সোমবার, এপ্রিল ২২

কাল ৩১ অক্টোবর, হ্যালোউইন উৎসবে পৃথিবীতে নামবে ভূতের দল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হ্যালোউইন এক ভূতুড়ে উৎসব। অক্টোবরের ৩১ তারিখ ইউরোপ, আমেরিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন  দেশে হ্যালোউইন ফেস্টিভ্যাল উদযাপিত হয়। এই দিনে ইউরোপ আমেরিকার মানুষরা বিভিন্ন আকৃতির কুমড়োর ভেতরটা কুরে, ফাঁপা কুমড়োর খোলা দিয়ে মানুষের করোটির মতো জিনিস তৈরি করেন। ফাঁপা কুমড়োর ভেতর মোমবাতি বা বৈদ্যুতিক আলো লাগান। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় নানান আকৃতির ভূতুড়ে কুমড়ো রেখে দেন। ঘরের আলো নিভিয়ে ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেন। তারপর রাস্তায় নেমে পরেন নানা রকম  ভূতুড়ে পোশাক পরে। ভূতের মুখোশ পরে, মানুষের নকল কঙ্কাল নিয়ে একে ওকে ভয় দেখিয়ে হই হুল্লোড়ে কাটিয়ে দেন দিনটি। বাচ্চারা পাড়ায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে দরজায় টোকা মারে আর টফি চকোলেট আদায় করে।
আমাদের মতো যাঁরা এসবে অভ্যস্ত নন, তাঁদের ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগবে। হঠাৎ রাস্তায় হাজার হাজার ভূত দেখলে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবারই কথা। হ্যালোউইন হলো  জেনে বুঝে কুসংস্কার উদযাপন করার উৎসব। অনেক বিখ্যাত নাস্তিক বা বিজ্ঞানীকেও দেখা গেছে কালো মাটি ছুঁয়ে ফেলা গাউন পরে, মুখে কঙ্কালের মুখোশ এঁটে রাস্তায় মানুষকে ভয় দেখাতে।

হ্যালোউইন প্রায় ২২০০ বছর পুরনো একটি উৎসব। হ্যালোউইনকে অনেক সময় বলা হয় হ্যালো ইভ। এই  অদ্ভুত উৎসবটির  জন্ম একটি প্রাচীন সেল্টিক ফেস্টিভ্যাল ‘সাহউইন’ থেকে।  প্রায় সব ঐতিহাসিক এই বিষয়ে একমত প্রাচীন সেলটিক উৎসব সাহউইন, খ্রিষ্টজন্মের  বহু আগের উৎসব। এবং এটি শুরু হয় সেল্টিক অঞ্চল বা বর্তমানের আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সে।  সেই সময় মানুষরা তাঁদের নববর্ষ উদযাপন করতেন নভেম্বরের ১ তারিখে। তার আগের দিন অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর হলো সাহউইন পালন করার দিন। সাহউইন শব্দের গ্যালিক ভাষায় অর্থ হলো ‘গ্রীষ্মের শেষ’। এই দিনটা তাঁদের কাছে যেমন গ্রীষ্মের শেষ দিন, তেমনই ছিল ফসল তোলার শেষ দিন। পরের দিন বা ১ নভেম্বরকে ধরা হতো অন্ধকারাচ্ছন্ন শীতের শুরুর দিন হিসেবে। প্রাচীন সেল্টিক মানুষরা বিশ্বাস করতেন ৩১ অক্টোবর দিনটি ভূতুড়ে।

এই দিনে পৃথিবীতে জীবিত ও মৃতের মধ্যে পার্থক্য মুছে যায়।  তাঁরা বিশ্বাস করতেন এই দিনে ভূতরা পৃথিবীতে ফিরে আসে। রাস্তা ঘাটে মানুষের চেহারা ধরে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু ভূতেরা এসে ফসলের ক্ষতি করে দেয়। যেহেতু ফসল তোলার শেষ দিন তাই ভূত তাড়াতে মানুষরা নিজেরাই ভূত সাজতো।  এবং কৃষিজমির ধারে বড় আগুন জ্বালাত। বাঙালি হিন্দুরা দোলের আগের দিন পুর্ণিমা রাতে যেরকম চাঁচর বা ন্যাড়া পোড়া করেন, অনেকটা সেরকমই।  রাস্তায় রাস্তায় মানুষ-ভূতদের দেখে এবং আগুন দেখে নাকি ভূতের দল ভয় পেতো। এলাকায় আগে থেকেই ভূতেরা আছে ভেবে আসল ভূতেরা এলাকায় ঢুকতো না। ফলে ভূতদের উপদ্রব থেকে বাঁচতো কৃষক জনপদ।

এই প্রথাটি চলত সমগ্র সেল্টিক অঞ্চল জুড়েই। মধ্যযুগে সেল্টিক অঞ্চলে  খ্রীস্টান ধর্মর প্রবেশের পরও সুপ্রাচীন এই প্রথাটি চলতে থাকে। খ্রিস্টানরা সাহউইন উৎসবটির নাম পরিবর্তন করে দেন। সাহউইন উৎসবের নাম হয় অল-হ্যালোজ-ঈভ। ধীরে ধীরে উৎসবটা  গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে। শহরের ভিতর তো বড় আগুন জ্বালানো যাবে না সুতরাং বনফায়ার বন্ধ হয়ে গেলো।  সেই জায়গায় ফাঁপা কুমড়ো বা লাউয়ের মধ্যে মোমবাতি জ্বালানো শুরু হলো।  এই সব্জিগুলো দামেও সবচেয়ে কম,উৎপাদন বেশি এবং আগুন কুমড়োর ভেতরে থাকে বলে ছড়ানোর ভয় থাকে না।

বিখ্যাত  কালচারাল ক্রিটিক ডেভিড জে স্কাল এটা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন।  তিনি বলছেন এই প্রাচীন ছোট্ট সেল্টিক উৎসব কালের চক্রে বিবর্তিত এবং বিবর্ধিত হতে হতে আজ একটা আলোড়ন সৃষ্টিকারী মার্কেটিং ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। স্কাল একটি লেখায় বলেছেন, খ্রিস্টানরা প্রথমে এটিকে ধর্মবিরোধী কাজ বলে মনে করলেও, কিছু ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ব্যবসায়ী এই ছোট্ট প্রথাটির মধ্যেও ব্যবসার আলো দেখেছিলেন। তাই আগুনের বেগেই ইউরোপ ছাড়িয়ে উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল এই অল-হ্যালোজ-ঈভ যা পরবর্তীতে প্রাচীন সেল্টিক উৎসব সাহউইনের উইন অংশটা নিয়ে পরিণত হয়  হ্যালোউইন-এ। এখন হ্যালোউইন একটি কোটি কোটি ডলারের  ইভেন্ট। ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা দেশে। ভূতের পোশাক, মোমবাতি, টুনিবাল্বের চেন, নকল কঙ্কাল, ভূতুড়ে মুখোশ ব্যবসায়ীরা সারা বছর এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন।     তাঁদের সঙ্গেই , এক গাল হেসে গোছাগোছা পাউন্ড,ডলার পকেটে ভরেন কুমড়োচাষীরাও।

Shares

Comments are closed.