থিয়েটার রিভিউ অথৈ জল

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

পম্পা দেব

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হিঙের কচুরি’ মনে পড়ে?

যার অবলম্বনে ‘নিশিপদ্ম’ (বাংলা) ও ‘অমর প্রেম ‘ (হিন্দি) চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। বিখ্যাত দু’টি সিনেমা। দেহোপজীবীদের নিয়ে গল্প এগিয়ে যায়। বিভূতিভূষণের গল্প উপন্যাসে এমন স্ত্রী চরিত্র প্রায়শই দেখা যায়। বাইরে থেকে দেহোপজীবী নারী, কিন্তু অন্তরে ভিন্ন রূপ। মানবিক  জীবিকা আর জীবন এক নয়। এই সন্ধান বা বলা ভাল মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন সংবেদনশীল সন্ধান – ‘মনে তার নিত্য আসা যাওয়া’।

পূর্ব-পশ্চিমের ‘অথৈ জল’, উপন্যাস বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নাট্যরূপ উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদন, পরিমার্জনা ও নির্দেশনা ব্রাত্য বসু। বিভূতিভূষণের সাহিত্য নিয়ে প্রথম মঞ্চায়ন। এক জন প্রকৃত অর্থে শিল্পীর জীবনের মননশীলতার কিছু নিরুচ্চার শব্দ থাকে। যা তাঁকে নিরুদ্দেশী করে, ঘর ছাড়া করে, পূর্ণ করে, শূন্য করে, আবার সেই শূন্যের ভিতর অন্য পূর্ণতা আসে। শূন্যের খেলা একমাত্র প্রকৃত শিল্পীই অনুধাবন করতে পারেন। সেই শূন্যতাকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে চূড়ান্ত রূপ দিতে পারেন। আসলে এম্পটি স্পেস বলে কিছু হয় না। তবে কি না খালি চোখে এই সব অপরূপ দৃশ্য দেখা যায় না। সম্পর্কের সরল আর অতি মৌলিক,  সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অবস্থাকে ধারণ করে নাটক এগোয়। পান্না আর শশাঙ্কের ভালবাসা পবিত্র। পাপহীন। কারণ সেখানে কোনও ব্যক্তিস্বার্থ নেই। পরস্পর ভেসে চলে খড়কুটোর মতো। জলের সরলমতী স্বভাবে। অন্য এক ভালবাসা। যেন শিশুর মতো ‘এইই দু টাকা’… আর অনাবিল অকারণ হাসি।

কবিতার ইমেজারিতে ভরপুর এই নাটক। যেন হাজারটা কবিতার জন্ম হবে। নমস্য বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। যিনি ‘পথের পাঁচালী’র অপূর্ব ঈশ্বর, যিনি ‘আরণ্যক, ‘দৃষ্টিপ্রদীপ, ‘দেবযান, ‘মেঘমল্লার, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল, ‘চাঁদের পাহাড়’ লিখেছেন, তিনিই ‘হিঙের কচুরি, ‘গিরিবালা, ‘অথৈ জল’ লিখছেন!  অপার বিস্ময়। আসলে প্রকৃত শিল্পী তো এমনই হন, ঐ যে নিঃশব্দতার শর্ত। তিনি হবেন বিশেষ ভাবে ব্যতিক্রমী । চেনা ছকের বাইরে তাঁর ছায়া বাজে। অতি সাধারণ দুর্বল চিত্তের বাইরের প্রান্ত রেখায় হেঁটে যাওয়া অচেনা মানুষ। মুগ্ধকর জাদুকর। কমফোর্ট জ়োনের বাইরে যিনি ব্যতিক্রমী কাজ করার জন্য সদা প্রস্তুত। বিভূতিভূষণও তাই।

এই নাটকের নাট্যরূপকার, নির্দেশকও সেই অসামান্য কাজটাই করেছেন।  আর চরিত্রায়নে প্রণম্য দেবশঙ্কর হালদার। তিনি এই নাটকের সম্পদ। প্রাণ। এত দিনের সব কাজের বাইরে এ এক অপূর্ব বিস্ময়। চোখের সামনে সব্যসাচী সেন থেকে জর্জ বিশ্বাস থেকে বিজয় নারায়ণ থেকে ভেসে ভেসে ফুটিয়ে তুলেছেন শশাঙ্ক মুখার্জি। আহা! কী অসামান্য দেহবল্লব শোভিত, অধিকারী তিনি গলায় হারমোনিয়াম, নাচের মুদ্রায় ধরা দিয়েছেন, প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন চরিত্রের। কী সহজ সরল। আর ছোটো ছোটো মুখচ্ছবি উল্লাসে উচ্ছ্বাসে অজানাকে জানার সরল উৎসাহে কি ভীষণ সুন্দর। পান্না দারুণ। আর সঙ্গীত, বিশেষত আবহ সঙ্গীতের উল্লাস বিষাদের মিশ্র অনুভূতিমালা সমস্ত সময় জুড়ে বিরামহীন এক চিরজীবী চরিত্র হয়ে উঠেছে। সমগ্র নাটকটি প্রথম থেকেই একেবারে শেষ মুহূর্ত অবধি যাত্রাপালার ঢঙে নির্মিত। দর্শক হিসেবে মনে হবেই এ এক যাত্রাপালা চলছিল।

দেবশঙ্কর হালদার অভিনব এই নাটকে। অন্য এক দেবুদা। আর শাবাস পৃথ্বীশ রাণা!  কী অসামান্য মঞ্চ নির্মাণ। মঞ্চ ডায়াসকে যে ভাবে ঘোরানো হলো, অসাধারণ। একটাই বেস। তাকে বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনও তা ডিসপেন্সারি, কখনও নৌকা, কখনও নাচনী কুঠি, কখনও শশাঙ্ক-পান্নার পাতানো সংসার, কখনও সেটাই ডাক্তারের ভিতরঘর। আর দীনেশ পোদ্দারের অপূর্ব সুন্দর আলো! ঝাড়বাতিটির বিষন্ন অথচ উজ্জ্বল আলোর ছটা বড়ই সুন্দর । ইমন চক্রবর্তীর কন্ঠ অবদান কী ভাবে বলা যায়! মাতোয়ারা সুরে করুণ এক মায়া জড়ানো। আর কবিয়ালের গান। আর  ইন্দুদীপ সিন্হার দ্যুতির কোরিওগ্রাফি । একি মুদ্রা এঁকেছেন তিনি। অসামান্য ।
তেমনই বেশভূষা। পোশাক-পরিচ্ছদ। এতগুলো চরিত্রের মানানসই পোশাক নির্বাচন সহজ নয়। মালবিকা মিত্রা ও মধুমিতা ধামের চোখজুড়োনো চমৎকার পোশাক পরিস্থিতি অনুযায়ী। শেষ অবধি থিয়েটার একটা টিম ওয়ার্ক। সেটা ভাল হলে পুরো প্রযোজনাটিই সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত হয়। এই নাটকটির ক্ষেত্রেও এটি প্রমানিত ।

বন্ধুরা সম্ভব হলে উপন্যাসটি পড়ুন। আর নাটকটি দেখুন অবশ্যই। আসলে উপন্যাসটা একটা নির্মাণ,  আর তাকে গ্রহণ করে আর একটা  নির্মাণ হলো নাটকটি। পথের পাঁচালীও তাই। যে কোনও মহৎ শিল্প মাত্রই তাই। পূর্ব পশ্চিম নাট্যদল ও এই নাটকের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে অভিনন্দন, সাধুবাদ জানাই। বাংলা নাটক আরও সমৃদ্ধ হলো। একটা নির্মাণ থেকে আর একটা নির্মাণে (নভেল থেকে  থিয়েটার) পৌঁছতে গেলে তার দৃশ্যপট থেকে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য সমূহের যে নিখুঁত কারিগরী ভাবনা থাকে, তা প্রকাশের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে বিভিন্ন ইমেজারির শব্দ পাওয়া যাবে। এই নাটকে যেমন প্রথম থেকে শেষ অবধি  শশাঙ্কের স্কুল ও কলেজ জীবনের দুই অবিচ্ছেদ্য ছায়াসঙ্গী থাকে। তারা কখনওই পরিণত বয়সের শশাঙ্ককে ছেড়ে যায় না। এই ভাবনার মধ্যে মূলত দু’টি বিষয় কাজ করে।  এক: বিভূতিভূষণ নিজেও সারা জীবন নিজের ভেতরে নিজের শৈশব, কৈশোরকে আঁকড়ে বেঁচেছেন। তারা কিন্তু পথের যাত্রায় কোনও বাধা দেয়নি বরং এক অপার্থিব শিশুসুলভতা সমগ্র জীবনব্যাপী তাঁকে ছায়ায়-মায়ায় ভরিয়ে রেখেছে। যা তাঁর অন্যান্য সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে, অনাবিল আনন্দের সরল এক সংকেত এঁকে রেখে গেছে।

দুই : এই নাটকের ক্ষেত্রে দেখি বালক ও কিশোর শশাঙ্কের জীবনে আবাল্য, আকৈশোর এক নীতিমালা মেনে চলার অভ্যাস । আর সে যতই বড় হয়েছে, ততই তার গ্রামজীবন যেন তাকে টেনেছে। সে বারবার স্মরণ করিয়ে দিত নিজেকেই নিজে,  এই বাতাসী গ্রামে সে এক দিন ফিরবেই ফিরবে। আর এই সূত্রে ফেরার পথে  এই সুখের সংসার, পুত্র, কন্যা, স্ত্রী সুরবালা যিনি স্বামীর গরবে গরবিনী, স্বামীর জন্য উদ্দিষ্ট জীবন, এমনই যার যাপন। গ্রাম সমাজে বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে শশাঙ্ক ডাক্তারের যথেষ্ট সুনাম আর সেই সুবাদে সেই সব মানুষদের কাছে তাঁর সম্মানও ছিল খুবই। একদিন মঙ্গলগঞ্জে নাচনীদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ আর সেখানে সব চেয়ে সেরা ষোড়শী পান্নার প্রেমে পড়ে সে। প্রেমমোহ তাকে টেনে নিল সংসার থেকে পথে প্রান্তরে।

তবে সে সম্পর্কে কোনও স্বার্থ নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যত নেই, যা আছে তা শুধু ভেসে চলার অসীম আনন্দ। মেঘের মতো।কখনও তা গভীর হলে বৃষ্টি, কখনও আবার শুধুই ভাসমান এখানে ওখানে। এই মান অভিমান তো ঐ মস্করা খুনসুটি । কিন্তু নারীর অধিকার বোধ হঠাৎই জাগ্রত হলে তা বুঝি সূক্ষ্ম ফাটলকে বৃহৎ পরিসরে করে তোলে। এ ক্ষেত্রেও সরল সহজ শশাঙ্ক পান্নার প্রতি শারীরিক ভাবে আগ্রহী না হওয়ার কারণে পান্না অপমানিত বোধ করে । সে ভাবে সুরবালাকে অতিক্রম করে শশাঙ্ক তার কাছে পূর্ণ সমর্পণ করতে পারছে না নিজেকে। শেষমেশ একটা হেস্তনেস্ত হয়, পুলিশ আসে। পান্নার মা (নাচনীদের দালাল) এসে তাকে নিয়ে যায়। শশাঙ্ক ফিরে আসে  সংসারে।

এখানে শেষ অঙ্কটি অসামান্য । ভরন্ত সংসারে ফিরে আসে শশাঙ্ক ডাক্তার, তার পূর্ব জীবনের সমস্ত কিছু সমেত। কিন্তু তার মনের মণিকোঠায়,তার একান্ত ‘ভেতরঘরে’ চিরদিনের জন্য রয়ে যায় পান্না। এই দৃশ্য নির্মাণের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য অবশ্যই মঞ্চাভিনয় দেখতে আসতে হবে দর্শকদের।

পম্পা দেব থিয়েটার কর্মী ও কবি। 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More