রবিবার, নভেম্বর ১৭

শান্তিনিকেতনের নীরব খোয়াইয়ের সৌন্দর্য ধরা দেয় যে বারান্দায়

  • 1.3K
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

চৈতালী চক্রবর্তী

শাল, আকাশমণির জঙ্গল পেরিয়ে সরসরিয়ে রাস্তা চলে গেছে কিছুটা ভিতরে। সবুজে চোখ সয়ে গেলে নরম রোদের গন্ধ মাখা বাড়ি দু’টো চোখে পড়বে দূর থেকেই। পাশাপাশি, গা ঘেঁষা গাছের সারির খোয়াইকে পিছনে রেখে একটু এগোলেই শান্তির নীড়। যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, টুপটাপ শিশিরের আদর মেখে প্রাণ ভরে টেনে নেওয়া যাবে তাজা বাতাস। শান্তির এই নীড়ের নামই তো শান্তিনিকেতন। আর শান্তিনিকেতনে গিয়ে শান্তি খোঁজা পর্যটকদের জন্য দু’হাত বাড়িয়ে রয়েছে গীতবিতান আর সঞ্চয়ন। ‘বেলাশেষে’র দিনগুলি এখনও স্মৃতিমাখা হয়ে রয়ে গিয়েছে এই বাড়ি দু’টির আনাচ কানাচে।

আমরা একসময় শান্তিনিকেতন বলতে বুঝতাম বিস্তীর্ণ লাল মাটির খোয়াই, কোপাই নদীর কোল ঘেঁষে শাল, আকাশমণির জঙ্গল। হেমন্তের শিরশিরে হাওয়া নিরিবিলি কোপাইরের চরে শাল বনে পাতায় পাতায় মর্মর ধ্বনি তুলে ফিসফিস করে শান্তির কথা বলে যেত। রবীন্দ্রনাথ তাই হয়ত বলেছিলেন, ‘আমাদের শান্তিনিকেতন আমাদের সব হতে আপন।’ কবির লেখনীতে হোক বা মানুষের স্মৃতিপটে, শান্তিনিকেতনের যে সৌন্দর্য, ভাস্কর্য এতদিন আমাদের মনে গাঁথা ছিল, তেমনটা কি আর সত্যি আছে? মানুষের ভিড়ে হারানো সেই খোয়াইয়ের উপরে আড়ে বহরে বেড়ে উঠেছে নব্য শান্তিনিকেতন।

দীঘা, মন্দারমণির মতোই শান্তিনিকেতনে এখন সপ্তাহান্তের ভিড়। গিজগিজে ট্যুরিস্ট লজ, হোটেল-রেস্তরাঁর মাখামাখি, উৎসব-পার্বণের হই হট্টগোল। টোটোর ফাঁকফোঁকড় দিয়ে সেই চেনা নিস্তব্ধতাটাই হারিয়ে গেছে। লাল কাঁকুড়ে টিলা-পাহাড়ে মেশা সেই শান্তিনিকেতন, তালতোড়, প্রান্তিক স্টেশনের কাছের সেই ফাঁকা-ফাঁকা ব্যাপারটাই এখন আর নেই। তবুও বাঙালির শিকড়ের টান বলে কথা। পরিবেশে যতই বদল আসুক শান্তিনিকেতন কি আপনাকে টানে না? শাল-সেগুন-আকাশমণির ছিমছাম নিরিবিলির খোঁজ পেতে হলে তাই যেতে হবে শ্যামবাটি থেকে কিছু দূরে, গোয়ালপাড়ার রাস্তা ধরে লাল কাঁকুড়ে মাটির দেশে। গীতবিতান আর সঞ্চয়ন দেবে পৌষের গন্ধ মাখা পুরনো শান্তিনিকেতনের স্বাদ।

একটা সময় ছিল যখন শান্তিনিকেতনের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছিল খোয়াই। বাঙালির কাছে খোয়াই মানেই হল একটা সেন্টিমেন্ট। কংক্রিটের জঙ্গলে হাঁসফাস করে সে চেনা খোয়াই এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। সোনাঝুরি হাটেও ঠাসাঠাসি ভিড়। কনকনে ঠাণ্ডায় জমাটি হাট যদিও মন্দের নয়, তবুও একটু নিশ্চিন্তে, চারপাশ ভুলে বারান্দায় বসে সবুজ আর সবুজ দেখতে কোন বাঙালি না ভালোবাসে, যেখানে দিগন্ত বিস্তৃত জঙ্গলে পাখনা মেলবে ভাবনারা, তেমনি পরিবেশ গীতবিতান আর সঞ্চয়নে, বলা যায় ছুটি কাটানোর জন্য এক্কেবারে ‘unique’।

‘বেলাশেষে’ ছবি নিশ্চয়ই অজানা নয়। ছবির শ্যুটিং হয়েছিল এই বাড়িতেই। পর্যটকদের কাছে হোম স্টে হলেও বাড়ি দু’টিকে শান্তির আশ্রয় বলতেই বেশি ভালোবাসেন এদের দায়িত্বে থাকা প্রিয়ব্রত পাল (যোগাযোগের জন্য- ৯৮৩১০৪৮১৬৫)। তিনি জানালেন, সৌমিত্র-স্বাতীলেখার সেই বাড়ি যা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল সেটা পালা করে শ্যুট হয়েছিল গীতবিতান আর সঞ্চয়নে।ছবিতে দেখা আর বাস্তবে দেখার মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই।

দোতলা বাড়ি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বারান্দায় বসলে চোখ আটকে যাবে শাল-আকাশমণির জঙ্গলে। হই হট্টগোলের বালাই নেই। গাছগাছালির মিঠে গন্ধ অবসাদকে বলবে গুডবাই। খুঁটিনাটি খেয়াল রাখার জন্য কেয়ারটেকার হাজির থাকবেন সর্বক্ষণ। বারান্দায় বসে এক পেয়ালা চা হাতে নিয়ে যতখুশি প্রকৃতি দেখুন। রান্নাও একবারে বাড়ির মতোই। হেঁশেল থেকে ভেসে আসা পাঁচফোড়নের গন্ধের সঙ্গে নিঃসঙ্গ প্রকৃতি একেবারে মিলেমিশে যাবে। পিঁয়াজ-রসুন দিয়ে কষা তুলতুলে মাংস মুখে পুড়ে মনে হবে এক্কেবারে মায়ের হাতের রান্না। সময়মতো আপনার পছন্দের খাবার চলে আসবে টেবিলে। পুরোপুরি ঘরোয়া পরিবেশ।

গোধূলির শান্তিনিকেতন যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন, খোয়াই সেখানে ছায়া ছায়া আলো–আঁধারির রূপকথা। মন উদাস করা বাউলের গানে, এক অলৌকিক জগতে ফিরে যাওয়ার ডাক। শহুরে জীবনের ক্লান্তি ছেড়ে গ্রামবাংলার নীরবতাকে উপভোগ করতেই শান্তিনিকেতনে ছুটে আসেন মানুষজন।

প্রিয়ব্রত বাবু নিজে একজন ইন্টিরিয়ার ডিজাইনার। বাড়ি দু’টির খুঁটিনাটি সাজসজ্জার খেয়াল রাখেন। বললেন, ‘‘সপ্তাহান্তে শুধু নয়, গোটা সপ্তাহ ধরেই মানুষজনের ভিড় লেগে থাকে। ইদানীং বয়স্ক মানুষদের ভিড় বেশি। অনেকেই দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘর বুক করে রাখেন। বারান্দায় বসে খোয়াইয়ের রূপ দেখতে ভালোবাসেন তাঁরা। সংসার থেকে ছুটি নিয়ে বিশ্রামও হয়ে যায়।’’ তাঁর কথায়, সব বয়সেরই আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে শান্তিনিকেতন। কলেজ পড়ুয়া থেকে সদ্য বিবাহিত দম্পতি, গীতবিতান ও সঞ্চয়ন ধীরে ধীরে পছন্দের জায়গা হয়ে উঠছে সকলেরই। আর ‘বেলাশেষে’ ছবির কথা মাথায় রেখেও সপ্তাহান্তে এখানে ঢুঁ মেরে যান অনেকেই।

শান্তিনিকেতনে গেলেই বিশ্বভারতী মাস্ট। অথবা উৎসবের দিনে সমাবর্তন, দোল, বর্ষবরণ বা বর্ষামঙ্গল। শান্তিনিকেতনে পার্বণ লেগেই থাকে। কিন্তু কখনও যদি মনে হয়, এ বার শুধুই শান্তির-নীড়ে আরণ্যক পরিবেশকে দু’চোখ ভরে দেখবো, তার গন্ধ মাখবো সারা গায়ে তাহলে গীতবিতান বা সঞ্চয়ন ছেড়ে যেতেই ইচ্ছে করবে না। একদিকে বাড়ির মতো আরাম, অন্যদিকে শিল্পীর তুলির টানের মতো প্রকৃতি, মন হয়ত বলে উঠবে, ‘শান্তিনিকেতন আমার সব থেকে আপন।’

Comments are closed.