শনিবার, এপ্রিল ২০

ঠিক যে ভাবে খুন হয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসন

রূপাঞ্জন গোস্বামী

চমকে গেলেন?

কিন্তু এটাই সত্যি। মাইকেলের দেহ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর লস এঞ্জেলেস কাউন্টি ডিপার্টমেন্ট অফ মেডিক্যাল এক্সামিনার-করোনার মাইকেলের মৃত্যুর কারণ হিসাবে লিখেছে হোমিসাইড অর্থাৎ খুন। প্রপোফল ও বেনজোডায়াজিপাইন নামক দুটি ড্রাগের তীব্র বিষক্রিয়ায় মাইকেলের মৃত্যু হয়েছে। মাইকেলের নিজস্ব ডাক্তার ডক্টর মুরেই  হলেন খুনি। তবে অনিচ্ছাকৃত খুন। যেটিকে বিচারের সময় কোর্ট বলেছে  ইনভলান্টারি ম্যানস্লটার।
জীবনের শেষ দিন গুলো খুব অস্থির কেটেছিল জ্যাকসনের। ধীরে ধীরে  তীব্র অর্থাভাব গ্রাস করছিলো তাঁকে।  প্রাণপণে এর থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। লন্ডন শো-দিয়ে কামব্যাক করতে চাইছিলেন। দুমাস ধরে  দিনরাত এক করে রিহার্সাল দিয়ে যাচ্ছিলেন। লন্ডনে ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১০ সালের  মার্চ পর্যন্ত চলার কথা ছিলো  তাঁর কামব্যাক সিরিজের। এক কোটির মতো দর্শক আশা করছিলেন প্রোমোটাররা। মাইকেল বলছিলেন ফাইনাল কার্টেন কল। চারিদিকে তখন সাজো সাজো রব।

আরও পড়ুন: বালুচ-বুকে কালাটেশ্বরী কালী, মাথা ঝোঁকায় পাকিস্তানও

এ রকমই অগোছালো ছিল পপসম্রাটের শোবার ঘর

অন্য দিকে  টেনশনে,  দুশ্চিন্তায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কায়  ক্রমশ ঘরের মধ্যে গুটিয়ে যাচ্ছিলেন বিশ্বের জনপ্রিয়তম নক্ষত্র মাইকেল। মাইকেলের নিজস্ব বেডরুমে মাইকেলের  তিন ছেলে মেয়ে ও নিজস্ব চিকিৎসক ডক্টর মুরে ছাড়া কারো প্রবেশ নিষেধ ছিল। এমনকী, সাফাইকর্মী ও পরিচারকদেরও ঢুকতে দেওয়া হতো না। ডক্টর মুরে কোর্টে জানিয়ে ছিলেন জীবনের শেষদিন গুলিতে জ্যাকসন ভীষন সন্দেহবাতিক হয়ে গেছিলেন। পরিচারকরা ঘর পরিষ্কার করতে এসে তাঁর অন্তর্বাস চুরি করে বেচে দিতে পারে, এমন কথাও ভাবতেন তিনি। তাই জ্যাকসন অন্তর্বাস কাচতে দিতেন না।

মুরের সাক্ষ্য বলছে, শেষ কয়েক বছর জ্যাকসন সম্পূর্ণ ভাবে ড্রাগ-অ্যাডিক্ট হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই জন্যই তাঁর দরকার ছিলো একজন বিশ্বস্ত ডাক্তারের। মাসে দেড় লক্ষ  ডলারের লোভ সামলাতে পারেননি ডক্টর মুরে। চাকরি নিয়ে মাইকেলের ব্যক্তিগত চিকিৎসক জ্যাকসনের  থেকে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। ডক্টর মুরে কোর্টে বলেছেন, একমাত্র তিনি মাইকেল জ্যাকসনের পুরুষাঙ্গে রোজ রাতে হাত দিতেন ক্যাথিটার পরানোর জন্য কারণ জ্যাকসন দুশ্চিন্তায় বিছানা ভিজিয়ে ফেলতেন। মুরে এতটাই ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন পপ-সম্রাটের। কিন্তু  চিকিৎসক  যদি রোগীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যান তাহলে সম্ভবত তিনি পেশার গুরুত্বই ভুলে যান। আর রোগী যদি মাদকাসক্ত হন এবং রোগীর নাম হয় মাইকেল জ্যাকসন হয় তাহলে তো কথাই নেই!

আরও পড়ুন:৬ অগস্ট, ১৯৪৫, সকাল ৮-১৫: আমি হিরোশিমা বলছি…

মাইকেল জ্যাকসনের শোবার ঘরের অন্য অংশ

মুরে তাঁর বন্ধু মাইকেলের ড্রাগের নেশা ছাড়াতে তো পারেননি, বরং সরবরাহ করে গিয়েছিলেন ব্যথানাশক তীব্র অ্যানাসস্থেটিক ড্রাগ প্রপোফল এবং দুশ্চিন্তানাশক লোরাজেপাম। মৃত্যুর পর জ্যাকসনের দেহে পাওয়া গিয়েছিল মিডাজোলাম, বেনজোডায়াজিপাইন, লিডোকেন, এফিড্রিন, অ্যালপ্রাজোলাম, সারট্রালাইন। এ ছাড়াও, জ্যাকসনকে নিয়মিত দেওয়া হতো ওমিপ্রাজোল, হাইড্রোকোডন, পারোক্সিটাইন, কারিসোপ্রোডল এবং হাইড্রোমরফোন।
তীব্র চেতনানাশক ওষুধের ককটেল নিতেন চরম অনিদ্রার রুগী মাইকেল জ্যাকসন আর নিজের হাতে এই ককটেল বানিয়ে দিতেন ডক্টর মুরে। প্রথম দিকে ডক্টর মুরে ইনজেকশন দিলেও শেষের দিকে নিজেই ককটেল ইনজেকশন নিজের শরীরে পুশ করতেন মাইকেল জ্যাকসন। ডক্টর মুরে নিজেই স্বীকার করেছেন, মৃত্যুর আগে জ্যাকসনকে ঘুম পাড়াতে টানা ষাট দিন  অপারেশনের সময় ব্যবহৃত তীব্র নার্ভ এজেন্ট প্রপোফল দিয়েছিলেন তিনি।

এই সেই বিতর্কিত ওষুধ

মৃত্যুর পর জ্যাকসনের ঘরে ঢুকে হতবাক হয় লস অ্যাঞ্জেলসের পুলিশ! কে বলবে এটা ছিলো পৃথিবীর পপ সঙ্গীতের সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের শয়নকক্ষ। যেন এক ছন্নছাড়া মাদকাসক্তের ঘর। এলোমেলো বিছানা। সারা ঘরে দুর্গন্ধ। বিছানার পাশের তাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চেতনানাশক ওষুধের ভায়াল ও সিরিঞ্জ। হাত বাঁধার রাবারের কর্ড। বিছানার পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার। হ্যাঙারে রক্তমাখা সাদা জামা।

ডক্টর মুরে অবশ্য কোর্টে বারবার বলেছেন জ্যাকসন নিজে নিজেকে খুন করেছেন।
২৪শে  জুন স্টেপল সেন্টারে রিহার্সাল করে, শো-এর প্রোমোটারদের সঙ্গে মিটিং সেরে জ্যাকসন ফেরেন লস অ্যাঞ্জেলসের নর্থ ক্যারলউড ড্রাইভের প্রাসাদোপম বাড়িতে। পরের দিন দুপুর বারোটা নাগাদ জ্যাকসনকে অচৈতন্য অবস্থায় শোবার ঘরে আবিষ্কার করেন ডক্টর মুরে। তাঁর কথায় তখনও জ্যাকসনের শরীর গরম, নাড়ির গতি ক্ষীণ। হার্ট পাম্প করতে থাকেন ডক্টর মুরে। এগারো মিনিট পাম্প করেও সাড়া মেলে না (যদিও জানা গেছে কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর মুরে হার্ট পাম্পের সঠিক নিয়মই নাকি জানতেন না। জ্যাকসনের পিঠের তলায় একহাত ও বুকে একহাত রেখে পাম্প করেছিলেন)। ঘরে ল্যান্ডলাইন না থাকায় নাকি আপৎকালীন নম্বর ৯১১ তে ফোন করতে পারেননি। জ্যাকসনের দেহরক্ষীদের ফোন করেও পাননি। শেষে নিজে নীচে নামতে গিয়ে দেখা পান জ্যাকসনের রাঁধুনির। সে ডেকে দেয় দেহরক্ষীদের। তারা গিয়ে ৯১১ নাম্বারে ফোন করে ডেকে আনে প্যারামেডিকদের। তাঁরা জ্ঞান ফেরানোর প্রাথমিক চেষ্টা করলেও অসফল হন। নিথর জ্যাকসনকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স  ছোটে গ্রিন করিডর দিয়ে রোনাল্ড রেগন ইউসিএলএ  মেডিক্যাল সেন্টারে। কিন্তু এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গিয়েছে অমূল্য তিরিশটা মিনিট।

দুপুর দুটো ছাব্বিশে বিশ্ব কেঁপে ওঠে সেই নিদারুণ দুঃসংবাদে “জ্যাকো ইজ ডেড”।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ‘জেনেশুনে’ রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া বা আইনি ভাষায় ইনভলান্টারি ম্যানস্লটার-এর অপরাধে দু’বছরের জেল হয় ডক্টর মূরের।

তিনি সারা বিশ্বের হতাশাবাদীদের এক লহমায়  জীবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন   ‘ইউ আর নট অ্যালোন’ গানটি গেয়ে। কিন্তু তিনিই তিনি যে সবার অলক্ষ্যে জীবন থেকে ক্রমশ  দূরে সরে যাচ্ছেন, এটা তাঁর কোনো গুণমুগ্ধ,  আত্মীয়স্বজন এমনকী  তিন সন্তানও  টের পাননি। জ্যাকসনের যে দ্রুত নির্মম মৃত্যু আসন্ন সেটা একমাত্র বুঝতে পেরেছিলেন মাসে দেড় লক্ষ ডলারের নেশায় বুঁদ থাকা ডক্টর মুরে। যিনি জীবন দিতে এসে অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও জীবন নিয়ে নিলেন ইতিহাসের সর্বকালের সর্বসেরা পারফর্মার মাইকেল জ্যাকসনের।

 

Shares

Leave A Reply