মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

হোলির আনন্দে হবিবপুর

 

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

 

কী ভীষণ দমবন্ধ করা জীবন আমাদের! কোনওদিকে তাকানোর ফুসরত নেই। তবু ফাল্গুন শেষের উচাটন হাওয়া সকাল সন্ধ্যা কানের কাছে বলে চলেছে, মনে নেই? কাল মধুমাস!

পাতা ঝরার দিন। পথের ধারে ছড়িয়ে থাকা সজনের সাদা ফুল, গাছের শুনশান শাখায় পলাশের অতর্কিত ঘোষণা। এমন সময়েই তো হতে পারে আগুনের উৎসব, মালিন্য থেকে উজ্জ্বলতায় উত্তরণ ––  বাংলার চাঁচর উৎসব। চৈত্রদিনে মধ্যদুপুরের মায়ায়, খরশান রৌদ্রে কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় রঙিন প্রকৃতির সুর আবিরে ছুঁইয়ে মেতে ওঠা আনন্দে।

দোল মানেই শান্তিনিকেতন –– ভাবনাটা এখন নিতান্তই ক্লিশে। বরং চোখ ফেরানো যাক অন্যত্র, যাওয়া যাক আমাদের রাজ্যেরই এমন এক জায়গায় যেখানে কৃত্রিম রঙ নয়, দোল খেলা হয় প্রকৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার ফুল দিয়ে। জায়গাটি খুব বেশি দূরে নয়। নদিয়া জেলার হবিবপুরে ইসকনের গৌরধাম মন্দির।

গৌরধাম মন্দিরটি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের আদর্শেই গড়ে উঠেছে। এই মন্দিরটির জন্যই নদিয়ার মানচিত্রে নতুন ভাবে স্থান করে নিয়েছে হবিবপুর। এই এলাকায় গোপ সম্প্রদায়ের মানুষজন উৎকৃষ্ট ‘হবি’ বা ঘি উৎপাদন করতেন। এই ‘হবি’ থেকেই হবিবপুর। ভিন্ন মত অনুযায়ী, এই অঞ্চলে মীর মহম্মদ নামে একজন পির বাস করতেন। তাঁর গুরু হবিব–এর নামানুসারেই এলাকার নাম হয়েছে হবিবপুর।

হবিবপুরের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ইসকনের জগন্নাথ মন্দির। মন্দিরটি যেমন বিশাল তেমনই সুদৃশ্য। জগন্নাথের বিগ্রহটি এত সুন্দর যে চোখ ফেরানো যায় না। অপলকে শুধু তাকিয়ে থাকতে হয়। যেমন মূর্তি তেমনই তার বসন–ভূষণ, ফুলের সাজ। সঙ্গে রয়েছে সুসজ্জিত রাধা–কৃষ্ণের বিগ্রহ। প্রতিদিনই এখানে মঙ্গলারতি থেকে সন্ধ্যারতি। ঠাকুরের ভোগ ও নিত্যপূজা হয় এখানে।

মন্দিরের রথযাত্রা ও দোল উৎসব পালিত হয় মহা সমারোহে। দোলের দিন ভোর থেকেই সাজো সাজো রব। গাড়ি গাড়ি ফুলে মন্দির চত্বর ভরে ওঠে। দর্শনার্থী ও যে প্রভুরা এখানে থাকেন তারা সকলেই বৃন্ত থেকে ফুল কুচিয়ে জড়ো করেন। তারপর সেই কুচনো ফুল দিয়ে প্রভুপাদ, জগন্নাথ ও শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দোল খেলা হয়। একইসঙ্গে চলতে থাকে ঠাকুরের নামগান ও কীর্তন। বিশাল মন্দির চত্বরে কমলা ও হলুদ গাঁদার আলপনা হয়ে যায়। উপস্থিত সকলে সেই ফুল দিয়ে একে অপরের সঙ্গে দোল খেলায় মেতে ওঠেন। এক অপার্থিব আনন্দে আচ্ছন্ন হয় পরিবেশ। দেখা যায় বহু মা–বাবা সেই ফুলের মধ্যে শুইয়ে দিয়েছেন তাঁদের শিশু সন্তানকে, ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রাপ্তির আশায়।

দোলের দিন রঙ খেলা, আবির খেলা, রঙের আনন্দে মাতোয়ারা হওয়া এসবই তো দোলোৎসবের অঙ্গ, সব জায়গাতেই থাকে কিন্তু ফুল দিয়ে দোল খেলা এই মন্দিরের সেরা প্রাপ্তি। ফুলের মধ্যে দিয়েই যেন বয়ে যায় ভালোবাসা ভালোলাগার স্রোত। এরপর স্থানীয় সকলকে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। অতিথিদের অবশ্য কুপন কাটতে হয় ভোগ প্রসাদের জন্য। জগন্নাথদেবকে ছাপান্ন রকমের ভোগ নিবেদন করা হয়। সেই ভোগ প্রসাদ সবাই পায়।

দুপুরে প্রসাদ গ্রহণের পর শুরু হয় যজ্ঞ। সুবিশাল যজ্ঞবেদি। যাঁদের মানত থাকে তাঁরা সেই বেদির চারপাশে ঘিরে বসে আগুনে ঘি আহুতি দিতে থাকেন। মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খনাদ, উলুধ্বনিতে পুরো মন্দির তখন গমগম করতে থাকে।

যজ্ঞ শেষ হতে হতে প্রায় সন্ধ্যা। আকাশে তখন পূর্ণিমার গোল চাঁদ আবিরের রঙ ছড়িয়ে তার মায়াজাল বিস্তার করে চলেছে। এদিকে মন্দিরে শুরু হয়ে গেছে সন্ধ্যারতি। সন্ধ্যারতির পর নামকীর্তন, গানের জলসা, নাটক হতে থাকে একের পর এক। ধূপ–ধুনোর ধোঁয়ায়–গন্ধে, প্রদীপের আলোয় নামকীর্তনে পরিবেশ তখন এক অন্য লোকে পাড়ি দিয়েছে। সারাটা দিন যে কোথা থেকে কেটে গেল বোঝাই যায় না। দোল উৎসবের এ এক অসামান্য অভিজ্ঞতা যা সারা জীবনের সঞ্চয় হয়ে থেকে যাবে।

তবে আর দেরি কেন। শিয়ালদা থেকে শান্তিপুর লোকাল ধরে হবিবপুর। স্টেশন থেকে রিকশ ধরে গৌরধাম। গাড়ি বা বাসে গেলে ৩৪ নং জাতীয় সড়ক ধরে রাণাঘাট পেরিয়ে হবিবপুর বিডিও অফিস। সেখান থেকে বাঁ দিকে হবিবপুর ইসকনের জগন্নাথ মন্দির। থাকতে চাইলে অবশ্যই থাকা যায় কারণ মন্দির কমিটির সুন্দর গেস্ট হাউস রয়েছে। আধুনিক ভাবে অতিথিশালাটি সুসজ্জিত। রথ বা দোলে থাকতে আগে থেকে বুকিং করে রাখতে হয়। সকালে দুপুরে রাতে খাবার ব্যবস্থা আছে তার জন্য কুপন কাটতে হবে।

 

হবিবপুর ইসকন মন্দিরের যোগাযোগ

(03473) 281150/ 281226/ 94340 56092

আরও পড়ুন

পাথরা

Shares

Comments are closed.