মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

উড়ান

রাজা ভট্টাচার্য

আজ তিনদিন হলো লোকটাকে খেয়াল করছে অর্ক। আজও ঠিক ছ’টায় এসেছে লোকটা। পশ্চিম দিকের গেট দিয়ে পার্কে ঢোকে রোজ; পরনে একটা গাঢ় নীল ট্রাকস্যুট, তার উপর কোনাকুনি ভাবে ছাইরঙা দাগ। পায়ে দামী জুতো। পুমা। এত উপর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায়।

আজকাল অর্কর মাথাটা সকালের দিকে ঠিকঠাক কাজ করে না, যেন ধোঁয়াটে কুয়াশায় ছেয়ে আছে ওর বোধ। অতিরিক্ত মাল খাওয়ার জন্যই বোধহয়। সারাক্ষণই মনে হয়– আর একটু ঘুমোলেই কুয়াশাটা কেটে গিয়ে রোদ উঠে যেত। কিন্তু ঘুম হয় না বেলা অবধি। পাশের ঘরে জয়িতা নিশ্চিন্তে ঘুমোয় বেলা দশটা-এগারোটা পর্যন্ত। ওর ঘুম ভেঙে যায়। বোধবুদ্ধি পুরোপুরি কাজ না-করলেও চোখ করে। ফলে, চারতলার খোলা ব্যালকনি থেকেও ও বোঝে– দিব্যি স্মার্ট আর খুশিয়াল দেখানোর কথা যেকোন মানুষকেই, এমন পোষাকে।

ওই জুতো একজোড়া অর্করও আছে। এগারো হাজার টাকা দাম পড়েছিল। অ্যামাজন থেকে। তখন খুব অনলাইন কেনাকাটা করত অর্ক। সেইজন্য এই জুতো ওর চেনা। পায়ে পরলে মাথা পর্যন্ত ফুরফুরে হয়ে যায়। কিন্তু লোকটার মুখচোখ দেখে বোঝা যায়– ওর মনমেজাজ মোটেই ফুরফুরে হয় না এই জুতোজোড়া পরেও। খুব সম্ভবত ওর সকালে পটি ক্লিয়ার হয় না। এই একটিমাত্র কারণেই এত সকালে মানুষের ভুরু এত কুঁচকে থাকতে পারে। পশ্চিম দিকের গেট দিয়ে ঢুকে লোকটা অন্যদের মতো জগিং করে না, ফ্রিহ্যান্ড করে না, কোমরে হাত দিয়ে আকাশমুখো হয়ে অকারণে হ্যা হ্যা করে হাসে না। লোকটা একটা অদ্ভুতুড়ে ভঙ্গীতে দৌড়য়। দৌড় শুরু করার আগে হাত দুটো ছড়িয়ে দেয় দু’পাশে; ঠিক যেন ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কোনো দূরদেশগামী অ্যালবাট্রস। তারপর ধীরে ধীরে ছুটতে আরম্ভ করে লোকটা, প্লেনের ট্যাক্সিইং-এর ভঙ্গীতে ক্রমে ছোটার গতি বাড়ায়। এই সময় অর্ক সোজা হয়ে বসে ওর চেয়ারে, শক্ত করে চেপে ধরে হাতল, আর ক্রমে ঝুঁকে পড়ে ব্যালকনির রেলিং-এর দিকে– যেন এক্ষুনি উড়ে যাবে লোকটা। কিন্তু লোকটা উড়ে যাচ্ছে না আজ তিনদিন ধরেই। ও ঠকাচ্ছে অর্ককে; আর সবার মতোই,জয়িতার মতোই এই লোকটাও অর্ককে ঠকাচ্ছে। রোজ ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু উড়ে যাচ্ছে না।

জয়িতার মতোই।

অর্ক জানে, জয়িতা খুব শিগগিরি উড়ে যাবে। কোনদিকে যাবে– সেটা অবশ্য অর্ক জানে না। কিন্তু উড়বে– এটা বোঝে। জয়িতার জন্মই হয়েছে ওড়ার জন্য। ওর ঝিলিক-দেওয়া চোখ, পুরু ঠোঁট, পুরন্ত কাঁধ, সরু কোমর…মানে এককথায় সর্বাঙ্গে– স্পষ্ট ভাষায় উড়ানের কথা লেখা আছে। অর্ক নিজেও তো ভেসে পড়েছিল হালকা হাওয়ায়– তাই না? ও-ই যে জয়িতাকে আকাশ চিনিয়েছিল একদিন– সে কথা অস্বীকার করলে অন্যায় হবে। তখন অর্ক ছিল পাখি। অ্যালবাট্রস। লম্বা উড়ালের পাখি। বাইক। বড় বড় চুল।  রাইডিং গ্লাভস। এগারো হাজারের জুতো। আড়াই হাজারের সানগ্লাস। এর দু’বছর আগে ওদের জমিটা বিক্রি হলো। ও নিজেই উদ্যোগ নিয়ে কাজটা করেছিল। বাবার যে খুব মত ছিল– এমন না। কিন্তু একটা স্ট্রোক হয়ে যাওয়ার পর আগের দাপট আর ছিল না লোকটার। কেমন যেন কুঁজো হয়ে পা টেনে টেনে হাঁটত। চিকিৎসায় টাকাও খরচ হয়েছিল দেদার। জমানো টাকাকড়ি উবে গেল কর্পূরের মতো। টাকা মানুষের মেরুদণ্ড খাড়া রাখে। তাই আস্তে আস্তে নুয়ে পড়ছিল লোকটা। পেন-পেন্সিল-খাতার ছোট দোকানটা মন্দ চলত না। সামনেই তো বয়ে’স স্কুল। সকালে কেক-টেকও বিক্রি হত টুকটাক। কিন্তু এই সামান্য আয় মানুষকে বড়লোক করে দেয় না। নিম্নমধ্যবিত্ত করে রাখে সযত্নে। আজীবন। অর্ক তাই ওই বয়ে’স স্কুল থেকে ক্লাস টুয়েলভ পাশ করে পার্টির কাজ করা শুরু করেছিল অল্পস্বল্প ; ওই ছোদ্দার পিছন পিছন ঘোরা, বাজারটা বাড়িতে দিয়ে আসা, দেওয়াল লেখার সময় পিছনে রঙের কৌটো নিয়ে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকা। নগদ পয়সা বিশেষ নেই, কিন্তু বেশ একটা রোয়াব আসে এ সব করলে। তারপর যখন ছোটখাটো দালালি শুরু করবে বলে ভাবছে– বাবার স্ট্রোক হলো। নাটাঝামটা খেয়ে গেল ও। রাত নেই দিন নেই দৌড়তে হলো এই হসপিটাল থেকে সেই নার্সিংহোমে। ছোদ্দা– মানে পাড়ার কাউন্সিলর অমলদা অবিশ্যি এই সময়টা কম করেনি ওর জন্য। পার্টির বন্ধুরাও ছুটেছে ওর সাথে, রাত জেগেছে মেডিকেলের মস্ত সিঁড়িতে বসে। তারপর বাবা যখন সুস্থ হয়ে ফিরে এল, আর মা অর্ককে বলল দোকানে বসতে– তখনই মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে ছোদ্দা একদিন বলল–”তোদের বাড়িটাই তো অতটা জমির উপর। বেকার ফেলে না রেখে গৌতমকে বল না একটা জম্পেশ করে ফ্ল্যাট হাঁকাতে। একটাই তো ছেলে তুই। করবি কি অত বড় জমি নিয়ে?” জল্পনার সুরে বললেও, এটা যে আদেশ– তা বুঝতে দেরি হয়নি অর্কর। আর প্রস্তাবটাও তো খারাপ কিছু নয়! ও শুধু ভাবছিল– বাবা রাজি হলে হয়। ঠাকুর্দার কেনা জমি। ষাট বছর আগে, এই শহর যখন সবে গড়ে উঠছে– তখন কত কষ্টে এই জমি কেনা হয়েছিল, কত কষ্টে এই ছোট্ট এবং ছিরিছাঁদ-বিহীন বাড়িটুকু তৈরি করা হয়েছিল– তা ও জন্মে ইস্তক শুনে আসছে। স্কুল ছুটি হয়ে গেলে এই রাস্তায় লোক-চলাচল কমে যায়। এই সময়টা দোকান ফেলে বাবা বাগান দেখে। কয়েকটা ফুলের গাছ, লঙ্কা-বেগুন-টোম্যাটোর মরশুমি সব্জিচাষ– এইসব কুঁজো হয়ে দেখে বেড়ায়। জল দেয়, গোড়া নিড়িয়ে দেয়। রাজি হলে হয়।

আশ্চর্য ভাবে, সামান্য চেষ্টাতেই রাজি হয়ে গেল বাবা। বোধহয় ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে গিয়েছিল বুকে একটা ধাক্কা খেয়ে। আর অত অত টাকার গল্প শুনেও একটু ভড়কে গিয়েছিল। প্রোমোটার গৌতমদাই ওদের ঠিক পাশেই একটা ফ্ল্যাটে শিফট করিয়ে দিল; যদ্দিন না ওদের ফ্ল্যাট তৈরি হয়, ততদিন থাকার জন্য। আর তারপরেই অ্যাকাউন্টে ঢুকল টাকা। এত টাকা! এত! শুধু বাবা নয়, মাও কেমন ভেবড়ে গেল অ্যামাউন্টটা দেখে। অর্ক অবশ্য জানত– এর অন্তত দ্বিগুণ টাকা ওদের আসলে পাওনা হয়। দালালি করবে ভেবে খোঁজখবর নিয়েছিল তো ক’দিন। কিন্তু গৌতমদা আবার ছোদ্দার জামাই। যাক গে। যা আসে। আর এ তো পর্বত! এত্ত টাকা!

কাজেই অর্ক প্রথমেই বাইকটা কিনল। বুলেট। আওয়াজ শুনলে বুক কাঁপবে– তবে না বাইক! পৌরুষের অভিজ্ঞান! তারপর জুতো। গগলস। মা গাঁইগুঁই করত প্রথম প্রথম। বাবা কিচ্ছু বলত না। ব্যালকনিতে বসে মন দিয়ে ওদের বাড়িটা ভাঙার শব্দ শুনত। তারপর আর একটা স্ট্রোক হলো। বাড়িতেই শেষ। এবার আর ভোগায় নি। পুরনো জমিতে ওঠা নতুন ফ্ল্যাটে আর যাওয়া হলো না বাবার। অর্ক প্রথম দিকটায় একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। বাবা কী মনের দুঃখেই মরে গেল নাকি! ওসব তো সিনেমায় হয়! পরে ভাবল– ধুস! অত্ত ভালবাসা থাকলে স্ট্রেট না করে দিত বাবা। বেচতই না বাড়ি! বেকার সেন্টু খেয়ে লাভ নেই। বরং ভাবা দরকার– টাকাটা কাজে লাগানো যায় কী ভাবে। এই চিন্তা থেকেই এল ঠিকাদারি, আর তা থেকে বান্টি দত্ত। রাজারহাটের রাইজিং ঠিকাদার। সব শুনে ছ’টা আংটি পরা হাত বাড়িয়ে দিল। হাতে ধরে নিয়ে গেল ডান্স বারে। আরে ভাই, আগে দোস্তি হোক। আগে শেখো টাকা খরচ করতে হয় কীভাবে– তারপর টাকা রোজগার। কান পর্যন্ত মদ খেয়ে ভোর চারটেয় বাড়ি ফেরা আরম্ভ হলো।

ঠিক এই সময় জয়িতাকে একদিন রাস্তায় দেখতে পেল অর্ক। পুরু ঠোঁট আর সরু কোমর মিলে পেড়ে ফেলল ওকে। কেসটা ফাইল করা সহজ ছিল না, কেননা সতেরো বছর বয়েসেই জয়িতার আঁটোসাঁটো টিশার্টের পিছনে অন্যূন সতেরোটা ছেলের লাইন ছিল। কিন্তু তাদের সবার বুলেট ছিল না, পুমার জুতো ছিল না। কাজেই মাস দুয়েকের মধ্যেই জয়িতা বুলেটে উঠে এল, সপ্তাহ-খানেকের মধ্যে একশা কিলোমিটার স্পিডে ভয় পেয়ে জাপটেও ধরল। বেশিদিন অপেক্ষা করলে বাইক অ্যাকসিডেন্ট করতে পারে– এই বিবেচনায় জয়িতার আঠেরো নম্বর জন্মদিনের তিনদিন পর মাহেশ্বরী কালীবাড়িতে গিয়ে বিয়ে করে ফেলল অর্ক। বিয়ের অনুষ্ঠান করতে পারেনি তেমন করে; জয়িতার খচ্চর বাপটা গিয়ে ছোদ্দার কাছে গিয়ে ওর নামে যা তা বলেছিল। কিন্তু ফ্ল্যাট তখন মাঝপথে, আর ছোদ্দা প্রায়ই সন্ধেবেলায় ওর ফ্ল্যাটে আসে স্কচ খেতে…দুইয়ে মিলে বিশেষ লাভ করতে পারেনি মালটা। পরে বন্ধুদের নিয়ে একটা ঘরোয়া পার্টি দিয়েছিল। এক একটা স্কচের বোতল বারো হাজার টাকা। বান্টি দত্তও ঘাবড়ে গিয়েছিল; অর্কর ঠাঁট দেখে না স্লিভলেস জয়িতাকে দেখে– অত ভাবার সময় ছিল না সেদিন। আর জয়িতার শাড়িটার দাম পড়েছিল তেত্রিশ হাজার টাকা।

কিন্তু বিয়ের মাস ছয়েকের মধ্যেই ফের ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বান্টি। ‘স্পাইস গার্ডেন’-এ রিয়ার নাচ অর্ককে টেনে নিয়েছিল চুম্বকের মতো। তারপর বাউন্সারকে টাকা খাইয়ে হাত করা, রিয়ার সাথে পরিচয়– সবই বান্টির মাধ্যমে। সত্যিকারের বন্ধুর মতো ওকে গাইড করেছিল বান্টি। ততদিনে অর্কর টাকায় টান পড়েছে। বান্টি এক কথায় ওকে তেরো হাজার টাকা ধার দিয়েছিল শুধু রিয়াকে একটা আংটি দেওয়ার জন্য– ব্যাপারটা নইলে ইজ্জতের সওয়াল হয়ে যাচ্ছিল। এরপর রিয়া একদিন সল্টলেকের ‘মাসিমা’র বাড়ির ঘন্টা-প্রতি ভাড়ার ঘরটায় শুয়ে  একটা হীরের নাকছাবি চাইল। আর অর্ক খতম হয়ে গেল। ফিনিশ। এই প্রথম রিয়ার সামান্য একটা আবদার ও মেটাতে পারল না টাকার অভাবে। বাড়ি ফিরে জয়িতার কাছে একটা ফ্ল্যাটের অ্যাডভান্স নাম করে ও টাকাটা চাইল– এবং জয়িতা; নরম, পেলব এবং মসৃণ জয়িতা শক্ত কাটাকাটা গলায় বলে দিল– রিয়ার ব্যাপারটা ও জানে। কোত্থেকে জানল– তা জিজ্ঞেস করার অবস্থায় ছিল না অর্ক। তবে ঝগড়ার শেষ পর্যায়ে যখন জয়িতার গলাটা টিপে ধরতে যাচ্ছিল ও, তখন জয়িতা ঠাণ্ডা গলায় বলে দিল– অর্ক আর বাড়াবাড়ি করলে ও সেটা ‘বান্টিদা’-কে জানাতে বাধ্য হবে। তারপর অর্কর এলিয়ে যাওয়া হাতে ছুঁড়ে দিয়েছিল ওর পাসবইটা। তাতে বাকি ছিল আটশো টাকা।

এরপর থেকে অর্কই বাড়িতে থাকতে আরম্ভ করল। বাইরে বেরনোর ইচ্ছেটা হঠাৎ যেন মরে গেল। ওর বদলে বেরনো শুরু করল জয়িতা। এতদিনে অর্ক জানতে পারল– জয়িতা ইতিমধ্যে দু’টো সিরিয়ালে মাঝারি রোল করছে। একটা সিনেমায় নায়িকার রোল করার কথা প্রায় ফাইনাল। বান্টিদা-ই যে টালিগঞ্জের স্টুডিয়ো পাড়ায় ওকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ক্রমশ– তা জানাতে দ্বিধা করেনি জয়িতা। কিন্তু বান্টিকে ফোন করতেও ইচ্ছে হলো না অর্কর। সব ছেড়েছুড়ে ঘরে বসে গেল অর্ক। শুধু একটা ব্যাপারে ওকে মারল না জয়িতা। রোজ সন্ধ্যায় এক পাঁইট ওল্ড মঙ্ক বরাদ্দ করল অর্কর জন্য। সন্ধ্যায় বাড়ি থাকে না জয়িতা। শ্যুটিং নাকি সব রাত্তিরেই হয়। বেরনোর সময় ওকে এক বান্ডিল বিড়ি আর পাঁইটটা দিয়ে যায় জয়িতা। পার্কের দিকের ব্যালকনিটায় গিয়ে বসে অর্ক। কোমর অবধি রেলিং-এর উপর পা তুলে দিয়ে খুব আস্তে আস্তে মদটা খায় ও। ধীরেসুস্থে, আয়েশ করে। মাঝেমধ্যে বিড়ি ধরায়। নীচের মাঠটায় লাইট জ্বলে, কেমন একটা তরল সবুজ অন্ধকারে বসে আড্ডা মারে অল্পবয়সী ছেলেরা। মাঝেমধ্যে দপ করে জ্বলে ওঠে দেশলাইকাঠি– সিগারেট ধরায় কেউ। নিমেষের জন্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটা মুখ। অর্ক দ্যাখে। চুপ করে বসে বসে দ্যাখে, আর মদ খায়, বিড়ি টানে। বাইকের স্বপ্ন দ্যাখে না আর। হাত কাঁপে আজকাল। অল্প অল্প। রিয়ার মুখটাও ঝাপসা হয়ে গেছে। মেয়েটার আসল নাম নাকি রিয়া নয়। বাঙালিও নয়। জয়িতা বলছিল একদিন। ও কোত্থেকে খবর পায়– কে জানে! অর্ক আজকাল আর কোনো খবর পায় না। রাখেও না। মা পড়ে থাকে পাশের ঘরে মড়ার মতো। একটাও কথা বলে না সারাদিনে। জয়িতা মাঝেসাঝে কথা বলে মায়ের সাথে। অর্ক কতদিন বলে না– মনে পড়ে না। নতুন ফ্ল্যাটে ঝকঝক করে থরে থরে শূন্যতা। খাবার ঢাকা দেওয়া থাকে। যেদিন মনে পড়ে, খায়। নইলে ব্যালকনিতেই ঘুমিয়ে পড়ে। জয়িতা ফেরে শেষ রাতে। অর্ক জানতে পারে না বেশির ভাগ দিন। তারপর ঘুমোয় অনেক বেলা অবধি। অর্কর ঘুম ভেঙে যায় সক্কালবেলায়। উঠে এসে বসে ব্যালকনিতে। আর গত তিনদিন ধরেই ও লোকটাকে দেখতে পাচ্ছে। রোজ। ঠিক ছ’টায় আসে পার্কে,তারপর হাত তুলে ছোটে– যেন এই এক্ষুনি ডানা মেলে উড়ে যাবে। উড়ে যাবে গাছগুলোর মাথা ছাড়িয়ে, চারিদিকে অস্বাভাবিক দ্রুত গজিয়ে-ওঠা ফ্ল্যাটগুলোর মাথা টপকে আকাশের দিকে। কিন্তু লোকটা উড়ছে না। ওকে দেখতে দেখতে, ওর উড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি দেখতে দেখতে বহুদিন পর শিরদাঁড়া খাড়া করে বসে অর্ক, ওর চোখ জ্বলে ওঠে সদ্য স্টার্ট-নেওয়া বাইকের হেডলাইটের মতো, বুকের ভিতরে গর্জে ওঠে টিউনিং করা বুলেটের ঢিগ ঢিগ শব্দ। কিন্তু লোকটা ওড়ে না। খানিক দৌড়ে ফের ডানা গুটিয়ে, ভুরু কুঁচকে ফিরে যায় নিজের বাসায়। আর অমনি ধপ করে নিজের চেয়ারে বসে পড়ে অর্ক, রমণক্লান্ত পুরুষের মতো হাঁপায়। ওকে ঠকিয়ে চলে যায় লোকটা। হেঁটে হেঁটে। উড়ে নয়।

সেদিন দুপুরে খেতে বসে জয়িতা জানালো– ওর নায়িকা হওয়ার ব্যাপারটা ফাইনাল হয়ে গেছে। তিনমাসের জন্য সিকিম যেতে হবে ওকে। টানা আউটডোর চলবে। কিছু টাকা ও রেখে যাবে মায়ের অ্যাকাউন্টে, আর কিছু ক্যাশ দিয়ে যাবে অর্ককে। বুঝে চালাতে পারলে চলবে, নইলে খাওয়া জুটবে না– এই সোজা কথাটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিল জয়িতা। অর্ক জানত জয়িতা উড়ে যাবে। যাবেই। এত তাড়াতাড়ি– সেটা বোঝেনি। জয়িতা ওকে ঠকিয়ে উড়ে যাচ্ছে। লোকটাও ওকে ঠকাচ্ছে, কারণ লোকটা উড়ছে না। ওর ধোঁয়াটে মগজ এর বেশি কিছু বুঝল না। সন্ধ্যায় যথারীতি বেরিয়ে গেল জয়িতা। কেনাকাটা করতে হবে সিকিমে যেতে হলে। আজ আর ফিরবে না। হাত তুলে ট্যাক্সিইং-এর ভঙ্গীতে বেরিয়ে যাচ্ছে জয়িতা। উড়াল দেবে এবার। জানতই অর্ক। ও মাথা নেড়ে বোতল-গ্লাস-জল-বিড়ি নিয়ে রওনা দিল ব্যালকনির দিকে। তারপর একসময় চেয়ারে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়ল। মাঝে মাঝেই যেমন পড়ে।

পরদিন যখন ঘুম ভাঙল, তখন ওর মগজের ধোঁয়াটে ভাবটা আরও বেড়েছে। আলো ফোটেনি ভাল করে। চোখেমুখে জল দিয়ে এসে ফের ব্যালকনিতে বসে ও অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইল পশ্চিমের গেটটার দিকে। লোকটার আসতে এখনো প্রায় আধ ঘন্টা। আজ যেন মাথাটা বেশি ধোঁয়াটে লাগছে। কালকে ঘুমটা হয়েছে ছেঁড়া ছেঁড়া মতো। মাঝে মাঝেই স্বপ্ন দেখছিল– জয়িতা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে একটা পার্কের উপর দিয়ে, আর নীচে পার্কটায় একটা নীলরঙা ট্রাকস্যুট-পরা লোক হাত তুলে ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে…নিয়েই চলেছে…কিন্তু উড়ছে না। বহুদূরে দেখা যাচ্ছে সিকিমের বরফে-ঢাকা পাহাড়। বারবার একই স্বপ্ন কেউ দেখে নাকি! কে জানে! মাথা নামিয়ে ব্যালকনির মেঝের দিকে তাকাল অর্ক। নোংরা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। মদের আর জলের বোতল, বাদাম, বিড়ির পোড়া টুকরো আর ছাই। প্রায় অর্ধেক ভরা একটা গ্লাস এখনো প্রতীক্ষায়। কী মনে করে ঢকঢক করে খেয়ে নিল মদটা। কখনো সকালে খায়নি। খালি পেট। গা গুলিয়ে উঠল। কোনোমতে বমির বেগটা সামলে তাড়াতাড়ি জল খেল। বিড়ি ধরাল একটা। লোকটা কী আজ আসবে না! না-ই আসতে পারে। আগেও তো আসত না। এই শেষ তিনদিন ধরেই তো দেখছে লোকটাকে। তবু, কেন যেন ওর মনে হলো– লোকটা না-এলে ওর চলবে না। কোনোমতেই না। অধৈর্য হয়ে একবার ব্যালকনি থেকে ঝুঁকে দেখল নীচে। না। আসেনি। অন্য অনেকেই এসে গেছে। হাঁটছে হনহনিয়ে। দুটো বাচ্চা বল পেটাচ্ছে। কিন্তু ওই লোকটা…

ওই যে আসছে লোকটা। ভুরু কুঁচকে ধীর পায়ে পার্কে ঢুকল। ওই হাত তুলল। শুরু হলো দৌড়। ওই গতি বাড়ছে। সোজা হয়ে বসল অর্ক। ওর দুর্বল আঙুলগুলো চেপে বসে গেছে চেয়ারের হাতলের উপর। গাঁটগুলো ফুলে উঠেছে। নিঃশ্বাস পড়ছে দ্রুত। এবার লোকটা উড়বে। অর্ক নিশ্চিত– আজ উড়বে লোকটা। ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর মাথা ছাড়িয়ে ও উড়ে যাবে চিরন্তন তুষারে আবৃত রহস্যঘন পর্বতমালার দিকে। কিন্তু লোকটা উড়ছে না। কেবলই ছুটছে। হাত তুলে, ডানার মতো ছড়িয়ে দিয়ে গতি বাড়াচ্ছে, কিন্তু উড়ছে না।

ধৈর্য হারিয়ে অর্কই উঠে দাঁড়াল এবার। খোলা ব্যালকনির রেলিং ধরে চিৎকার করে ডাকল লোকটাকে। লোকটা শুনছে না। আবার চেঁচাল ও প্রাণপণে, গলার শিরা ফুলে উঠল ওর–”ও দাদা! শুনছেন? আরে এই শুয়ার! আর কবে উড়বি রে তুই? আর কদ্দিন ধরে ঠকাবি আমায়– ওই হারামি!”

লোকটা ইচ্ছে করেই তাকাচ্ছে না। একদম ইচ্ছে করে। কেননা তাকালেই ওকে জবাব দিতে হবে। তাই ও ইচ্ছে করে না-শোনার ভান করছে। লোকটাকে একটা শিক্ষা দেওয়া দরকার– এই ভেবে রেলিং-এর উপর উঠে দাঁড়াল অর্ক। তারপর টলমল করতে করতে ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে উঠল আবার–”আবে দেখে নে রে হারামির বাচ্চা– এইভাবে ডানা মেলতে হয় রে– এইভাবে!” – বলে দু’পাশের দেওয়াল থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে হাত দু’টো কাঁধের দু’পাশে মেলে দিল ও। এক ঝলক হাওয়া লেগে ওর হাতটা একবার শিউরে উঠল– কাঁটা দিল– যেন পালক বেরোচ্ছে। তারপর হাল্কা করে একটা লাফ দিয়ে ও ভেসে পড়ল হাওয়ায়। বিশাল ডানা দু’টোয় বাতাস কেটে ও ধীরগতিতে উড়াল দিল এক অতিকায় দূরগামী অ্যালবাট্রসের মতো…পায়ের নীচে শিউরে উঠল অনন্ত তরঙ্গক্ষুব্ধ সমুদ্র…দূরে দেখা যাচ্ছে তুষারাবৃত পর্বতমালার অনন্ত বিস্তার…

আসলে এরা কেউ ঠিকঠাক উড়তেই জানে না। ডানা মেললেই কী আর ওড়া যায় হে! মাটির মায়া কাটাতে জানতে হয়; তবেই না আকাশ আর হাওয়ার দূরাগত আবাহন কানে আসে!

সে কথা শিখিয়ে দেওয়ার জন্যই বাতাস কেটে, এক দূরগামী বিহঙ্গের মতো উড়ে গেল অর্ক। ভীমবেগে, ওর বুলেট বাইকটার চেয়েও জোরে। সমুদ্রপারগামী এক অতিকায় অ্যালবাট্রসের মতো এই ধুলোমাখা জীবনের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল অর্ক।

রাজা ভট্টাচার্য পেশায় শিক্ষক। কবিতা ও গদ্য– দুই ধরণের লেখাতেই স্বচ্ছন্দ; যদিও প্রথম পছন্দ কবিতাই। এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তিনটি কবিতার বই এবং ছ’টি গদ্যগ্রন্থ।

 

Shares

Leave A Reply