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে কাজ চলছে ভবিষ্যতের সুপারহিট ‘যদুবংশ’ ছবিটির।উত্তমকুমার শটের টেকনিক্যাল দিক গুলো খু্ব ভালো বুঝতেন ও খেয়াল রাখতেন। সেদিনের শুটিংয়ে একটা
শটের পর উত্তমকুমারের মনে হলো সেটের উপর থেকে একটা আলো পড়ার কথা ছিল সেটা জ্বলেনি।এবং সেই আলোটি জ্বালানোর কথা যাঁর, সেই লাইটম্যান কালী আনমনা।সেটে কিছু বললেনা উত্তম। শ্যুটিং শেষে কালীকে মেকআপ রুমে ডাকলেন উত্তমকুমার ।ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন কালী,দাদার শটে এতো বড়ো ভুল। মাথা নিচু করে কালী এলেন মেকআপ রুমে, উত্তমকুমারের কাছে।
উত্তমকুমার গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন
‘‘কী রে, কিছু হয়েছে?’’
মহানায়কের সামনে কেঁদেই ফেললেন কালী। আবার উত্তম জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তোকে আজ আনমনা মনে হল কালী,কি হয়েছে রে?”

কাঁদতে কাঁদতেই কালী উত্তর দিয়েছিলেন ‘‘আমার মেয়ের বিয়ের ঠিক হয়েছে দাদা। এখনও টাকা জোগাড় করতে পারিনি। সেই চিন্তা করতে করতে ভুল হয়েগেছে দাদা,আর কখনও ভুল হবে না।’’ কালীর পিঠে হাত রেখে উত্তমকুমার তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। মুখে আর একটি কথাও বলেননি।
পরদিন কালীকে নিজের বাড়িতে ডেকে পাঠিয়ে খামে করে বিয়ের পুরো খরচের টাকা কালীর হাতে দিয়েছিলেন তুলে দিয়েছিলেন উত্তমকুমার।

উত্তমকুমারের অন্যতম সুপারহিট ছবি ‘সাগরিকা’র শ্যুটিং চলছে , ছবির শ্যুটিং যখন মাঝ পথে তখন ছবির প্রডিউসার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। টাকার অভাবে শ্যুটিং প্রায় বন্ধ হয় হয়।আর্থিক সংকটে পড়লেন ছবির সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা। চিন্তায় পড়লেন ছবিটিতে অভিনয় করা বিখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রীরাও।তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুচিত্রা সেন, পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্ররা।অবস্থা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে গেলো, ছবির ডিরেক্টর সরোজ দে উত্তমকুমারকে ধরলেন। উত্তমকুমার পুরো ঘটনা জেনে বললেন ‘‘তুমি কাজ বন্ধ কোরো না।আমি হাজার তিরিশেক টাকা দেব, তুমি কাজ চালিয়ে নাও!’’ তখন তিরিশ হাজার টাকা প্রচুর টাকা। অবশ্য ঘটনাচক্রে সে টাকার দরকার হয়নি, কিন্তু উত্তমকুমারের সহশিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাটি তাঁরই মতো কিম্বদন্তী হয়ে আছে।

আছে এরকম প্রচুর টুকরা টুকরো ঘটনা। যেমন হাজারিবাগে ‘জীবনমৃত্যু’ ছবির আউটডোরের ঘটনা।এই ছবির নায়ক-নায়িকা উত্তম-সুপ্রিয়াকে রাখা হয়েছে বিলাসবহুল সরকারি ডাকবাংলোয়।অন্যদিকে বাকি শিল্পী ও কলাকুশলী রাখা হয়েছে বাড়ি ভাড়া করে। উত্তমকুমার ছবির প্রডিউসারকে বলেছিলেন , তিনি আর সুপ্রিয়া দেবীই কেন এই ঢাউস বাংলোটায় থাকবেন? ছবির কাজে আসা সবাই থাকবে এই বাংলোতে। কিন্তু প্রডিউসার রাজি নন, খরচ বিপুল বেড়ে যাবে ডাকবাংলোর ভাড়া বাবদ। নাছোড়বান্দা উত্তমকুমারও। খানিক তর্কবিতর্কের পর উত্তমকুমার বললেন ‘জীবনমৃত্যু’ছবিতে কাজই করবেন না। মাথায় হাত প্রডিউসারের।বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিলেন উত্তমের কথা। ভাঙাচোরা ভাড়াবাড়ি ছেড়ে বাকি টিম উঠে এলো বিলাসবহুল ডাকবাংলোয়।শ্যুটিং শেষে রোজ হতে লাগলো জমজমাট আড্ডা।মধ্যমনি উত্তমকুমার।

একবার উত্তমকুমার আর তাঁর ভাই তরুণকুমার তৎকালীন রাজ্যপাল হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে ডিনারে যাচ্ছিলেন।
রাজভবনের প্রায় গেটের সামনে এসে উত্তমকুমার গাড়ি ঘুরিয়ে নিলেন।পাশের সিটেই বসেছিলেন ভাই তরুণকুমার। তিনি তো অবাক! জিজ্ঞেস করলেন,
‘‘কী হল ঘোরালে যে”
‘‘নারে, একটা কথা মনে ছিল না। একবার টালিগঞ্জ যেতে হবে।’’
কি সেই কাজ? যা উত্তমের কাছে রাজ্যপালের দেওয়া ডিনারের চেয়েও বড়ো। আসলে
সে দিনই টালিগঞ্জের এক টেকনিশিয়ানের মেয়ের বিয়ে ছিল। উত্তমকুমার অনেক আগেই সেই টেকনিশিয়ান ভাইকে কথা দিয়েছিলেন,তাঁর মেয়ের বিয়েতে যাবেন বলে। তাই রাজভবন থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে সটান চলে গিয়েছিলেন সেই টেকনিশিয়ানের বাড়ি। গিফট কিনে, মেয়ে-জামাইকে আশীর্বাদ করে, আবার রাজভবনের ডিনারে ফিরে গিয়েছিলেন ।

ভবানীপুরে, উত্তমের নিজের পাড়ার দুর্গা পূজার একদিন আগের ঘটনা।কোনও কারণে দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো প্যান্ডেলের কাপড়। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেলো প্যান্ডেল সহ প্রতিমা। মুষড়ে পড়লো পাড়া, আবাহনেই বিসর্জনের সুর। পটের ঠাকুর পুজোর কথা বললেন উদ্দোক্তাদের কেউ কেউ। কেউ বলছেন নমঃ নমঃ করে ঘট পুজো করে দায় এড়াতে। কেউ বলছেন কুমারটুলিতে বিক্রি না হওয়া ঠাকুর কিনে আনতে। কিন্তু লাও তো বটে আনে কে। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তদের পুজো, কার ক্ষমতা আছে নতুন ঠাকুর আনার, নতুন প্যান্ডেল তৈরি করার।এক বুক দুঃখ নিয়ে ঘুমাতে গেলো পাড়া।
পরদিন কাকভোরে বেজে উঠলো সানাই। ঘুমের ঘোর কাটিয়ে দৌড়ে এলো পাড়া। পোড়া মণ্ডপের চিহ্নমাত্র নেই। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে রাতারাতি তৈরি হয়ে যাওয়া সুদৃশ্য এক মণ্ডপ। মণ্ডপ আলো করে আছেন মৃন্ময়ী দুর্গা মা তাঁর আদি অকৃত্রিম চিন্ময়ী রূপ নিয়ে।
সবাই অবাক, কে দিলো এতো টাকা।রাতের অন্ধকারে কার রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় আবার প্রাণ জেগে উঠলো শোকে মুহ্যমান ভবানীপুরের তস্য গলিতে।নিঃশব্দে প্রতিমাই কিভাবে এসে গেলেন মণ্ডপে?
ঘটনার বহুবছর পর বিখ্যাত অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায় রহস্যটির পিছনে লুকিয়ে থাকা সত্যটি ফাঁস না করে দিতেন। কেউ জানতেই পারতোনা প্রকৃত সত্যটা।রাতে শ্যুটিং করে ফিরছিলেন উত্তমকুমার। দেখেন ওই মণ্ডপ, গাড়ি থেকে নামেন। শোকে ভেঙে পড়া ছেলেদের পীঠ চাপড়ে বলেন, তিনিই সব ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু এক শর্তে,তিনি প্রতিমা আর প্যান্ডেলের জন্য টাকা দিচ্ছেন এটা কাউকে বলা যাবেনা। সেই রাতে একই সঙ্গে আকাশের চাঁদ আর সূর্যকে হাতে পেয়েছিল ছেলেরা। শর্তে রাজি হয়েছিলো এক কথাতেই। রাতারাতি ভোজবাজির মতো সব কিছু হয়ে গিয়েছিলো। শর্ত ভাঙেনি ছেলে ছোকরার দল।
কারণ তারা বিস্ময়কর ভাবেই আবিস্কার করেছিলো বাস্তবের এক মহানায়ককে।যাঁকে তাঁর কোটি কোটি ভক্তদের অনেকেই চেনেন না।

তথ্য কৃতজ্ঞতা:- মহানায়ক (লেখক অশোক বসু)

Leave A Reply