মন্দার সময়ে কেউ দেশের সম্পত্তি বেচে? দাম পাবে? সরকারের উদ্দেশ্য নিয়েই তাই সন্দেহ তৈরি হচ্ছে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অভিরূপ সরকার

    মূল কথাটা যেটা বুঝতে হবে, আমরা আসলে কী চাইছি? আমাদের দু’টো সমস্যা চোখে পড়ছে। একটা হল, যখন লকডাউন চলছে তখন বহু মানুষের রুটিরুজি নেই, রোজগার নেই। ফলে তাঁদের কথা ভাবা, তাঁরা যাতে এই লকডাউনের সময়টুকু বেঁচে থাকতে পারেন তার একটা ব্যবস্থা করা। এবার সেটার জন্য যেটা দরকার ছিল, তা হল তাঁদের হাতে কিছু টাকা পৌঁছে দেওয়া। কারণ, জিনিসপত্রের অভাব এখনও পর্যন্ত ঘটেনি। পুরনো যে স্টকগুলো ছিল, সেই স্টক থেকে জিনিসপত্র এখনও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এই স্টকে সারা জীবন চলবে এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। তবে আপাতত চলছে।

    কিন্তু এই মুহূর্তে সমস্যাটা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের হাতে টাকা নেই। সেই টাকা যদি কিছু পৌঁছে দেওয়া যেত, যাকে বলে ইনকাম ট্রান্সফার করা যেত, তাহলে খুবই উপকার হত এই মানুষগুলোর জন্য। কিন্তু সেইটা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না কেন্দ্রের ঘোষণায়।

    তবে একটা ভাল দিক রয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য, কিছু খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু পরিযায়ী ছাড়াও তো আরও অনেক শ্রমজীবী মানুষ আছেন, যাঁদের রুটিরুজি নেই এখন। ধরুন গ্রাম থেকে যাঁরা এই কলকাতা শহরেই আসেন তাঁদের তো রুটিরুজি বন্ধ। এরকম অসংখ্য মানুষ আছেন। তাঁদের জন্য একটা সরাসরি আয়ের ব্যবস্থা মানে অনুদানের দরকার ছিল। সেটা আমরা এখনও দেখতে পাচ্ছি না।

    আরও যে জিনিসটা দরকার সেটা হল, লকডাউনটা উঠে গেলে উৎপাদনটা যাতে আবার স্বাভাবিক ভাবে চালু হয় তার ব্যবস্থা করা। কারণ, উৎপাদন না হলে বন্টন হবে কী করে? লোকে খাবে কী? তাই উৎপাদনটা খুবই দরকার। এই উৎপাদনটা চালু করার জন্য যা যা দরকার ছিল তার মধ্যে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে একটা অনুদান দেওয়া বা ভর্তুকি দেওয়া দরকার ছিল।

    আরও পড়ুন: কেন্দ্রের আর্থিক প্যাকেজ পুরোটাই ফাঁপা, শ্রমিক-মজদুররা শিগগির বুঝতে পারবেন রাজার গায়ে জামা নেই

    লকডাউনের সময়ে উৎপাদন না হওয়ার পিছনে যেটা মূল সমস্যা সেটা হল মানুষ কাজের জায়গায় পৌঁছতে পারছে না। কোনও পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেই হোক বা কোনও কলকারাখানায় কাজ করার জন্য হোক, তারা কাজের জায়গাটায় পৌঁছতে পারছে না। কারণ বন্ধ গণপরিবহণ ব্যবস্থা। এখন করোনা সংক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচিয়ে সামাজিক দূরত্বের রীতি মেনে যদি বাস-ট্রেন ইত্যাদি চালাতেই হয়, তাহলে একটা বাসে খুব বেশি লোককে নেওয়া যাবে না। আবার তা যদি হয় তবে বাসওয়ালারাই বা কী করে বাস চালাবে, কী করে লাভ করবে তারা? এটাও একটা প্রশ্ন। সেক্ষেত্রে অনুদানটা সরকারের দিক থেকে আসতে হবে। সরকার নিজস্ব বাস চালাতে পারে কিন্তু বেসরকারি বাস অনুদান ছাড়া এভাবে চালানো সমস্যার।

    ট্রেনের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। কিন্তু শহরতলির ট্রেন না চললে শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অচল হয়ে থাকবে। অতএব পরিবহণের দিকটা সবচেয়ে জরুরি বিষয়। আর সেটার দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল। সেটাও দেখা যাচ্ছে না কেন্দ্রের ঘোষণা।

    তবে যেটা করা হয়েছে সেটা হল ছোট ছোট সংস্থার জন্য নানা রকমের ঋণের ব্যবস্থা। যদিও ছোট সংস্থার সংজ্ঞা বদল করা হয়েছে। এখন একশো কোটি টাকা পর্যন্ত যাদের টার্নওভার তাদেরও এমএসএমই বলা হচ্ছে। তবে ঋণ দিয়ে কতটা ত্রাণ হবে তা নিয়ে নিশ্চিত নই। কারণ, এক্ষেত্রে দু’টো সমস্যা। এক হল, যেখানে আয়ই নেই, সেখানে নতুন করে যে ঋণ নিলে শোধ কী করে দেওয়া যাবে?

    দ্বিতীয় কথা, যেহেতু সাধারণ মানুষের হাতে ক্রয় ক্ষমতা নেই, তাই ঋণ নিয়ে উৎপাদন শুরু করলেও সেই উৎপাদনের বিক্রি কী করে হবে?

    মনে রাখতে হবে, এখনকার সমস্যাটা হচ্ছে, মানুষের হাতে টাকা নেই বলে তাঁরা বাজারে জিনিস থাকলেও কিনতে পারছেন না। তাই যতদিন না টাকা আসবে ঠিকমতো, ততদিন তো ক্রয়ক্ষমতাও তৈরি হবে না। আর ক্রয় ক্ষমতা ঠিক মতো তৈরি না হলে উৎপাদনও সেই ভাবে শুরু হতে পারবে না। সেজন্যই ঋণের বদলে একটা অনুদান হলে ভাল হত। কেনার ক্ষমতাটা যদি বাড়ানো হত, তবে ভাল হত।

    এছাড়াও খুবই সিরিয়াস কিছু ব্যাপার বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, কিছু দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের কথা। বলা হয়েছে, বাজারমুখী সংস্কারের কথা। কয়লাখনি থেকে প্রতিরক্ষা, বিমানবন্দর ইত্যাদি বহু সরকারি সম্পত্তির দরজা বেসরকারি ক্ষেত্রের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রেও দুটো প্রশ্ন। প্রথম কথা, এই সময়ে এই বেসরকারিকরণ করে কী করোনা থেকে আমরা কোনও মুক্তি পাব? ত্রাণের সঙ্গে কি আদৌ এর কোনও সম্পর্ক আছে?

    আপাতদৃষ্টিতে তো মনে হয় নেই। সেক্ষেত্রে একটা সন্দেহ হতে পারে যে করোনার ত্রাণ নিয়ে আমাদের যে নজর রয়েছে সেটা সরানোর জন্য এখন একটা বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। বেসরকারিকরণ নিয়ে বিতর্ক চিরকালই রয়েছে। কিন্তু এখন বিতর্ক বাধিয়ে চোখ ঘোরানোর চেষ্টা হলে কি কারও মঙ্গল আদৌ হবে!

    তা ছাড়া জরুরি প্রশ্ন হল: ধরা যাক বেসরকারিকরণ খুব দরকার। ধরা যাক, কয়লাখনিগুলি ঠিকমতো চলছে না তাই বেসরকারি হাতে দিয়ে দিলে হয়তো আরও ভাল চলবে। বেসরকারিকরণের বিরোধিতাকে সরিয়ে রেখেও এ কথা বলা যায়, এখন কিন্তু বেসরকারি‌করণের সবচেয়ে খারাপ সময়। কারণ, দেশে মন্দা চলছে। বিশ্ব জুড়েও মন্দা চলছে। যার মানে বাজার খারাপ। তা সেই খারাপ বাজারে কি জিনিসের ভাল দাম পাওয়া যায়? বরং বিপদে পড়ে তড়িঘড়ি যখন মানুষ কিছু বেচতে যায় তখন কম দামে লোকসানেই বেচতে হয়। ফলে এই সময়ে যদি সরকার সম্পত্তি বিক্রি করে, তবে সরকার ভীষণ কম দাম পাবে। আর সেটা শুধু সরকারের ক্ষতি নয়, পুরো দেশের ক্ষতি, সমাজের ক্ষতি।

    তাই এই সময়টা কেন বেসরকারিকরণের জন্য বেছে নেওয়া হল সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে। যাঁরা ষড়যন্ত্র খোঁজেন তাঁরা হয়তো বলবেন, বিশেষ কারও হাতে এই সম্পদগুলো সস্তায় তুলে দেওয়ার জন্য এখন ঘোষণা করা হল। আসলে এখন কেন ঘোষণা করা হল তার কোনও যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন বিক্রি করলে জলের দরে ভাল সম্পদগুলো বেরিয়ে যাবে। তাহলে কী ধরে নেওয়া হবে বিশেষ কারণে এই সময়টাকে বেছে নেওয়া হল? এই প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যাবে।

    সব মিলিয়ে আমি বলব, যে কোনও সংকটের সময়ে সরকারকে অনেকটা দায়িত্ব নিতে হয়। এখন যে সংকট চলছে সেটা বেসরকারিকরণের সময় নয়। বেসরকারিকরণ মানেই হচ্ছে সরকার তার দায়িত্ব থেকে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু এখন সরকারকে দায়িত্ব থেকে সরে এলে চলবে না, সরকারকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে। বেসরকারিকরণটা আরও অনেক পরে হতে পারত কিংবা অনেক আগেও হতে পারত। কিন্তু এই সময়টা বেসরকারিকরণের জন্য অত্যন্ত অনুপযুক্ত।

    আর বাকি যা যা বলা হয়েছে তা কি আদতে নির্মলা সীতারমন নতুন করে কোনও বাজেট পেশ করলেন? বুঝতে পারলাম না। এই খাতে এত কোটি, ওই খাতে অত কোটি। এর সঙ্গে করোনার কী সম্পর্ক আছে? আর সবই তো ধার। নানা নামে, নানা সংস্থার মধ্যে দিয়ে যাই ঘোষণা হয়েছে সবই ধার। এখন ধার কে নেবে? সরকারকে এগিয়ে এসে দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু সেই পথে তো সরকার হাঁটছে না।

    (লেখক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, মতামত তাঁর নিজস্ব।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More