বাহা পরবে ভ্রমণ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    সুনীল আকাশে রূপোর গলানো পাতে স্নান করে চাঁদ তার মায়াবী দ্যুতিতে চারিদিক ভাসিয়ে দিচ্ছে। দুপাশে পড়ে আছে ফসলহীন বিস্তীর্ণ ন্যাড়া মাঠ। মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে সটান। সেই আলো–আঁধারি রাস্তার বুকে এগিয়ে চলেছে ম্যাজিক গাড়ি ছয়জন সওয়ারিকে নিয়ে। একজনের সুরেলা মিষ্টি গলায় হাল্কা ভাবে ভেসে আসছে- চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে…। গানের রেশ, চারিদিকের মায়াবী পরিবেশ সর্বোপরি সদ্য ফেলে আসা পরিবেশের স্মৃতি আর পাঁচজনকে বিবশ করে রেখেছে। সবার মনেই ফেলে আসা ঘটনার চোরা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ঘটনাটি একটু বিশদে বলা যাক।

    দোলের ছুটি সম্বল করে বেরিয়েছিলাম পুরুলিয়ার উদ্দেশে। পুরুলিয়ার বাগমুন্ডিকে খুঁটি করে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো আর তত্ত্বতালাশ চালানো কোন গ্রামে বাহাপরব হচ্ছে। বাহা মানে ফুল- এটুকু জানাকে সম্বল করে এগিয়ে যাওয়া।

    দোল মানেই বসন্ত আর বসন্তের প্রতীক হল পলাশ। ভূভারত চষে ফেললেও বসন্তে পুরুলিয়ার  রূপের তুলনা মেলা ভার। রাঢ় বাংলার টাঁড় জমিনের রুখা ভূমি পুরুলিয়াকে মাতিয়ে তোলে সুন্দরী পলাশেরা। মাঠ জুড়ে শুধু পলাশ আর পলাশ। যত্রতত্র অকৃপণ ভাবে ফুটে থাকে পলাশ। পায়ে লাল, মাথায় লাল, লালও ঠিক নয় ,লাল আর কমলার মাঝামাঝি একটা অদ্ভুত রঙে পলাশের লেলিহান শিখায় চারিদিক যেন জ্বলতে থাকে। তাই ফাগুনের আগুন পেতে যেতে হবে পুরুলিয়ায়।

    বরাভূম স্টেশনে নেমে বাগমুন্ডি যাওয়ার পথেই পড়েছিল পাখি পাহাড়। গোটা একটা পাহাড়ের নাম বদলে হয়ে গেছে পাখি পাহাড়। পাহাড় কেটে একঝাঁক পাখির আদল দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন সরকারি আর্ট কলেজের ছাত্র চিত্ত দে। এলাকার ৩১ জন তরুণকে নিয়ে কাজ শুরু হলেও বর্তমানে তা বন্ধ আছে নানাবিধ কারণে। আমরা তো পাখি পাহাড় দেখতে  ব্যস্ত, দূর থেকে মনে হয় একঝাঁক উড়ন্ত পাখি। হঠাৎ লক্ষ্য করি মুন নেই। দূরে পলাশ গাছের তলায় উবু হয়ে বসে কি যেন করছে। পলাশ গাছের তলাটা দেখে মনে হচ্ছে কে যেন সিঁদুর ছিটিয়ে দিয়েছে। গাড়িতে ওঠার পর আবিষ্কার করলাম পলাশ ফুলে বোঝাই একটা প্যাকেট। পরের দিন দোলের সকালবেলায় সে ফুল তোলার রহস্য বোঝা গেল যখন সকলের হাতে, গলায় পলাশের মালা দুলে উঠল। প্রায় সারা সন্ধে জুড়ে মুন ব্যস্ত ছিল পলাশের মালা গাঁথায়। ফাগুনের নবীন আনন্দ এভাবেই সকলের বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দিল মুন।

    দোলের দিন অযোধ্যার এ গ্রাম ও গ্রাম ঘুরে দু–একটা বাহা উৎসব দেখলাম ঠিকই কিন্তু মন ভরল না। মনে হল কিছুটা কৃত্রিমতার রং লেগেছে। খবর পাওয়া গেল ২৫ কিলোমিটার দূরে  আমাগাড়া গ্রামে বাহা উৎসব পালিত হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি স্টার্ট দিল। যেতে যেতেই বিকেল হয়ে গেল। দূর থেকে বুকের রক্ত চলকে ওঠা ধামসা, মাদলের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।  নিটোল ভাবে নিকানো অপূর্ব রঙের আলপনা আঁকা সার দেওয়া পরিচ্ছন্ন মাটির বাড়ি  পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম একটা বড় মাঠে। মাঠের এক কোণে মারাংবুরুর থান। মাঠের চারদিকে  শাল পলাশের জঙ্গল। মাঠে তখন গোল হয়ে লাল পাড় শাড়ি–ধুতি পরিহিত পুরুষ–মহিলারা নেচে চলেছে। প্রায় দেড়শ জন। মারাংবুরুর থানে পুজো হয়েছে। আস্তে আস্তে সবাই পুজোর  জায়গা ছেড়ে নাচতে নাচতে গ্রামের অভিমুখে এগুতে লাগল। দূরে আগুনঝরা পলাশের জঙ্গলে তখন সূর্য তার শেষ রং ছড়িয়ে অস্ত যেতে বসেছে। মূল পুরোহিতের মাথায় ঝুড়িতে একটা  ঝাঁটা উঁকি দিচ্ছে। সে একে একে প্রতিটা বাড়ির সামনে দাঁড়াচ্ছে আর বউ মেয়েরা তার পায়ে তেল লাগিয়ে হাঁটু থেকে পা ধুইয়ে দিচ্ছে জল দিয়ে। পা ধোয়ানো হয়ে গেলে সে তার ঝুড়ি থেকে একটা করে মহুয়া ফুল তাদের দিচ্ছে। এই ফুলের স্পর্শে নাকি তাদের যাবতীয় পাপের মুক্তি ঘটবে।

    একটা ফাঁকা জায়গায় মঞ্চ বানানো হয়েছে। বাহা উৎসবকে কেন্দ্র করে চলবে গানবাজনার উৎসব। এই উৎসবের সেক্রেটারি আমাদের আহ্বান জানালেন তাদের বাড়িতে। বাড়ির বাইরেটা দেখে ভেতরটা কল্পনা করা কঠিন। ছোট দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখি গোয়াল এবং সেখানে কটি গরুবাঁধা রয়েছে। গোয়াল পেরিয়ে রান্নাঘর, তারপরে বেশ বড়সড় উঠোন। বাড়ির বউ মেয়েরা আমাদের দেখে তাড়াতাড়ি করে উঠোনেই বেশ কয়েকটি খাটিয়া পেতে দিল বসার জন্য। বসার পরে বাড়ির একটি বউ একটি ঝকঝকে কাঁসার ঘটি নিয়ে এসে মাটিতে বসাল। ঘটি ভর্তি জল তার উপরে সবুজ আমপল্লব। তারপর বউটি যা করল তাতে আমরা সবাই লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম যন্ত্রের মত। কারণ সে তখন মাটিতে মাথা  নুইয়ে আমাদের প্রণাম করতে ব্যস্ত। আমাদের হতচকিত অবস্থা দেখে বাড়ির বয়স্ক ব্যক্তি বুঝিয়ে বললেন, এটাই আমাদের রীতি, এতে কুণ্ঠিত হওয়ার কিছু নেই। বাড়িতে অতিথি এলে আমরা এভাবেই আপ্যায়ন করে বলি, ”নাই বা দিলাম অন্নজল, দিলাম শুধু ঘটিটুকু জল।” আমরা বাক্যহারা। ‘অতিথি দেব ভব’র এরকম রূপ আমাদের কাছে একেবারে নতুন। তারপরে এল চা বিস্কুট। কথায় কথায় বাহা পরবের যে লোকগাথা রয়েছে সেটি উঠে এল।

    ধরিত্রী মায়ের একটি মেয়ে বিন্দি। সে ভারি মিষ্টি। একদিন সে জঙ্গলে হারিয়ে যায়। মেয়ের শোকে মা ক্রমশ মুহ্যমান হয়ে পড়ে। সৃষ্টির প্রতি তার অনীহা গ্রামের আদিবাসী মানুষজনকে ভীত করে তুলল। কারণ ধরিত্রী যদি সৃষ্টির প্রতি বিমুখ হন তাহলে প্রকৃতি বন্ধ্যা হয়ে যেতে বাধ্য। ফুল–ফল কিছুই হবে না, পড়ে থাকবে শুধু ঊষর জমি। আস্তে আস্তে সব কিছু অবলুপ্ত হয়ে যাবে। উপায়ান্তর না দেখে আদিবাসীরা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল বিন্দির খোঁজে। অবশেষে এক কঠিন জায়গায় তাকে পাওয়া গেল। দেখা গেল যমরাজা বিন্দিকে আটকে রেখেছেন। অনেক অনুরোধের পর যমরাজা বিন্দিকে ছাড়তে রাজি হলেন তাও শর্তসাপেক্ষে। ছয়মাস বিন্দি থাকবে যমরাজের কাছে আর ছয়মাস থাকবে তার মায়ের কাছে। এই শর্ত মেনে নিয়ে বিন্দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হল তার মায়ের কাছে। মা ধরিত্রী হারানো নিধিকে পেয়ে  প্রচণ্ড খুশি হয়ে পুনরায় সৃষ্টিতে মন দিলেন। এল ফুলে ফুলে ভরা বসন্তকাল। এই সময়ই বাহা  উৎসব। বিন্দিকে যখন যমরাজার কাছে ফিরে যেতে হয় তখন আদিবাসী সমাজ আর একটি বিদায় উৎসব করে যার নাম সহরায়। গল্পটি শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে ভাবছিলাম প্রকৃতি এবং মানুষের অচ্ছেদ্য বন্ধনের গল্প কত সরল ভাষায় এই লোকগাথায় লুকিয়ে রয়েছে যা আদিবাসী সমাজ সযত্নে বুকে লালন করে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

    প্রকৃতিকে ছেড়ে পলাশকে ছেড়ে এগিয়ে চলেছি আমরাও আর এক আবর্ত – দৈনন্দিনতার দিকে। ভেসে আসছে কানে …হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙা পলাশ ফুল, এনে দে, এনে দে…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More