রবিবার, মার্চ ২৪

স্মৃতির শহর বুদাপেস্ট

সুদেষ্ণা ঔরঙ্গাবাদকর

ইতিহাসের শিকড় বেছানো এক দেশ হাঙ্গেরি। এই দেশ কখনও ফ্যাসিস্ট আক্রমণের শিকার, কখনও বা রক্ষকের ভক্ষক হয়ে ওঠার দুর্ভাগ্যের বলি। অপূর্ব সুন্দর এই দেশের রাজধানী বুদাপেস্টের সঙ্গে মমতা, সহানুভূতি মিশে যে থাকবে, তা তো  যে কোনও পর্যটকের জন্যই স্বাভাবিক। আমিই বা তার ব্যতিক্রমী হই কী করে !

মধ্যযুগীয় শহর, দুপাশে দুটি শহর পাহাড়ি বুদা আর সমতল পেস্ট। তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে বিশালকায় দানিয়ুব নদী যা অনেকগুলি সেতু দিয়ে যুক্ত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মার্গারেট ব্রিজ , অপার্ড ব্রিজ আর ঐতিহাসিক চেন ব্রিজ ।  একপাশে বুদা, পাহাড়ি এলাকা যার মধ্যে গিলেট পাহাড়ের উপর স্বাধীনতার মূর্তি দাঁড়িয়ে, যা শহরের যে কোনও প্রান্ত থেকেই দৃশ্যমান। নদীর অপর দিকে, দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু পেস্ট ।

পার্লামেন্ট

রক্তক্ষয়ী বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সাক্ষী এই বুদাপেস্ট শহর। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিনাগগ এই শহরে আছে। যে সিনাগগ একসময়ে হাজারে হাজারে ইহুদিদের ঘেটোতে পরিণত হয়েছিল । ঠান্ডায়, অনাহারে থেকে ইহুদিরা মারা যাবার পর তাদের এখানেই কবর দেওয়া হতো !

অবাক বিস্ময়ে দেখলাম ইহুদিরা কবরে ফুল দেয় না, দেয় ছোট ছোট নুড়ি পাথর। তাদের বক্তব্য, ফুল তো ঝরে যায়, কিন্তু শিলা তো চিরন্তন। আমাদের সিনাগগ যে ঘুরে দেখালো তার নাম চিলাহ। ইহুদিদের ওপর অত্যাচারের কাহিনী বলতে বলতে তার চোখের কোন চিকচিকিয়ে ওঠে আজও। সে দেখালো আমাদের ট্রি অফ লাইফ, সে এক বিশাল ইস্পাতের গাছ অগুনতি ইস্পাতের পাতা নিয়ে নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় পাঁচ হাজার ইহুদির নাম সে পাতায় খোদাই করা আছে ! বহু পাতা এখনো খালি, কারণ ছয় মিলিয়ন ইহুদির মৃত্যু হয়েছিল। সেখানেই শুনলাম রাউল উলেম্বার্গ নামে বিখ্যাত সুইডিশ কূটনীতিকের কথা যিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচিয়ে ছিলেন বহু লোকের প্রাণ !

চেন ব্রিজ

আরেক নির্যাতন ও অবমাননার সাক্ষী হয়ে আছে দানিয়ুবের পূর্ব তীরে Shoes on the Danube Bank, Gyula Pauer এর বানানো সারি দিয়ে রাখা জুতো! ইহুদিদের এখানেই নিজেদের জুতো খুলে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৪৪-১৯৪৫-এ। নদীতে পড়ে যাওয়া মৃতদেহ দানিয়ুবের জলেই ভেসে যেত!  মানুষের জীবনের চেয়ে তখন জুতোর মূল্য বেশি ছিল তাই বিভিন্ন ধরণের পুরুষ, মহিলা আর শিশুদের রিবন বাঁধা জুতোর সারি দেখে মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায় !

দানিয়ুবের তীরে জুতোর সারি, নিহত ইহুদিদের স্মরণে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের থাবায় নির্যাতিত হয়  আরেকবার এই দেশ। যার প্রমাণ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে House of Terror museum !

Hero Square আর তার সংলগ্ন পার্ক মন ভরিয়ে দেয় ! সেদিন ছিল ১লা মে, তাই সারা শহর মেতে উঠেছিল মে দিবসের উৎসবের রঙে।

সিনাগগ

দিনেরবেলার এই বিষণ্ণতা মুছে দিলো রাতের দানিয়ুবের বুকে বোট যাত্রা। দিনের বোট যাত্রা আর রাতের বোট যাত্রার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন ! পুরো বুদাপেস্ট শহর যেন আলোয় মোড়া এক রূপকথার নগরী হয়ে উঠলো ! আলোয় উদ্ভাসিত পাহাড়ের টিলায় হাতে অলিভ পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নারী মূর্তি, যে স্বাধীনতার প্রতীক। পাহাড়ের কোলে বুদাপেস্ট প্রাসাদ, অন্য পাশে সুবিশাল পার্লামেন্ট হাউস যেন সোনায় মোড়া, তার সোনালী ছায়া পড়েছে দানিয়ুবের কালো জলে! তারই মধ্যে তিনটি ব্রিজ আলোর ছটায় উদ্ভাসিত!

বুদা প্রাসাদ

বুদাপেস্টের উত্তরে দানিয়ুবের ধারে ছোট্ট শহর Szentendre। ছোট চার্চ, সরু গলি, আর রঙীন ছোট ছোট বাড়ির রূপকথার শহর ! তারই মধ্যে ছোট দোকানে হাঙ্গেরির বিশ্ববিখ্যাত কুরুশের কাজের পসরা সাজিয়ে বসেছেন গ্রামের মা , ঠাকুমা আর দাদুরা !

এতো বঞ্চনা , অবমাননার সাক্ষী এই শহর কিন্তু কী অমায়িক আর সরল মানুষজন ! কলকাতার মানুষ শুনে মাদার টেরিজার উদ্দেশে প্রণাম জানালেন এক হাঙ্গেরীয় ভদ্রলোক। কখনও তুরস্ক, কখনও রুশ ও বিভিন্ন জাতি এদেশে এসেছে। সকলেই খুব দীর্ঘকায় !  ছুটি কাটাতে দলে দলে ট্যুরিস্ট গ্রুপ আর তাদের বিভিন্ন ভাষার মেলা! ঐতিহাসিক গুল্যাশ স্যুপ সব রেঁস্তোরার মুখ্য আকর্ষণ। পরিবহণ বলতে ট্রাম ও মেট্রো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে শহরটাকে ।

বিকোচ্ছে পোশাক

শহরের সরু গলি

এক সপ্তাহ থাকার পর অদ্ভুত এক মায়া পড়ে যায় এই শহর তার রোদ ঝলমলে দিন আর মায়াবী রাতের ওপর। তাই ফিরে আসার সময় কেমন যেন এক মনখারাপের কষ্ট অনুভব হয় ! মন থেকে বলতে ইচ্ছে হয় আর যেন কেউ তোমাকে বঞ্চনা না করে। এমনই আনন্দে আর শান্তিতে থেকো বুদাপেস্ট!

 

Shares

Leave A Reply