শনিবার, এপ্রিল ২০

পদ্মাপারে ইলিশ ভ্রমণ

অনার্য তাপস

সেই গল্পটা শুনেছেন তো? সেই যে, এক জামাই অনেক শখ করে ইয়া বড় এক পাঙ্গাস মাছ নিয়ে রাতের বেলা শ্বশুরবাড়ি হাজির। শাশুড়ি পাঙ্গাস দেখে খুব খুশি। তবে তিনি ভাবলেন, এখন যা আছে জামাই তাই দিয়ে খাক। আমি বরং কাল জম্পেশ করে রেঁধে দেব। জামাই খেতে বসে আর পাঙ্গাস পায় না! কথাটা কাউকে বলতেও পারছে না। কষ্ট করে সেই শাকপাতা দিয়েই খেয়ে ফেলল।

মধ্য রাতে জামাই স্বপ্ন দেখছে, শাশুড়ি পুরো পাঙ্গাস একলা খেয়ে ফেলছে! ঘুমের ঘোরেই জামাই চেঁচিয়ে উঠলো— পাঙ্গাস…

পাশের ঘর থেকে শাশুড়ি বললো— কাল খাস।

-পাঙ্গাস…

-কাল খাস।

আমার অবস্থা হয়েছে সেরকমই। ফ্রিজে একেকটা প্রায় সোয়া কেজি ওজনের চারটে ইলিশ শুয়ে আছে হিম হয়ে, আর আমি হোটেলের খাবার কিনে খাচ্ছি! মাঝে মাঝে ফ্রিজ খুলে দেখছি— তারা আছেন। খেতে পারছি না, কারণ ইলিশ প্রসেস করাটা আমার পক্ষে ইয়ে, মানে একটু কঠিন। আমার এখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে— ইলিশ, ইলিশ।
আর শুনতে ইচ্ছা করছে কেউ বলছে— কাল গিলিশ!

ছুটির দিনগুলো বেশ নিরামিষ কাটছিলো কিছুদিন থেকে। বউ-বাচ্চা গ্রামের বাড়ি আম-কাঁঠাল খেতে। আর আমি বাসায়, অফিস করি, ঘুরিফিরি, ঘুমাই, অফিস করি। বিবাহিত ব্যাচেলরের বড্ড একঘেয়ে ছুটির দিন সেসব। হঠাৎ খুব স্নেহের ছোটভাই ফোন করে বললো— আইতাছি ভাই। মাওয়া যামু, ইলিশ খামু। আমি দু’পায়ে ভর দিয়ে বললাম— আয়। ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে কোথাও যেতে আমার ভালো লাগে না, সত্য। এই জ্যাম ঠেলার চেয়ে ছুটির দিনের ঘুমটা বেশি আরামদায়ক। কিন্তু ভরা মৌসুমে ইলিশ খাবো না! তাও আবার মাওয়া ঘাটে? মাইরি বলছি, এতটা পাষাণ হৃদয় হতে পারিনি এখনও। যাইহোক, স্নেহের ছোটভাই চলে এলো সুদূর নরসিংদী থেকে। ঠিক হলো শনিবার ছুটি, সেদিনই হবে অভিযান।

সকাল ৬টায় উঠে রেডি। অটো করে গুলিস্তান মোড়। ‘ইলিশ’ নামক এক বাসে উঠে ১ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম মাওয়া ঘাট— পদ্মার একেবারে তীরে। সকাল নটা। বাস থেকে নেমেই খোঁজ খোঁজ। কোথায় ইলিশ পাবো? পুরো লঞ্চঘাট খুঁজতে শুরু করলাম দু’জনে মিলে। হঠাৎ করে মাথায় এলো, আমরা সকাল থেকে কিছু খাইনি। অবশ্য সেই ভোরবেলা, গুলিস্তান মোরে দুই গ্লাস মাঠা আর দুই দলা ছানা খেয়েছিলাম আমরা দু’টিতে মিলে। বাসের ঝাঁকুনিতে সেসব কোথায় উড়ে গেছে! খুঁজে পেতে ট্রাক স্ট্যান্ডের দিকে একটা হোটেলে ঢুকলাম। পরিষ্কার হয়ে বসে অর্ডার দিলাম— গরম ভাত, ইলিশ মাছ ভাজা আর চাকা চাকা করে কাটা বেগুন ভাজা। পিসও পছন্দ করা যাবে ইচ্ছে মতন। ছোট ভাই গিয়ে ইলিশের পিস পছন্দ করে দিয়ে এলো। বসে আছি। উপরে টিনের চালা আর নিচে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা হোটেলটা একেবারে পদ্মার তীরে। দু’তিন হাত দূরেই পদ্মা— বর্ষায় প্রমত্তা! ভয়ঙ্করী! এই টালমাটাল যুবতী পদ্মার বুকে এক খণ্ড কাঠের পাটাতনে চড়ে দুঃসাহসী কিছু মানুষ রাতের পর রাত জেগে,  হু হু বাতাসে দরদরিয়ে ঘামতে ঘামতে তুলে আনে রূপালী ফসল— ইলিশ। সে যে কী কষ্টসাধ্য কাজ, যারা আমরা ইলিশ খেতে যাই মাওয়া ঘাটে, তাদের কাছে সেই কষ্টের কোন বিহাইন্ড দ্য সিন থাকে না। না থাকাই ভালো। থাকলে আর খেতে পারতাম না। যারা সমরেশ বসুর গঙ্গা  কিংবা আবদুল জব্বার এর ইলিশমারির চর  পড়েছেন তারা কিঞ্চিৎ বুঝতে পারবেন।

আষাঢ় মাস চলছে। তবে আজ মেঘ থাকলেও সকাল থেকে বৃষ্টি নেই। ভীষণ বাতাসে মাঝ পদ্মায় দুলতে থাকা নৌকা, স্পিডবোট, ট্রলার আর লঞ্চ দেখতে দেখতে মন কেবলি উদাস হয়। পদ্মা-মাঝি-নৌকা-ইলিশ-কুবের-কপিলা- সৈয়দ মুজতবা আলী-গোয়ালন্দ ঘাট— কত গল্প, কত চরিত্র যে মস্তিস্কের নিউরনে অনুরণন তুলছে, তার কোন হিসাব নেই। আচ্ছা, এই যে ইলিশটা ভাজা হচ্ছে, যার গন্ধ নাকে ঝাপটা মেরে আমার মস্তিকের কোষে হ্যালুসিনেশন তৈরি করছে যুগপৎ উদ্ভিন্ন যৌবনা কপিলা আর মুজতবা আলীর, সেটি কি দেড় সের বা সাতপোয়া ওজনের কাজল গৌরী ইলিশ, ভাজতে বসলে যার শরীর দিয়ে কল কল করে তেল বেরোয়?  দুচ্ছাই, কী ভাবছি! কাজল গৌরী ইলিশ তো মাঝিরা বিক্রি করে না। দিনের পর ‍দিন স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ছাড়া থেকে, ঝড়-জলে ভিজে রাতের পর রাত নৌকা-জাল আর ঢেউয়ের সাথে যুঝতে যুঝতে নিজেদের নিংড়ে দিয়ে ইলিশ ধরা শেষ করে মাঝি যখন ঘরে ফেরে, তখন তার হাতে থাকে কাজল গৌরী ইলিশ আর চোখে থাকে নেশা। না বলা কত কথাই না বলা হয়ে যায় দেড় সের বা সাতপোয়া ওজনের এক জোড়া কাজল গৌরী ইলিশ দিয়ে! বাতাস বাড়ে। ঢেউ আছড়ে পড়ে হোটেলের বাঁশের বেড়ার গায়ে। ছ্যাড় ছ্যাড় শব্দে ইলিশ ভাজা হতে থাকে হোটেলের বড় কড়াইতে। ঘ্রাণে কুপোকাৎ হয়ে যখন সম্বিৎ ফেরে, কপিলা তখন মিশে যায় ভরা বরষার যৈবতী পদ্মার ঢেউয়ে, মুজতবা আলী অন্তরীক্ষ থেকে টুলটুল চোখে চেয়ে থাকেন ইলিশের প্লেটের দিকে।

 

খাবার এসে গেছে। ঝরঝরে ভাত, গরমা গরম ভাজা ইলিশ, তেল চুপচুপে বেগুন ভাজার সাথে শুকনো কড়কড়ে মরিচ ভাজা। পদ্মার হু হু বাতাসের মধ্যেও নাকে ঝাপটা লেগে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। মনে মনে ‘খাইদে মামা’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ইলিশ দেখে স্নেহের ছোট ভাইয়ের অবস্থা সঙ্গীন! খেতে খেতে মনে হলো— নাঃ, ইলিশই তো খেতে এসেছি। তাহলে এক পিস কেন? আর একটা পিস বলে দিলাম। পাশ থেকে ইলিশের আস্ত মাথারও অর্ডার গেল। সঙ্গে পুঁইশাক আর আলু সহযোগে ইলিশের মাথা দিয়ে রান্না করা অতীব উপাদেয় একখানা তরকারিও অর্ডার হলো। ‘কোপা শামসু’ বলে দু’প্লেট উধাও!

বিক্রমপুর, লৌহজং, মেদিনীমণ্ডল— নামগুলো সুন্দর! মায়াময়। তবে বিক্রমপুর বাংলাদেশের স্বাধীনতাত্তোর সময়ে মুন্সিগঞ্জ নাম ধারণ করেছে। যাইহোক, এই মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নে মাওয়া ঘাট। পুরো এলাকাটাই মূলত পদ্মাবিধৌত। নদী ও জল যেখানে থাকবে, প্রাণ এবং প্রকৃতি সেখানে শ্যামল হবেই। মানুষও হবে মায়াময়। এখন বর্ষাকাল। চারিদিকে জল থৈ থৈ করছে। খেয়াল করে দেখলাম, এখানকার নারীপুরুষ নির্বিশেষে নৌকা চালাতে জানে। তবে এটা বলবো না যে, নৌকাটা সবাই সবসময় চালায়। প্রয়োজনে সবাই সেটা চালাতে পারে।

সকালবেলা ভরপেট খেয়ে আমরা দু’জন ঘুরতে শুরু করলাম। ঘোরার তেমন কিছু নেই। সামনে প্রমত্তা পদ্মা আর তীরে এক বিরাট বাস ও ট্রাক টার্মিনাল। সাথে একটা ফেরি ঘাট। প্রচুর মোটরযান আর লঞ্চ-ফেরি। তার সাথে প্রচুর মানুষ— ড্রাইভার-কুলি-রিকশাওয়ালা-দোকানদার-যাত্রী-সহযাত্রী ইত্যাদি। এত মানুষের ভিড়ে বেশ বিরক্তই হলাম। শেষে আমরা ইলিশের বাজারের সন্ধানে চললাম।

ট্রাক টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে সোজা লঞ্চঘাটের দিকে চলে হাঁটতে লাগলাম। প্রচুর ফল আর বিস্কুট-পাউরুটির দোকান। বেশ খানিকটা হাঁটার পর ছোট্ট একটা বাজার আর তার লাগোয়া অনেক খাবারের দোকান। আমরা ইলিশের বাজারে ঢুকলাম।

লঞ্চঘাট যত বড়, বাজারটা তার চেয়ে অনেক ছোট। কয়েকটা মাত্র দোকান। তবে ইলিশ দেখে নয়ন সার্থক! ইয়া বড় বড় সাইজ একেকটার। এক কেজির নীচে খুব কমই দেখলাম। মোটামুটি ২ কেজি বা তার কিছু বেশি ওজনের ইলিশ বেশির ভাগ। হুট করে ছোটবেলার কথা মনে হলো। উনিশশো ছিয়াশি বা সাতাশি দিকে এই ওজনের ইলিশ আমি নিজে কিনেছি প্রতি পিস ৩০-৫০ বাংলাদেশি টাকা বা কিছু বেশি দামে। রংপুর জেলায় এমনও দেখেছি, মানুষ তামাক বিক্রি করে জোড়া ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরছে। এখন সেটা ভাবাই যায় না। আমার বাবা সম্ভবত সপ্তম বারের মতো স্ট্রোক করে বেঁচে আছেন— লোকে বলে ওই ইলিশের তেলের গুণেই!

স্নেহের ছোটভাই ইলিশের দরদাম করতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। একেক দোকানদারকে দাম জিজ্ঞেস করে আর আমার দিকে তাকায়। চারটেয় এক হালি। হালি ষোল হাজার! শুনেই চিত্তির! নাহ, ইলিশ খাওয়া আর হবে না। সাহস করে আর একটা দোকানে জিজ্ঞেস করে। হালি ছ’হাজার পাঁচশো। ভাবলাম, আশা আছে এখনও। দেখেশুনে হালি প্রতি চার হাজার টাকায় কেনা হলো দুই হালি।

সকাল গড়িয়ে দুপুর। হিসেব কষে দেখলাম, ঢাকা ফিরতে ফিরতে বিকেল। ক্ষুধায় আধমরা হবার চাইতে দুপুরের খাওয়াটা সেরে নেওয়া ভালো। দুজন দুজনের দিকে চাইলাম। কোন কথা না বলে নিঃশব্দে ঢুকে পড়লাম এ তল্লাটের সবচাইতে ভালো হোটেলে। হে হে হে করে হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো হোটেল বয়।

– মামারা তো ঢাকাত্থন আইছেন। কয় পিস দিমু মামা?

ঠিক হলো, দু’জনে চার পিস ইলিশ ভাজা আর দু’ছড় ইলিশের ডিম, সঙ্গে ব্যাক আপ হিসেবে নদীর বেলে মাছের ঝোল আর গরম ভাত। চেহারা সুরত দেখে হোটেল বয় এক চামচ করে ইলিশের তেল ছড়িয়ে দিয়ে গেল সাদা ভাতের উপর। আহা! নাকে ঘ্রাণ লাগতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো কপিলা। একে একে টেবিলে নামিয়ে রাখলো চার পিস ভাজা ইলিশ আর দু’ছড় ইলিশের ডিম। তাহার হাতপাখার বাতাসে দুলতে দুলতে ইলিশের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লো মেদিনীমণ্ডলের বাতাসে।

অনার্য তাপস লোকসংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক ও লেখক। ঢাকায় বসবাস করেন।

Shares

Leave A Reply