বুধবার, অক্টোবর ১৬

থিয়েটার রিভিউ: কালিন্দী ব্রাত্যজনের ‘ওঃ স্বপ্ন’

শমীক ঘোষ:  এটাই পৃথ্বীশ রাণার এখন অবধি সেরা কাজ। তবু আমি একটু কনফিউজড।

কেন কনফিউজড সে কথায় পরে আসছি।

সেট খুব কম। শুধু মাত্র ছ’টা চেয়ার। আর পেছনে একটা প্রোজেকশন স্ক্রিন। সেই স্ক্রিনও সোজা প্রজেকশন নয়। স্লান্টিং প্রজেকশন। সেই স্লান্টিং প্রজেকশন স্ক্রিনটাই এই নাটকের অন্য এক কুশীলব।

নাটকের শুরুতে ওই স্লান্টিং স্ক্রিনেই দেখা যায় নাটকের টাইটেল কার্ড। একদম সিনেমার মতো। ওপর থেকে পড়া স্পটলাইটে স্টেজের নানা প্রান্তে এসে দাঁড়ান নাটকের মূল চরিত্ররা। ঘোষক পরিচয় একে একে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁদের সঙ্গে।

এই নাটকের ‘এ টু জেড’ ব্রাত্য বসু নাটকের কুশীলবদের সঙ্গে পরিচয় করানোর এক নতুন ধারণা তৈরি করেছেন। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি পৃথ্বীশ ক্রমশ সেই পথেই হাঁটছেন।

বাদল সরকারের নাটক শনিবার। সেটাই পৃথ্বীশ মঞ্চস্থ করছেন ‘ওঃ স্বপ্ন’ নাম নিয়ে। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির সন্তান দিব্যেন্দু। কাজ করে এক বড় ঠিকাদার সংস্থায়। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে দিব্যেন্দু। অফিসের কাজে অসাধারণত্বের পরিচয় দেওয়াই তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

এই দিব্যেন্দু যেন বাঙালি জীবনের আর্কেটাইপ। অফিসের কেরানী জীবনের উন্নতিই যাঁর জীবনের অভীষ্ট। আর বাকি সব কিছু তাকে ঘিরেই। ব্রিটিশ আমলের সদাগরি অফিসের কেরানি থেকে হালের ঝা চকচকে আইটি ফার্মের কর্পোরেট কেরানি, যূগে যূগে এই রূপেই তো বিরাজমান বাঙালির মেধাবী একটা অংশ।

আর সেই অফিসেরই দিব্যেন্দুর অন্য দুই সহকর্মীর নেশা ক্রশওয়ার্ড করা। যে সে ক্রশওয়ার্ড নয়। এই ক্রশওয়ার্ড আসলে একটা লটারি। যার বহু টাকা পুরস্কার মূল্য আমূল বদলে দিতে দিব্যেন্দুর মতো সাধারণের জীবন।

উত্তর কলকাতার আটপৌরে জীবনের ছবি যেন আঁকা হয় দিব্যেন্দুর বাড়ির সিনগুলোয়। অথচ সময়টা উচ্চারিত হয় না একবারও। নাট্যনির্দেশক ছবিটা এঁকে দেন চরিত্রদের বাচন ভঙ্গিমায়। সাজসজ্জায়। টেক্সটেই থাকা ওই সময়ের ছোট ছোট দৃশ্য তাকে সাহায্য করে।

আর থাকে আবহ। রেডিওর খুব চেনা কিছু শব্দ আর গানের প্রক্ষেপন আসলে সময়টাকে সুনির্দিষ্ট ভাবে আরোপ করে দেয় দর্শকের সামনে। এই নাটকে শব্দ-আবহের ব্যবহার দারুণ। তবে শব্দগুলো প্লে করার শেষটা আরও যতিহীন হলে হয়ত ফিল্ম/ অডিও ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে প্রতিনিয়ত পরিচিত দর্শকের কানে আরও সুবিধে হত।

একই ভাবে আঁকা হয় অফিস জীবনের ছোট ছোট ছবিও। ওই সামান্য ছ’টা চেয়ারের অবস্থান পরিবর্তন করা মিনিমালিজম নিয়ে যায় দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে।

কিন্তু এ তো শুধু একরৈখিক জীবনের ছবি নয়। এ হল জীবনের অভিঘাতে ঢাকা পড়া মানুষের স্বপ্নের আচম্বিতে ফোরগ্রাউন্ডে চলে আসা। যখন সত্যি জীবন একটু ঠেলে পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। আবার এই স্বপ্নগুলোও জীবন থেকে উঠে আসা। জীবনের ভীষণ চাপে পড়ে ঢেকে যাওয়া সাধারণ মানুষের ছোট ছোট ইচ্ছে-বাসনা।

স্ট্রিম অব কনশাসনেস যেন উঠে আসে মঞ্চজুড়ে। আবার সেই স্লান্টিং প্রজেকশনের ব্যবহার। এইবার ব্যবহৃত হয় সিনেমার দৃশ্য। সত্যজিতের নায়ক থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী, বার্গম্যানের সেভেন্থ সিলের ছোট ছোট দ্রশ্যের মন্তাজ ব্যবহার করা হয় দিব্যেন্দু স্বপ্ন-কল্পনা-বাসনা-ধাক্কা খাওয়ার প্রেক্ষাপট নির্মাণ করতে।

আর এর সঙ্গেই যোগ্য সঙ্গত করে পরিচালকের কোরিওগ্রাফি, ডিজাইন। কঠোর বাস্তবকে আরও বেশি থিয়েটার উপযোগী, বা বলা চলে ড্রামাটিক করে তোলে মঞ্চে কুশীলবদের হঠাৎ বদলে যাওয়া অতিবাস্তব-অবাস্তব অভিনয়। যেমন ধরা যাক দিব্যেন্দুর বসের সঙ্গে কথা বলার সময় সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজের আদল আনা। তৈরি করে অসামান্য কিছু মুহূর্ত।

আর ফিল্ম প্রোজেকশনের সময়গুলোতে, এই পরিচালকের এই কোরিওগ্রাফি অন্য মাত্রা পায়। যেমন একটা সত্যজিতের নায়ক ছবির অরিন্দমের স্বপ্ন দৃশ্যে টাকার মধ্যে ডুবে যাওয়ার সঙ্গে মঞ্চে দিব্যেন্দুর তুলে ধরা হাতকে মিলিয়ে দেওয়া।

দিব্যেন্দুর চরিত্রে অসাধারণ সুমন্ত রায়।  গোটা মঞ্চ জুড়ে তাঁর শরীরী অভিনয় বহু দিন মনে থাকবে। বেয়ারার চরিত্রে মূক থাকতে থাকতে হঠাৎ কথা বলে ওঠা সুরজিৎ পালের অভিনয়ও মনে থাকবে অনেকদিন।

আর মনে থাকবে পৃথ্বীশের তৈরি করা অসাধারণ মুহূর্তগুলো।

তবে এরপরও কনফিউশন আছে।

কনফিউশন কী? থিয়েটারের অন্যতম আইকন বাদল সরকারের নাটককে বর্তমানের দাঁড় করালেন পৃথ্বীশ। অথচ চরিত্রগুলোর সময়টাকে বেঁধে রাখলেন আরও অনেক আগে। ঠিকাদারি অফিস থেকে দিব্যেন্দুকে কি দাঁড়া করানো যেত না আইটি ফার্মের বর্তমান দুনিয়ায়। ঝা চকচকে মাল্টিপ্লেক্স, শপিং মলের অন্তসারশূন্য বাস্তবে?

আর পেছনে ব্যাক প্রজেকশনে ব্যবহার হওয়া সিনেমাগুলো এত চেনা কেন? হয়ত দর্শকের সঙ্গে এই দৃশ্যগুলোর বহুদিনে পরিচয় মুহূর্তের নির্মাণে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন পৃথ্বীশ রাণা। কিন্তু নাটকটা যখন বাদল সরকারের, বাস্তব আর অবাস্তব, স্থান-কাল-পাত্র যেখান মুহুর্মুহু বদলে যেতে পারে, সেইখানে মুভিং ইমেজের ব্যবহার আরও অন্যরকম হতে কি পারত না? হলে হয়ত আমার আরও বেশি ভালো লাগত।

Leave A Reply