বুক রিভিউ – তিলোত্তমার ‘রাজপাট’

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রাজপাট

তিলোত্তমা মজুমদার

আনন্দ পাবলিশার্স

৫০০ টাকা

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

তিলোত্তমা মজুমদার রচনা সমগ্রের অন্যতম বিচিত্র সংযোজন ‘রাজপাট’ উপন্যাসটি। এই উপন্যাসের পটভূমিতে আছেমুর্শিদাবাদ জেলাকে। বাংলার অন্য যে কোনো জেলার থেকে এই জেলা স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র এর ভৌগোলিক পটভূমি। স্বতন্ত্র এখানকার সমাজ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতি। মুর্শিদাবাদের সংস্কৃতি মিশ্র সংস্কৃতি। এখানে হিন্দু-মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সকল ধর্মের মানুষের অবস্থান। এরা পাশাপাশি বসবাস করছে প্রাচীনকাল থেকে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত পেরিয়ে আসা নিত্যনতুন সব মানুষ। এখানকার সহিষ্ণু সমাজ চেতনা ধর্ম ও বর্ণের উর্ধ্বে। প্রাচীন ভারতবর্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এই জেলা। কোনও রাজনৈতিক বিভেদনীতি এখানকার মানুষের ধর্মবোধে বিভেদের বিষ ঢোকাতে সক্ষম হয়নি। ইংরেজ আমলে অস্থায়ী বিভাজনে মুর্শিদাবাদকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও, সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থান সত্ত্বেও এই জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ব্যাপক হানাহানির ইতিহাস এই জেলায় নেই। সৌহার্দ্য এখানকার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। নবাবি শাসনের আমলে যেমন হিন্দুদের উচ্চপদাধিকারী হওয়ার কোনও বাধা ছিল না, তেমনি মুর্শিদাবাদকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার ব্রিটিশ চক্রান্ত সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন হিন্দু ও মুসলমানের ঐকান্তিক চেষ্টায়। চির বিস্ময় এই জেলাকে তিলোত্তমা তুলে ধরেছেন তাঁর ‘রাজপাট’-এ।

তুলে ধরেছেন তার ধর্ম-ইতিহাস-ভূগোল-রাজনীতি-অর্থনীতিসহ। আসলে এতে করে শুধু মুর্শিদাবাদ নয়, বৃহৎ বঙ্গ এমনকি সমগ্র ভারতবর্ষ মূর্ত হয়েছে। মুর্শিদাবাদের রাজনীতির যে চিত্র উঠেছে এখানে তা শুধু মাত্র একটি জেলার রাজনৈতিক ডিসকোর্স নয়, আমাদের জাতীয় রাজনীতির সামগ্রিক প্রতিফলন সেখানে। চিরকাল জাতীয় রাজনীতিতে এই জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেই মুগোল আমল থেকেই। নবাবি আমলের ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মিলনে সমগ্র মানব ইতিহাসই ধরা পড়েছে। গ্রামীণ ভারতবর্ষের নানান সমস্যাকে তুলে ধরা হয়েছে। সেই গ্রামও একটি একক হিসেবে ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিলোত্তমা এই উপন্যাসে বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।

বারবারই এখানে এসেছে পুরাণ-প্রসঙ্গ। কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে উদগ্র হয়ে আছে পৌরাণিক অনুষঙ্গ। বিষয়ের সঙ্গে চমৎকারভাবে ব্যঞ্জিত হয়েছে এই প্রসঙ্গগুলি। বৈদিক পুরাণের সঙ্গে তিলোত্তমা আশ্চর্য মুনশিয়ানায় মিলিয়েছেন লোকায়ত পুরাণকে। আর এই দুই পুরাণের মিলনে পূর্ণতা পেয়েছে বাংলার মানুষের পুরাণ-চেতনা। শুধু বাংলার নয়, ভারতীয় পুরাণের আকর হয়ে উঠেছে এই গ্রন্থ। মনে রাখতে হবে ‘রাজপাট’ শুধু কাহিনিতে শেষ হয়ে যাওয়ার মতো উপন্যাস নয়। তিলোত্তমা তার চেষ্টাও করেননি। আপাত একটি কাহিনিকে কেন্দ্র করে আমাদের ভারতকথা শোনাতে বসেছেন। সেই কথায় শুধু আজকের কথা নেই, আছে প্রাচীনকালের জনমানসের কথাও। তাই তো বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয় পুরাণ। আসলে শুধু পুরাণ বললে যথার্থ বলা হবে না। আমাদের শিকড়কে ধরতে চেয়েছেন। শিকড়কে খুঁজতে চেয়েছেন তিনি। চারিদিকে যখন অতীতকে, আমাদের শিকড়কে অস্বীকার করার বাহুল্য দেখা যায় একদল ভুঁইফোঁড় মানুষের মধ্যে তখন ‘রাজপাট’ মনে করিয়ে দেয় আমাদের গৌরব। আমাদের ঐতিহ্য। যা নিয়ে এখনও অহংকার করতে পারি আমরা। শুধু তাই নয়, আমাদের প্রাত্যহিকতায় সর্বদা লীন হয়ে থাকে এই অতীতচেতনা। তা বুঝতে পারি না সবসময়। বা বুঝতে চাই না।

বাংলা তথা ভারতবর্ষের বহু বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ন্ত্রণ করে এই গঙ্গা। মুর্শিদাবাদ জেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গা বহু মানুষের রুটি-রুজির সংস্থান যেমন করে দেয়, তেমনি বহু মানুষকে মুহুর্তে পথের ভিখিরি করে দিতেও দ্বিধা করে না সে। গঙ্গার ভাঙনে প্রতিবছর কত কত গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পুণ্যতোয়া গঙ্গা মুহুর্তে রাক্ষুসি হয়ে ওঠে। কিছুই করার থাকে না মানুষের। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এক একটি গ্রাম স্মৃতি হয়ে যায়—“তখন শান্ত নদীটি বয়ে যাচ্ছে পটে আঁকা ছবিটির মতো। কে বলবে, ওই নদীর তলায়, খানিক আগেও একটা আস্ত গ্রাম ছিল! গৃহস্থী ছিল কত! কত শোকগাথা! মানুষের কত প্রাচীন ইতিহাস ধরা ছিল সেই গ্রামে! কে বলবে ? চতুষ্কোনা আজ হতে বিপন্ন স্মৃতিকথা!”

নদী যেমন বহু ইতিহাসকে মুছে ফেলে, তেমনি তাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। আসলে নদী বয়ে চলে ইতিহাস নিয়ে। যে সকল অঞ্চলের উপর দিয়ে গঙ্গা প্রবাহিত হয়ে চলেছে সেই সব অঞ্চলের মিথ-কিংবদন্তী-লোককথা-কৃষ্টি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি-রাজনীতি-ঐতিহ্য… জনজীবনের প্রতিটি স্মৃতি-অনুস্মৃতি বয়ে নিয়ে চলে সে। আমাদের সভ্যতার ইতিহাস এক অর্থে নদীর প্রবহমানতার ইতিহাস। ‘রাজপাট’-এ সেই ইতিহাসই তুলে ধরেছেন তিলোত্তমা। গঙ্গা মুর্শিদাবাদকে দুভাগে ভাগ করেছে—রাঢ় এবং বাগড়ি। মুর্শিদাবাদের ইতিহাস এই দুটি অঞ্চলের সমন্বয়ে পূর্ণতা পায়।

চারপাশের যে প্রাকৃতিক তাণ্ডব চলে, বা প্রকৃতির সৌন্দর্যময়ী যে রূপটি মুগ্ধ করে আমাদের তারও পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে। পতিতপাবনী গঙ্গার পৌরাণিক মাহাত্ম্য বিস্তারিতভাবে এসেছে। গঙ্গার উৎস থেকে সমুদ্রে গিয়ে বিলীন হওয়ার টোপোগ্রাফিক বর্ণনা করা হয়েছে। পাহাড়-পর্বত-মালভূমি-সমভূমির উপর দিয়ে বয়ে চলার সময় তার গতি-প্রকৃতির যে রূপান্তর তার ভৌগোলিক ব্যাখ্যা আছে। একই সঙ্গে প্রবহমান গঙ্গার ভৌগোলিক ব্যাখ্যা ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা। কোনো ব্যাখ্যার সঙ্গে কোনও ব্যাখ্যার বিরোধ নেই। আশ্চর্য মিশ্রণ ঘটিয়েছেন লেখক। এভাবেই আমাদের পৌরাণিক মিথ কিংবদন্তির একটা বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। নদীবিজ্ঞানের নিরিখে স্রোতের প্রবাহের আলোচনা করা হয়েছে।

উপন্যাসের একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে বাউলদের কথা। বৈষ্ণবীয় আখড়ার কথা। বৈষ্ণবীয় মঠ-আখড়ার ডকুমেন্টারি। গোটা মোগল যুগ জুড়ে উনিশ শতক পর্যন্ত যত কীর্তন পদাবলী রচিত হয়েছে, তেমন আর কখনও হয়নি। মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে সকলেই ছিলেন বৈষ্ণব গুরুকুল সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষক। উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ময়না বৈষ্ণবী। সেই মহাপ্রাণ বৈষ্ণবীকে খুন হতে হয়েছিল অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ফলে। কিন্তু মৃত্যুর পরেও সারা উপন্যাসে প্রবল উপস্থিতি তার। সে জেনেছিল—“পুরুষকে কামে চিনলে হয় না। তাকে স্নেহে চিনতে হয়। সেখানেই আছে তার প্রেমের আখর। সেখানেই দিয়ে দেওয়া যায় সকল হৃদয়।” বাউলদের উপর মোল্লাদের আক্রমণের প্রসঙ্গও এসেছে ঐতিহাসিকভাবে। রাঢ় বংলায় আজও বহমান এই সাংস্কৃতিক ধারা। বাউল সাধনার গুহ্য কথা, শরীরী সাধনার বিবরণও এসেছে প্রাসঙ্গিকভাবে।

সাহিত্যের সঙ্গে ইতিহাসের নিবিড় সম্পর্ক। মানুষের দৈনন্দিনতার যে স্তরে ইতিহাস ঢুকতে পারে না, সাহিত্য অনায়সে তাকে তুলে আনতে পারে। সাহিত্যিকের মরমী দৃষ্টি জনমানসের গহনে প্রবেশ করতে পারে। তাই আসল ইতিহাস—মানুষের ইতিহাস, মানব ইতিহাস ধরা থাকে সাহিত্যের পাতায়। একদিক থেকে সাহিত্যিকরাও ইতিহাস চর্চা করেন। নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার যে সাম্প্রতিক বীক্ষা তারই নিরিখে ‘রাজপাট’-কে দেখা যেতে পারে। এই উপন্যাসের শেষে তিলোত্তমা একটি দীর্ঘ গ্রন্থ তালিকা দিয়েছেন। তাতে সেইসব বইয়ের উল্লেখ আছে যেগুলির সহায়তা নিয়েছেন তিনি এই উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে। সেই তালিকায় চোখ রাখলে বোঝা যায় কী গভীর অন্বেষা থেকে তিনি মুর্শিদাবাদের মাটি ও মানুষকে দেখতে চেয়েছেন। এই গবেষণা আছে বলে ‘রাজপাট’ আর পাঁচটা উপন্যাসের মতো কাহিনি সর্বস্ব নয়। চরিত্র সর্বস্বও নয়। কিছু চরিত্র একটু বেশি গুরুত্ব পেলেও কাউকেই আমরা নায়ক বলতে পারি না। নায়ক এখানে আমাদের সকল দেশবাসী। নায়ক বৃহত্তর জনমানস। শেষ পর্যন্ত যে মানস মুর্শিদাবাদ জেলার ঘেরাটোপে আটকে থাকে না। ফলে উপন্যাসটির একটি পৃথক গুরুত্বও আছে। আমাদের বারবার করে ফিরে আসতে হবে এখানে। দেশকে জানার জন্য, অতীতকে জানার জন্য বারবার পড়তে হবে। এখানেই উপন্যাসটি স্বমহিম। স্বমহিম উপন্যাসকার তিলোত্তমা মজুমদার।

(বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More