থিয়েটার রিভিউ বিবর

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

পম্পা দেব

‘বিবর’ মানে গহ্বর।

‘বিবর’ সমাজ মনস্তত্ত্বের এক জটিল কাহিনী। যার ছত্রে ছত্রে রয়েছে আত্মদহনের বিবমিষা।

নীতার প্রেমিক আসলে নীতাকে হত্যার মধ্যে দিয়ে হত্যা করে তার চারপাশের নাগরিক অভিশাপ, সামাজিক বিষাদ। অর্থনীতিই ঠিক করে দেবে কী হবে সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস – হত্যাকারীর ছায়া পড়ে প্রতিবিম্বে। যে হত্যা একপ্রকার আত্মহত্যা।

পারিপার্শ্বিক অবক্ষয়ে আত্মগ্লানি, মনস্তাপ দীর্ঘ হলে তার দহনে পুড়তে পুড়তে তৈরি হয় যে কৃষ্ণগহ্বর, যে অমোঘ সুড়ঙ্গ, তারই মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে শ্যাওলা পিচ্ছিল হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার রাস্তা। মুক্তি মানে কেবলই হত্যা থেকে হত্যার মতো আত্মঘাতী সমাচার। তবুও এ পথেই পথ চাওয়া। বুলেভার্ড জুড়ে যতই থাকুক রক্তাক্ত আর্তনাদ, নিষিদ্ধ নিয়ম ভেঙে বেরিয়ে আসবে লুকিয়ে থাকা কার্তুজের ঘোষিত চিৎকার।

বীরেশ আর নীতার প্রেম, যৌনতা, আশ্লেষ, বিষাদ, বিরহ, বেদনা, আনন্দঘন নিবিড়তা, আর মুক্তি । মুক্তি মানে বন্ধনও। আসলে নীতা আর বীরেশের এই সম্পর্ক, এই বৃহত্তর পরিসরে সমগ্রকে ছুঁয়ে যায়। সেই যে স্ট্রাকচার আর সুপার স্ট্রাকচার এর খেলা, সেই যে অ্যালিয়েনেশনের খেলার নিয়ম মানা না মানার খেলা। আসলে সব সম্পর্কই কোনও ভাবে রাজনৈতিক, সমাজনীতির শিকার। যে মানুষ, যে চিন্তাশীল মানুষ তার মনোজগত ও বাহ্যিক জগতের আপাত জটিল ও সরল সমীকরণ থেকে নিজেকে কখনও ভীষণ ভাবে যুক্ত ও বিযুক্তিকরণের দোলাচলে ক্লিষ্ট, ক্লান্ত, ক্ষত-বিক্ষত হতে হতে আবারও মরমী মনের তাগিদে বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় চালিত হয়, বাহিত হয় তার কাছে সমাজের সংজ্ঞা ঠিক কী? সম্পর্কের জ্যামিতিক অবয়বটাই বা কীরকম। যে জীবনে স্বাভাবিকত্ব উহ্য থাকে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নীতি আর দড়ি টানাটানি, এক চক্রব্যূহ তৈরি করতে থাকে নাগরিক জীবনের এমনকী ব্যক্তি জীবনের স্বাধীনতার স্বত্তাকে কেন্দ্র করে,  যেখানে নাটক বা উপন্যাসের নায়ক আর ছায়াসঙ্গী নীতার সম্পর্ক, তার মৃত্যু, হত্যা, আসলে এই নাগরিক জীবনের আদতে স্বাধীনতাহীন, স্বার্থমগ্ন, জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় আচ্ছন্ন এক হতাশার কথা বলতে চায়। এই মুহুর্তের ডিজিটাল ইন্ডিয়া, আচ্ছে দিন, মেরা ভারত মহান হ্যায় থেকে নগরজীবন, গ্রামজীবন, কর্পোরেট সেক্টর থেকে সাধারণ মানুষের জীবনে যে ‘মন কি বাত’ বয়ে চলেছে, আর সাধারণ মানুষ কীভাবে সেই ফাঁপা ফাঁসে হতাশাজনক অবস্থায় জর্জরিত, সেই কথাই বারবার ফিরে আসে এই নাটকে।

অসামান্য নাট্যরূপ উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের। তাঁর সংলাপ চোখে জল আনবেই। এমনটাই তাঁর বরাবরের সূচক । নির্দেশকের মুন্সিয়ানায় এই রকম কঠিন, জটিল অথচ সরল এক উপন্যাসের নাট্যাভিনয় সম্ভবপর হয়েছে । দেবাশিস দত্ত বরাবরই এই রকমের কাজ করে থাকেন। আবহে দিশারীর মিউজিক বেশ যোগ্য সঙ্গত। আর পৃথ্বীশ রানার আলো এবং সেট। প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করতে করতে মনে হবে এক বিষন্ন, বিষাদঘন অথচ সম্ভাবনার নীল আলো হাতছানি দিয়ে ডাকছে ।

এক অজানা গহ্বর, নির্ধারিত গন্তব্য। এই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আলোর উৎসবে ফেরার রাস্তা হয়ে উঠবে এই পথ। যেখানে বীরেশ আর নীতার কথোপকথনের ভেতর দিয়ে ফুটে উঠবে এই পৃথিবীর, এই পরিপার্শ্বের যাবতীয় নিষিদ্ধ নিয়ম ও নিষ্ঠুরতা। মানবিক অধিকারে। নির্মাণের অভিনবত্ব ফুটে ওঠে নাটক শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেওয়ালে এই নাটকের মুখ্য উপদেষ্টা শ্রী ব্রাত্য বসুর ভাষ্য । হঠাৎই যেন স্বয়ং ঔপন্যাসিক কিছু কথা রেখে গেলেন। ১৯৬৫ এর ‘বিবর’ – ২০১৮-তে যে বার্তা বহন করে তা যেন সময়েরই ধারাবিবরণী । অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে আলোকবর্তী সময়। অভিনয়ে গুলশানারা অসামান্য। প্রান্তিক আর প্রসেনজিত যথারীতি খুব ভালো। ভালো লাগলো মানালিকে, কী মিষ্টি। আর অভি সেনগুপ্ত। এবং অনির্বাণ। অনির্বাণের অভিনয় যথেষ্ট সাবলীল। স্বচ্ছন্দ। রুবি দত্তকেও বেশ ভালো লাগলো।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More