বুধবার, মার্চ ২০

খুন গরমের খুন

মিঠু সরকার নিয়তিতে বিশ্বাস করতেন কি না জানা নেই। তবে এই সে দিন এক আনন্দময় নৈশাহারের শেষে বন্ধু-পরিজন পরিবৃত হয়ে পার্কসার্কাস থেকে মা সেতু দিয়ে ফেরার পথে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু যে ভাবে হলো, ভাগ্যবাদীরা তাকে নিয়তিই বলবেন।

রাত গভীর হয়েছিল। একেবারে ফাঁকা সেতু। তাঁরা যাচ্ছিলেন ই এম বাইপাস-এর দিকে। অন্য লেন-এ উল্টো দিক থেকে আসছিল এমন একটি গাড়ি, যার আরোহী আকণ্ঠ পান করে তাঁর শরীর ও মনের সুস্থিতি হারিয়েও স্টিয়ারিংয়ে বসতে দ্বিধাগ্রস্ত হননি। দু’বার ভাবেননি রাজপথ যতই ফাঁকা হোক, যান শাসন যতই হালকা হোক, বেপরোয়া-বেসামাল হওয়ার একটা গন্ডী থাকে। আর ভাবেননি বলেই উড়িয়ে চালালেন গাড়ি, নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলেন না, কান ফাটানো আওয়াজে ডিভাইডার-এ মারলেন ধাক্কা, উল্টে পাল্টে আছড়ে পড়লেন সেই মুহূর্তে পাশ দিয়ে যাওয়া বিপরীতমুখী গাড়িটার গায়ে। এবং যাকে পরিভাষায় বলে ‘লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট’….আচম্বিতে, অতর্কিতে মিঠুদেবীর প্রাণ নিয়ে নিলেন।

মুখ্যমন্ত্রী আদর করে সেতুর নাম রেখেছিলেন ‘মা’। তা মা তো সন্তানকে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু মা সেতুতেই তো রক্তক্ষরণ, অঙ্গহানি, প্রাণহানি প্রায়শই হচ্ছে। কিন্তু সে কি মায়ের দোষ, নাকি শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করা নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখানো সন্তানদের? সত্যি সত্যি যানশাসন করে কি এই প্রবণতা আটকানো যায়? এই সেতুতেই তো স্পিড-লিমিট বলা আছে,গতি নির্ধারণের যন্ত্র বসানো আছে ভুরি ভুরি। ঊর্ধসীমা টপকে গেলেই জরিমানা। আর কীই বা করা যাবে? সারা দিন, সারা রাত তো টহলদারী পুলিশ এক পায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।

তবে শুধু মা কেন, একটু রাত বাড়লেই শহর কলকাতার কোন রাস্তা নিরাপদ? কোন রাস্তায় সিগন্যালের তোয়াক্কা করা হয়? গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রিত থাকে? মোটরবাইক বাহিনী যথেচ্ছাচার করে না? নিষেধাজ্ঞাকে ফাঁকি দিয়ে শহরের নানা প্রান্তে বিশ বাইশের রক্তগরম যুবারা বাপের পয়সায় কেনা দামি ও কলজে কাঁপানো শব্দ করা দ্বিচক্রযান নিয়ে গতি, আরো বেশি গতি প্রদর্শনের মারণখেলায় মাতে না?

সাধারণ ভাবে ভুক্তভোগী নাগরিক এই পরিস্থিতিতে অভিযোগের আঙুল তোলেন দুর্বল যান শাসনের দিকে। কোথাও কোথাও তাতে ঘাটতি থাকে না, তা নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্যই নিয়মের কঠোরতর নিগড়ে যান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু পুরোটা সম্ভব কি?

না সম্ভব না। আমাদের প্রবণতা যদি হয় আমরা দায়িত্বহীন হয়ে নিজেদের ও অন্যের ক্ষতি ডেকে আনবো, তা হলে আমরা সুইসাইড বোম্বার-এর মত লাগামহীন শক্তি। যেমন এক শক্তি কেড়ে নিল মিঠুদেবীর প্রাণ, মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে।

অতএব, নিয়তি নয়, এই ভদ্রমহিলা নিছক নিয়ম না মানার এই প্রবণতার শিকার।

 

Shares

Leave A Reply