বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভরছে এক লক্ষ লিটার জলের ট্যাঙ্ক! আবাসনের অভিনব উদ্যোগকে কুর্নিশ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দক্ষিণ ভারত জুড়ে বেড়ে চলা জলকষ্টের কথা বোধ হয় আর কারওই তেমন অজানা নেই। সারা দেশেই জল সংরক্ষণের জন্য সচেতনতা প্রচার চলছে। নানা নতুন নতুন উপায়ে সকলেই চাইছেন জলের অপচয় বন্ধ করতে, জল সংরক্ষণ করতে। কিন্তু কী সেই উপায়, হাতে-কলমে কী ভাবে মিলতে পারে ফল, তা নিয়ে কাজকর্ম সে ভাবেও সামনে আসছে না।

এরই মধ্যে নয়া নজির তৈরি করলেন চেন্নাইয়ের শোলিঙ্গানাল্লুর এলাকার শবরী টেরেস অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারা। সারা শহর যখন বৃষ্টিশূন্য, শুকিয়ে যাচ্ছে নদী-নালা-পুকুর, ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণও যখন আশঙ্কাজনক ভাবে কমে আসছে দ্রুত, তখনই তাক লাগিয়ে দিলেন এক দল শহরবাসী। মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে, ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের ছাদ থেকে তাঁরা সংগ্রহ করে নিলেন ৩০ হাজার লিটার জল!

২০১৭ সালে ওই কমপ্লেক্সের ছাদে বৃষ্টির জল ধরে রাখার একটি সিস্টেম তৈরি দিয়ে গিয়েছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তার পর থেকেই প্রতি বছর বর্ষায় জল সংরক্ষণ করেন ওই কমপ্লেক্সের বাসিন্দারা। সেটাকেই অভ্যেসে পরিণত করেছেন গত দু’বছর ধরে। কিন্তু এই বছর সেই অভ্যেসই যে এত মূল্যবান হয়ে উঠবে, তা ভাবতে পারেননি তাঁরা।

শবরী টেরেস অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে একাধিক রেনপাইপ লাগানো রয়েছে। সেই পাইপগুলির মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জল মাটিতে পড়তে দেওয়া হয় না। পাইপগুলিকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে তিন হাজার লিটার আয়তনের দু’-দু’টি ট্যাঙ্কের সঙ্গে। অর্থাৎ মোট ছ’হাজার লিটার জল ধরে রাখা সম্ভব হয় শুধু বৃষ্টি থেকেই! ওই ট্যাঙ্কে জমা হওয়ার পরেই থিতিয়ে যায় বৃষ্টির জলে ধুয়ে আসা কাদা-বালি-মাটি।

শুধু তা-ই নয়। ওই ট্যাঙ্কের জল আবার গিয়ে মেশে মাটির তলায় এক লক্ষ লিটার আয়তনের একটি বিশাল বড় রিজ়ার্ভারে। বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা অপরিশোধিত জল একত্র করে সেখান থেকেই পাঠানো হয়ে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে। তার পরে তা অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের ব্যবহারের উপযুক্ত হয়ে ওঠে।

অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, সিস্টেম তৈরি হওয়ার পরের বছরে অর্থাৎ ২০১৮ সালের অক্টোবরে তিন দিন ধরে খেপে খেপে বৃষ্টি হওয়ায়, তাঁদের সংগ্রহ করা জলেই প্রথম ভরে গিয়েছিল ওই ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্ক। সারা শহরের তিন দিনের তিন ঘণ্টা মতো বৃষ্টি তেমন কোনও প্রভাবই ফেলেনি সেই বার। কিন্তু বৃষ্টির জলটুকু একসঙ্গে করতে পারলে যে আদতে কতটা সাশ্রয় হয়, তা নিজের চোখে দেখে চমকে গেছিলেন তাঁরা।

কিন্তু তখনও জানতেন না, পরের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালেই যে জলের জন্য চরম হাহাকারের সম্মুখীন হতে হবে। এ-ও জানতেন না, যে এই তীব্র জলকষ্টে তাঁদের রেনওয়াটার হারভেস্টিংয়ের এই চেষ্টা দৃষ্টান্তমূলক হয়ে উঠবে গোটা দক্ষিণ ভারতের কাছে।

শবরী টেরেস অ্যাপার্টমেন্টের রেসিডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি হর্ষ কোডা জানিয়েছেন, এই বছর বৃষ্টি প্রায় হচ্ছেই না। কিন্তু যতটুকু হচ্ছে, তা কাজে লাগিয়ে অনেকটা সুবিধা পাচ্ছি আমরা। তাঁর কথায়, “হয়তো মাত্র এক দেড় ঘণ্টার বৃষ্টি হল। কিন্তু হিসেব করে দেখা গেল, তাতেই জমেছে ৩০ হাজার লিটার জল। আর এখন এই জল জমানো মানে, ৫ হাজার টাকার সাশ্রয়!” জানা গিয়েছে, হর্ষ কোডা এবং তাঁর স্ত্রী প্রভা কোডা-ই এই বৃষ্টির জল ধরে রাখার প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা।

প্রভা কোডা বলেন, “২৫ হাজার বর্গফুটের ছাদ রয়েছে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে। এবং এক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে অন্তত ২৫ হাজার লিটার জল সংগ্রহ করতে পারি আমরা। তিন ঘণ্টা টানা বৃষ্টি হলে আমাদের এক লাখ লিটারের ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্ক পুরো ভরে যায়। ওই জলে অ্যাপার্টমেন্টের ৫৬টি ফ্ল্যাটে তিন দিন ধরে জল সরবরাহ করা যায়।”

চেন্নাইয়ের রেন সেন্টারের তরফে ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে এই উদ্যোগের। সারা শহরের কাছেই এক রকম অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে শবরী টেরেস অ্যাপার্টমেন্ট। জানা গিয়েছে, শহরের তীব্র জলকষ্ট মোকাবিলা করতে চেন্নাইয়ের আরও অ্য অ্যাপার্টমেন্টে এই ব্যবস্থা চালু করার কথা ভাবছে সরকার।

Comments are closed.