শনিবার, মার্চ ২৩

চরম ঝুঁকি, তুখোড় দক্ষতা! জটিল অস্ত্রোপচারে প্রাণ ফিরে পেল দুই সদ্যোজাত

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

একটি নয়। পরপর দু’টি। এবং প্রচলিত ভাষায় যাদের বলা যায়, ‘এক সে বড়কর এক!’

দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালে সদ্য দুই নবজাতকের সফল অস্ত্রোপচারের কথা শুনলে এমনটাই বলবেন আপনিও।

বার্নপুরের বাসিন্দা অনিতা দাস ও পার্থসারথি দাসের সদ্যোজাত মেয়ের বুক ও পেটের মাঝের পাতলা পর্দা অর্থাৎ ডায়াফ্রামটি পুরোপুরি তৈরি না হওয়ায়, তার পেটের স্টম্যাক, লিভার, পিলে– এ সবই বুকের দিকে উঠে গিয়েছিল। ফলে বুকের ফুসফুস এবং হার্ট, দুই-ই বিপজ্জনক রকমের অপরিণত অবস্থায় জন্মেছিল সে। চিকিৎসার পরিভাষায় এ অসুখের নাম ‘কনজেনিটাল ডায়াফ্র্যাগমেটিক হার্নিয়া’।

এর কয়েক দিন পরেই দুর্গাপুরের বাসিন্দা সুধা সিং ও লবকুশ সিং-এর ছেলে জন্মায় খাদ্যনালী ও শ্বাসনালীর মধ্যে একটা অসঙ্গতি নিয়ে। যে অসঙ্গতির কারণে দু’টো নালী জুড়ে যাওয়ায়, মুখে জমা হওয়া থুতু গিলতে পারছিল না সদ্যোজাত সে শিশু। চিকিৎসার পরিভাষায় এ অসুখের নাম ‘ট্র্যাকিও ইসোফ্যাজিয়াল ফিসচুলা’।

এবং এই দু’টি অসুখেরই এক ও একমাত্র সম্ভাব্য নিরাময় ছিল, বড় মাপের অস্ত্রোপচার। সম্ভাব্য, কারণ চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই ধরনের অস্ত্রোপচারের ‘সাকসেস রেট’ উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। একই সঙ্গে, সদ্যোজাত একরত্তির শরীরে এই জটিল অস্ত্রোপচার খুবই কঠিন। পরিসংখ্যান বলছে, নিওনেটাল সার্জারির তালিকায় ১০-১৫ হাজার শিশুর মধ্যে এক জনের প্রয়োজন পড়ে এমন অস্ত্রোপচার করার।

সেই কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব বিষয়টিকেই সফল করে ফেলেছে দুর্গাপুর মিশন হাসপাতাল। হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও কার্ডিও সার্জেন, ডক্টর সত্যজিৎ বসু জানালেন, এই সাফল্যের কৃতিত্ব হাসপাতালের নিওনেটাল টিমেরই।

ডক্টর জোশি আনন্দ

সার্জেন শঙ্খশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানেই সম্পন্ন হয় অস্ত্রোপচার দু’টি। সহযোগী হিসেবে ছিলেন, ডক্টর দেবদীপ মুখোপাধ্যায়, ডক্টর অরিত্র সেনগুপ্ত, ডক্টর কৃশানু মণ্ডল, ডক্টর জোশি আনন্দ।

দেবদীপ বাবু জানালেন, বার্নপুর ইসকো থেকে মিশন হাসপাতালে রেফার করা হয়েছিল সন্তানসম্ভবা অনিতা দাসকে। আল্ট্রা সোনোগ্রাফিতে ধরা পড়েছিল, তাঁর গর্ভস্থ সন্তানের ডায়াফ্রামের বাঁ দিকটা তৈরি হয়নি। ফলে স্টম্যাক, লিভার, স্প্লিনের মতো যে প্রত্যঙ্গগুলি পেটে থাকার কতা, সেগুলি উঠে এসেছে বুকের খাঁচায়। একটা অংশে অন্য কোনও প্রত্যঙ্গ ঢুকে আসাকেই চিকিৎসার পরিভাষায় হার্নিয়া বলে।

এই অবস্থায়, দু’সপ্তাহ ধরে স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর দীপান্বিতা সেনের তত্ত্বাবধানে থাকার পরে, ৩৭ সপ্তাহের মাথায়, গত মাসের ২৪ তারিখে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন অনিতা। দেবদীপ বাবু জানান, জন্মানোর আগে থেকেই বাচ্চার বাবা-মাকে দফায় দফায় কাউন্সেলিং করানো হয়েছে, অসুখের জটিলতা এবং সার্জারির আশঙ্কা নিয়ে বোঝানো হয়েছে। ওঁদের বলেই দেওয়া হয়েছিল, বাচ্চার জন্মের পরেই অস্ত্রোপচার করতে হবে। মানসিক ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল ওঁদের।

ডক্টর দেবদীপ মুখোপাধ্যায়

দেবদীপ বলেন, “জন্মের পরে বাচ্চাটি একটুও কাঁদেনি। এবং আরও ধরা পড়ে, ওর বাঁ দিকের ফুসফুস প্রায় তৈরিই হয়নি, অপরিণত অবস্থায় রয়েছে ডান দিকেরটিও। একই সঙ্গে ঠিক ভাবে পাম্প করছে না হার্টও, ফলে রক্তচাপ ঠিক নেই। পরিস্থিতি সুবিধাজনক না হওয়ায় সর্বোচ্চ লেভেলের নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (নিকু) রাখা হয় ওকে। ৪৮ ঘণ্টা ভেন্টিলেশনে ছিল মেয়েটি।”

এর পরেই অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়। শিশু-চিকিৎসক থেকে নিওনেটাল সার্জেনের গোটা টিম তৈরি হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল অ্যানাস্থেশিস্টেরও। কারণ চিকিৎসকেরা বলছেন, এত ছোটো বাচ্চাকে প্রয়োজন মতো অ্যানাস্থেশিয়া দেওয়া খুব সহজ নয়। বিপদ ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিপদ ঘটেনি। অপারেশনের প্রাথমিক পর্ব পার করে দেখা যায়, শুধু স্টম্যাক, লিভার আর স্প্লিনই নয়, বুকের খাঁচায় ঢুকে এসেছে ক্ষুদ্রান্ত্রও। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই অবস্থায় সদ্যোজাতের বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে।

সার্জেন শঙ্খশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, “খুবই জটিল কেস ছিল এটা। একটা একটা করে প্রত্যঙ্গ বুক থেকে পেটে নামিয়ে আনতে হয়। তার পরে তৈরি করে হয় ডায়াফ্রাম, অর্থাৎ বুক ও পেটের মাঝের পর্দা। অন্য দিকে, ওর ফুসফুস অপরিণত, হার্টও পাম্প করছে না। খুব, খুব জটিল পরিস্থিতি ছিল। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম। গোটা টিম জান লড়িয়ে দিয়েছিল।”

এখানেই শেষ নয়। অস্ত্রোপচারের পরে ভয় ছিল, কোনও রকম মুভমেন্টে সদ্য তৈরি করা ডায়াফ্রাম ছিঁড়ে যেতে পারে। ফলে আরও ছ’দিন পুরোপুরি সাপোর্ট দিয়ে ভেন্টিলেশনে রাখা হয় ছোট্ট মেয়েটিকে। শুধু তাই নয়, একটু জোরে শ্বাস নিলেও ক্ষতি হতে পারত, তাই ওষুধ দিয়ে সাময়িক ভাবে প্যারালাইজ়ড করে দেওয়া হয় তাকে। একই সঙ্গে জরুরি ছিল বাচ্চাটির যাতে ওজন কমে না যায়, সে দিকটাও খেয়াল রাখা। সেই কারণে সেন্ট্রাল লাইন চ্যানেল করে, অর্থাৎ শরীরের বড় শিরার মাধ্যমে নিউট্রিশন পাঠানো হয়েছে শরীরে। খেয়াল রাখা হয়েছে অক্সিজেন জোগানের দিকটিও। স্বাভাবিক রাখা হয়েছে রক্তচাপ।

ছ’দিন পরে ভেন্টিলেশন থেকে বার করলেও, তখনও নিজে শ্বাস নেওয়ার অবস্থায় পৌঁছয়নি সে। ফলে আরও এক সপ্তাহ তাকে রাখা হয় বিশেষ একটি যন্ত্রের ভিতরে, যাতে শ্বাস নিতে পারে সে। এর পরে একটু সুস্থ হলে, নাকে নল পরিয়ে খাওয়ানো শুরু করেন চিকিৎসকেরা। শেষ পর্যন্ত, সকলকে আশঙ্কামুক্ত করে, গত এক সপ্তাহ হল নিজে শ্বাস নিচ্ছে একরত্তি খুদে, চামচে করে খেতেও পারে মুখ দিয়ে।

ডক্টর অরিত্র সেনগুপ্ত

চিকিৎসক দেবদীপ মুখোপাধ্যায় জানালেন, দু’তিন বছর পরে ডায়াফ্রামে কোনও সমস্যা হলে, ফের সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়াও, বড় হয়ে গেলেও, নির্দিষ্ট সময় অন্তর চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিত মেয়েটির। শুক্রবার, আগামী পরশুই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কথা মা-মেয়ের।

অনিতাদেবীর স্বামী অর্থাৎ বাচ্চার বাবা পার্থসারথি দাস বলছেন, “ডক্টরদের এই গোটা টিমটাই আমার কাছে ঈশ্বর। ওর জটিলতাগুলো জানার পরে, সত্যি বলছি, আমাদের পুরোপুরি আশা ছিল না মেয়েকে ফিরে পাওয়ার। অসম্ভব সাধন করেছেন ওঁরা। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলেছে অপারেশন। তবে শুধু অপারেশনই নয়, তার আগে পরেও যেভাবে আমাদের সাপোর্ট করেছেন, বুঝিয়েছেন, মানসিক ভাবে ভরসা জুগিয়েছেন, তা বলার নয়। আমরা চিরকৃতজ্ঞ।”

এই সফল অস্ত্রোপচারের তৃপ্তি ভাল করে উদযাপন করারও সময় পাননি চিকিৎসকেরা। তার কয়েক দিন পরেই, গত সপ্তাহের ২৯ তারিখ, ৩৮ সপ্তাহের মাথায় ছেলের জন্ম দেন সুধা সিং। জন্মের আগে কোনও অসঙ্গতি বা অসুস্থতা ধরা পড়েনি বাচ্চার। কিন্তু ডাক্তারবাবু জানালেন, জন্মের পরেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তার। দেখা যায়, মুখের মধ্যে জমা হওয়া লালা, যা বাচ্চারা নিজেরাই গিলে ফেলে, তা গিলতে পারছে না শিশুটি। ফ্যানার মতো জমা হচ্ছে মুখে, গলায়। ফলে শ্বাস নিতে পারছে না সে।

ডক্টর কৃশানু মণ্ডল

“সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ নিকু-তে ট্রান্সফার করে ভেন্টিলেশনে রাখা হয় ওকে। অক্সিজেনের জন্য নাক দিয়ে নল পরাতে গিয়ে দেখা যায়, নল আটকে যাচ্ছে। পাস করছে না মসৃণ ভাবে। এক্স রে-তে ধরা পড়ে, খাদ্যনালী ও শ্বাসনালীর মধ্যে একটি অস্বাভাবিক সংযোগ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ট্র্যাকিও ইসোফ্যাজিয়াল ফিসচুলা হয়েছে ওর। এই অবস্থায় মুখে জমতে থাকা লালা যে কোনও সময়েই শ্বাসনালীতে চলে গিয়ে দমবন্ধ হয়ে যেতে পারে। এখুনি অপারেশন করতে হবে। কিন্তু মাত্র ঘণ্টা তিনেক বয়সের বাচ্চার এমন অপারেশন শুধু কঠিন নয়, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”– বললেন দেবদীপ বাবু।

সিজার হওয়ার পরে অসুস্থ থাকায়, বাচ্চার মাকে কিছু না জানিয়েই বাঁকুড়ার বাসিন্দা, বাবা লবকুশ সিংয়ের সঙ্গে কথা বলে অপারেশনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন চিকিৎসকেরা। চিকিৎসকের কথায়, “২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয় বাচ্চাটিকে। একই ভাবে তৈরি হয় অ্যানাস্থেশিয়া টিম, তৈরি হন চিকিৎসক ও সার্জেনরা। এই অপারেশনটিও শঙ্খশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায়ই করেন। তবে অপারেশন শুরুর পরে দেখা যায়, যতটা বোঝা গেছিল, জটিলতা তার চেয়ে অনেকটাই বেশি। খাদ্যনালীর ওপরটা রয়েছে, মাঝখানটা নেই। নীচের অংশটা রয়েছে অনেকটা নীচে। মাঝে জুড়ে রয়েছে শ্বাসনালী। এবং সেই সঙ্গে হার্টেও রয়েছে ফুটো।”

সার্জেন জানালেন, খাদ্যনালীর ওপরের অংশ এবং নীচের অংশ টেনে একসঙ্গে করে সেলাই করা হয়। এক জন সদ্যোজাতের পক্ষে এই অস্ত্রোপচার জটিল বললেও কম বলা হয়। ঝুঁকি তো ছিলই! আড়াই ঘণ্টার অপারেশন শেষে সারানো হয় ত্রুটি। এর পরে ছিল আরও বড় ভয়। বাচ্চাটি জোরে নিঃশ্বাস নিলেই ছিঁড়ে যেতে পারে সেলাই। ফলে চার দিন ঘুম পাড়িয়ে, ভেন্টিলেশনে রাখা হয় ওকে। তার পরে আস্তে আস্তে ঘুমের ওষুধের ডোজ় কমিয়ে, বার করে আনা হয় ভেন্টিলেশন থেকে। আরও ৪৮ ঘণ্টা অন্য একটি যন্ত্রের মাধ্যমে শ্বাস নেয় সে। খাওয়ানো হয় শিরার মাধ্যমে চ্যানেল করে। কারণ এ ক্ষেত্রেও বাচ্চার পুষ্টি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এমনই ক্রিটিক্যাল পরিস্থিতি পার করে, দিন কয়েক পরে নিজে খেতে শুরু করে বাচ্চাটি। শ্বাস-প্রশ্বাসও স্বাভাবিক হয়। আগামী পরশু ছুটি মিলবে তারও।

বাচ্চার বাবা লবকুশ সিং জানালেন, “ভাবতেও পারিনি এত সমস্যা নিয়ে জন্মাবে ছেলে। তবে অত কম সময়ের মধ্যে ডাক্তারবাবুরা যা করলেন, তা চিন্তার বাইরে। আমরা সাধারণ মানুষ, কী ভাবে কী হল– এত তো বুঝি না। এটুকু বুঝি, ওঁরা না থাকলে ছেলেকে কোলে ফিরে পেতাম না।”

মিশন হাসপাতালের চেয়ারম্যান সত্যজিৎ বসু বলছেন, “পরপর দু’টো এত কঠিন অস্ত্রোপচার সফল ভাবে করতে পেরে আমরা সত্যিই গর্বিত। চিকিৎসক, সার্জেন, অ্যানেস্থেশিস্ট, নার্স– কারও ভূমিকা বাদ দেওয়া যায় না এই সাফল্যে।”

চিকিৎসক মহল বলছে, দুর্গাপুরের মতো একটা জায়গায় যে আমরা এই পরিকাঠামো তৈরি করা গিয়েছে, সেটাই অনেক বড় ব্যাপার। এই ধরনের কেস সাধারণত কলকাতা বা অন্য বড় শহরে রেফার করেন চিকিৎসকেরা। অনেক সময়ই তাতে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময় চলে যায়, অস্ত্রোপচারে দেরি হয়ে যায়। মিশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আশ্বাস, ভবিষ্যতে আরও উন্নত করা হবে পরিষেবা।

শিশু চিকিৎসক ত্রিদিব বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, “এই ধরনের নিওনেটাল সার্জারি কয়েক দিন আগেও সংখ্যায় নগণ্য ছিল। ইদানীং বেশ কিছু বড় অস্ত্রোপচার হলেও, সাকসেস রেট খুব ভাল বলা যায় না। ঝুঁকি থেকে যায় অনেকটাই। সেই জায়গা থেকে মিশন হাসপাতালের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। চিকিৎসকদের অভিনন্দন।”

Shares

Comments are closed.