সোমবার, নভেম্বর ১৮

পটের গ্রাম নয়া

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

কলকাতা থেকে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে উন্মুক্ত প্রকৃতির প্রাঙ্গণে এক অপূর্ব শিল্পের আঙিনায়। আজকের নয়া গ্রাম দেখলে কয়েক বছর আগের নয়াকে কল্পনাও করা যাবে না। সম্প্রতি প্রচারের আলো এসে পড়লেও দীর্ঘদিন প্রচারবিহীন হয়েও পটচিত্রের মতো পুরনো লোকশিল্পের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে নয়ার পটুয়া শিল্পীরা।

ত্রিশ থেকে চল্লিশ ঘর পটুয়াকে নিয়ে নয়াগ্রাম আর পাঁচটা গ্রামের মতোই অতি সাধারণ। কিন্তু অসাধারণত্ব ফুটে উঠেছে প্রতিটি বাড়ির রঙিন চিত্রিত দেওয়ালে। গ্রামের বৈশিষ্ট্য হল শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রত্যেকে রঙ তুলি নিয়ে পটের প্রাণ প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত।

অতীতে এদের ভিটেমাটি ছিল নন্দীগ্রাম, ঠেকুয়াচক, আকুরপুর ও তমলুকের মতো মেদিনীপুরের বিভিন্ন স্থানে। চার–পাঁচ যুগ আগে এ অঞ্চলে পট দেখাতে এসে এখানকার পট দেখার চাহিদায় ও মানুষের দানে গড়ে ওঠে আজকের গ্রাম নয়া। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত পুলিন চিত্রকর, দুখুশ্যাম চিত্রকর, শ্যামসুন্দর চিত্রকরের মতো আরও অনেকে পথ ছেড়ে ঘর বাঁধে। আস্তে আস্তে তারা তাদের নিজস্ব সমাজ সংসার গড়ে তোলে। হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের বাড়িতেই যেহেতু পট দেখানোর সূত্রে যাতায়াত তাই এরা দুই সম্প্রদায়েরই আচার-বিধি পালন করে থাকে। এরা নিজেদের বিশ্বকর্মার বংশধর মনে করে। আবার কোনও পটুয়ার মতে ফকির পটুয়া নামে এক চিত্রকর এক নরখাদক দৈত্যের ছবি এঁকে সেই দৈত্যকে বোকা বানিয়ে হত্যা করেছিল। সেই ফকির পটুয়া থেকেই এদের উৎপত্তি। গ্রাম বাংলার জনশিক্ষা ও গণসংযোগের দায়িত্ব এরা আদিকাল থেকে বহন করে চলেছে। পটচিত্রের ধারাবিবরণী শোনানো হয় গানের মাধ্যমে। গানের কথা ও সুর বংশানুক্রমে পটুয়াদের মুখে মুখে প্রচারিত। লোকশিল্পের এমন ধারা খুব কমই আছে যেখানে ছবি ও গানের মেলবন্ধন ঘটেছে।

পটের চাহিদা অনুযায়ী, সামাজিক ও ধর্মীয় এই দু’ধরনের বিষয় নিয়ে পট তৈরি হয়। বীরভূম, বাঁকুড়ার পটের থেকে নয়ার পটের বর্ণময়তা, উজ্জ্বলতা, ভাবনা–চিন্তা অনেক বেশি। পটচিত্রগুলিতে ব্যবহৃত হয় পরস্পর বিরোধী রঙ যাতে পট আরও উজ্জ্বল লাগে। আজও ওরা দেশীয় প্রথায়, যেমন – সেগুন গাছের পাতা থেকে লাল, অপরাজিতা ফুল থেকে নীল, গাছের পাতা থেকে সবুজ, হলুদ গাছের কন্দ থেকে হলুদ, কালোর জন্য ভুষো কালি আর কুসুম মাটি থেকে সাদা রঙ তৈরি করে নেয়। উজ্জ্বলতা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখতে ব্যবহার করে কাঁচা বেলের আঠা। তুলির জন্য আছে ছাগল বা কাঠবিড়ালীর লোম।

পট হয় দু’রকমের। (১) দীঘল পট বা জড়ানো পট (২) চৌকো পট। ক্যালেন্ডারের মতো পাকানো পটে উঠে আসে মূলত পুরাণভিত্তিক বিষয়। এগুলি প্রায় ১৫ থেকে ৩০ ফুট লম্বা। দ্বিতীয় পটগুলি ফ্রেমের মতো আয়তাকার বা বর্গাকার। এগুলি মঙ্গলকাব্য বা মহাকাব্য বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়, যেমন– সতী বেহুলা, পুতনা বধ, মাতা চণ্ডী, মনসা মাতা, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ইত্যাদি। গ্রামের মহিলা শিল্পীরা নিপুণ হাতে পটের বুকে ফুটিয়ে চলেছে মাছের বিয়ে, রাধাকৃষ্ণ, গণেশ, ধনদাত্রী লক্ষ্মী।

নয়ার পটের বিষয়বস্তু পুরাণাশ্রয়ী হলেও বর্তমানে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিও স্থান করে নিয়েছে। সমসাময়িক ঘটনার মধ্যে পণপ্রথা, স্বাক্ষরতা, ঘরে ঘরে শৌচালয় গড়ে তোলার পট মনকে নাড়া দিয়ে যায়। পটের গানে রয়েছে আদিম সারল্য ও কল্পনার সহজিয়া প্রকাশ। এইদিক থেকে তাদের সমাজ সচেতন শিল্পীও বলা যেতে পারে।

একটা কথা মনে রাখা দরকার যে পট আঁকার জন্য প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হলেও পোশাকে কিন্তু ব্যবহার করা হয় ফেব্রিক। শাড়ি বিক্রি হচ্ছে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকায়।  আর শার্ট বা সালোয়ার ৫০০ টাকা থেকে শুরু। পোশাক অনুযায়ী গলার মালা, কানের দুলও রয়েছে যাতে পটের ছবি আঁকা থাকছে। আজকের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের পশ্চাতে রয়েছে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগ। ২০১০ থেকে পটুয়ারা ঘর সাজানোর সামগ্রী বা পোশাকেও পটের ছবি আঁকা শুরু করে। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি।

নয়া গ্রামে যাওয়াটা খুব একটা দুরূহ নয়। ট্রেনে হাওড়া থেকে খড়গপুর বা মেদিনীপুরগামী লোকাল ট্রেনে বালিচক স্টেশন, তারপর ট্রেকারে নয়া প্রায় ২০ কিলোমিটার। গাড়িতে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে প্রথমে ডেবরা, ডেবরা থেকে বাঁদিকের রাস্তা ধরে বালিচক, বালিচক থেকে মুণ্ডমারি হয়ে পিংলার নয়া গ্রাম। বালিচক–ময়না রাজ্য সড়কের পাশেই নয়া।

কার্তিক মাসে এখানে একটি বাৎসরিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়। পুজোর কিছুদিন আগে থেকেই নয়ায় লোক সমাগম শুরু হয়। চলে দরদস্তুর, কেনাকাটা। কলকাতা থেকে আগত গাড়ির ভিড় লেগেই থাকে। পটুয়াদের হাতে তৈরি পোশাক পড়ার ইচ্ছে থাকলে একবার নয়ায় চট করে ঘুরে আসা যায়। বালিচকে থেকেও জায়গাটি ঘুরে দেখা যায়।

নয়ায় থাকতে চাইলে অতিথিবৎসল পটুয়াদের বাড়িতে কিংবা রিসোর্স সেন্টারে। থাকা খাওয়া নিয়ে মাথাপিছু খরচ ৬০০-৮০০ টাকা।

যোগাযোগ

মন্টু চিত্রকর, চলভাষ-৯৭৩২৭৩১৭৭৬।

বালিচকের হোটেল:  সামন্ত গেস্ট হাউস, চলভাষ-৯৪৩৪৪১৪৪৬৭।

গত শুক্রবারের ভ্রমণ ছিল পুরুলিয়ায়

বাহা পরবে ভ্রমণ

Comments are closed.