শনিবার, মার্চ ২৩

মেয়েদের যৌন হেনস্থা এতই বেশি, যে মিথ্যে বলার প্রয়োজন ভীষণ কম

দেবস্মিতা

হঠাৎ করেই কয়েক দিন ধরেই একদল মানুষ বিশাল দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। তাঁরা কাজে যেতে ভয় পাচ্ছেন, রাস্তাঘাটে হাঁটতে ভয় পাচ্ছেন, রাতে অন্ধকারে এদিক ওদিক যেতে ভয় পাচ্ছেন। তাঁদের ভয়, যদি পাছে ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগে তাঁদের নাম কেউ জুড়ে দেয়! এ ভয়ঙ্কর অবিচারের কথা তাঁরা বলবেন কাকে? সাধারণ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা লোকেদের তো আবার শত্রুর অভাব নেই নাকি, তা-ও আবার বিপরীত লিঙ্গ যদি হয়। তাই সেই সব শত্রু প্রতিশোধ নিতে ‘মি টু’-র সাহায্যই যে নেবেন তাতে সন্দেহ থাকতে যাবে কেন?

যৌন হেনস্থার জড়িয়ে পড়ার ভয় সাংঘাতিক। মানে কেউ অফিসে চুরির দায়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় পাচ্ছেন না, গাঁজা-কোকেনের কেসে ফেঁসে যাবেন তেমন ভয়ও  নেই, ঘুষ খেতে গিয়ে ধরা পড়লে কী হতে পারে সেই ভয় অমূলক, এমনকী হেলমেট ছাড়া বাইক চালাতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে মরে যাওয়ার ভয়ও যাঁরা পান না, সেই তাঁরাই একদম সিঁটিয়ে রয়েছেন এই ‘মি টু’-র ভয়ে। সুতরাং সব ভীত জাতি এক হও, ছুড়ে দাও সস্তা পাবলিসিটির কাদা, সরব হয়ে ওঠো মিডিয়ায় খোলাখুলি কথা বলা নিয়ে, প্রশ্ন তোলো দশ বছর ছিলেন কোথায়, আর “নট অল মেন” তো রয়েইছে।

আসল সমস্যাটা সরিয়ে রাখব, পারলে ধামা চাপা দেব যেমন এত দিন দিতাম। মেয়েরা তো হেনস্থা হওয়ার জন্যই জন্মায়, এ আর বড় কথা কী! দুধ-ঘি খাওয়া, অধিক আদরে বড় হওয়া ছেলেদের বদনাম এ দেশ কোনও মতেই সহ্য করবে না, এই আমি বলে রাখলাম।

কয়েকটা বিষয় একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক।

১) সস্তার পাবলিসিটি কী এবং এই ‘মি টু’ থেকে তা কী ভাবে পাচ্ছেন মহিলারা।
আমরা এই ‘মি টু’ আন্দোলনে তাঁদেরই নাম শুনছি, যাঁরা আগে থেকেই কিছুটা হলেও সকলের কাছে পরিচিত। বাঁশবেড়িয়ার যে মেয়েটি ‘মি টু’ লিখবে, তাকে নিয়ে তো এমনিতেও কেউ মাথা ঘামাবে না তাই না। সুতরাং তার পাবলিসিটির গুড়ে ইগনোরেন্সের বালি। আমাদের দেশে এসসি/এসটি-র মতো কোনও কোটা তো মেয়েদের জন্য রাখা হয়নি যে, চাকরি পেতে গেলে ন্যূনতম দু’টো এলিগেশন থাকলেই মহিলারা চাকরি করার যোগ্যতা অর্জন করবেন। এক বার কেউ খোলাখুলি যৌন হেনস্থার কথা লিখলে, বিবাহযোগ্য পুরুষ ও তাঁর পরিবার আগে থেকেই লিস্টি থেকে সে মেয়ের নাম চুপচাপ সরিয়ে ফেলবেন। যৌন হেনস্থার পরে কোনও মেয়ে কাউকে অটোগ্রাফ দিচ্ছে বলেও তো শুনিনি। সরকার ট্যাক্স বেনিফিটও দেয় না। অত্যাচারিতা অভিনেত্রী তাঁর পারিশ্রমিক দ্বিগুন করে দিয়েছেন এমন কথাও তো কেউ রটায়নি। তা হলে এই পাবলিসিটি মেয়েদের ঠিক কোন কাজে লাগছে বুঝতে আমার অন্তত বেশ সমস্যা হচ্ছে।

২) মিথ্যে আরোপ
হ্যাঁ এই পৃথিবীর নিয়মে সকল সত্যিরই একটা পরিপূরক মিথ্যে থাকে। যেমন রাম সুবোধ বালক এ কথা সত্যি হলে, রামের সুবোধ বালক না হওয়ার সম্ভাবনাও ততটাই সত্যি। অপারেশন করে রোগী সুস্থ হওয়ার ঘটনা যেমন আছে, সেই অপারেশন করতে গিয়েই রোগীর মৃত্যু হয়েছে, এমন ঘটনাও আছে। তিন মাসের শিশুকে ধর্ষণ করার ঘটনা যেমন আছে, এক মাসের শিশুকে আস্তাকুঁড় থেকে তুলে নিয়ে মানুষ করার ঘটনাও আছে। মানে সব কিছুরই একটা ভালো আর একটা খারাপ দিক থাকে। ঠিক সেই কারণেই ভালো আর খারাপের তুলনামূলক সংখ্যাই বলে দেয় পরিস্থিতিটা ঠিক কেমন। তা হলে এক বার কি ভেবে দেখতে হচ্ছে না, যে সত্যি আরোপ আর মিথ্যে আরোপের সংখ্যা এবং অনুপাতটা ঠিক কী রকম এ ক্ষেত্রে?

৩) ব্যক্তিগত দুশমনি।
থাকতেই পারে, কিন্তু সেগুলো তো হাতে-গোনা কেস। তাই নিয়ে গোটা মহল এত ভীত কেন! ক্লাসে যে দিন পড়া করে আসব না, সে দিনই তো পড়া ধরার ভয় সব থেকে বেশি থাকে। যার কাছে টিকিট থাকে, সে তো টিকিট চেকার দেখে ভয় পায় না। আর সত্যি কথা বলতে আমাদের টেলিসোপগুলো যতই কুচুটে মহিলা বা পুরুষ সব বাড়িতে বাড়িতে দেখায়, যাদের এক এবং একমাত্র কাজ মেইন প্রোটাগোনিস্ট ও তার বাড়ির লোককে নাকানি-চোবানি খাওয়ানো, তেমনটা  তো আদৌ হয় না, তাই না? তা-ও সেই অভিনব শত্রুতার দোহাই দিয়েই সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে আমাদের সচেতন সমাজ।

৪) সব না জেনে শুনে কথা বলা ঠিক নয়।
মুশকিল হল এই জানা আর শোনার মানেটা কী। শুনতে তো আমরা সবই পাই। জানার জন্য মাধ্যম লাগে। এখন তনুশ্রী বা নানা এরা কেউই তো ঠিক জানার আওতায় পড়েন না, শোনার আওতায় আছেন। যে কোনও অভিযোগই কোনও না কোনও অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে এবং কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসনের কাজ হল সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখা। কোনও মাধ্যমে কথা বলার মানে তো কোনও ব্যক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়। কেউ অভিযোগ করছে আর অন্য কেউ তাকে মিথ্যে বলছে। এই নিয়ে তো রাগ-অভিমানের কিছু নেই। কোনও মহিলা যদি তাঁর সাথে হওয়া কোনও দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান, তাঁকে সস্তা পাবলিসিটির আক্রমণের ভয় পেতে হবে কেন! এটা কেন আমরা ভুলে যাই, যে যাঁর সাথে অন্যায় হচ্ছে তিনি নিজে মুখ না খুললে তো আর অপরাধী এসে নিজের দোষ  স্বীকার করবেন না। তা হলে কাউকে না কাউকে অভিযোগটা  তুলতে হবে, তাকে আমরা চিনি বা না-ই চিনি, জানি বা না-ই জানি। অভিযোগটা শুনতে আমাদের এত সমস্যা বা ভয় কোথায়।

৫) নিজেই ভাবুন।
যে কোনও কেউ যে কারও বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করতে পারেন বলে একদল আশঙ্কা করছেন, তাঁরা নিজেরাই বলুন, এটা কতটা রোজকারের ঘটনা, যে সবাই ভয়ে শিউরে উঠছেন? কতটা আকছার এমন ঘটনা ঘটলে এত সহজে অভিযোগ আনা যায়? কারণ এ খুন করেছে, ও ড্রাগ বিক্রি করছে এমন অভিযোগ তো যখন-তখন উঠছে না। আর এক বার ভেবে দেখুন যাঁরা গলা ফাটিয়ে বলছেন “সব পুরুষ এক নয় (নট অল মেন)”, এই কথাটা বলার অর্থই তো হলো বেশির ভাগ মানুষ এটাই মনে করেন, এবং সেই ধারণাটা পরিষ্কার করে দেবার জন্যই এই স্লোগান। আরে বাবা, কে না জানে সবাই এক নয়! কে-ই বা বলছে সবাই এক? কিন্তু সেটা না হয়েও তো মানুষের নিস্তার নেই। এই দেড়শো কোটির দেশে মাত্র দশ শতাংশ ও যে কত বড় সংখ্যা হতে পারে, তা তো সহজ পাটিগণিতই বলে দেয়।

৬) সমস্যাটা কোথায়।
মানে আসল সমস্যাটা কোথায়? যে কথাগুলো চাপা পড়ে থাকারই কথা ছিল, সেগুলো কেন ‘মি টু’-র হাত ধরে ‘ইউ টু’-র দিকে ছুটে আসবে? কেন “এগুলো তো হয়েই থাকে”-র জায়গায় “এসব আর চলবে না” বলা হচ্ছে? কেন সোশ্যাল মিডিয়ার একটা ভালো দিক তুলে ধরা হচ্ছে? কেন বোবা মুখগুলোতে কথা ফুটে উঠছে? নাকি আজ এই প্রথম বার অন্যায় করে বেলুনের মতো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো মর্কটদের দিকে কিছু সুঁচ ধেয়ে আসছে বলে আশঙ্কা বাড়ছে? বেলুন যখন তখন ফেটে যেতে পারে বলে? সমস্যাটা ঠিক কোথায়।

আমরা তো স্বাধীন দেশের দায়িত্বশীল মানুষ। মিথ্যে বা সত্যিকে যাচাই করে নেব, এটাই কাম্য। কিন্তু যে সমস্ত মানুষেরা অপমান, ভয়, লাঞ্ছনা পেরিয়ে এসে, সাহস সঞ্চয় করে তাঁদের কথা বলার চেষ্টা করছেন, তাদের ধূলিসাৎ করাটা কেমন বুদ্ধির পরিচয়? যে কোনও সমস্যা তার সঙ্গে আরও অনেক সমস্যা নিয়ে আসে। অভিযোগের পাশে মিথ্যে অভিযোগটাও তাই। মিথ্যে অভিযোগ নিশ্চয়ই একটা সমস্যা, কিন্তু সেটা যে কোনও সিস্টেমের ক্ষেত্রেই বাস্তব। এই তো কালকের খবরেই ছিল ছত্রিশ জন মেয়ে পড়ুয়া স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বিহারে, স্কুল আসা যাওয়ার পথে ছেলেরা ইভ-টিজ়িং করত বলে।

ভেবে দেখুন, ওইটুকু টুকু মেয়েগুলো, যাদের নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করার কথা, তারা শুধুমাত্র পড়াশোনা বন্ধ করে দিচ্ছে ওই অসভ্যতার সঙ্গে পেরে উঠছে না বলে। এই সমস্যা কতটা প্রাথমিক স্তরের, আর কতটা গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে এর প্রভাব। ওই মেয়েগুলোর মানসিক যন্ত্রনা ঠিক কী করলে আমরা বুঝতে পারবো? আসলে যৌন হেনস্থা এতটাই রোজকার ঘটনা মেয়েদের জীবনে, যে এই নিয়ে মিথ্যে বলার প্রয়োজন ভীষণ রকম কম।

যে কোনও সমস্যার সমাধান তখনই সম্ভব, যখন তাকে উপযুক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। মহিলাদের যৌন হেনস্থা অনেক বড় সমস্যা। অযথা কাউন্টার যুক্তি দেখিয়ে তার গুরুত্ব কমিয়ে দিলে, সমাধানও পিছিয়ে যাবে আরও অনেক বছর। সমাজকে পিছিয়ে দিয়ে কার কবে লাভ হয়েছে! যে সমস্যাটা এখনও ততটা বড় নয়, তাকে নিয়ে অযথা সোচ্চার হলে, আসল বড় সমস্যাগুলোর গায়ে ‘সস্তার পাবলিসিটি’-র লেবেল সেঁটে পড়ে থাকবে আমার-আপনার সচেতনতার গুদাম ঘরে।

সেটাই চাই বুঝি ?

Shares

Comments are closed.