রসিক বেড়াতে চলে গিয়েছেন, আমাদের জন্য তাঁর মনটি রেখে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অরিন্দম বসু

    সুব্রত মুখোপাধ্যায় যখন লিখতে শুরু করেছেন, তখন আমি বালকমাত্র। সাতের দশকের সেই সময়টা খুবই টালমাটাল, তার সামান্য স্মৃতি ছাড়া আর কিছু নেই। অনেক পরে যখন বই পড়ার অভ্যাস শুরু হল, তখনও বই বেছে নেওয়ার মধ্যে কোনও ধারাবাহিকতা ছিল না। সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর সময়ের অনেক লেখকের লেখাই পড়েছি বিচ্ছিন্নভাবে, আরও পরে। তার পর চেষ্টা করেছি গুছিয়ে পড়তে।

    আমি নিজে লেখালিখির চেষ্টা শুরু করেছিলাম নয়ের দশকের মাঝামাঝি। তার কয়েক বছরের মধ্যেই দেখতে পেলাম সেই সব লেখক, যাঁদের লেখা এতদিন নেড়েচেড়ে পড়ে এলাম, তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাচ্ছে। সুব্রতদার সঙ্গেও হল। আমরা যে ক’জন বন্ধু লিখতে এসেছিলাম বা লেখার ফলে বন্ধু হয়েছিলাম, তাঁদের মধ্যে যেন সুব্রতদাও এসে পড়লেন। অগ্রজ লেখক, দাদা এবং সবচেয়ে বড় কথা– তিনি আমাদের বন্ধু। হাস্যময়, রসিক মানুষটি মুখের কথায় লাগাম রাখতেন না। ফোনে, মুখোমুখি, আড্ডায়– কোথাও নয়। সমবয়সি কোনও বন্ধুর সঙ্গে কথা বললে যেমন হয় আর কি। গানে, গল্পে, কথায় ভরিয়ে দিতেন চারপাশ। সে সবের ভেতরে ছুঁয়ে থাকত তাঁর জীবন-দেখার সারসত্যটুকু।

    আনন্দময় মানুষ ও লেখক ছিলেন তিনি। সকালে, দুপুরে, গভীর রাতে যখনই ফোন করতেন, ওজনদার ঈষৎ জড়ানো গলায় প্রথমে বলতেন– ‘বাবু অরিন্দম, কেমন আছ?’ তার পরের প্রশ্নটিই হল– ‘নতুন কী লিখছ?’ এই যিনি নতুন লেখার কথা জানতে চাইছেন, তাঁর থেকে প্রায় পনেরো বছরের ছোট এক লেখকের কাছে, তাঁকে বন্ধু ছাড়া কীই বা বলা যায়!

    তিনি আমার ও আমার বন্ধুদের লেখা পড়লে বলতেন, তাঁর নিজের বন্ধুদের লেখা নিয়ে আলোচনা করতেন। কথা হত আরও অগ্রজদের লেখা নিয়েও। সব কাজের মধ্যেও সাহিত্যের খোলা দরজার চৌকাঠটিতে বসে থাকাই ছিল তাঁর একান্ত কাজ। তিনি মনে করতেন, নিজের লেখা নিয়ে কথা বলা প্রায় মৌনাবস্থারই প্রতিধ্বনি। বলতেন, ‘‘যত দিন যায়, ততই মনে হয় লেখার বিষ এবং বিষয় দুইই অফুরান। সব কিছু পড়ে আছে তোমার সামনে। একটি ছোট্ট ঘাস থেকে মহাবৃক্ষ, অথৈ সমুদ্র ও পাহাড়, গ্রহ-তারকাময় মহাকাশ, মানুষ, পোকামাকড়– কত কী। মানুষে-পাথরে-ধূলিকণায় প্রাণের প্রভেদ নেই। সেই যে বৈষ্ণব পদাবলির গানখানি আছে না, ‘কুসুমে প্রভেদ হইলেও কি হে মধুতে প্রভেদ হয়’।’’

    ঠিক এখান থেকেই বোধহয় সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের লেখা নিয়ে কিছু কথা বলা যায়। এখান থেকেই তাঁর লেখার মূল সুরটিও ধরতে পারা যায়। প্রায় গোড়ার দিকে লেখা তাঁর একটি গল্প ‘বলিপ্রদত্ত’। অন্য পার্টির ছেলেদের পাইপগানের গুলি অর্জুনকে জড়ভরত করে দিয়েছে। যে অর্জুনকে এখন ব্যবহার করছে তার নিজের পার্টি। অর্জুন নামের তেত্রিশ বছরের সেই যুবকের বিবাহিত জীবনের ভেতরে বারবার ভেসে ওঠে অবনীন্দ্রনাথের আঁকা সূর্যাস্তের ছবি। ‘সে ছবির বুকে কখনও ছায়া নামে না’। কিংবা ধরা যাক, ‘বাসভূমি’ গল্পটি। জয়ন্ত নামের লোকটি নিজের কেনা বাড়িতে এসেও কিছুতেই ভুলতে পারে না আগের ভাড়াবাড়ির কথা। তার স্বপ্ন ছিল বাড়ি সে তৈরি করবে একটি-একটি ইট গেঁথে। কেনা বাড়িতে, জমিতে আগে থেকে বসানো লেবুগাছে তাই তার সুখ নেই। আসলে, স্বপ্ন তো কেনা যায় না। তাকে তৈরি করতে হয়। তাঁর ‘নদীর রেখা’ গল্পটি পড়ুন। বউ তপতীকে নিয়ে পুরী যাচ্ছে বিলাস, সমুদ্র দেখতে। তার আগে সে এসেছে প্রভাতীর কাছে। যে প্রভাতী বিলাসকে ভালবাসে। বিলাস জানতে চায়, কী আনবে সে প্রভাতীর জন্য। প্রভাতী জানতে চায়, কী পাওয়া যায় সমুদ্রে। বিলাসের মনে পড়ে যায় সমুদ্রমন্থনে অমৃত আর বিষ– দুইই উঠেছিল। জানে না কোনটা নেবে সে।

    সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের অনেক গল্পেই ফিরে-ফিরে আসে পুরনো বাড়ি, গাছ, নদী, সঙ্গীত, মফস্বল শহরের আলো-অন্ধকার। ফিরে আসে তাঁর একদা বাসস্থান হালিসহর। আসে নৈহাটি, ব্যারাকপুর। এ সব কিছুর মধ্যে তিনি জড়িয়ে নেন মানবজীবনের অজ্ঞেয় রহস্যময়তা, সম্পর্কের ছোঁয়াছুঁয়ি। তাঁর লেখায় ইতিহাস এসে দাঁড়ায়। যে ইতিহাস বাঙালি-জীবনকে ভেঙেছে, গড়েছে। ঐতিহ্য-পরম্পরা কোথাও ‘উইয়ে খাওয়া বিকট ছবি’। আবার কোথাও তা জীবনের শিকড়। তার মধ্যে তিনি খুঁজে চলেন ব্যক্তিমানুষের, অতিসাধারণ নারী-পুরুষের জীবনযাপনের দৃশ্য। যদিও মাছের গা থেকে কাঁটা বেছে সরিয়ে রাখার মতো করে তিনি সরিয়ে রাখেন কাহিনিকে, গোদা গল্প বলার যে কোনও রকমের চেষ্টাকে। ‘অনধিকার’, ‘জোয়ার’, ‘বিশ্বরূপ’ কিংবা তেমন আরও আরও গল্প তার সাক্ষী হয়ে থেকে যাবে।

    অনেক লেখকই কাহিনির ভরসায়, চরিত্রের ব্যাখ্যায় ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের গল্প শুনিয়ে ক্ষান্ত থাকেন। কেউ হয়তো দেশ-কাল-সমাজকে বুড়িছোঁয়ার মতো করে ছুঁয়ে রাখেন। আবার কেউ এমনভাবে তা জোড়েন যে, ফাটলটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুব্রত মুখোপাধ্যায় মানুষকে, তার জীবনকে অনেক বড় প্রেক্ষিতে দেখিয়ে একা কোনও মানুষের গল্প বহু মানুষের কাহিনি হিসেবে তৈরি করেন।

    সুব্রত মুখোপাধ্যায় ও তাঁর বন্ধুরা যখন লিখছেন, ততদিনে পাঁচের দশকের অনেক লেখকই তাঁদের বেশ কিছু লেখা লিখে ফেলেছেন, যা নিয়ে কথা হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে, হইচইও হচ্ছে। তাঁদের সেই সব লেখায় স্বপ্নদর্শী অথচ বিভ্রান্ত মানুষের অবস্থানই প্রবল এবং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নাগরিক। সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন লিখতে এসে এমন একটি ধারা বেছে নিলেন, যা মূলত নাগরিক জীবনকাহিনির বৃত্তের বাইরে। তাঁদের দেখা এবং অভিজ্ঞতা নানা কারণেই পাল্টে গিয়েছে। বা বলা যেতে পারে, ওই সব অভিজ্ঞতাই মনে করিয়ে দিয়েছে যে, তাঁদের অন্যরকম করে দেখতে হবে। ফলে সব মিলিয়ে তাঁরা এমন লেখা লিখতে থাকলেন, যার সঙ্গে তাঁদের গুরুজন লেখকদের মিলল না। মধ্যবিত্ত টানাপোড়েন বা জটিলতা তখন অন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মাত্রায় পৌঁছেছে। সে সব আবিষ্কারের চেষ্টাও করেছেন কেউ-কেউ। তবে আটের দশক থেকে যে পটপরিবর্তন হবে, তা লেখার বিষয়বস্তুতে কতখানি থাবা বসাবে, তা কি কেউ আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। চারপাশে এ সবের যে ছবি ফুটে উঠছে, তারই এক-একটি খণ্ড সেই সময়ের অনেক লেখকের করতলে। তাঁদের মধ্যে সুব্রত মুখোপাধ্যায় আবার বেছে নিলেন সম্পূর্ণ অন্য একটি ধারা।

    উপন্যাসের কথাই যদি ধরা যায়। গল্পের মতোই সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস কোনও নিটোল কাহিনির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে না। গল্প হয়তো একটা গড়ায় কিন্তু তা নিখুঁত করে গড়ে তুলতে তিনি মনোযোগী নন। বরং তিনি বেছে নেন কয়েকটি চরিত্র, তাদের পারিপার্শ্বিক এবং সেই সব নিয়ে বুনে চলেন এক-একটি লেখা। যে কথা তাঁর বলার আছে তা তিনি ছড়িয়ে রাখেন গোটা উপন্যাসে। এ রকম লেখা খুব ব্যাপ্ত পাঠকপ্রিয় নয়। যারা উপন্যাসে কাহিনি পড়তে ভালবাসেন, এই ধরনের লেখা তাদের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এনে ফেলে। কাজেই সেই সব পাঠকের কাছে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের লেখা মনোরঞ্জক হয়ে ওঠেনি কোনও কালেই। তাতে অবশ্য কিছু যায়-আসেনি। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের পাঠকদের কাছে তো নয়ই, তাঁর নিজের কাছেও নয় নিশ্চয়ই।

    ‘পৌর্ণমাসী’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়বে। লেখার ভেতরে মন্তব্য করার জন্য বা নিজের কথা লেখায় নিয়ে আসার জন্য তিনি এমন একটি আঙ্গিক ব্যবহার করেন যা অনেকটা আমাদের পাঁচালি বা কাব্যে ব্যবহৃত। যেখানে বর্ণনা করতে করতে হঠাৎ একটি বা কয়েকটি পদ মন্তব্য হয়ে চলে আসে। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের লেখার বৈশিষ্ট্য এখানেই। এই রীতি তাঁর সমসময়ে বা পরেও কেউ নিয়েছেন বলে মনে হয় না। প্রায় প্রথম থেকেই তিনি এভাবেই লিখতে শুরু করেছিলেন, পরেও লিখেছেন।

    সংযমী থেকে এই আঙ্গিক বা ধারাটি তিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন তাঁর অন্য একটি উপন্যাস ‘মধুকর’-এ। সেখানে মধুকরও নৌকা তৈরির মতো প্রায় বিলুপ্ত এক জীবিকাকে আঁকড়ে ধরে রাখে, যেমন কিনা ধরে রাখতে চেয়েছিল পৌর্ণমাসী উপন্যাসের পূর্ণশশী। মধুকরে তিনি কখনও মিলিয়ে দেন চণ্ডীমঙ্গলের কাহিনি, রাজা প্রতাপাদিত্যের গল্প, কখনও বা মধুকরের ছোটছেলের বউ রঙিন সুতোয় কাপড়ের ওপর ফুটিয়ে তোলে পোড়ো শিবমন্দিরের দেওয়ালে দেখা সাবেকি বজরার চিত্র। পৌর্ণমাসীতে তেমন জুড়ে যায় প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচন, মেয়েমহলের মুখের ছড়া, বিয়ের গান, কবি ঈশ্বর গুপ্ত ও তাঁর পদ, কখনও বা মহাভারতও। ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে সঙ্গে নিয়েই সুব্রত মুখোপাধ্যায় তাঁর গদ্যের ধরনটিকে দেশজ করে তোলেন। ফলে কথকতার ভঙ্গির সঙ্গে মিশে যায় আমাদের চালু গদ্যের আঙ্গিক এবং তা তৈরি করে আবিষ্টতা।

    এই যে সহজিয়া কথার আড়ালে থেকে যাওয়া কোনও গভীর অর্থ, তার সার্থক চেহারাটি দেখা যায় তাঁর ‘রসিক’ উপন্যাসেও। যেখানে মানভূমের গান ও নাচ, অর্থাৎ সুর ও ছন্দ মিশে আছে রসিক ও নাচনির জীবনের সঙ্গে। যেখানে তরণীসেন প্রভঞ্জনের কাছে জানতে চায় রসিক কে। ঝুমুরগানের ওস্তাদ প্রভঞ্জন তখন বলে, রসিক সে, যে প্রেমের রসটি বোঝে। এই বোঝাবুঝি একজনেতে হবার নয়। তার জন্য রসিকার দরকার। সেই হল সাধনা। রসিক হল নাগর কালা আর নাচনি তার প্রেমময়ী রাধারানি। তার পর আরও একবার প্রভঞ্জন বলে, ‘উয়ারা মানুষের মতন বঠে, কিন্তু মানুষ লয়।’ এই লেখাটিতেও সুব্রত মুখোপাধ্যায় বিজুলিবালা ও পাণ্ডবকুমার আর দুলালি ও তরণীসেনকে নিয়ে এমন এক উপাখ্যান তৈরি করেছেন যা মাটির গন্ধ নিয়ে উঠে আসে আর বুঝিয়ে দেয়, জীবনের শেষে যদি মরণ থাকে তবে মাঝখানে আছে পিরিতি। মানুষের জীবনের মূল সুরটি যে সৃষ্টির, ধ্বংসের নয়, শিল্পের চেয়ে শাশ্বত যে আর কিছু নয়, তা তিনি পাঠকের মনে গেঁথে দেন। সেই সঙ্গে আরও একটি বিপরীত-দর্শনও মনে দাগ কাটে। কোনও কিছুই অমর-অক্ষয় নয়। সব কিছুকেই একদিন মুছে যেতে হবে, মুছে যেতে হয়।

    সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের অন্য উপন্যাস ‘আলতাপাতা’, ‘নিগড়’, ‘বীরাসন’, ‘রাজদরবার’ পড়লেও তাঁর লেখার বীজের জাতটি চেনা যায়। আর কে না জানেন, বীজের জাত ভাল হলে বৃক্ষ মহীরূহ হয়। রামপ্রসাদ ও তৎকালীন সময়কে নিয়ে লেখা ‘আয় মন বেড়াতে যাবি’ অথবা গিরিশ ঘোষকে নিয়ে লেখা ‘গিরিশদর্শন’ যিনি পড়বেন, তিনি আবিষ্কার করবেন লেখক যেন তাঁর লেখাটি থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছেন। অথচ গদ্যে ভরে দিয়েছেন অভূতপূর্ব প্রাণরস। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক যে কাঠামো মানুষের জীবনকে গড়ে তোলে সে সব জুড়েই কাহিনির অন্য এক বয়ান তৈরি করে রেখে গিয়েছেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। এক ফাঁসুড়েকে নিয়ে তিনি যখন উপন্যাস লেখেন– ‘নিখিলের অন্ধকার পাখি’, তখনও স্থিত থাকেন নিজের চিন্তা ও চেতনায়, যা কিনা বলে জীবনের কোথাও না কোথাও কোনও মহত্তর সত্য আছে।

    সুব্রতদার সঙ্গে মেলামেশার যে সব দিন, তা এখন স্মৃতি। তবে সেই স্মৃতি তাঁরই মতো আনন্দময়। সরকারি চাকরিতে যখন তিনি অতি উঁচু চেয়ারে বসে তখনও তাঁর কাছে গেলে কাজের ফাঁকে-ফাঁকে উঠে আসত লেখালিখি নিয়ে কথা। লিখতে না পারলে কষ্ট পেতেন। শরীরের ওপর যথেষ্ট অত্যাচার করেছেন। তার ফল ভুগতে হয়েছে তাঁকে। তবু কোনও কিছুর পরোয়া না করে আনন্দে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। গানের জন্য পাগল ছিলেন। তাঁর অনেক লেখাতেই গান এসেছে উচ্ছ্বাসের চেহারায়। ‘পরশপাথর’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করার সময়ে একবার তাঁকে বলেছিলাম, অমর পালের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা। একবাক্যে চলে এসেছিলেন। অমর পালের সঙ্গে দীর্ঘ সময় গল্প করেছেন, গান শুনেছেন, মানুষটিকে বুঝতে চেয়েছেন। অমর পালও চলে গিয়েছেন কিছুদিন আগে। জানি, ব্যারাকপুর আর টালিগঞ্জের মাঝখানে ভেসে যেত আর আসত অনেক কথা, বহুদিন পর্যন্ত। সাক্ষাৎকারের চেয়ে তা অধিকতর। যেমন কিনা সুব্রতদা ফোন করে বলতেন, ‘এবার এসো অরিন্দম, আমার বাড়ি। কত রকম ফুলের গাছ লাগিয়েছি। কী সুন্দর দেখাচ্ছে বাগানটা। আমি সারাদিন বসে-বসে দেখি।’ আবার কখনও বলতেন, ‘এই চৈত্রে এসো, আমার বাগানের আমগাছে কত বউল ধরেছে, দেখে যেয়ো।’

    সুব্রতদার সঙ্গে তো দেখা হল এ জীবনে কতবার। কখনও পয়লা বৈশাখের ভিড়ে ঠাসা কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায়। কখনও অসমের কোকরাঝাড়ের নির্জন বাংলোয়। একবার বাংলা অ্যাকাডেমিতে কথাসাহিত্য উৎসবের শেষদিনের অনুষ্ঠান ভেস্তে গিয়েছিল কালবৈশাখির দাপটে। বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়েছিল আমাদের অনেককে। খোলা মঞ্চে কেউ নেই। আলো নিভে গিয়েছে। সুব্রতদা গলা খুলে রামপ্রসাদী ধরলেন। তখন ভিজে হাওয়ার পিঠে চেপে উড়ে যাচ্ছে সব ঝরাপাতা। এই বোধহয় সত্যি। আলো তো নিভেই যায়। পাতাও ঝরে যায়। তবু লেখকের গান থামে না। লেখা সুরে বেজে ওঠে।

    সুব্রতদার সঙ্গে, আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক কথাকারের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা হল এক হাসপাতালে। তিনি তাঁর মতো করে বেড়াতে চলে গিয়েছেন। নিজের মনটি রেখে গিয়েছেন আমাদের জন্য।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More