সত্যজিৎ বহির্ভূত ২০টি ছবিতে সৌমিত্র ম্যাজিক

১১,০০৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

তাঁর প্রথম চরিত্র হতে পারত মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। কিন্তু তিনি হয়ে গেলেন অপু। কার্তিক চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ ছবিতে নিমাইয়ের ভূমিকায় অডিশন দিয়ে বাদ পড়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তাঁর জায়গায় শ্রীচৈতন্যের ভূমিকায় অভিষিক্ত হলেন আরেক নবাগত অসীম সরকার। ছবিতে যার নাম দেওয়া হল অসীম কুমার। আর সৌমিত্রকে শুনতে হল তাঁর দ্বারা অভিনয় হবেনা। কিন্তু কিছুদিনের অপেক্ষা তাঁর জন্য আরো বড় সুযোগ অপেক্ষা করছিল। সদ্য যুবক পুলুর গডফাদার সত্যজিৎ রায়।

এরআগে অবশ্যি সত্যজিৎ রায় ‘অপরাজিত’ করার সময় যখন অপুর জন্য নতুন মুখ খুঁজছেন তখন দেখা করেছিলেন সদ্য কলেজ পাশ করা পুলু ওরফে সৌমিত্র। কিন্তু ‘অপরাজিত’র অপুর জন্য আরো কম বয়সী ছেলে খুঁজছিলেন সত্যজিৎ। সে যাত্রায় হলনা সুযোগ। তার দু বছর পর সৌমিত্র ‘জলসাঘর’ র শ্যুটিং দেখতে গেছেন সেখানে শ্যুটিং ব্রেকে ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে সৌমিত্র-র আলাপ করিয়ে দিয়ে সত্যজিৎ বললেন ‘এ হল সৌমিত্র। আমার পরের ছবি অপুর সংসারের নায়ক অপু।’

সেদিন বাকরূদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সৌমিত্র। এই শুরু। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি সৌমিত্রকে।
উত্তম কুমার কিন্তু পরের পর অনেক গুলো ফ্লপ ছবি করে ফ্লপমাস্টার হয়ে যান সেখান থেকে নিজ চেষ্টায় হিটের মুখ দেখেন। উত্তমের কোন গডফাদার ছিলনা, উচ্চ শিক্ষার অতীত ছিলনা কিন্তু নিজেকেই নিজে তৈরী করেছেন। সেখানে সৌমিত্রের প্রথম ছবিই ছিল সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। সাফল্য প্রশংসা যেমন পেয়েছেন ‘অপুর সংসার’ করে সৌমিত্র, তেমনি সত্যজিৎ রায়ের ৩৪টি সিনেমার মধ্যে ১৪টি সিনেমায় নায়ক হয়ে সত্যজিৎ মানস পুত্র সৌমিত্র, তাঁর বাইরে সৌমিত্রর অস্তিত্ব নেই এও তাঁকে শুনতে হয়েছে। সত্যজিৎ-সৌমিত্র জুটি নিয়েই সিনেমহল থেকে দর্শকমহল চিরকাল আলোচনা করে এসেছেন যা নিয়ে আক্ষেপও ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। তাঁর অন্য পরিচালক দের সঙ্গে ছবির চরিত্র গুলি কি আলোচনাযোগ্য নয়? আবার সত্যজিৎ প্রয়াণের পরের তিন দশক সৌমিত্র সমান দাপটে চলচ্চিত্রে ও মঞ্চে বিরাজ করেছেন।

সৌমিত্র কিন্তু শুধু সত্যজিৎ শিষ্য নন , নাট্যাচার্য্য শিশির কুমার ভাদুড়িকে গুরুর মান্যতা দিয়েছিলেন সৌমিত্র। শিশির কুমার ভাদুড়ির নাটকই সৌমিত্রকে অভিনয়ের দিকে নিয়ে আসে। তাঁর মঞ্চাভিনয়ের প্রতি প্রেম শিশির ভাদুড়ির দেখানো পথেই।

আমরা আলোচনা করব সত্যজিৎ চলচ্চিত্রের বাইরে অন্য পরিচালকদের ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে। যেদিকটা অনালোচিতই থেকে গেছে ইন্ডাস্ট্রিতে অথচ সৌমিত্র বাবু আলোচনা করতে চেয়েও বলার প্ল্যাটফর্ম পাননি কখনও, কারণ সত্যজিৎ আলোকেই তাঁকে বিচার করা হয়েছে বারবার।

যেমন সৌমিত্র অপর্ণা জুটির কথা উঠলে শুধু ‘তিন কন্যা’, ‘বাক্স বদল’ আর ‘আকাশ কুসুম’ নিয়ে আলোচনা করা হয়। অথচ এই জুটির ‘নৌকাডুবি’,’জীবন সৈকতে’,’খুঁজে বেড়াই’ ছবিগুলো বাণিজ্যসফল হিট ছবি। যার অনেকগুলি আর দেখা যায়না। এই জুটির এই বানিজ্যিক ছবি গুলো নিয়ে কেউ কখনও কথা বলেনা।

এর কারণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই বলেছেন ‘ ‘নৌকাডুবি’,’খুঁজে বেড়াই’ হিট ছবিগুলো সিরিয়াস দর্শকরা কোনদিন সিরিয়াস ভাবে নেননি। এটা জাতপাতের দেশ। এখানে ছবিকেও কৌলিন্য দিয়ে বিচার করা হয়। নিজেদের যারা ইন্টেলেচুয়াল মনে করে তাঁরা নিজেদের সবার থেকে বেশী জানে মনে করে। এরাই স্বীকার করবেনা নৌকাডুবির হিট হবার ঘটনা এবং বলবে রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে দুর্বলতম সাহিত্য এটি। অজয় কর এই ছবি পরিচালনা করায় তাই তাঁরা ধর্তব্যের মধ্যে আনেনা। কজন এই পোড়া দেশে বুঝেছে অজয় কর এর ট্যালেন্ট? কিন্তু মানিকদা সবসময় বানিজ্যিক ছবিকে সমর্থন করেছেন।’

ক্ষুধিত পাষাণ

‘অপুর সংসার’ র অপু কে দেখে সৌমিত্রকে ডেকে নেন তাঁর পরের ছবি ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ র জন্য তপন সিনহা।
সত্যজিৎকে সৌমিত্র জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘আপনি কি বলেন তপন সিনহার ছবি করব?’ সৌমিত্র জানতে চেয়েছিলেন অন্য পরিচালকদের ছবিতে কাজ করার সম্মতি দেন কিনা সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ বলেন ‘কেন করবেনা! বাংলা ছবির জগতে তপন সিনহা একজন প্রধান পরিচালক। তুমি অবশ্যই ওঁনার ছবিতে অভিনয় কর।’
‘ক্ষুধিত পাষাণ’ এ প্রাসাদের দীর্ঘ বারান্দা গুলি দিয়ে অনেক হাঁটার দৃশ্য সৌমিত্রকে মাপেমাপে শিখিয়ে দেন তপন সিনহা। শুধু তাই নয় ছবির প্রয়োজনে অশ্বারোহণ শিখেছিলেন সৌমিত্র। তপন সিনহা প্রযোজককে বলে সৌমিত্রকে ‘সোসাইটি অফ হর্সম্যানশিপ এন্ড ইকুইটেশন’ এ ভর্তি করে দেন। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছিল সৌমিত্রর প্রথম বক্সঅফিস সফল বানিজ্যিক ছবি। যা বক্সঅফিস সেরা নায়কের আসনে তাঁকে বসিয়ে দেয়।

ঝিন্দের বন্দী 

এই ছবিতে প্রথম মহানায়ক সুপারস্টার উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনয় করলেন সৌমিত্র প্রথম। দর্শকরা দু দলে ভাগ হয়ে গেল কে বড় নায়ক উত্তম কুমার নাকি সত্যজিৎ নায়ক সৌমিত্র? ময়ূরবাহন নেগেটিভ রোলেও প্রথম অভিনয় এটি সৌমিত্রর। যে নায়ক দিয়েই শুরু করেছিল তাঁর প্রথম দিকেই এমন ভিলেন রোল চয়ণ করা নিঃসন্দেহে সৌমিত্রর বড় সিদ্ধান্ত ছিল। তপন সিনহাও ঐসময় একজন নায়ক চরিত্রের অভিনেতাকে প্রতিনায়কের ভূমিকায় নির্বাচিত করে শুধু বিচক্ষণতার পরিচয়ই দেননি, তরুণ সৌমিত্রর উন্নতির বিকাশলাভে সাহায্যই করেছিলেন। ময়ূরবাহনের চরিত্র করতে গিয়ে অশ্বারোহণ পরিপক্কতা আরো বাড়াতে হল সৌমিত্রকে। উত্তমকুমারের পাশেও ময়ূরবাহন সৌমিত্রর ছিপছিপে চেহারার স্মার্টনেস আর ঐ ক্রূর হাসি দর্শকদের মন জিতে নিল। ছবিতেও টক্কর চলল দুই নায়কের। মিথ হল ঝিন্দের বন্দীর ময়ূরবাহণ। ভিলেন দেখতেও অত সুন্দর হয় দর্শক প্রথম সৌমিত্রকে দেখে বুঝল।

স্বরলিপি 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নিজের  খুব পছন্দের ছবি হল ‘স্বরলিপি’। এই ছবিতে সৌমিত্রর চরিত্র ওঁর অভিনয় জীবনের সেরা চরিত্রর একটি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ ছবিটির প্রিন্ট হারিয়ে গেছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরারোপে অনবদ্য সব গান ছিল ছবিতে হেমন্ত কন্ঠে ‘যে বাঁশী ভেঙে গেছে’ বা গীতা দত্ত কন্ঠে ‘আমি শুনেছি তোমারই গান’,’কে ডাকে আমায়’।

অসিত সেনের পরিচালনায় সৌমিত্রর বিপরীতে ছিলেন এই ছবিতে সুপ্রিয়া চৌধুরী। সৌমিত্র-সুপ্রিয়া জুটির ছবির সংখ্যা খুব কম যাও আছে তাঁর বেশীরভাগের প্রিন্ট নেই। কিছু ছবি যা মাইলফলক ছিল সৌমিত্র-সুপ্রিয়ার ক্যারিয়ারে স্বয়ম্বরা,সন্ধানীর পরিচালনায় ‘অয়নান্ত’। এই তিনটি ছবিই আর পাওয়া যায়না। কেউ সৌমিত্রর ফিল্মোগ্রাফিতে আলোচনাতেও আনেননা।

সাত পাকে বাঁধা 

অজয় কর তাঁর ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে মিথ ভাঙলেন যেমন ছবি তৈরীতে তেমনি নায়ক নায়িকা নির্বাচনে। রোম্যান্টিক হিট ছবির ফমূর্লা না মেনে বানালেন প্রেম, বিয়ে,দাম্পত্য কলহ থেকে ডিভোর্সের কাহিনী আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের লেখনীতে। উত্তম সুচিত্রা যুগে অজয় কর সুচিত্রা সেনের স্বামীর ভূমিকায় বাছলেন সৌমিত্রকে। অধ্যাপক সুখেন্দু দত্ত। মায়েরা মেয়েদের ভালো করতে গিয়ে মেয়ের সংসারে ঢুকে পড়েন এবং জামাই-মেয়ের মধ্যে বিবাদ  সৃষ্টির করার সূত্রপাত ঘটান মেয়ের মায়েরাই। যে কাহিনী যুগ যুগ ধরে সমকালীন। সেই ছবি হিট করল এবং সুচিত্রা সেন আর ছায়া দেবীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করলেন সৌমিত্র। একটা চাপা মাপা বিষন্ন অথচ ক্ষিপ্ত চরিত্র অথচ সে নিজের মতো করে ভালোবাসতে জানে। সুখেন্দু যেন সুচিত্রার বিপরীতে উত্তমকে মানায়না, সৌমিত্রই যথাযথ যা চিনেছিল অজয় করের জহুরীর চোখ। সৌমিত্রর বিপরীতেই সুচিত্রা সেন পেলেন সেরা অভিনেত্রীর সম্মান মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে।

অপরিচিত 

আবার উত্তম-সৌমিত্র মুখোমুখি হলেন এই ছবিতে। দস্তয়েভস্কির The idiot এর ছায়া অবলম্বনে সমরেশ বসু রচনায় সলিল সেন পরিচালনা করেছিলেন “অপরিচিত” ছবিটি। উত্তম -অপর্ণা -সৌমিত্র -সন্ধ্যা রায় অভিনীত ছবিটি সেই সময়কার রোম্যান্টিক ছবির ঘরানা থেকে বেরিয়ে এসে অসম্ভব পরিণত ছবি। রোম্যান্টিক ইমেজ থেকে এন্টিরোম্যান্টিক চরিত্রে উত্তম যে মস্তান -সুরা ও নারী তে আসক্ত আর সৌমিত্র মানসিক হসপিটাল ফেরত চরিত্রে। আলোচিত ও প্রশংসিত ছবি চিরকালের।

বাঘিনী

বিজয় বসুর পরিচালনায় সুপার ডুপার হিট বাংলা ছবি। এই ছবিটির নামভূমিকায় অভিনয় করেন সন্ধ্যা রায়। ছবিতে তার চরিত্রটির নাম ছিল দুগগা। দুগগার ভূমিকায় সন্ধ্যা রায় এতটাই অনবদ্য যে আজও বাঘিনী শব্দটা উচ্চারণ করলে তাঁর মুখটাই আমাদের চোখের ওপর ভেসে ওঠে। ছবির নায়ক চিরঞ্জীবের ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয়ের জন্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বিএফজেএ পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান লাভ করেন। সৌমিত্র সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন মেঠো পথ ধরে আর মান্না দে-র কন্ঠে ‘ও কোকিলা তোরে সুধাইরে’ শুনলে বুকটা হাহাকার করে ওঠে।

তবে খলনায়কের চরিত্রে রবি ঘোষের অভিনয়ের কথা আলাদা করে উল্লেখ না করলে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি যে কত বড় মাপের অভিনেতা, শুধুমাত্র কমেডিয়ান এর চরিত্রেই যে তার অভিনয় সীমাবদ্ধ নয়, এই ছবিতে আরও একবার তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সংসার সীমান্তে 

‘সংসার সীমান্তে’-র অঘোর করতে চাননি উত্তম কুমার। ডিগ্ল্যামারাইজড চোরের চরিত্র তখন নায়ক ইমেজ ছেড়ে করতে সাহস পাননি উত্তম। তাই অঘোর চরিত্রটি পেয়েছিলেন সৌমিত্র। বাঙালির আইকনিক যে ফেলুদা উটের পিঠে চেপে চোর ধরতে যান তিনি আবার পরক্ষণেই পোশাক বদলে ছ্যাঁচড়া চোর রূপে অবতীর্ণ হন ‘সংসার সীমান্তে’।

ঋত্বিক ঘটক এই ছবি করবেন ঠিক করলেও পরে না করায় তরুণ মজুমদার করলেন সংসার সীমান্তে এবং অঘোর চোরের ভূমিকায় সৌমিত্র আর পতিতার রোলে সন্ধ্যা রায়। পতিতাগৃহে চুরি করতে যায় চোর এবং সেখানে পতিতাকেই ভালোবেসে ফেলে চোর। চোরটি দেয় পতিতাকে নতুন সংসার নতুন জীবন। অঘোর সৌমিত্রর জীবনে একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয়। সত্যজিৎর ছবি করেও জীবনের শেষ দিন অবধি এই অঘোরকে ভালোবেসে গেছেন সৌমিত্র আর আক্ষেপ করে গেছেন ‘সংসার সীমান্তে’ র প্রিন্ট পাওয়া যায়না বলে। কারুর কাছে আছে কিন্তু সঠিক পুণরুদ্ধার হচ্ছেনা।

তিন ভুবনের পারে 

সমরেশ বসু কাহিনী অবলম্বনে সৌমিত্র-তনুজা জুটির কালজয়ী ছবি। সৌমিত্র একজন বেকার রকবাজ ছেলে, এই ছেলেগুলোই আবার পাড়ার ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো, যারা  পথচলতি মেয়েদের দেখলে টোন কাটে ‘কে তুমি নন্দিনী আগে তো দেখিনি’ বলে। এমনই এক নন্দিনী বখাটে যুবকটিকে নিজের উদ্যমে পড়াশুনো শিখিয়ে কলেজের অধ্যাপক করে তোলে। এই যে বখাটে ও প্রফেশারের দুধরনের অভিনয় তাতে সৌমিত্র ছিল অনবদ্য। সৌমিত্রর টুইস্ট ডান্স বাংলা ছবির নায়কও নাচতে পারে সবাইকে বুঝিয়ে দিল।

অগ্রদানী 

তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় রচিত ,পলাশ বন্দোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি অগ্রদানী। অগ্রদানী ব্রাহ্মণ সৌমিত্র। যে পারলৌকিক কাজেই লাগে পুজোর কাজে লাগেনা। গরীব ব্রাহ্মণ, যাত্রা করে,খেতে বড় ভালোবাসে ।দুই ছেলে মেয়ের পর আবার স্ত্রী গর্ভবতী হয়, কিন্তু হতদরিদ্র ব্রাহ্মণ খেতে দেবে কী ? এদিকে জমিদার গিন্নীর একটি সন্তানও ভূমিষ্ঠ হয়ে বাঁচে না। জমিদার গিন্নীর অনুরোধে আঁতুড় ঘরের সামনে তাকে অবস্থান করতে হয় ।মান্যতা এই যে ব্রাহ্মনের পয়ে ভূমিষ্ঠ সন্তান বাঁচবে ।তবে এইবারও মরা সন্তান জন্ম দেয় জমিদার গিন্নী। অগ্রদানী ব্রাহ্মণ নিজের স্ত্রীর সদ্যজাত সন্তানের সাথে সেই মৃত সন্তান বদলে দেয়।কালক্রমে নিজের বড় ছেলে হয় এক লম্পট যে কিনা নিজের পিতার পরিচয় করায় servent বলে ।মেয়ের বিয়ের পর স্থান হয় বেশ্যালয়ে ।জমিদার গৃহে বেড়ে ওঠা নিজের ছোট ছেলে বিকলাঙ্গ তাঁকে কোলে পিঠে করে মানুষ করে অগ্রদানী বামুণ। সেই ছেলের  অকাল মৃত্যুর পর সেই ছেলেরই শ্রাদ্ধ তে পিন্ডি গ্রহণ করেন পিতা কারণ সে যে শ্রাদ্ধতে পিন্ডি ভক্ষণ কারী অগ্রদানী বামুণ। গায়ে কাঁটা দেওয়া সৌমিত্রর অভিনয়।

কোনি 

মতি নন্দীর কাহিনী অবলম্বনে সরোজ দের পরিচালনায় জলকন্যা কোনিকে বিজয়িনী করায় ক্ষিদ্দার লড়াইয়ের গল্প। কোনিকে পিতৃসম ভালোবাসায় বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন যেন ক্ষিদ্দা আর ক্ষিতীশ সিংহ ওরফে ক্ষিদ্দা বলছেন, ”ফাইট কোনি, ফাইট।”

কোনি ছবিটা যখন করার কথা ভাবা হয় তখন উত্তম কুমার জীবিত, প্রযোজকগোষ্ঠী উত্তম কুমারকে ক্ষিদ্দা ভূমিকায় ভেবেই ছবি করার কথা ভাবেন। কিন্তু উত্তম কুমারের আকস্মিক প্রয়াণে ক্ষিদ্দার রোল সৌমিত্রর কাছে আসে এবং ক্ষিদ্দার রোলে নিজেকে সঁপে দেন সৌমিত্র। মেক-আপ তৈরি করেছিলেন তিনি নিজে নিজেই, ঘষা কাচের হাই-পাওয়ার চশমা জোগাড় করা থেকে ধুতি আর হাফ হাতা শার্ট পরে দাপিয়ে বেড়িয়েছিলেন গোটা ছবিতে, দেখে তাঁকে উত্তর কলকাতার জল-ধুলো-মাটি ঘাঁটা সাঁতারের কোচ ছাড়া আর কিছু ভাবার অবকাশই ছিল না। মনেই থাকত না, তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। নিজের ওয়ার্কশপ নিজেই করেন পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে। নিয়ম করে উত্তর আর মধ্য কলকাতার সাঁতারের ক্লাবে যেতেন। দেখতেন সাঁতারুদের কী ভাবে শেখাচ্ছেন কোচরা, তাঁরা কী ভাবে হাঁটেন, কথা বলেন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাঁদের বোঝাপড়ার ধরনটাই বা কী— সবই খুঁটিয়ে খেয়াল করতেন। শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় একটাই ছবি করেছেন কোনি হয়ে সারাজীবনে। কোনি আর ক্ষিদ্দার জুটি আজও সব লড়াইয়ে প্রেরণা যোগায়। মনে হয়নি উত্তম না করায় ক্ষিদ্দাকে আমরা কিছু কম পেয়েছি।

 আতঙ্ক 

‘আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি মাস্টারমশাই।’খুনী ছাত্রদের ধমকানীতে মুখ বন্ধ  রাখতে হয় মাস্টারমশাইকে, সত্যের কাছে আপোষ করতে হয়। যেসব সততার বাণী ছাত্রদের পড়িয়েছেন, বাস্তবে সেসব স্তোকবাক্য হয়ে দাঁড়ায়। আতঙ্ক ছবিতে সৌমিত্র র মুখের মেক আপ অভিব্যক্তি দুরন্ত। তপন সিনহা যা সব রোল দিয়েছেন সৌমিত্রকে তা সত্যজিৎ রায়ের থেকে কোন অংশে কম নয়। আরো একটা ছবির উল্লেখ করতে হয় তপন সিনহার ‘অন্তর্ধান’। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে ছবি মেয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পিতা মাতার টানাপোড়েনের গল্প, ক্রিমিনালদের সঙ্গে এক বৃদ্ধ পিতার লড়াইয়ের গল্প আর সৌমিত্রর দুঃসাহসিক অভিনয়।

 হুইল চেয়ার 

সৌমিত্র অভিনীত তপন সিনহার এই ছবিটি সৌমিত্রর প্রিয় ছবির একটি, কারণ প্রতিবন্ধী মানুষদের উত্তরণের গল্প। এই ছবি সম্পর্কে সৌমিত্র বলেছেন ‘ তপনদার ‘ হুইল চেয়ার’ আমার সবথেকে প্রিয়। এই ছবির মধ্যে এমন এক মানসিকতা, এমন এক মানবিকতার কথা আছে যে মানুষরা সমস্ত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে জীবনের পথে ফেরার জন্য লড়াই করছেন। লড়াই আমার প্রিয়তম বিষয়ের অন্যতম। প্রতিবন্ধকতা কখনই জীবনের অন্তরায় হতে পারেনা।’

‘হুইল চেয়ার’-এ এক শারীরিক প্রতিবন্ধী ডাক্তারের চরিত্র করতে কয়েক মাস ধরে বাড়িতেই হুইল চেয়ারে চলাফেরা রপ্ত করেন সৌমিত্র। প্রতিবন্ধী বহু দর্শক ছবিটি দেখে সৌমিত্রকে জানিয়েছিলেন তাঁরা যেন নিজেদের দেখছেন সৌমিত্রর ভিতর।

একটি জীবন 

রাজা মিত্রের ‘একটি জীবন’ ছবিটি অভিধানলেখক ও শব্দকোষ-সঙ্কলক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন কাহিনী। যে ভূমিকার আদলে গুরুদাস ভট্টাচার্য চরিত্রটি সৌমিত্র বাবুকে দেন রাজা মিত্র। যে মানুষটি বাংলা ভাষার বিপুল শব্দভাণ্ডারের জন্য, বাঙালির মননের পরিসরকে আরও বিস্তারের জন্য একা লড়াই করে চলেন।
এই গল্প নিয়ে সত্যজিৎ রায় ছবিটি করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তাঁর করা হয়ে ওঠেনা। রাজা মিত্র সত্যজিৎ রায়ের অনুমতি নিয়েই ছবিটি করেন এবং ছবিটি জাতীয় পুরস্কার জিতে নেয়।

দেখা 

শশীভূষণ যিনি গ্লুকোমা রোগে আক্রান্ত এবং স্ত্রী, কন্যা বর্জিত। শশীভূষণের আছে একটা কবি মন কিন্তু সে আবার শিল্পীর দুর্বলতাও ত্যাগ করতে পারেননি। বহুগামী জীবনে যৌবন থেকেই লিপ্ত শশীভূষণ। নব্য ছাত্রী থেকে পতিতা সবই এসেছে তাঁর জীবনে। শশীভূষণের ভূমিকায় সৌমিত্র। প্রতিবন্ধী অন্ধ মানুষের রোল দুর্দান্ত করেন। আবার ট্যাক্সি করে যেতেযেতে দরাদরি করে বেশ্যা তোলার দৃশ্যে তখন শশীভূষণের যুবক বেলা। তাই সৌমিত্রর শরীর না দেখিয়ে কন্ঠ শুধু ঐ দৃশ্যে চমৎকার ব্যবহার করেন পরিচালক গৌতম ঘোষ। আর পতিতাবৃত্তিতে দরাদরি করতে থাকা সেই বেশ্যা চরিত্রে ছোট্ট ভূমিকায় সোমা চক্রবর্তী। এই দৃশ্যের এত উন্মাদনা হয় যে মফস্বলের এক পতিতাপল্লীর সমস্ত পতিতা ‘দেখা’ প্রেক্ষাগৃহে দেখতে গেছিলেন। যে খবর উঠে আসে সংবাদপত্রে। সৌমিত্রকে ঘিরে তিন নায়িকা এ ছবিতে দেবশ্রী রায়(সরমা), ইন্দ্রাণী হালদার এবং রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্যে দেখার নাম প্রথমে ‘দৃষ্টি’ রাখা হয়েছিল। আর্ট ফিল্ম হলেও বিশাল বানিজ্যিক হিট ছবি করেছিল রেনবো প্রোডাকশান।

অসুখ 

সংসার শুধু মায়েদের,মেয়েদের নির্ভর একথা যে ঠিক নয় তা প্রমাণ করে দেন ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর ‘অসুখ’ ছবিতে। যেখানে একজন বৃদ্ধ পুরুষ সংসারের অন্দরমহল বাহিরমহল পরিচালনা করেন । তিনি টলিউডের ব্যস্ত নায়িকা রোহিনীর বাবা। মেয়ে রোহিনী আউটডোরে বাইরে, অসুস্থ স্ত্রীকে একা হাতে হাসপাতালে ভর্তি থেকে রোজ সেখানে যাওয়া আসা আবার পুরো সংসার একা হাতে তিনি পরিচালনা করেন। স্ত্রীর বেডশোর পরিস্কার থেকে মেয়ের পুরস্কার পাবার খবর কেটে রাখা সংবাদপত্র থেকে। যেসব মহিলারা বলে বেড়ান নারী ছাড়া পুরুষদের ভাতের হাড়ি উনুনে চড়বেনা তাঁদের মুখে সপাটে চড় মারেন ঋতুপর্ণ, রোহিনীর পিতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্র দেখিয়ে। অন্যদিকে এই পিতা মায়ের অভাব মিটিয়ে দেন মেয়েকে। মেয়ে কটা ঘুমের অসুধ খাবে বা কবার চোখে ড্রপ দেবে সেটাও বাবা নিজ হাতে করে থাকেন দেবশ্রী রায় এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বোঝাপড়া এ ছবিতে অনন্য। আবহে অপর্ণা সেনের আবৃত্তিতে যা আরো বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।

এমন একটি পুরুষ চরিত্র বহু সংসারে বিরল হলেও পাওয়া যায় কিন্তু তাঁদের কখনও কৃতিত্ব দেওয়া হয়না।
এমনই একটি সৌমিত্রের চরিত্র যেন সেসব বাবাদের সম্মান জানায়।

আত্মীয় স্বজন 

সৌমিত্র সুপ্রিয়া জুটির যৌবনবেলার ছবি গুলো পাওয়া যায়না। তাই ওঁদের জুটির ‘আত্মীয় স্বজন’ এ যুগের ছবিটি উল্লেখযোগ্য। সৌমিত্র একজন যৌথ পরিবারের কর্তা কিন্তু সেই পিতা পুত্র কন্যাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। ভাবেন দায়িত্বহীন ছেলেমেয়েরা বাপের পারলৌকিক কাজটাও করবেনা তাই সেই বৃদ্ধ নিজেই নিজের শ্রাদ্ধ করার ব্যবস্থা করেন নিজের পিন্ড নিজে দান করেন এবং শুধু তাই নয় বার্ধক্যজনিত অবসাদ আর সইতে না পেরে স্বস্ত্রীক  আত্মহত্যা করেন। স্ত্রী বেঁচে গেলে ছেলেমেয়েরা মায়ের মূল্য বোঝে। এ ছবিতে অবসাদগ্রস্থ সৌমিত্রর মেক আপ, মুখের অভিব্যক্তি দুর্দান্ত ছিল। নববই দশকে এ ছবি ধুকতে থাকা সিঙ্গেল স্ক্রীনে দর্শক টেনেছিল প্রচুর।

ক্যান্সার

একজন বাড়ির কর্তা বটগাছের মতো কিন্তু তাঁর অস্তিত্ব পাল্টে যায় হঠাৎ আসা কর্কট রোগের ছোবলে। তিনি পরিবারের কাছে চিন্তার কারণ কতকটা বোঝাও হয়ে ওঠেন। আবার পরিবারের লোকরাই তাঁর ক্যান্সার রোগটা ছোঁওয়াছে রোগ ভাবতে থাকে। ফলতঃ তাঁর ঘরে নাতি নাতনির আসাও বন্ধ হয়ে যায়। এই যে হঠাৎ নিজের সংসারে নিজের বাড়িতে নিজের অস্তিত্ব পাল্টে যাওয়া, করুণার পাত্র হয়ে যাওয়া সেটার ভাবপ্রকাশ অনবদ্য অভিনয়ে ফুটিয়ে তোলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সুচিত্রা ভট্টাচার্যর ‘গভীর অসুখ’ কাহিনি অবলম্বনে পিণাকি চৌধুরীর পরিচালনা করেন ‘ক্যান্সার’ ছবিটি। ছবির শেষে রয়েছে একটি দুর্দান্ত চমক। এই ছবিটি তখন আলোচিত প্রশংসিত হয় ২০২০ সালে কিন্তু আজ কুড়ি বছর পর এ ছবি মানুষ ভুলে গেছে।

সমান্তরাল 

এই ছবিতে সৌমিত্রর সাহসী অভিনয় বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ তিনি এখানে একজন উভলিঙ্গ সন্তানের পিতার ভূমিকায় রূপদান করেছেন। হিজড়া বলেই তাঁদের আমরা চিনি। কিন্তু আদতে হিজড়া একটা পেশা। এই ছবিটা দেখলে মনে হবে কোন ট্রান্সজেন্ডার মেয়েলি পুরুষের নিজেকে লুকিয়ে রাখার গল্প। যেহেতু আজকাল একই ছাতার তোলায় উভলিঙ্গ, ট্রান্সজেন্ডার বা সমকামী পুরুষ মহিলাদের আনা হয়। কিন্তু বিচারে মননে সবটাই আলাদা। সৌমিত্রর একটা ডায়লগেই গল্পের সেই রহস্য কিনারা হয়ে যায়। যখন সৌমিত্র বলেন জন্মের সময়ই মেজো সন্তানের লিঙ্গ দেখেন এবং তাকে হিজড়ারা নিতেও এসছিল, ওর মা নিতে দেয়নি। কিন্তু আমরা তো ওকে বদলাতে পারলামনা। ট্রান্সজেন্ডার রূপান্তরকামীদের নিয়ে ছবি ঋতুপর্ণ থেকে কৌশিক গাঙ্গুলী করেছেন কিন্তু সমান্তরাল পরিচালক পার্থ চক্রবর্তী করলেন উভলিঙ্গ হিজড়াদের নিয়ে ছবি। এমন একজন প্রান্তিক সন্তানের পিতার হাহাকার তা সৌমিত্র এই শেষ বয়সেও কি মন কেমন করায় মূর্ত করে তোলেন।

পারমিতার একদিন 

পারমিতার একদিন এর মণিদা, সনকার বাল্যবন্ধু এবং প্রেমিক। সনকা বিবাহ সূত্রে শ্বশুরবাড়ি চলে এলেও সনকার ভালোবাসার সুতোর লাটাইটা যেন মণিদা ধরে রেখেছেন। এবং প্রায় রোজই সনকার বরের বাড়িতে ঠিক দুপুরে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে মণিদার দেখা মেলে। তবু মণিদা সাহস করে সনকাকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করতে পারেননি যৌবনে। তাই সনকা বলেন মণিদা ভুলে যেওনা তোমার জন্য তিন তিনটে জীবন নষ্ট হয়েছে। এখন তোমার ওষুধের টাকা আমি দিচ্ছি রাখো। এ আমার নিজের টাকা।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটা আলোকমালায় থেকেছেন সারাজীবন কিন্তু এই মণিদা খুব ভীতু চুপচাপ চরিত্রটা যে সংসারে ব্রাত্য। পরের সংসারে লজ্জার মাথা খেয়েও আসেন সনকার টানে। স্টার সৌমিত্র হয়েও কি অনবদ্য করেছিলেন। সৌমিত্র অপর্ণাকে বলতেন ‘তোমার ছবিতে আমায় নাওনা।’ অপর্ণা সেন বলতেন’তোমার করার মতো চরিত্র না থাকলে কি দেব?’

শেষমেষ সনকা মণিদা র আইকনিক ভালোবাসার একটা জুটি হয়ে থাকল। বিয়েই ভালোবাসার শেষ পরিণতি যেখানে নয়। সনকার দুপুরের বারান্দার দক্ষিনের জানলা মণিদা।

 বরুণবাবুর বন্ধু 

সৌমিত্রর শেষ সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র ছিল এই বরুণবাবু। সৌমিত্র বলেছিলেন ‘অনেকদিন পর এমন একটি ছবিতে কাজ করে খুব শান্তি পেলাম, মনের খিদে মিটল।’ মাধবী মুখোপাধ্যায়ও বলেছেন সৌমিত্রর শেষদিকের অভিনয় জীবনে এই ছবিতে সৌমিত্র বাবুর অভিনয় তারও প্রিয়।

রমাপদ চৌধুরীর ‘ছাদ’ গল্প অবলম্বনে তৈরি অনীক দত্তর এই পারিবারিক ছবিটিতে বরুণ বাবুর আদর্শ,রাজনৈতিক সত্ত্বার সঙ্গে তাঁর পরিবারের লোকেদের মতভেদ পার্থক্য, সুযোগসন্ধানী ব্যবহার যে বৈপরীত্য তৈরী করছে তা ফুটে ওঠে সৌমিত্রর অনবদ্য অভিনয়ে।

দর্শক ধন্য সৌমিত্র চলচ্চিত্র

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কেরিয়ারের দুই বেলার দুই ছবিকে অস্বীকার করা যায়না। যা বানিজ্যিক ছবির বক্সঅফিসে রেকর্ড কালেকশান দেয় এবং চিরন্তন নিখাদ বাঙালীয়ানার ছবি।

বসন্ত বিলাপ 

দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবিতে হোস্টেলের মেয়েদের সঙ্গে পাড়ার ছেলেদের টক্কর এবং শেষমেষ প্রেম থেকে শুভ পরিণয়। একদম নিখাদ পাড়া কালচারের ছবি। বাঙালী ছবি বললে বসন্ত বিলাপ প্রথমেই আসবে। ‘আগুন লেগেছে লেগেছে আগুন’ থেকে ‘যদি কেউ সাধু সেজে হয় আসলে ভন্ড নকল/ আমরা সবাই যে তার মুন্ডু নিয়ে খেলব ফুটবল’ গানে দুর্দান্ত সৌমিত্র। সৌমিত্র-অপর্ণার রাধে-শ্যাম জুটি উত্তম-সুচিত্রা জুটির পর বাঙালীর কাছে খুব বাস্তবধর্মী জুটি হয়ে উঠতে পেরেছিল। যাদের অভিনয়ে মেলোড্রামা কম অনেকটাই পাশের বাড়ির ছেলেমেয়ের মতো। যা চিরকালীন ‘বহমান’।

 বেলা শেষে 

দুই প্রবীন মুখ জুটি রেকর্ড বক্সঅফিস সুপারহিট দেন এ ছবিতে। ‘ঘরে বাইরে’ বহু যুগ পর আবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত জুটি ‘বেলা শেষে’ ছবি দিয়ে তরুন প্রজন্মের চোখে জল আনেন। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-নন্দিতা রায়ের এই ছবিতে দেখান বিশ্বনাথ-আরতি দুই প্রবীন দম্পতি বিবাহের পঞ্চাশ বছর পর ডিভোর্সের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন যা তাঁদের ছেলে মেয়ে নাতি নাতনিদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঘটে। এই ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হিরো হয়ে বক্সঅফিস হিটে বহু যোজন পেছনে ফেলে দিয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন থেকে শাহরুখ খানের সমসাময়িক রিলিজ ছবি গুলিকে। বেলা শেষে ধুতি-ধনেখালি দর্শক থেকে জিনস হটপ্যান্ট সব দর্শককে হলমুখী করে। বিষাদ নয়, বেলাশেষে-র গল্পে আশাবরীর সুরটাই মন প্রফুল্ল করে দেয়। শীঘ্র রিলিজের অপেক্ষায় ‘বেলা শুরু’ তাতেও দেখা যাবে সৌমিত্র-স্বাতীলেখা জুটি, এই পরিবারটির দ্বিতীয় অধ্যায়।

সত্যজিৎ রায়ের ছবির বাইরে এতগুলি শ্রেষ্ঠ চরিত্র করেও এসব চরিত্র কোনদিন কৌলিন্য পাইনি। এমনকি পোড়া দেশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতা সত্যজিতের চোদ্দোটি ছবি সহ … সংসার সীমান্তে,একটি জীবন বা দেখা র মতো ছবি করেও জাতীয় পুরস্কার পাননি। জাতীয় পুরস্কার পেলেন ২০০৬ সালে ‘পদক্ষেপ’ ছবিতে যেটি পেয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন ‘এত ভালো ভালো ছবি সেই চারুলতা, দেবী থেকে সংসার সীমান্তে এমনকি দেখাতেও যা অভিনয় করলাম সেগুলির কাছে পদক্ষেপ র জন্য এই জাতীয় পুরস্কার সান্ত্বনা পুরস্কার সম।’

দাদাসাহেব ফালকে জয়ী সৌমিত্রের আসন বাঙালীর হৃদয়ে, তিনি একটা বাঙালী যুগ,রূচি,ক্লাস,শিক্ষার দেবতা। বাঙালী জাতি যতদিন থাকবে ততদিন সেই দেবতা পূজিত হবেন … দশর্কদের ভালোবাসা ‘হোমা পাখি’ পৌঁছে দেবে জীবন দেবতার শ্রীচরণে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More