রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২

একের বদলা এক: ঢিল ছুড়লে পাটকেল আসবে 

শঙ্খদীপ দাসলোকসভা ভোটের আগে চিটফাণ্ড ও নারদ তদন্তে যখন ফের গতি বাড়ার আশঙ্কা ঘনাচ্ছে তখন চোয়াল শক্ত করছে রাজ্যের শাসক দলও।

বাংলার রাজনীতির উঠোনে আমধারনা হল, উনিশের ভোটের আগে চিটফাণ্ড কেলেঙ্কারিতে নতুন উদ্যমে ধরপাকড় শুরু করে দিতে পারে সিবিআই। তৃণমূলকে অস্বস্তিতে ফেলতে একাধিক মন্ত্রী-নেতাকে গ্রেফতার করতে পারে তারা। কিন্তু শাসক দলের শীর্ষ সূত্রে খবর, এ ব্যাপারে আটঘাট বেধে প্রস্তুত নবান্নও।

তৃণমূলের কোনও নেতা বা মন্ত্রীকে সিবিআই গ্রেফতার করলেই, চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে রাজ্য পুলিশ বা সিআইডি-র হাতে গ্রেফতার হতে পারেন রাজ্যের কোনও বড় মাপের বিজেপি নেতা বা সাংসদ। এমনকী ফাইল তৈরি রয়েছে বিজেপি-র কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা নেতার জন্যও। জলপাইগুড়িতে শিশু চুরি মামলা, হিংসার ঘটনায় প্ররোচনা, রেলে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, কয়লা পাচার চক্রের সঙ্গে যোগ, কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পের টাকা বেআইনি ভাবে হাতিয়ে নেওয়া ইত্যাদি মামলায় সাক্ষ্য, প্রমাণ, জবানবন্দি ‘রেডি’ করে রেখেছে রাজ্য পুলিশ ও গোয়েন্দারা। যে সব মামলায় জামিন অযোগ্য ধারা সহজেই গ্রেফতার করা যেতে পারে।

মোদ্দা কথা, একের বদলা এক।

তৃণমূলের শীর্ষ সূত্রে বলা হচ্ছে, এ জন্য রাজনৈতিক ও মানসিক প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই নিতে শুরু করে দিয়েছিলেন দলনেত্রী। দীর্ঘ সময় দৃশ্যত শীতঘুমে থাকার পর চিটফান্ড তদন্তে সিবিআই ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছিল ২০১৬ সালের শেষ দিকে। রোজভ্যালি কাণ্ডে প্রথমে সাংসদ তাপস পাল ও তার পর পরই লোকসভায় তৃণমূল নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করে ভুবনেশ্বরে জেল হেফাজতে রেখেছিল সিবিআই।

তখনই ক্ষোভের জ্বালামুখ খুলে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের মধ্যে স্পষ্ট ফরমান জারি করেছিলেন, সিবিআই ডাকলে এর পর কেউ যাবেন না। ওঁরা বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাক।

এর পর গত বছর গোড়ার দিকে নারদ তদন্তে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিবিআই ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট তৃণমূলের একাধিক নেতা-মন্ত্রী-সাংসদ-বিধায়ককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিলেন ঠিকই। কিন্তু তাপস-সুদীপ অধ্যায়ের মতো তদন্ত এজেন্সির সেই মেজাজ ছিল না।

কিন্তু সম্প্রতি সিবিআইয়ের তরফে ফের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গিয়েছে। চিটফান্ড ও নারদ কাণ্ডে সিবিআই তদন্তের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি দিল্লি থেকে কলকাতায় এসেছিলেন সিবিআইয়ের বিশেষ অধিকর্তা রাকেশ আস্থানা। ফলে ধরপাকড় নিয়ে ফের আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করেছে।

এবং সেই পরিস্থিতিতেই পাল্টা প্রস্তুতি রাখছে তৃণমূল সরকার। বিজেপি নেতাদের মধ্যে, অস্ত্র আইনে ও হিংসায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে খোদ দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে মামলা ঝুলছে। রেলের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে প্রতারণা করার অভিযোগে তৃণমূল থেকে বিজেপি-তে যাওয়া নেতা মুকুল রায়ের শ্যালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। ওই মামলায় মুকুল রায়ের নাম চার্জশিটে রাখা হতে পারে বলেই গোয়েন্দা সূত্রে খবর। মুকুলবাবু এ জন্য আগে ভাগেই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তা ছাড়া শিশু পাচার মামলায় অভিযোগ রয়েছে, রাজ্যসভায় মনোনীত সাংসদ তথা বিজেপি নেত্রী রূপা গাঙ্গুলি ও বিজেপি-র কেন্দ্রীয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয়র বিরুদ্ধে। এবং এই মামলাগুলিতে গ্রেফতার করা হলে জামিন পাওয়া খুব সহজ নয়।

স্বাভাবিক ভাবেই তৃণমূল নেতৃত্ব এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু বলতে নারাজ। শুধু দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় শুধু বলেছেন, ভোট এলেই বিজেপি-র সিবিআইয়ের কথা মনে পড়ে। বিজেপি-র বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও এনেছেন তিনি।  আবার দিলীপ ঘোষ আগেই জানিয়েছেন, গ্রেফতারের ভয় পান না তিনি। বরং তৃণমূলকে এখন নিত্যদিন পাল্টা এনকাউন্টারের হুমকি দিচ্ছেন। রাজ্য বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্যর আবার বক্তব্য, “সারদা রাজনীতি নিয়ে বাংলার রাজনীতিতে একটা রোম্যান্টিসিজম রয়েছে। তদন্ত তার নিয়মে চলছে। বিজেপি সিবিআইকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইলে বিধানসভার ভিতরের মানচিত্রটাই এতোদিনে বদলে যেত।”

তবে বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা আর রাজনৈতিক চাপানউতোরের জায়গায় নেই। বাস্তবে কী হয় এখন সেটাই দেখার।

Leave A Reply